Monday, 3 August 2015

ক্যানবেরা ক্যানভাস


ন্ধকারের চূড়ায় তোমার বাড়ি
আমলকি পাতা সারারাত যায় ঝরে...

আমলকি পাতা নয়, পায়ের তলায় ঝরে পড়া  একরাশ ম্যাপল পাতা  আর চোখের পাতা ছোঁয়া ঠান্ডা হালকা হাওয়া।  ক্যানবেরায় তখন  সুহানি আঁধারি  মাঝরাত ।  এ দেশের পশ্চিম থেকে পুবে চলে এলেম ,সময় দু ঘন্টা এগিয়ে ।
সকালে আলো ফুটলে দেখলাম বাইরে  রঙের বাহার , নীল আকাশে বেলুনবিলাস আর নীল পাহাড় বেড় দিয়ে ঘিরে আছে চারদিক








অনেকের কাছে ক্যানবেরা মানে ভয়ানক বোরিং একঘেয়ে একটা শহর বা একটা বড়সড় গ্রাম শুনশান । পার্থে যদি বাংলা বন্ধ , তাহলে এখানে কারফিউ সবাই সিডনি মেলবোর্ন করে করে লাফায় । ছুটি পেলেই পালিয়ে যায়কিন্তু এসবের মধ্যে  এখানকার বাসিন্দা রোজি কালরা বললেন অন্য কথা । তবে রোজি কালরারা হলেন চিরকালের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । চারিদিকে উঁচু উঁচু বাড়ি , হুশ হাশ গাড়ি , গুঁতো গুঁতি ভিড়, চোখ ধাঁধানো আলো, শপিং মলের চেকনাই আর হাজারটা বোকা বোকা পয়সা খরচের জায়গা না থাকলে জায়গাটা জাতে উঠল না বলে যারা নিন্দে মন্দ করবেন আর হাই তুলবেন তাদের জন্য সিডনি মেলবোর্ন তো রয়েইছে ।
রোজি বললেন আমার এ জায়গাটা খুব ভাল লাগে জানেন । সকাল থেকে রাত্তির পর্যন্ত আমার বাড়ির সামনেটা কেমন একটু একটু করে বদলে যায়। কেমন এক আশ্চর্য ম্যাজিক । কেউ যেন একই ক্যানভাসে একটার পর একটা ছবি আঁকছে , সূর্যের সাতটা রঙ তার প্যালেটে গুলে দিচ্ছে ঘাসের শিশির আর হঠাৎ বৃষ্টির জল ,আলো আর হাওয়ার তুলি বুলিয়ে  বুলিয়ে সে বদলে দিচ্ছে একই দৃশ্যপট । কখনো মায়াবী , কখনো ছায়াবী , কখনো রহস্যময় ছমছমে, কখনো উল্লাস , স্নিগ্ধতা , অলসতা,শান্তি । আমার কেমন নেশা লেগে যায় । বাড়ির পাশের ঢিবিটায়  সন্ধে বেলায়  ক্যাংগারুর দল  এসে জোটে । আর বাগানে যে কতো বাহারি  রঙ বেরঙের তোতাপাখি এসে বসে থাকে! লক্ষ করে দেখবেন প্রকৃতির নিজস্বতাকে এখানকার লোকেরা কি যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছে ।
কেমন করে , একটু বলুন না , শুনি । আমি হলাম গিয়ে দুদিনের মুসাফির । যা দেখি  যা শুনি তাই ভাল লাগে ।
নিজের হাতে বানানো ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের একটা টুকরো প্লেটে তুলে দিয়ে রোজি বললেন,দুদিন থাকলে নিজেই বুঝতে পারবেন । এদের কি পয়সার  অভাবঅথচ দেখুন কতো কম আলো ব্যাবহার করে ।   শহরে গাছপালা ,  আলো আঁধার , তিরতিরে বয়ে যাওয়া জলে দিবারাত্রির কাব্য । পায়ের নিচে জমে ওঠে শিশির আর ঘন হয়ে আসে  ঝিঁঝিঁ র ডাক । কোথায় শহরের শেষ আর জঙ্গলের শুরু ঠাহর করতে পারবেন না । শহর যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে টিডবিনবিল্লার জঙ্গলে ।  পাখি ক্যাংগারু এদেরি রাজত্ব এখানে । মানুষকে এরা বিশেষ পাত্তাও দেয় না ।  গাড়িকেও ভয়টয় পায়না ।
আমি ভাবলাম বেশ মজা তো । এবারে তাহলে বেশি লিখতে টিখতে হবে না । ব্লগে শুধু ছবি দিয়ে দেব । আর নাম দেব ক্যানবেরা ক্যানভাস ।









"ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মত করি পান ।"
অফিসের পাশে ওয়েস্টন পার্ক আর গ্রিফিন লেক । কাজের ফাঁকেই দুপুরের খাবার আর জল নিয়ে সেই সব ছবির মত পার্কে ঘাসের মধ্যে ঘাস হয়ে বসে থাকি আর সেই আশ্চর্য জাদু শিল্পীর ছবি দেখতে থাকি ।
ওয়েস্টন পার্কে ক্যাংগারুদের বারোয়ারি সম্মেলন । বিভিন্ন পরিবার পুত্রপুত্রীকলত্র সমেত জড়ো হয়েছে । অনেকেই দুপুরে গা এলিয়ে রোদ্দুর মেখে শুয়ে আছে , কেউ কেউ বিশ্রম্ভালাপে মগ্ন , একদল আবার  পলিটিক্স নিয়ে বেজায় তর্কে মেতেছে , একেবারে দু’পা তুলে মারামারিএরই মধ্যে একটা পরিবার আবার সটকে পড়ার তাল করছে আর আমাদের মত কিছু আদেখলে মানুষের দল পট পট করে ফোটো তুলতে ব্যাস্ত । লম্বা লম্বা সেলফি স্টিক, কুচো কাঁচাদের মহা উৎসাহ । তাতে ওদের কিছুই যায় আসে না, কোনই হেলদোল নেই ।












এক ছুটির দিন চললাম টিডবিনবিল্লার জঙ্গলে । পথের দুপাশে রাজার ভান্ডারের মত ছড়িয়ে থাকা সেই বিশাল ক্যানভাসের কিছুটা কানাকড়ির মত তুলে নিলাম দেখলাম সবুজ উপত্যকায় পাহাড়তলির পিকনিক ।

























কাক্কেশ্বর কুচকুচের N R I ভাই  Magpie  


মনের মত বিজ্ঞপ্তি


মনের মত বিজ্ঞপ্তি
দেখা হল টেলস্ট্রা টাওয়ার থেকে পুরো শহরের ছবি । আর সব ট্যুরিস্টদের যা যা দেখা কর্তব্য সেগুলোও বাদ পড়েনি । ওয়ার মিউজিয়াম , আনজাক প্যারেড গ্রাউন্ড ।পার্লামেন্ট , মিন্ট এবং  ক্যানবেরার ন্যাশনাল আর্ট মিউজিয়াম ।







আনজাক প্যারেড গ্রাউন্ড


ওয়ার মিউজিয়াম

্পুরোনো পার্লামেন্ট


নতুন পার্লামেন্ট


টাঁকশাল


আর্ট গ্যালারি


আমার দুই জাঁদরেল ভেজিটেরিয়ান সঙ্গী এবারে আরো কট্টর হয়ে উঠল দেখছি । হোটেলের শেফকে দিয়ে
ঘাড় ধরে  প্রতিদিন চাল ডাল সবজি দিয়ে একটা ডিশ বানিয়ে নিত । মাঝে মাঝে আমিও ভাগ নিতাম কিন্তু প্রত্যেকদিন ওই জগাখিচুড়ি হজম করা মুশকিল, তাই আমার খুব ফেভারিট হয়ে দাঁড়ালো  নারকেলের দুধ , লেবু পাতা আর নানান সুগন্ধি হারব দেওয়া  থাই চিকেন কারি আর ভাত ।


