Thursday, 13 November 2014

প্রেম বিবাহ পরকীয়া

অঘটন টা শেষ মেস ঘটেই গেল । দিল্লিতে এসে আমি ঝপাৎ করে প্রেমে পড়ে গেলাম । হ্যাঁ ,একেবারে প্রথম দর্শনেই । কোন বুদ্ধি যুক্তির ধার ধারলো না। আমি পান্ডারার দিওয়ানা হয়ে গেলাম । আমার সেই প্রেমিকের নাম পান্ডারা । কয়েকমাস আগেও আমার জীবনের মানচিত্রে তার কোন অস্তিত্ব ছিল না । ইন ফ্যাক্ট তাকে আমি চিনতামই না । তার শান্ত ক্যাজুয়াল অথচ স্মার্ট চেহারা আমার মন  ভরিয়ে দিচ্ছে ।   প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে আমি পান্ডারার অলি গলি পথে পথে প্রায় প্রতিদিনই ঘুরতে থাকি । তার চারদিক জুড়ে ব্যাস্ত দিল্লির গাড়ি ঘোড়া । কিন্তু সে কেমন অবিচল । কী ভীষণ উদাসীন , হ্যান্ডসাম আন্ড কুল ।   তার সবুজ রঙ করা বাঁশের কঞ্চির বেড়ায় মাধবীলতার অজস্র  উপচে পড়া ফুল । আমি যেন দু চারটে ভোমরাও দেখতে পেলাম । আর আমার প্রিয় ফ্র্যাঙ্গিপানি কাঠগোলাপ জায়গাটাকে ছায়াময় করে রেখেছে ।  ভেজা শিউলি তার অলিন্দে কেমন ঝরে ঝরে পড়ছে । মনে মনে কঠিন সঙ্কল্প নিলাম যে  এর গলাতেই মালা পরাতে হবে , নইলে দিল্লির এই পরবাস বৃথা , একেবারেই বৃথা ।   মনের কথা জানাজানি হতেই অমনি হিংসুটের দল বলতে শুরু করল পান্ডারার ফ্যানক্লাব নাকি জবরদস্ত । তার পেছনে  লম্বা লাইন । সে লাইনে বড় বড় সব রাঘব বোয়াল । আমার মত চুনো পুঁটি পাত্তাই পাবে না । সে কি কথা ! হোমড়া চোমড়াদের জন্য তো কত্ত বড় বড় পেল্লাই সব বাড়ি আছে । তারা সেখানেই যাক না । কিন্তু প্রেমের পথ কি কোনোদিন  ফুল বিছানো ছিল ? বন্ধুর দল  বলল, আরে বেজায় কম্পিটিশনের খেলায় নেমেছ! পান্ডারার পাণি প্রার্থী হতে হলে কলজের জোর লাগে ।  আমি তখন গভীর প্রেমে হাবুডুবু । দেখি ,সে আমাকে কতটা চায়?
পান্ডারার সবুজ জমিতে আলোছায়ার আলপনায় আমি তখন অলরেডি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি । একটা লতানো জুঁই লাগালে কেমন হয়? নেশার মত আমার মন তার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে  যাচ্ছে কখনো । আমি দেখতে পাচ্ছি সেমি  সার্কুলার   ছোট্ট কাঁচ ঢাকা বারান্দায় আমি জ্বেলে দিয়েছি ডোম ঢাকা নরম আলো । আর সেই লাল কালো কিলিমের ওপর বাহারি সুজনি আর কুশন । কল্পনার গোরু তত ক্ষণে  মগডালে   চড়ে বসেছে।



“তোমার কুকুর আছে? খিদমৎ খাটার জন্য  গুটিচারেক বান্দা?  নেই তো? একা একা থাকবে? তাহলে পান্ডারার স্বপ্ন ছাড়ো । কোন মাল্টি স্টোরিডের দ্বারস্থ হও ।“
এত সহজে হার মানার  পাত্রী আমি নই । আমি জানি এ বিবাহ সম্পন্ন হবে অনলাইনে । বরপক্ষ খোদ সরকারি দপ্তর । চুপিচুপি লিস্ট খুলে দেখি আরে, কি আশ্চর্য  ! পান্ডারায়  মাল্টিস্টোরিড ! তার মানে পান্ডারাও আমাকে চায় ! আমি হ্যাংলার মত প্রেম নিবেদন করতে ছুটে চলে যাই তার কাছে । কিন্তু এ কী ! সর্বাঙ্গ পোড়া আমার প্রেমিক ! চারদিকে শুধু পোড়া কালো দাগ । জানতে পারলাম এ সি ফেটে গিয়ে নাকি এমনটা হয়েছে । আহা রে ,তাতে কী ? আমি তোমাকে ছাড়ব না । সে তুমি যতই কালো হও ।
ওর সেরে উঠতে অনেক সময় লাগবে । লাগুক । দুটো সুটকেসে বন্ধ জীবনের  যন্ত্রণা নাহয় আরো কিছু দিন মেনে নেব ।
পাত্রী স্বয়ম্বরা । বিবাহের দিন ফাইনাল লিস্ট খোলা হল । নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না । সে নেই ।   কোথাও নে ই । সে চলে গেল , বলে গেল না , সে কোথায় গেল ফিরে এল না ।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বরপক্ষ কে ফোন করি ।
পালিয়ে গেছে মশাই । পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে । ইলোপ । বুঝলেন না । এরকম কতো হয় । কতলোকের বুক ভাঙ্গে । কতো চোখের জল বয়ে যায় ,কে তার হিশেব কবেই বা রেখেছে ? দুঃখ করবেন না ।  আরো কতো ভাল ভাল পাত্র আছে ।
এমন নির্লিপ্ত বাবা মা আমি চোদ্দ পুরুষে দেখিনি ।
স্তোকবাক্য যাই দিক না কেন , লিস্টের মধ্যে আরো  একটা পান্ডারা ছিল । সোনামণিটা !
দিলাম বোতাম টিপে । তারপর অপেক্ষা আর অপেক্ষা ।
তারপর বসন্তের বাতাসের মতো আমাকে হাহাকারে ডুবিয়ে দিয়ে সেও কার হাত ধরে চলে গেল আমার সামনে দিয়ে ।
অভিভাবকের দল,বন্ধুর দল এবারে হই হই করে উঠল , অনেক হয়েছে , ঢের হয়েছে  প্রেমের কাঁদুনি পনা । কেন,বাকি পাত্রগুলো কী দোষ করেছে ?   তারা তো ওরই তুতো ভাই  । না হয় কারুর মাথায় টাক , একটু ভুঁড়ি , বা একটু বদমেজাজ । তোমাকে একটু মানিয়ে চলতে হবে বাপু । বিয়ে টা অ্যা ডজাস্টমেন্ট ছাড়া আর কি !
আবার আমি গৃহহীন । আমি আর দু টো সুটকেস ।
আবার একটা মাসের অপেক্ষা । আমার পান্ডারাপ্রেম কিন্তু অমলিন ,অবিচল একনিষ্ঠ । সব উপদেশ পরামর্শ আমি পূর্ব রাগের রাধার মত এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছি ।
আবার লিস্টি খোলা হল । একটা নয় এবার দু দুটো পান্ডারা । নাহ এও আমাকে বড্ডো ভালবাসে ।
 এবারে  গুরুজনের দল এমনকি খোদ বরপক্ষ আমার এই পাগলপনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল । পাত্রপক্ষ তো বলেই বসল, শুনো বেটা, অ্যায়সা   মত কর । পান্ডারার দিওয়ানাপন ছাড় । ও তোকে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দেবে না । বেটা শাদিমে সবসে ইম্পরট্যান্ট হ্যাঁয় সিকিওরিটি ।
এমন পাত্রকে বেছে নে যে তোকে সেফটি সিকিওরিটি দেবে । এই দ্যাখ একটা জবরদস্ত পাত্র তোরই অপেক্ষায় বসে আছে । টল ডার্ক হ্যান্ডসাম  । আর স্ট্যাটাস ? পান্ডারার চেয়ে অনেক বেশি । পান্ডারার আছে টা কি? মিস্টি মিস্টি কথা বলে লোক পটায় । আওয়ারাগিরি করে খালি। তু যাকে একবার দেখ লে তো সহি ।
সবাই ঠেলেঠুলে পাঠাল । আবাহন ও নেই । বিসর্জন ও নেই । বড়লোক পাত্র । পয়সার জোর আছে । এমনই লম্বা যে চোখ কপালে তুলতে হয় । ইয়া বড় ছাতি । নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ।   কেঠো চাল । মিষ্টত্বের নাম গন্ধ নেই । ভেরি ম্যাটার অফ ফ্যাক্টলি । তবে এমন পাত্র হাতছাড়া করলে পস্তাবে । শেষে প্রেম জানালা দিয়ে পালাবে ।  বড় মাপের দিল দরাজ অথচ কতো গুছোনো সাবধানী দেখেছ আমাদের পাত্র । এমন হাতে তুমি পড়লে আমাদের শান্তি ।