খুব ছোট্ট জায়গা, খুব অল্প লোকজন , ভারতীয়দের সংখ্যাও বেশ  কম । বেশির ভাগই নানান প্রফেশনাল , আই টি , ডাক্তারব্যাবসা । গুজরাটি , পাঞ্জাবি । ছাত্র । আরেকটা দল আছে । ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়া ভারতের যুব সম্প্রদায় । দেশে থাকলে থিকথিকে লোকের ভিড়ে  মকান তো দূর অস্ত, রোটি কপড়া জোটানোই যাদের কালঘাম  ছুটিয়ে দিত , তারা এদেশে এসে অডি গাড়ি হাঁকাচ্ছে , অ্যাপেলের মোবাইল আর ট্যাব হাতে ঘুরছে । কেউ দূতাবাসে গাড়ি চালায় কেউ আবার সিকিউরিটি গার্ড । ভারি মোলায়েম ব্যাবহার, সদা হাস্যমুখ ।  কেরালার নিষাদ হরিয়ানার খুশবিন্দর বহাল তবিয়তে আছে, দেখেও ভাল লাগে । কী ই বা করতে পারত এরা দেশে ?  এর ওর  পেছনে খিটখিটে মেজাজ নিয়ে  ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াত  আজ আমার থেকেও ভাল তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান । তবে এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের ছিল রামভজের চাকরিটা । দূতাবাসের দুধসাদা বারান্দায় যেখানে গাছের পাতায় রোদের ঝিকিমিকি খেলা চলছে  সেখানে রামভজ সারাদিন একটা দুধসাদা বড় বেতের চেয়ারে রোদ্দুরে পা মেলে বসে থাকে । তার পাশে নকল ঝর্না ঝরঝর বয়ে চলছে । নীল আকাশ ,  আকাশ ছোঁয়া কটকটে হলুদ ফুল , বেতের চেয়ারে রোদ্দুর  আর রামভজসেও সিকিউরিটি গার্ড । তবে রামভজ লোকাল স্টাফ নয়, সে দেশ  থেকে গেছে , পোস্টিং । এমন পোস্টিং ও আছে  তাহলে? আমি তাকে দেখলে ডাকঘরের অমলের মত প্রায় বলে ফেলি, রামভজ ও রামভজ ,তোমার মত যদি  সিকিউরিটি গার্ড হতে পারতুম তাহলে বেশ হত ।
নীল পাহাড়  আর  গ্রিফিন লেকের ধারে তুমি কেমন করে অফিস পাহারা দাও? আমায় শিখিয়ে দাও ।
রামভজ অমনি বলে উঠত, পাহারিদারি করায় যে এত সুখ তা আপনার কাছ থেকে শিখে নিলুম ।




ক্যানবেরায় শুধুই সরকারি অফিস আদালত, ব্যাবসাপত্তর সব অন্যান্য  শহরে । আর সরকারি কাজের মতই অনেকের কাছে এই জায়গাটা বোরিং ।  আরো জানতাম এখানে ভারতীয়দের সংখ্যা বেশি নয় ,  লাইব্রেরি ঘরে হঠাৎ দেখি বইএর ফাঁকে উঁকি মারছে এই ছবিটা । তাহলে বঙ্গজনেরা এখানেও আছে , আছে শুধু নয় জমিয়েই আছে , আবার জমিয়েই শুধু নয় তাড়াতাড়ি না এলে জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে  বলে চেতাবনিও দেওয়া আছে।