মনে হতে লাগল পান্ডারা যদি এবারো আমাকে ফাঁকি দেয় । তার মিথ্যে আশ্বাসে এতদিন ধরে দুটো সুটকেসে বন্দী আমার জীবন যে হাঁপিয়ে উঠেছে । আশা নিরাশায় নানান দোটানায় রামকৃষ্ণ পুরম কে একটা টিক লাগালাম ।
প্রতিদিন    লিস্টি খুলে খুলে দেখি । আর মনে মনে শিহরিত হই । আমি এক নম্বরে । পান্ডারা আমাকে চায় । রেখনা বেঁধে আমায় ...।।
বিয়ের দিন সমাগত ।  ঘোষণা করল বরপক্ষ, রামকৃষ্ণপুরমের হাতে তোমাকে আমরা সঁপে দিলাম । সুখী হও মা ।
কেন? কেন ? কেন ? পান্ডারা নয় কেন? সে তো আমাকে এবারে  খুবই চেয়েছিল । কিন্তু তুমি তো তার প্রেমে ভরসা পুরোপুরি রাখতে পারনি ।
আমি ভীষণ কাঁদতে কাঁদতে ওদের বলি প্লিজ আমাকে পান্ডারার হাতে তুলে দিন । আমার এতদিনের কতো স্বপ্ন কল্পনা । মাধবীলতাবিতান , সবুজ গালচের মত ঘাস , হাতের মুঠোয় ইন্ডিয়া গেট , কানের পাশে খান মার্কেট , ঢিল ছুঁড়লেই অফিস ।
এত বড়লোক পাত্রের হাতে তুলে দিলাম ।তাও মন উঠছে না । ওই ভ্যাগাবন্ড টাকে নিয়েই পড়ে আছো? এবার ঘরে গিয়ে ওঠো । শুরু কর সংসার । পান্ডারাকে বাকি সময়ের জন্য ভুলে যাও।    
সংসার তো শুরু করলাম । মনের মিল হল কই । প্রথম রাত বিনিদ্র রজনী । প্রেমালাপে নয় । রাতভোর ইয়া বড় বড় লরি আর ট্রাকের আওয়াজে ।   বাড়ির সামনে দিয়ে দিনভোর রাতভোর যান বাহনের স্রোত । আর তাদের পিলে চমকানো আওয়াজ । অনেক সম্বন্ধ করা বিয়ের মত এই বিয়েতেও অনেক কিছু খবরাখবর নেওয়াই হয় নি ।
ও একটু আধটু দোষ থেকেই থাকে । হিরের আংটির আবার বাঁকা ট্যারা কি? আর কোন অসুবিধে হচ্ছে কি ? সুখ সুবিধের ? নাহ ,আর কোন অভিযোগ নেই আমার । কোন কিছুর অভাব সে রাখেনি । তবুও, বুড়ো তুমি লোকটি ভাল চেহারাও নয় তো কালো , তবু কেন তোমায় ভালবাসছিনে?  সেই প্রেম আর ফিরে এল না ।
প্রতিদিনের জীবন গতানুগতিক বয়ে যায় । আমার প্রেমহীন সুখের জীবন যন্ত্রের মত এগিয়ে চলে । আমার ঘুমহীন রাতে তার কিছু যায় আসে না । সে শুধু জানে আমার কোন অভাব সে রাখেনি । মনের ধার ধারতে তার বয়েই গেছে । 
কিন্তু আবার বসন্তের বাতাস বয় । মাধবীলতার গন্ধ আর ভোমরার দল আবার ফিরে ফিরে আসে । আমি আবার প্রেমে পড়ি ।
সোজা পথে বাড়ি ফিরি না ।জেনেশুনেই । একটু বেঁকে মিটমিটে আলো জ্বলা পথ, যত্ন করে বাঁধানো  মসৃণ রাস্তা ।    কোন শব্দ নেই , চারদিক চুপচাপ ।   ভারি শান্ত । পরিপাটি  সাজানো গাছের সারি ।   ।চৌকস  সুন্দর কেতাদুরস্ত নিউ মোতি বাগ আমাকে হয়ত চেনেই না । চেনার কথাও নয় । তাকে পাবার আশাকে দুরাশাই বলা যেতে পারে । কিন্তু ভালবাসতে বাধা কই? যদি কখনও আমাকে সে চিনে নেয় কোনো এক ফাল্গুনের দিনে? কে বলতে পারে? শব্দহীন রাতের স্বপ্নভরা ঘুম যদি আবার ফিরিয়ে দেয় ? 



এই হল আমার প্রেম বিবাহ পরকীয়া।
 সেই অর্থে ননাসুদুর গল্প নয়  ( নরনারীর সুখ দুঃখ –পূষন দেব উবাচ)
হতাশ হলেন?
জানতাম ! 


















Tuesday, 23 September 2014

বনস্পতির ছায়া




 আমাদের আশাবরী বাড়িটার  সবচেয়ে ভাল লাগার জায়গা  ছিল তিনতলার বারান্দা ছোঁয়া কদম আর শিরীষ গাছ । হাত দিয়ে তাদের পাতা ধরা যেত । বারান্দায় পড়ে থাকত কদম আর  শিরীষ ফুল । সেই কারণেই  বারান্দায় আমরা গ্রিল লাগাই নি ।  গাছের পাতাগুলো ছাতার মত জায়গাটাকে ঘিরে থাকত । ভারি স্নিগ্ধ আর নরম ।

বাড়িটার আরো একটা ল্যান্ডমার্ক ছিল , সামনে ছিল একটা ন্যাড়া পার্ক । চোখের দৃষ্টি কোথাও আটকাত না । অনেকটা আকাশ দেখা যেত ।   পুবের নরম রোদ সকালবেলায়   বারান্দার দরজা দিয়ে লাজুকভাবে ঢুকে খাবার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো  মঞ্জুষা থেকে  কেনা মা দুর্গার তেলতেলে মুখ টা য়  এসে পড়ত ।  তখনই বাবার ধ্যানে বসার সময় । কখনও স্তোত্রপাঠ, একটু পরেই চা আসবে । বাবা চাএর ব্যাপারে খুঁতখুঁতে । সকালের চা ভাল হওয়া চাই। ন্যাড়া পার্কে পাড়ার বাচ্চারা  খেলত । আমরা বাড়ির ঠিকানা বলার সময় বলতাম ,ন্যাড়া পার্কের  ঠিক সামনের বাড়িটা । কিন্তু  পার্ক টার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ওখানে পাড়ার দুর্গা পুজো হত।   বাড়ির সামনেই পুজো ।এর থেকে ভাল আর কিছু হয় নাকি? গাছের ডালপালা আর ঘন পাতার চালচিত্রের মধ্যেই প্যান্ডেল বাঁধা হত।সেটাই ছিল  মন্ডপের শোভা । বেশ দেখাত ।
অষ্টমীর দিন বাড়িতে বাবা চন্ডী পড়তেন শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে ।

পুজো মন্ডপেও বাবাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হত চন্ডীপাঠ করার জন্য।  মুখের সামনে কোন বাড়ি না থাকাটা আমাদের  বাড়ির একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল।  ফাঁকা জমিটার কোন মালিক ছিল না। অন্তত পাড়ার পুরোন লোকেরা কিছু জানত না। বাবা পাড়ার মাতব্বরদের বলেছিলেন ওখানে বেড়া দিয়ে বাচ্চাদের একটা পার্ক করে দিতে ,তাহলে জবরদখলের হাত থেকে জমিটা বাঁচতে  পারে। এক চিলতে  জমি কোথাও খালি পরে থাকে না । বলাটাই সার । কেউ গায়ে মাখে নি । বিনি পয়সায় কিছু পেলে তার কদর থাকে না ।

একদিন দেখা গেল জমিটার চারদিকে কিছু নতুন মুখের আমদানি। নানান রকম গাড়ি, ওজনের ভারে জাহাজের মত দুলতে থাকা লোকজন,পান পরাগের পাউচ । ক্রমশ প্রকাশ্য রহস্য গল্পের মত জানা গেল জমিটার নাকি একটা মালিকও আছে । তার কাছে  সব কাগজপত্র আছে । পাড়ার লোক তো শুনে থ । আরো জানা গেল সর্ষের মধ্যে ভূতের মত পাড়ারই কিছু লোকের মদত আছে এর পেছনে ।

ওখানে নাকি একটা ফ্ল্যাট বাড়ি উঠবে ।

আমাদের বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেল। বাবার ভালবাসার ডালপালা তো পরিবারের মধ্যে আটকে ছিল না । তাই সময় অসময়ের বালাই নেই ,দুপুর দুটো,রাত দশটা সবসময় তারা সদল বলে হাজির । দলে প্রচুর মহিলা । অতএব পরিবেশ সরগরম ।  বলাই বাহুল্য মা আর টুম্পার (মায়ের সহকারী ,মেয়ের মত)  মৃদু আপত্তি    বাবা কানেই তোলেন নি । মানুষ মানুষের কাছে আসবে , উপকারে আসবে এ টাই তো তার মনের কথা ।    বাবা   সাধ্যমত পরামর্শ দিতেন । কাগজপত্র তৈরি করে দিতেন,অ্যাপ্লিকেশন লিখে দিতেন। আন্দোলন ধোপে টিকলো না । কারণ সদুপদেশ দিলেই তো হয় না, দাতা  গ্রহীতাকে সমভাবাপন্ন হতে হয় । উপরন্তু প্রতিপক্ষ শক্তিশালী । অর্থে , ক্ষমতায় , কৌশলে ।  বাবাকে   বলতে শুনেছিলাম  “তোমাদের না আছে সদিচ্ছা,না আছে নেতৃত্ব ,না আছে সংগঠন । তোমাদের অনেকদিন আগে থেকেই  আমি  বলে আসছি “

এতদিনের পুজোটা কি তাহলে উঠে যাবে? বাচ্চারাই বা খেলবে কোথায় ?  এইসব নানান জল্পনা কল্পনায় সবাই বিশেষ করে   মহিলারা দিশেহারা ।

সেপ্টেম্বর নাগাদ পার্কে  প্যান্ডেল   বানানোর  বাঁশ  এসে  পড়ল না  তার বদলে টিনের পাত দিয়ে পার্ক টাকে পাঁচিল দেওয়া হল। সেদিন পুলিশ ও ছিল ।  

আরেক দিন রাতে টুম্পা বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে উঠল “এই ,এই তোমরা   কী করছ? গাছ টায় কী করছ?”।  কারা যেন শিরীষ গাছটায় কিসব ঢেলে দিয়ে পালিয়ে গেল । চোখের সামনে অতবড় গাছটা শুকিয়ে শুকিয়ে মরে যেতে থাকল । জায়গাটা খাঁখাঁ করতে লাগ ল । আমাদের বুকের ভেতরটাও।

এতদিনের পুজো তো বন্ধ করা যায় না । এর গ্যারাজ ,ওর গেট ,রাস্তা বন্ধ করে একটা মন্ডপ বানানো হল ।      

এদিকে  সামান্য কারণে   ভুল চিকিত্সার জন্য  শরীরে বিষক্রিয়ায়  আচমকা ম্যাজিকের মত  আমাদের অমন  সজাগ সচেতন ,   প্রাণবন্ত বাবা  চলে গেলেন ।

মন্ডপের উদ্বোধন হয়েছিল । তবে ঢাকের বোলে নয়, চার সন্তান নিয়ে বাপের বাড়িতে আসা মায়ের মুখের  ঝলমলে হাসিতে নয়। হয়েছিল পাড়ার সবচেয়ে শ্রদ্ধার মানুষটির  শোকসভা  দিয়ে ।

পুবের রোদ মা দুর্গার মুখে আর পড়ে না । বারান্দাতেও গ্রিল বসে গেছে ।



Sunday, 21 September 2014

যদি সেদিন


অফিস যেতে আসতে রাস্তার দুধারে ডান দিকে বাঁদিকে  ওপর দিকে তির চিহ্ন দিয়ে নানা জায়গার নাম হুশহাশ পেরিয়ে যায় ।

I S B T । আনন্দবিহার I S B T, কাশ্মিরি গেট I S B T, সরায় কালু খাঁ I S B T । কালু খাঁ টা আবার কে? মোগল আমলে কোন সরাইখানার মালিক হবে হয়ত ।  সে যাক গে , দেখছ কান্ড ! এতো গুলো I S B T ! মানে  Inter state bus terminal  ।  

আমি  তো  জানতাম  একটাই  আছে এ শহরে  ।  শুধু এইটুকুই  খালি ভেবেছি , অমনি মাথার মধ্যে গুটিকয়েক ফচকে জোনাকি ফিচেল হেসে চোখ মটকে বলল  মনে পড়ছে ? তোমার সেই বোকামির  কীর্তি কাহিনীগুলো ?

সেবারে হোল কি আমার আর যশোধরার মনে হল কলকাতা থেকে শিমলা এই মরুতীর্থ হিংলাজের মত লম্বা জার্নিটাকে একটু  কেটে ছেঁটে স্ট্রিমলাইন্ড করা যাক । উদ্দেশ্য  একটাই,  যতটা বেশি সময় কলকাতায় থাকা যায় । তখন তো আর ট্রেনিং থেকে কথায়  কথায় ছুটি পেতাম না ।

এমনিতে আমরা চিড়ে গুড় বেঁধে নিয়ে মোটামুটি তিন দিনের জন্য দুগ গা বলে হাওড়া কালকায় চেপে বসতাম । তারপর কখন  পৌঁছাবে  দেখা যাক । কিন্তু সেবারে ঠিক হল যে  আমরা রাজধানীতে করে দিল্লি যাব ,সেখান থেকে বাসে করে শিমলা  ।  রানাঘাট , কলকাতা , তিব্বত  ব্যাস ।  এতে আমাদের সময় অনেকটা বাঁচবে ।

দিল্লি নেমে I S B T থেকে বাস ধরে নিলেই হবে ।  সোজা ব্যাপার । তখন আমরা খুব ছিমছাম চিন্তা ভাবনা করতাম । এতো যন্ত্রপাতিও ছিল না ,এতো জটিলতাও ছিল না ।  আঙ্গুলের ডগায় এতো ইনফরমেশন ছিল না ।

ঠিকঠাকই এগুচ্ছিল । দিল্লি নেমে  একটা কুলি ধরা গেল । না হলে উপায় নেই । আমরা একটা ব্যাগ নিয়ে বাড়ি যেতাম , ফিরতাম তিনটে নিয়ে ।

কুলির মাথায় , ঘাড়ে হাতে মাল পত্র ঝুলিয়ে দেওয়া হল । সবার ওপরে রইল ধুসো রঙের ভুসকো একটা ব্যাগ । ব্যাগটা কার ছিল এখন আর মনে নেই ।

আমি কুলিটাকে পই পই করে বলে দিলাম   আহিস্তা চলিয়ে । জরা আহিস্তা চল । আর ওই বাঁধ ভাঙা জনসমুদ্রে আমার নিশানা ওই ধুসো রঙের ভুসকো  ব্যাগ , যেটা শাকের আঁটির মত সবার ওপরে দেখা যাচ্ছে । আমরা এগুচ্ছি । চলছি চলছি । চোখের সামনে কুলি,কুলির মাথায় ব্যাগ ।

হঠাত কী হল জানিনা , কয়েক সেকেন্ডের এদিক ওদিক হবে । আমার চারদিকে শুধু কালো কালো মাথা , যশোধরা নেই , কুলি নেই , ধুসো রঙের ভুসকো  ব্যাগটা ?  এবার কী হবে?  আমি অসহায় ভাবে এদিক ওদিক দেখতে থাকি ।  না কাউকে দেখা যাচ্ছে না ।  ভিড়ের ঠ্যালায় তখন নাজেহাল অবস্থা । কুলিটা কোন গেট দিয়ে বের হবে সেটাও তো জানি না । এখানে তো আবার অনেক গুলো  গেট আছে । কী আপদ ! এখন কী করি?

বেশ নার্ভাস লাগছে । কিন্তু ঘাবড়ে গিয়ে ক্যাবলামি করলে আরো গন্ডগোল ।  আমি চারপাশের লোকের পা মাড়িয়ে কনুইয়ের গুঁতো মেরে নিচে নেমে এলাম । আচ্ছা, আমাদের তো অটো বা ট্যাক্সি নিয়ে  I S B T যাবার কথা । সুতরাং  অটো ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকেই যাওয়া যাক । এরপর আমি বিভিন্ন গেটের অটো ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে  দফায় দফায় খোঁজ নিতে থাকি । আচ্ছা ভাইসাব কাউকে এরকম দেখেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি এমনকি ওই ভুসকো ব্যাগের কথাটাও বাদ গেল না । তারপর যখন পাকাপাকি ভাবে বোঝা গেল যে কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাই বা বোনের মত আমরা দিল্লি স্টেশনের জনারণ্যে সত্যিই হারিয়ে গেছি , তখন আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল । কিন্তু মুখের মধ্যে কিছুতেই ফুটিয়ে ওঠা চলবে না যে আমি ঘাবড়ে গেছি । সঙ্গে হাতব্যাগে টাকা পয়সা তো আছে  । অতএব আমি যতদূর সম্ভব স্মার্ট হয়ে একটা অটোওয়ালাকে খুব শান্তভাবে বলি, I S B T চলিয়ে । দিল্লি শহরটাকেই তখন ভালোভাবে চিনি না , I S B T তো দূর অস্ত ।

এখন যদি অটোওয়ালা বলে  বসতো , কোন I S B T যেতে হবে ?

অটো চলতে শুরু করল । সে আমাকে কোথায় কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে ,ঠিক না ভুল  রাস্তায় ? কোন বদ মতলব নেই তো ? আবার বার বার  জিগ্যেস করলে ও তো বুঝেই নেবে যে এ তো কিছুই চেনে না । তাই মুখচোখে খুব একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বেশ গম্ভীর ভাবে বসে রইলাম । এদিকে তো বুকের মধ্যে দুম দুম করে হাতুড়ি পেটা হচ্ছে । আমি কোথায় চলেছি কে জানে ? আর ওদিকে যশোধরা গুণে গুণে ছ’ পিস লাগেজ নিয়ে  হিমশিম খাচ্ছে আর আমাকে নির্ঘাত শাপশাপান্ত করে চলছে । পুরো ব্যাপারটা কল্পনা করে শিউরে ওঠা ছাড়া আর কোন গতি ছিল না । অটোওয়ালা গোঁগোঁ করে ছুটেই চলছে । দিল্লিতে এর আগে একেবারেই আসিনি তাতো নয় , শহরটাকে একটুকুও চিনিনা কেন ছাই !