একদিন কাজের ফাঁকে দূতাবাসের লাউঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রং বেরঙের ম্যাগাজিন দেখছি ।আমার সামনে সেজো কর্তা গোছের একজন পায়চারি করতে করতে  মোবাইলে  কথা বলে চলেছেন।
“আচ্ছা, শাদি ডট কম । দহেজ ভি দে দিয়া । কিতনা? ওকে ওকে । নহি নহি , চিন্তা মৎ কিজিয়ে । হাম হ্যাঁয় না ? “
উনি খুব নরম ভাবে বার বার “নহি নহি ওকে ওকে”  বলে চলেছেন । কাঁহাতক মিনিয়েচার পেন্টিং আর বুদ্ধের আধবোজা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় ? পুরোটা না শুনে তো যেতেও পারছি না বাপু  বেশ কিছুক্ষণ এইসব ডায়ালোগ চলার পর সেজো কর্তা যেই বেরিয়ে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছেন আমি সটান গিয়ে বললাম, ও মশাই , তারপর কী হল? উনি খুব হকচকিয়ে বললেন, মানে?
মানে ওই যে , শাদি ডটকম, দহেজ তারপর?  সত্যি, আপনি এতো চাপের মধ্যে আছেন !
ওই শেষের লাইনটাতেই ম্যাজিকের মত কাজ হল । তারপর যদি সেটা অডিটের লোকের কাছ থেকে শোনা যায় তাহলে তো কথাই নেই । এই ভদ্রলোকও তাই  উজাড় করে দিলেন সব দুঃখের কথা ।
কিন্তু সত্যিই পুরো ব্যাপারটাই বাস্তবে  খুব দুঃখের । দুর্ভাগ্যের । অপমান ও অসম্মানের । শুধু এই ফোনটাই নয় এরকম অজস্র ফোন তারা পেয়ে থাকেন ।  স্টোরিলাইনটা মোটামুটি এইরকম, পয়সা রোজগারের লোভে দেশ থেকে অনেক  লোক এসে জোটে  এখানে এদের অনেকেই  একটা সময় দেশে ফিরে  গিয়ে প্রচুর  পরিমান পণ নিয়ে একটি মেয়েকে বিয়ে করে । মেয়ের বাপ মা গদগদ হয়ে বিলাইতি দামাদের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে পরম শান্তি লাভ করে । কিন্তু মেয়েকে ছেলেটি তখনই নিয়ে ফেরে না । অস্ট্রেলিয়ার ডিভোর্স পদ্ধতি খুব সহজ । একবছর একসঙ্গে না থাকলে সহজেই  ডিভোর্স । অনেক কাঠ এবং খড় পুড়িয়ে ভিসা নিয়ে কেউ কেউ স্বামীর সন্ধানে চলেও আসে । স্বামী তাকে সরাসরি অস্বীকার করে । মদত দেয় লোকটির বাড়ির লোকজনও।  সেই সময় এইসব মেয়েদের অবস্থা ভয়ানক শোচনীয় হয়ে ওঠেদূতাবাসের সাহায্য ছাড়া , ভারতীয় কমিউনিটির  সাহায্য ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকেনা । শুধু ক্যানবেরাই নয় যেখানেই আমরা গেছি এই  একই কাহিনি শুনতে পেয়েছি ।
এছাড়া ভাল অবস্থাপন্ন ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধ বাবা মায়ের চিকিৎসা , মৃত্যুর পর দাহকার্য সবই  দূতাবাসের কমিউনিটি রিলিফ থেকে করতে চায় । এই সব নানান রকম ঊনকোটি পঞ্চাশরকমের ঝামেলা লেগেই আছে । সেজোকর্তা এই পর্যন্ত বলে জল খেলেন ,আমিও উঠে পড়লাম, বাইরে গাছের ছায়া লম্বা হয়ে এসেছে । বিকেলের রোদ ছড়িয়ে পড়েছে ঘাসে।


ক্যানবেরার পাততাড়িও গুটিয়ে ফেলতে হয় একদিন । প্রকৃতির মায়াময় স্পর্শ , এই ক’দিনের অনুপম ছবিগুলো তোরঙ্গে ভরে ভরে রাখি । শেষ বারের মত ওয়েস্টন পার্কে লাঞ্চবক্স নিয়ে হাজির হই । সাদা তোতা পাখিগুলো গাছের ডালে । ফিরে আসার সময় দেখি ডালে আটকে আছে একটা সাদা পালক ।