শিমলায় বরফের তলায় চলে গেলে যখন কল খুললে জল পড়ত না , বাজারে সব্জির আকাল দেখা যেত , আম্বালা না পাটিয়ালা থেকে আনা দুধ জমে কুলফি হয়ে যেত , পড়াশুনো ডকে তুলে আমরা যখন স্নো ম্যান বানানোর প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম তখন আমাদের ঘাড় ধরে দিল্লিতে নামিয়ে আনা হত । গালভরা সব নাম ছিল পার্লামেন্টারি অ্যাটাচমেন্ট , ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট এই সব । আবার যখন খবর মিলত যে জলটল পড়ছে , বাজারে কপি , আলু টমাটর দেখা যাচ্ছে তখন আবার হেড কাউন্ট করে করে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত । দিল্লিতে যখন নামিয়ে আনা হত ,সেই সময় শনি রবি গুলো আমাদের ওপর নজরদারি ব্যবস্থা কিছু শিথিল থাকত । অনেকেই মামা কাকা মাসি পিসির বাড়ি যেত, কেউ কেউ যেত পুরনো ইয়ার দোস্ত দের সঙ্গে গুলতানি করতে । আর যাদের বাড়ি একটা সুবিধেজনক দূরত্বের মধ্যে তাদের তো কথাই নেই ,ফি হপ্তায় বাড়ি । মুশ কিলে পড়তাম আমরা । কেননা তত দিনে হাঁ করে কুতুব মিনার , যন্তর মন্তর লালকেল্লা দেখার দিন অনেকদিন ফুরিয়েছে । কাজেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম । একবার গেলাম ভোপাল । এমনিই মাথায় ধাঁ করে আইডিয়া এল,চল ভোপাল দেখে আসি ।

কোথায় উঠব কিভাবে যাব এই সব ভেবে আমরা মাথাটাকে অকারণ জটিল করতাম না । আগেই বলেছি চিন্তা ভাবনা ছিল খুব ছিমছাম ।



ট্রেনের টিকিট কাটা হয়ে গেল খুব সহজেই । আমরা ছোট্ট একটা করে ব্যাগ নিয়ে  গুটি গুটি রওনা দিতে যাব ,অমনি আমাদের ব্যাচমেট সন্ধ্যা দেখতে পেয়ে  বলল ,এই তোমরা  চললে কোথায়?

ভোপাল ।

ভোপাল ? কেন ?

এমনই ।

আমাকে বললে না তো ?

আমাদের মনেই ছিল না সন্ধ্যার বাড়ি ভোপালে ।

তুমি যেতে চাও?

হ্যাঁ , অফকোর্স ।

দশ মিনিট টাইম পাবে ,মাত্র দশ মিনিট ।

সন্ধ্যা প্রায়  সঙ্গে সঙ্গে নেমে এল । আমাদের সঙ্গে চলল বিনা টিকিটে । আমরা ঠিকঠাক ভোপাল পৌঁছেছিলাম । টিকিটের ব্যবস্থাও হয়ে গেছিল ।  একটা সম্পূর্ণ অজানা অচেনা শহরে একটা বেশ সাধারণ মানের হোটেলে রাত কাটিয়েছিলাম , কাবাব খেয়েছিলাম , সন্ধ্যা ফিয়াট গাড়ি চালিয়ে ভোপাল লেক, ভারত ভবন ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল । কোন সমস্যা হয় নি । কোন ভয় গলা টিপে ধরে নি । কেন ধরেনি ?  এখন ভাবলে খুব  অবাক হয়ে যাই  ।

আর এক উইকেন্ডে আমাদের গন্তব্য হল জয়পুর । সেবার জে এন এউ হোস্টেলে যশোধরার এক বন্ধু কাকলির সঙ্গে এক রাত্তির থেকে  পরের দিন কাকডাকা ভোরে ট্যুরিজমের বাসে জয়পুর রওনা দিলাম । যথারীতি কোথায় থাকা হবে  ঠিক নেই । এবারে আমাকে আর পায় কে? কারণ জয়পুর আমার দেখা শহর । বাবার সঙ্গে লেজুড় হয়ে দিল্লি এসেছিলাম । ঝাড়া দুদিন হৌজ খাসের গেস্ট হাউসে বসে থাকার পরে  বাবার আপিসের কাজ সারা হলে পরে আমরা বাবা আর আমি জয়পুর ঘুরতে গেলাম । গাংগৌর নামে কী সুন্দর একটা  থাকবার জায়গা ! ফোক সং হচ্ছে, বিশাল পাগড়ি বাঁধা রাজস্থানি লোক  কাঠপুতলি নাচাচ্ছে । সুতরাং ওদের খুব মুরুব্বিয়ানার সঙ্গে বললাম আরে আমি খুব ভাল থাকার জায়গা জানি । কোন অসুবিধে তো হবেই না ,ওখানে  জায়গা না পেলে  সিধে চলে যাব সার্কিট হাউস । হ্যাঁ, সোনার কেল্লার শ্যুটিং হয়েছিল । ওই বিছে ধরার  সিন টা তো ওখানেই ।

ওরাও আমার এই জ্ঞানগম্যিতে বেশ খুশিই হল দেখা গেল । বুকিং টুকিং কিচ্ছু করা নেই ,চিন্তার মধ্যেও নেই ।

চমৎকার বাস জার্নি । শকিল সাহাব নামে আপাদমস্তক শরিফ এক  বয়স্ক উর্দু কবি খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলছিলেন । কে না জানে কবিরা বানিয়ে বানিয়ে সুন্দর কথা বলতে ওস্তাদ । আমরা বললাম, কিছু শোনান দেখি । উনি বললেন

“এক পরিন্দা উড়া

আঁখে নম হুই

সমঝা, ম্যায় তুমহে ভুলা নহি “
আবার বললেন 
"বড়হে  শওক  সে  সুন রহা থা জমানা /হম হি  সো গয়ে দাস্তান   কহতে   কহতে"
নামবার সময় বললেন, আপনারা একলা একলা ঘুরতে বেড়িয়েছেন ? উনি কি বোঝাতে চাইছিলেন সঙ্গে কোন পুরুষ সঙ্গী নেই কেন?  
আমাদের তিনজনকে আপনার একলা একলা লাগছে ?

এরপর আমার থাকার জায়গা খোঁজার পালা  । সামনেই কিছু ঘোড়ার গাড়ি , হালকা ভিড় ,জটলা । আমি এগিয়ে যাই ।

হাম লোগোকো গাংগৌর জানা হ্যায় । ক্যায়সে জায়েঙ্গে ?

গাংগৌর জানা হ্যাঁয় ? কিন্তু গাংগৌর তো একটা তেওহার । হামলোগ মনাতে হ্যাঁয় । জ্যায়সে তিজ, হোলি । তবে আপনি যদি খুব বেশি আগ্রহী হন তবে সিধা বিকানের চলে যাইয়ে ।

কী বলে লোকটা ? পাগল নাকি ? কিসসু জানে না দেখছি । আরে আমি নিজে থেকেছি ইত্যাদি ইত্যাদি । এইসব বলতে বলতে সামনে তাকিয়ে দেখি বড়বড় করে লেখা আছে  গাংগৌর, রাজস্থান ট্যুরিজম , পধারো মাহরে দেশ ।

জয়পুর ট্রিপ তো ভালো হয়েইছিল । থাকার জায়গাও একটু দামি হলেও পাওয়া গেছিল ওই গাংগৌরেই  মানে ট্যুরিস্ট লজে।

 এদিকে অটো অবশেষে থামল ।  I S B T এসে গেছে । আমার সঙ্গে প্রথম তার পরিচয় । বাস অড্ডা । নানান রাজ্যের গুমটি । শিমলার বাস যেখান থেকে ছাড়বে সেখানে ধুপ করে বসে পড়ি । ভারি মনখারাপ লাগছে । যশোধরাকে তো  I S B T   আসতেই হবে । ঠিক আসবে তো? এইসব  চিন্তাই করছি । বেশ কিছুক্ষণ ।

 হঠাত  আমার চোখ আটকে গেল ,আরে দেখতে পেয়েছি ! ওই তো ধুসো রঙের ভুসকো ব্যাগ !   কুলির মাথায় ।  আর আমাকে পায় কে । রাগে গিরগির করতে করতে এক ছুটে কুলিটার সামনে গিয়ে  ঝামড়ে পড়ে বলতে থাকি ,সেই ইস্তক বলে আসছি আহিস্তা চলিয়ে , আহিস্তা চলিয়ে, সুনতাই নহি । কি ভেবেছ কি তুমি,অ্যাঁ ?

আমার গলা ছাপিয়ে যশোধরা  বলে ওঠে, মাথাটা না হয় গেছে ।চোখটাও গেছে তোর? এটা কি সেই স্টেশনের কুলি? তাকে আমি ট্যাঁকে নিয়ে  এতোক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছি ? এটা  I S B T র কুলি ।

ওঃ তাই তো!

তারপর পাক্কা আধ ঘন্টা ধরে একে অন্যকে দোষারোপ করার পর আমরা একটু ঠান্ডা হয়ে বসলাম । তারপর শিমলা যাবার একটা লম্বা ডিলাক্স বাসে চেপে বসি । কিন্তু কী আশ্চর্য বাস টা অদ্ভুত রকমের খালি । পথে লোকজন তুলতে তুলতে যাবে বোধহয় । কিন্তু না । সবমিলিয়ে সাত জনের বেশি লোক দেখা গেল না । আমাদের সামনেই বসে ছিলেন এক বয়স্ক দম্পতি । ভদ্রমহিলা আলাপ করলেন ।  আমরা ছাড়া উনিই একমাত্র মহিলা যাত্রী ।দু একটা লোক মাঝপথে নেমেও যেতে লাগলো । একটু খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল শিমলায় কেউই যাবে না । এমনকি ওই ভদ্রমহিলারাও না । এরমধ্যে বাসটার নানা রকম ঝামেলা শুরু হল । এই বন্ধ হয়ে যায় , এই চলতে শুরু করে । শিমলা প্রায় ছ’সাত ঘণ্টার পথ । ক্রমশ একটা অনিশ্চিতির দানা জমাট বাঁধতে শুরু করে । তখনও ভয় বা সন্দেহ মনের মধ্যে আসেনি । তখন একটাই চিন্তা । রাতের মধ্যে যে ভাবেই হোক শিমলা পৌঁছুতেই হবে । কারণ পরের দিন সকালে আমাদের  টানা সাত দিন তিব্বত বর্ডারে এক্সকারশন আর ট্রেকিং শুরু হয়ে যাবে । সময় মত হাজিরা না দিলে যে ঠ্যালা সামলাতে হবে সেই চিন্তাই আমাদের পাগল করে মারছিল । সন্দেহের বীজটা বুনতে শুরু করলেন ওই ভদ্রমহিলা । উনি বললেন  তোমরা ভাই কী করবে ? ভেবে দেখ । শিমলায় কেউ যাবে না । রাত কতো হবে কে জানে ? তার ওপর এই বাস টার তো কোন ভরসাই নেই । তোমরা দুজন মেয়ে । একলা একলা ।




তত ক্ষণে পানিপথ কুরুক্ষেত্র ঐতিহাসিক পৌরাণিক যুদ্ধক্ষেত্র পেরিয়ে এসেছি ।  চন্ডীগড়ের প্রায়  কাছে এসে  বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামার মুখে বাস জবাব দিয়ে দিল যে সে  পাদমেকং ন গচ্ছামি । এখন কী কর্তব্য ? আবার ওই লটবহর নিয়ে কোথায় যাব ? একটু দিশেহারা দুজনেই ।

এরপর আমাদের  চমকে যাবার পালা । যে ড্রাইভার আর তার হেল্পারকে সারা রাস্তা  অকথ্য কুকথ্য গালিগালাজ করতে করতে আমরা এসেছি  তারাই এগিয়ে এসে বলল আমরা আপনাদের চন্ডীগড় পৌঁছে দেব । হেল্পারটি একটা অটো করে বাস স্টপে নিয়ে গেল এবং একটা ভিড় থিকথিকে শিমলার বাসে তুলে দিল ।

আমাদের সেই রোমাঞ্চকর দিনটি এখানেই শেষ হয়ে গেল না । প্রায় মাঝরাতে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হল  শিমলার টানেল নম্বর ১০৩ এ ।

এই টানেল থেকে আমাদের মই এর মত খাড়াই পথ বেয়ে চৌরা ময়দানে উঠতে হবে সেখান থেকে উৎরাই । আমাদের একাডেমি । জোগাড় করতে হবে আবার সেই একটি কুলি । যশোধরা কুলির খোঁজ নিতে ওই পাহাড়ি মই এর মত রাস্তায় উঠতে শুরু করল । আমি এক রাশ মালপত্র নিয়ে চারপাশ দেখতে লাগলাম । রাত প্রায় বারোটা । দুটো শিমলা পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে । তাদের মধ্যে কোন হেলদোল দেখা গেল না । কোন কৌতূহলও নেই আবার সাহায্যের ইচ্ছেও নেই ।    বিধি বাম । কার মুখ দেখে সকালে উঠে ছিলাম কী জানি । অত রাতে কুলি পাওয়া গেল না ।

তারপর একটি করুণ, মর্মান্তিক ও অভাবনীয় দৃশ্য । ওই খাড়াই পথে ছ’পিস ব্যাগ নিয়ে আমাদের অভিযান । নাওয়া নেই খাওয়া নেই ক্লান্ত অবসন্ন দুটি দেহ  যেন পাপের বোঝা নিয়ে ধুঁকতেধুঁকতে এক পা এক পা করে চলছে । এর সঙ্গে একমাত্র প্রভু যিশুর ক্রুশ নিয়ে চলার তুলনা দেওয়া যেতে পারে । ক্লাসিক । সাক্ষী হয়েছিল শুধু  পাইন গাছ ,রাতের তারা আর হিমেল হাওয়া ।

যদি সেদিন মোবাইল থাকত তাহলে পথের বাঁকে বাঁকে এই অকিঞ্চিৎকর রোমাঞ্চ ,রহস্য আর বিস্ময়ের তুচ্ছ গল্পটা আজ আর বলা হত না ।


Sunday, 7 September 2014

চাষ নালার মেয়ে


রবীন্দ্রনাথের “রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি “ এই লাইনটাকে এখন এভাবেও বলা যেতে পারে “ পুরুষ হস্ত করে সমস্ত রমণীর ধন চুরি “ (বাসুদেব দেবের লেখা) ।
এখানে রাজা বা পুরুষ এই শব্দের দ্যোতনা আসলে  মনোভাব , কতগুলো চারিত্র লক্ষণ । আগ্রাসী চিন্তা, লোভ, লালসা ,  রিরংসা ,ভোগ ,ক্ষমতার আস্ফালন , দম্ভ । যাকে বলা হচ্ছে পুরুষালি মনোভাব । মাসকুলিনিটি । এর বিপরীতে নারী প্রকৃতি , নারীমনোভাব  । সংবেদনশীলতা ,সহনশীলতা , সহমর্মিতা , স্নেহ ,মমত্ব, পালন পোষণ ধারণ ও একটি অনুভবী মন  । মেয়েলিপনা নয় কিন্তু ।
মধ্যবিত্ত বলতে যেমন বিত্তের থেকে মানসিকতাকেই বোঝায় , সেই রকমই পুরুষালি মনোভাব বা নারী মনোভাবের সঙ্গে লিঙ্গের সম্পর্ক নেই । একজন নারীও হতে পারেন পুরুষালি মনোভাব সম্পন্ন । বা একজন পুরুষ ,নারী মনোভাবাপন্ন  । ব্যক্তিত্বের মধ্যে লালিত হয় নারী  বা পুরুষ প্রকৃতি ।নেপথ্যে হয়ত থাকে  মানসিক গঠন, শিক্ষা ,সংস্কার, মূল্যবোধ ,সংস্কৃতি ।  সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটভিটির একটা উৎস এই নারী মনোভাব যা সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলোকে ছুঁয়ে যেতে পারে অনায়াসে । সেই আবার একজন ভাল মানুষ হয়ে উঠতে পারে সহজে । মানবিক গুণ আর নারী মনোভাবের মধ্যে  দুস্তর ফারাক নেই ।
পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা সেই দিক থেকে মানবিক মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে ।
এই যে পুরুষ তন্ত্রের রমরমা বাজার,  তার সাফল্যের জন্য  মেয়েদের পুরুষালি মনোভাবের ভূমিকা লক্ষণীয় ।  উল্টো দিকে ঠিক তেমনি একজন পুরুষ তার নারী মনোভাব দিয়ে একটি মেয়ের অনুভূতির গভীর থেকে গভীরতর কেন্দ্রে পৌঁছুতে অবশ্যই পারেন । তা যত বেশি হয় ততই সমাজের মঙ্গল ।
কিন্তু দুঃখের কথা আজকের এই উদ্ধত পুরুষালি মনোভাবের জন্যই চুরমার হয়ে যাচ্ছে একটি মেয়ের জীবন, তার সম্মান, তার স্বপ্ন , তার অধিকার ।নদী বন সম্পদ উজাড় করে পণ্য আর বাজারে পুরুষালি আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তুমুল ভাবে । আর ক্রমশ প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতম হয়ে পড়ছে মেয়েরা । নারীর চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখতে হবে । পুরুষের চোখ দিয়ে নয় । তবেই যন্ত্রণা বেদনা আর অসম্মানের মূল্য বোঝা যাবে । আর তারই অভাব আজকের দিনে বড় বেশি ।
ওপরে যা লিখলাম তা নিয়ে সাউথ এশিয়ার  বিখ্যাত নারীবাদী নেত্রী কমলা ভাসিন নিরন্তর কাজ করে চলেছেন । দ্য হিন্দু পত্রিকায় (২৬ এপ্রিল ২০১৩) একটি ইন্টারভিউ তে তিনি বলেছিলেন যে এতদিনে তার স্বামীর থেকে বড় ফেমিনিস্ট মানুষ তিনি দেখেন নি । আমাদের বাবাকেও দেখতাম মেয়েদের খুব ভাল বুঝতে পারতেন । হয়ত এমন করে আমার মা ও পারতেন না । মেয়েরা বাবার ওপর খুব নির্ভর করত । নিজের স্বামীকে এমনকি বাপের বাড়িতে যে সব কথা বলতে পারতেন না অবলীলায় বাবাকে এসে বলতেন, কোন দ্বিধা বোধ  করতেন না । বাবার চলে যাবার পর  অনেকেই তাই  মানসিক ভাবে খুব অসহায় বোধ করেন । এ কথা তারা নিজেরা আমাকে বলেছেন ।
 
কমলা ভাসিন উৎস গুগল


  
ধানবাদের কাছে চাষ নালার কয়লা খনিতে প্রবল জলের তোড়ে তিনশ বাহাত্তর জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিল । তখন ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ । আমি তখন নেহাতই বালিকা ,স্কুলের নিচু ক্লাস । তখন মিডিয়া বলতে খবরের কাগজ , সাদা কালো টিভি কলকাতা দূরদর্শন সবে শুরু ,আর রেডিও। চাষ নালার মর্মান্তিক খবর নিশ্চয় বাড়ির বড়রা শুনেছিলেন , আমিও হয়ত শুনেছিলাম । কিন্তু সময়টাতো এখনকার মত অত খবরমুখী ছিল না । পঞ্চাশটা চ্যানেলের  হুমড়ি খেয়ে মানুষের দুঃখ কষ্ট চোখের জল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে  সেকেন্ডে সেকেন্ডে ব্যাখ্যান করার অত্যাচার তখন ছিল না । তবে ঘটনাটা নিয়ে খুব হৈ চৈ হয়েছিল ।
আমাদের বাড়িতে  অনেক  সময় নানান চমৎকার সব মানুষেরা এসে হাজির হতেন । সেই সব অনেক আলোকিত সময় , অনেক স্মৃতিজোনাকি আজও বেঁচে থাকবার রসদ যোগায় ।   কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে হৈ হৈ অজিত  পান্ডে আসতেন ।ঝোলা ব্যাগ থেকে বের হত তার সদ্য প্রকাশিত ৪৫ আর পি এম এর রেকর্ড । কাকু গণ সঙ্গীত গাইতেন । হা হা করে হাসতেন । খুব ভালবাসতেন আমাকে । গানগুলো আমরা শুনতাম ,খুবই শুনতাম । অনেক সময় বিষয় বস্তু বুঝতাম না ,বোঝার বয়সও সেটা নয় । বেশ একটা জোরালো দাপুটে ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর । গলাটাও ছিল মানানসই । ছোটবেলায় আমার মনে হত কাকুর বোধহয় মাইক লাগেনা । যা তেজালো গলা ! লোকে এমনি শুনতে পাবে । খুব একটা উচ্চকিত ব্যাপার ছিল তাঁর গানে , গণ সঙ্গীতের ধর্মই তাই । একদিন আমাদের হাতে এল কাকুর নতুন রেকর্ড । যাবার সময়  গমগমে গলায় বলে গেলেন “মিঠু মা, শুনিস কিন্তু ।চাষ নালার খনি নিয়ে গেয়েছি । ওখানে গিয়েছিলাম , জানিস ?“
রেকর্ড বাজানো শুরু হল । বিকেলের আলো মাখা আমাদের মফস্বলের ছোট বসার ঘরে বাবা মা একমাত্র  মেয়ের শান্তির নীড় খান খান করে বন্যার জলের মত ঘুরপাক খেতে লাগলো 

এই পাঞ্চেতের পাহাড়ে ম্যাঘ জম্যাছে আহা রে
এমন দিনে হায় হায় মরদ আমার ঘরে নাই
গ্যান্দা ফুলেও রঙ নাই
এই টুসু পরবে যাবক নাই
বাপ নাই ভাই নাই
দুগগা পূজায় যাবক নাই ,মহরমে যাবক নাই ,পীরের মেলায় যাবক নাই
খোঁপায় ফুল গুঁজবো নাই , চুড়ি আলতা পরবো নাই
এই চাষ নালার খনিতে মরদ আমার ডুব্যা গেল রে
দিন কে বিতাইলাম হো , রাতকে বিতাইলাম হো...
তেবেও আমার মনের মানুষ আইল না
এই চাষ নালার খনিতে মরদ আমার হারায় গেল গো ...

তিনশ বাহাত্তরটি মেয়ের ডুকরে ওঠা কান্না , বুকের হাহাকার   একটি জোরালো পুরুষ কন্ঠের ভেতর দিয়ে  সার্বজনীন হারাবার দুঃখ হয়ে কী অপরিসীম বেদনার্ত পরিবেশ তৈরী করেছিল আমাদের বাড়িতে সেদিন ! সাদামাটা সুর সাদামাটা কথা ! কিন্তু তাঁর গলার ভেতরে কী ছিল জানিনা ,আমি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলাম ।  পাঞ্চেতের মেঘ তখন অঝোরে বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের । কেউ একজন মাঝপথে গান টা থামিয়ে দিয়েছিল মনে আছে । একটি বালিকা হৃদয় নিংড়ে তার চোখের জল বের করে এনেছিলেন তিনি । কী ভাবে ? কতদূর সংবেদনশীল হলে এমনটা সম্ভব ?  শুধু সংবেদনশীলতা নয়, আরো বেশি কিছু, তা হল একাত্মতা ,সেই মেয়েটির চোখ দিয়ে দেখা ।  নারী প্রকৃতির আলোয় ।
সেই মুহূর্তে তিনি  তখন হাটে মাঠে শহরে গ্রামে গঞ্জের ডাকসাইটে গায়ক নন, কারুর বাবা, স্বামী, বন্ধু ও না ।

তিনি তখন স্বামী হারানো , বাপ হারানো ভাই হারানো  ভিটে খোয়ান  চাষনালার মেয়ে হয়ে গিয়েছিলেন । 

অজিত পান্ডে

Friday, 29 August 2014

ইকো ফ্রেন্ডলি

 
“সকালবেলা একা একা আবার হাঁটতে যাবেন না যেন ।“
“কেন, গেলে কী হবে? “ খুব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করি ।  আমার তো যাবার খুবই ইচ্ছে । হবে নাই বা কেন? যে দিকে দু চোখ যায় সবুজ গাছের সারি আর চকচকে রাস্তা । দেখলেই মন ভাল হয়ে যায় ।
“কিছুদূর গিয়েই হয়ত দেখলেন চুপিচুপি পেছনে একটা চিতাবাঘ আসছে । তখন ? এখানে যে কতো দুর্ঘটনা ঘটেছে ,তাই বলছিলাম সাবধানের মার নেই”।
আমাকে এই কথা গুলো বুঝিয়ে সে রাতের মতো কেয়ারটেকারটি বিদায় নিল ।
না এটা কোন বনবাংলো নয় । এসেছি চান্দায় (মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর) গোলাবারুদ ফ্যাক্টরি তে নিতান্তই অফিসের কাজে । ফ্যাক্টরিগুলো শহরের বাইরেই বেশি হয় । বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গাছপালা ঘেরা অনেক অনেক জায়গা  । তার যে এমন মারাত্মক গল্প আছে কে জানতো ।
পরের দিন প্রায় সারা রাত ধরে ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দ শুনলাম , চিতা বাঘ তাড়ানো হচ্ছে । ইঁদুর ধরার  খাঁচা বাড়িতে যেমন রাখা হয় তেমনি চিতা ধরবার জন্য বড়বড় খাঁচা বসান হয় এখানে ।
চান্দায় এসেছি অথচ তাড়োবার জঙ্গল দেখতে যাব না ? এখানকার সেই  চার বাচ্চেওয়ালি বাঘিনী তখন রীতিমত বিখ্যাত ।
“তাড়োবায়  আর গিয়ে কী করবেন ? এখানেই বসে থাকুন , ওখানে যা যা দেখতে পেতেন ,দেখবেন সবই  একে একে আপনার সামনে হাজির হচ্ছে । “ কর্মকর্তাদের একজন কেউ আমাকে বললেন । আসলে তাড়োবার জঙ্গল ঘিরে আছে চান্দা ফ্যাক্টরিকে । “জঙ্গল তো পাতলা হয়েই আসছে । তাই এখানেই আমরা  অনেক  কিছু দেখতে পাই “।   অর্থাৎ চান্দার গেস্ট হাউস কোন ফরেস্ট বাংলোর চেয়ে কম কিছু নয় ।
সেদিক থেকে আমাদের সল্টলেকের সরকারি বাড়িটা ছিল খুবই ইকো ফ্রেন্ডলি । মাঝে মাঝে শীতের রাতে জমকালো হুক্কাহুয়া হুয়া হুয়া  ডাকে মনে হত যেন শীতটা আরো জাঁকিয়ে পড়ল । বাগানে একটা ঢোঁড়া সাপ নিয়ম করে বেড়াতে আসত । তবে খুব বেশি নয় কারণ চারদিকে বেজিরা টহল দিত ।  আর ছিল প্রচুর পাখি । ফিঙে , দোয়েল , মৌটুসি আরো অনেক আমি তাদের নামও জানিনা ।  একটু হলুদ ডানার ঝলক একটু বাহারি ঝুঁটির দেমাক দেখিয়ে উড়ে পালিয়ে  যেত ।  বাগানে রাজত্ব ছিল কাঠবেড়ালিদের । আমরা মুড়ি বাদাম ছড়াতাম , পাখিদের খাবার দিতাম । নীল ডানা ছড়িয়ে কিংফিশার মাছরাঙা  বসে থাকতো  ।  এমনকি লাল চোখো রাগী কোকিল কতবার পাতার ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসেছে । গা ঘষটে ঘষটে শামুকের দল বারান্দায় উঠে পড়ত । অবিশ্যি ইকো ফ্রেন্ডলি লাইফের খেসারৎ ও  ছিল ভালোই  ।  দেওয়াল আলমারিতে উই লেগে সবকিছু নষ্ট হয়ে যেত ।

এই  প্রকৃতি ,মহাবিশ্ব মহাকাশ আর আমি একা  মানুষ এই দুই এর  মধ্যে যে নিবিড় অচ্ছেদ্য একাত্মতা   সেটা ভেঙে গেলেই যত উৎপাত আর গন্ডগোলের শুরু । মানসিক শারীরিক সবকিছুর ।  আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাইরোসোনিক্সের   ( Gyrosonics)  গবেষণার বিষয় তাই । সজল দা বলেন মাটির কাছাকাছি থাকবি, ঘাসে ,রোদে জলে মিশে । সজলদা চিনিয়ে দেন ,দেখ সব জায়গায় কেমন একই প্যাটার্ন , গাছের পাতায় শিরা উপশিরার জালি , আকাশ চেরা বিদ্যুৎ, তোর হাতের রক্ত বয়ে নিয়ে যাওয়া নালী গুলো সব এক প্যাটার্নের । ছক একটাই । ফ্র্যাক্টাল ।   চালাকি করে ডিজাইন ভেঙেছিস কি মরেছিস ।  সজল দা কে বলি ,জানেন কাঠগোলাপ গাছটায় বসার একটা সুন্দর ব্যাবস্থা বের করেছি । নাম দেওয়া যেতে পারে Frangipani couch  । বেশ আরামেই বসা যায় । আমি সকালে ওখানে বসেই চা খাই , খবরের কাগজও পড়ি । দু একটা কাঠ পিঁপড়ে আসে না যে তা নয় ,একটু টোকা মেরে ফেলে দিলেই হয় । একদিন  ঝিরঝিরে বৃষ্টি  এসে গেল । ঘন পাতার জন্য গায়ে জল  পড়ছিল না । ওমা , কোত্থেকে একটা বড় পাখি (নাম জানিনা) বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গাছটার পাতার নিচে এসে বসলো । আমি ও বসে আছি , পাখিও বসে আছে । আমাদের দুজনকেই গাছ জড়িয়ে আছে নিবিড় ভালবাসায় ।
সজলদা শুনে বলেন গাছ থেকে এনার্জি নিয়ে নিবি ,  ওর থেকে  শক্তিশালী  পজিটিভ  এনার্জি  বের  হয় । চুপ করে বসে থাকবি ওর নিচে ।
যত্ন করে প্রাণায়াম তো আর করা হয় না ,ওই একদিন বসে দম নিচ্ছি ,ছাড়ছি । একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ,একটা ছন্দে বলা যেতে পারে । একটা মৌটুসি পাখি তার রিনরিনে সুরেলা গলায় ওই একই মাত্রায় ডেকে যাচ্ছে ,আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস আর তার ডাক তালে তালে কেমন জড়িয়ে মিশিয়ে যাচ্ছে !


Frangipani couch    সল্ট লেকের বাড়িতে


আজকাল লোকে দেদার পয়সা খরচ করে ইকো ফ্রেন্ডলি ট্যুর করে । দুই কিস্তিতে সাত বছর ভুবনেশ্বর বাস আমার সে শখ মিটিয়ে দিয়েছে । আমি দুটো বাড়িতে থেকেছি  এক নম্বর আর এগারো নম্বর ।  এলাকা টার নামও একেবারে মানানসই , ফরেস্ট পার্ক ।
এক নম্বর বাড়িতে বারান্দাটা দেখা যেত না । ছাদ থেকে লতানো পাতা দিয়ে পাতার ঠাসবুনুনি পর্দা করা ছিল মাটি পর্যন্ত । আমি তো আর টারজান নই । সেই পর্দা উপড়ে ফেলতেই হল । সাবাড় করে দিতে হল পাতা পচানো সারের দুটি ঢিবি । তার দুর্গন্ধে টেকা দায় । বাগানের চৌবাচ্চায় এই বড়বড় কচ্ছপের সাইজের ব্যাং থাকত । আর তাদের কী ডাক । পিলে চমকানো । আর সারা বাড়ি জুড়ে তিড়িং বিড়িং লাফাতো নানান সাইজের ব্যাং । সাপের কথা আর আলাদা করে কি লিখব ।
গাছপালার বাড়বাড়ন্তের সীমা তো ছিলই না । এই কাটছি এই গজাচ্ছে  । এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম ।  নাম না জানা পোকা বোঁ করে ঘুরপাক খেয়ে কামড়ে দিয়ে চলে যেত । সেই ভয়ঙ্কর মুখ নিয়ে অফিস ও করতে হয়েছে । বোলতার কামড় তো খেতে হয়েইছে । চান টান করে বেশ তোয়ালে দিয়ে গা হাত পা মুছলেন , কিন্তু সারা শরীর চুলকে একসা ! তোয়ালের গায়ে তো শুঁয়ো পোকা লেগেছিল । তাকে তো খেয়াল করাই হয় নি । এসব তো আমাদের হামেশাই হত ।  ইকো ফ্রেন্ডলি লাইফে আরেকটা দরকারি বিষয় হল সেন্স অফ টাইমিং । সেটা কী রকম ? যেমন পিঁপড়ের সারি যেই মাটি তুলতে শুরু করবে বুঝে নিতে হবে মেঘ ডাকল বলে । কাজেই হাতের কাছে সব গুছিয়ে নিতে হবে কারণ গাছের দুলুনিতে ঘষা খেয়ে এক্ষুনি ইলেক্ট্রিকের তার ছিঁড়ে কারেন্ট চলে যাবে । ইনভারটার আবার ইকো ফ্রেন্ডলি বাড়িতে থাকে নাকি ?
বৃষ্টি শেষ হলেই ফড়ফড় করে উড়তে শুরু করবে উই পোকার দল । যদি দরজা জানালা খোলা পায় তবে আর রক্ষে নেই । রেড্ডি আগেরদিন নুনের বদলে   চিনি দিয়ে চিকেন রান্না করেছিল বলে আমি রেগে মেগে নিজেই রান্না ঘরে ঢুকলাম । খেয়ালও করিনি যে গোধূলির আকাশ পতঙ্গে পতঙ্গে ছয়লাপ । তারপর যা হবার তাই হল । চিকেন আর উইপোকার একটা নতুন রেসিপি ।
সেদিন অফিস থেকে  ফিরে দেখি বাড়ির চারদিকে প্রচুর লোকের জটলা । এ তল্লাটে  যে এতো লোক আছে  তাই জানতাম না । তারা সব্বাই ওপর দিকে গাছগুলোর মাথার দিকে তাকিয়ে খুব উত্তেজিত ভাবে  খুব চিল্লামিল্লি করছে ।
“ওই যে ওখানে । না না ওই তো সেই দিকে” এপটে  ওপটে  পিছপটে । তার মধ্যে আমাদের মিত্তুন আর রেড্ডি লাঠি সোটা নিয়ে দৌড়া দৌড়ি করছে । সে এক মহা যুদ্ধের প্রস্তুতি । আমার গলা শোনা তো দূরের কথা । আমাকে কেউ দেখতেই পাচ্ছে না । কোনরকমে ওদের থামিয়ে জিগ্যেস করি , ব্যাপারটা কি ? কি  হয়েছে বলবি তো?
ঘেমে নেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ গোলগোল করে রেড্ডি বলল “শ  রি  য়া  প তি নি”।
সেটা কি  ? ভূতপেত্নী না কোন অপদেবতা? অনুমান করলাম শরিয়াপতিনি বলে কিছু একটা এ ডালে সে ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে । সবাই তারই পেছনে পেছনে ছুটছে । তবে  রেড্ডি যেভাবে  কথাটা বলল তাতে মনে একটু খটকা লাগছিল । একটু চিন্তাও হচ্ছিল ।  কাছেই চন্দকা ফরেস্ট । কি জানি কী এসে পড়ল আবার? তবুও   এ ভাবে কাঁহাতক আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় ? ঘরে ঢুকতে যাব ,সমস্বরে চিৎকার “পশি গলা ,পশি গলা ,পশি গলা  ”।
আবার কি  হল ? জানা গেল সেই শরিয়াপতিনি লাফ দিয়ে রান্নাঘরের চিমনির মধ্যে ঢুকে পড়েছে । চিমনি দিয়ে যে রান্নাঘরে সেঁধিয়ে যাবে সে উপায় নেই কারণ সে রাস্তা আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে  ।  ধোঁয়া বের হবার চিমনি ,আজকাল তার ব্যাবহার নেই । তার মানে শরিয়াপতিনি এখন অন্ধকূপে নাকানি চোবানি খাচ্ছে । দেখলাম মিত্তুন  আর রেড্ডি  লাফ মেরে  কার্নিশ বেয়ে  একেবারে বাড়ির ছাদে । নিচে দাঁড়িয়ে থাকা  আগ্রহী জনতার একদল স্রেফ মজা দেখছে , আরেক দল ওই দু জনকে নানান উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে । জল ঢাল , না না আগুন দিয়ে ভয় দেখাও , নানা অন্য কিছু কর , দাঁড়াও, ভেবে বলছি  । রেড্ডি এরই মধ্যে বাঁশের মাথায় কাপড়ের পুঁটলি বেঁধে আগুন জ্বালাবার জন্য তৈরি । চারদিকে হুলুস্থূল ,চেঁচা মেচি আর চিমনির ভেতরে সেই শরিয়াপতিনির লম্ফঝম্প ।
 এদিকে বসার ঘরে টেলিফোন ঝন ঝন করে বেজেই যাচ্ছে । উফ এসময় আবার কে ফোন করে? ফোন টা তুলতেই হল ।
ওপাশ থেকে কেউ বলে চলেছে “ আপনার বাড়িতে একটা  শরিয়াপতিনি আটকে পড়েছে ? “
“হ্যাঁ পড়েছে ,তা আমি কি করতে পারি বলুন?” আমি ঝাঁঝিয়ে উঠি ।  
“ওড়িশা ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট অনুসারে শরিয়াপতিনি এনডেঞ্জারড স্পেসিস ।  সুতরাং প্রাণী টির যদি কোন ক্ষতি হয় বুঝতেই পারছেন  আপনার কী  হতে পারে?”
“মানে? আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন ? আমার বাড়িতে ঢুকে গেলে আমি কী করতে পারি ?” 
কে ফোন করছে, কোত্থেকে  করছে , কিভাবে খবর পেল ?  কিছু না জিজ্ঞেস করে আমি  অসম্ভব রেগে যেতে থাকি । এমনিতেই মাথা গরম হয়েই  ছিল ।
“আমি অত কিছু জানতে চাই না । শুধু জানাচ্ছি আইন অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিতে বাধ্য হব যদি শরিয়াপতিনির কিছু হয়...”
মিনিট কয়েক ধরে  আমাদের চাপান উতোর চলতেই  থাকে ।
 হঠাত্  লোকটির গলা ছাপিয়ে তখন আরেকটা চিল চিৎকার , এবার হিন্দিতে , “নিকাল গয়া, নিকাল গয়া , 
নিকাল গয়া ”।

শরিয়াপতিনি একটা ওয়াইল্ড ক্যাট ,জংলি বিল্লি বা লেপার্ড ক্যাট ( Prionailurus Bengalensis)  !


Tuesday, 5 August 2014

পদ্মনাভ




“সতীপতি গোস্বামী (Superintendent) আমাকে একদিন বললেন বাচ্চা হতে দেখেছ । অবাক হলাম হঠাৎ প্রশ্নে । সামান্য লজ্জায় বিব্রতও বটে । কবিতা লিখি তখন পুরোদস্তুর । বল্লাম  ঃ না । অন্যমনস্ক ভাবে প্রবীণ ডাক্তার বলে যাচ্ছিলেন “সে এক অদ্ভুত দৃশ্য । পদ্মনাভ শুনেছ? শ্রীকৃষ্ণের এক নাম । সৃষ্টির প্রথমে ছিল জল । জলের ওপর পদ্ম । সেই পদ্মলগ্ন নাভিতে ঈশ্বর শয়ান ।

শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়াও সেই পৌরানিক কাহিনীর মতই । একটি রক্তপদ্ম অর্থাৎ প্ল্যাসেন্টার মাঝখানে ,জলের মধ্যে ভাসছে জায়মান শিশু । সে এক অপার্থিব দৃশ্য “। সত্যি, একজন সার্জেন না হয়ে কবি হলে বেশ হত তার পক্ষে। এতদিন পরেও তার কথা আমার মনে আছে ।“

ওপরের লেখাটি  আমার বাবার লেখা (বাসুদেব দেব) স্মৃতিকথা থেকে নেওয়া,  ষাটের দশকের একেবারে প্রথমদিকের ঘটনা ।

এর পরে কেটে গেছে আরো কয়েকটা দশক । ২০০১ সালে ভুবনেশ্বর বদলি হই । বাড়ির কাছে বদলি হবার সুবাদে ঘনঘন কলকাতা আসা হতই । শুক্রবার এলেই মনটা পালাই পালাই করত । রেলের ব্যাবস্থাপনাও ছিল সময় মিলিয়ে । কাকভোরে কলকাতায় হাজির হও আবার ভাল মন্দ চাট্টি খেয়ে সোমবার সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফেরত যাও । এতদিন পরে মিথ্যে বলব না, কলকাতায় আসার জন্য যেমন মন আনচান করত আবার ভুবনেশ্বর ফিরে গেলে শান্ত সবুজ শহরটা তার সবটুকু ভালবাসা দিয়ে জড়িয়ে ধরত ।  গেট খুলে লাল নুড়ির রাস্তা দিয়ে বাড়ির দরজার দিকে যেতে যেতে দেখতাম বাগানে কেমন ফুল এসেছে ,ভেজা ভেজা ঘাস ,গাছের ছায়া ,আমার দরজা জানালা হাট করে খোলা বাড়ি , অরবিন্দ আশ্রমের ধূপের গন্ধ ,কাঁচের বাটিতে বাগান থেকে তোলা ক’টি সাদা ফুল আমারই অপেক্ষায় বসে আছে ।

সেবারে আউট হাউস থেকে গোপী লছমির জায়গায় থাকতে এল প্রফুল্ল নায়েক আর সুকান্তির জমজমাট সংসার । তাদের দুটো মেয়ে ।  প্রফুল্ল অটো চালায় । সুকান্তি আমাকে বাড়ির কাজে সাহায্য করে । মাঝে মাঝে প্রফুল্লর মা আর বোনও আসে ।  

সেবারে আমি আর আমার সর্ব ঘটে সহকারী ড্রাইভার কাম কেয়ারটেকার কাম সেক্রেটারি  মিত্তুন   দু জনেই কলকাতায় গেছিলাম । ফিরে দেখি বাড়িটা অদ্ভুত শান্ত । বাচ্চাগুলো স্কুলে গেছে । প্রফুল্ল ও নিশ্চয় বেরিয়ে গেছে । সুকান্তিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না । ও তো জানে আমরা ফিরে আসব সাত সকালেই । ভয়ানক নিঝুম চারদিক । কী হল রে বাবা এদের ? আমি সুকান্তির ঘরের দিকে যেতে থাকি । ওদের ঘরটা বাড়ির পি ছন দিকে ।   সেদিকে আম আর কাঁঠালের রাজত্ব । এতোটাই ঘন পাতার ঘেরাটোপ যে মাটিতে রোদ প্রায় পড়েই না ।  হিজলের নয়,সেই আম কাঁঠালের বনে তখন ঘুঘুর ডাকের  কনসার্ট  । সকালেই দুপুরের ঘুম এসে যাচ্ছে সেই একটানা ডাকে। দেখতে পেলাম সুকান্তির ঘরের দরজা আধ খোলা । তালা দেওয়া নেই । তাহলে সে গেল কোথায় ? আমি সুকান্তি সুকান্তি বলে ডাকতে ডাকতে ঘরের দিকে এগুচ্ছি,কিন্তু কেউ সাড়াও দিচ্ছে না । দু ধাপ সিঁড়ি উঠে আমি দরজা টা হাট করে খুলে যা দে খলাম তাতে আমি হতবাক আর নিশ্চল হয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত ।

দেখলাম সুকান্তি মাটিতে পড়ে আছে । জলে ভেসে যাচ্ছে ঘরের মেঝে । জন্ম হচ্ছে একটি শিশুর । জন্ম হচ্ছে পদ্মনাভর । মায়ের শরীরের সঙ্গে জুড়ে আছে তার নাভি ।জলের মধ্যেই শুয়ে আছে সে । আমার শব্দ শুনে চোখে করুণ মিনতি নিয়ে সুকান্তি হাত দুটোকে  কোন রকমে মাথার ওপর তুলে  প্রণামের ভঙ্গি করে নির্বাক আকুতি জানাচ্ছে ,বলতে চাইছে বাঁচাও আমাদের। আমার জীবনের এ এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা । ভয়ে,উত্তেজনায় তখন আমি আর আমার মধ্যে নেই । সম্বিত ফিরে পেয়ে মিত্তুন কে  ডাকতে থাকি।  এখখুনি গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে চলে যা ,নার্স ,দাই যাকেই পাবি নিয়ে চলে আয়।

মিত্তুন হতভম্ব । আমি একা পারব না ,আপনিও চলুন ।

আমি তখন ভেতরে ভেতরে কাঁপছি ,বললাম এদের একা রেখে কীভাবে যাবো? যদি কুকুর বেড়াল ঢোকে? তুই চলে যা। সময় নষ্ট করিস না ।

মিত্তুন চলে গেলে আমি সেই অদ্ভুত নিরালা সকালে  ঝরে পড়া একরাশ আম পাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে  সেই ঈশ্বর আর তার জন্মদাত্রীকে পাহারা দিতে থাকলাম ।  ঘুঘু পাখির ডাক ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই  ।

একেকটা মুহূর্ত কে মনে হতে থাকল অনন্তকাল ।


 কয়েক বছর পরে আবার ভুবনেশ্বর । একদিন বিকেলবেলায় দেখি সুকান্তি আসছে ।ছোট জায়গা তো । খবর পেয়েছে বোধহয় ,  সঙ্গে আসছে আরো একজোড়া ছোট ছোট পা।  সুকান্তির আঁচলে তার মুখ ঢাকা । হাসিমুখে সুকান্তি দাঁড়ায় । আঁচলটা সরিয়ে নিয়ে তার পিঠে ঠ্যালা দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলে  “পুঅ “ ।