প্রিয়সখা ভাল থেকো ,
ভুলে যেও তুচ্ছ ভুলচুক
মনে রেখ, একদিন একটি
পালখ সাদা, সুদূর পাখির
ছুঁয়েছিল তোমাদের বুক






কবিতা ঃ বাসুদেব দেব

Friday, 3 July 2015

সেই সাবেকি গান


(নববর্ষে দিল্লির প্রবাসী পত্রিকা দিগঙ্গনে প্রকাশিত একটি লেখা “সেই সাবেকি গান”
ধন্যবাদ  সৌরাংশু সিনহা )





খরচ করে ফেলেছি সেই কবে
নলেনগুড়ের গন্ধ মাখা রোদ
শিউলি শিশির নীবার উৎসবে
কতকাল যে হয় না দেওয়া যোগ
মায়ের দেনা কখনো হয় শোধ?

এখনো চোখ বুজলে সেইসব ছবিগুলো স্পষ্ট দেখতে পাই । বাতাসে তখনো  ছিল বসন্তের মালতীগন্ধ , একটানা  কোকিলের ডাক , গেটের ওপর মাধবীলতার ঝাড়, সন্ধে বেলার সতরঞ্চি পাতা বসার ঘর ,
রান্নাঘরে আম পোড়া শরবৎ তৈরির তোড়জোড় , একে একে এসে হাজির হচ্ছে হারমোনিয়াম  তবলা , তানপুরা । দরজার বাইরে জড়ো হচ্ছে চটি । একটু পরেই তাঁতের শাড়ির খসখস , পাঞ্জাবিতে ধোপাবাড়ির রোদের গন্ধ মেখে সবাই এসে বসবে । পাটভাঙা ধুতি ফতুয়া পরে নিখিল বাবু সুর লাগাবেন,বলবেন “নিন, একসাথে ধরুন আআআআমরা নুতন যৌবনরই দূত... “। ব্যস শুরু হয়ে যেত নববর্ষের রিহার্সাল । যত্ন করে লেখা গীতি আলেখ্য । বাছাই করা কবিতা গান এইসব গীতি আলেখ্যর দুটো পাকাপাকি সময় ছিল একটা নববর্ষ আরেকটা রবীন্দ্র জয়ন্তী । প্রথমটা ছোট , পরেরটা বড় ।  ছবির রিলে ধরে রাখা আছে সেইসব  সিপিয়া রঙের সুখস্মৃতি । তখনো তার একটাই ব্র্যান্ড নিখাদ বাঙালিয়ানা । ছিল না এত আয়োজন ,উপকরণ , ছিল না পণ্য সম্ভার , বিশ্ব বাজার । প্রলোভন প্রতিযোগিতা । রবিবারে আলু দেওয়া পাঁঠার মাংস ছিল নিয়মবাঁধা রুটিন । প্রেসার কুকারে সিটি আর সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়া সুগন্ধ । স্মৃতির মধ্যে সেই গন্ধ আজও ধরা আছে ।  জন্মদিনে মাছের চপ , রাধাবল্লভী ,  মাংসের ঘুগনি  বাড়িতেই তৈরি হত সারাদিন ধরে জলখাবারে চিঁড়ের পোলাউ আর লুচি আলুর সাদা তরকারি । বিজয়ার সময় নাড়ু , নিমকি গজা । গান বলতে আমাদের বাড়িতে সেই সময় ছিল রবিবাবুর একচ্ছত্র আধিপত্য ।  শুধু শুনে শুনে গানগুলো মুখস্থ হয়ে গেছিল ।সেই সময় যতদূর দেখেছি মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে বেশির ভাগ বাংলা গানই শোনা হত ।  শোনা হত অতুল প্রসাদ , দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত , নজরুল ।  বিনোদনের বাড়াবাড়ি ছিল না । সেই জায়গা জুড়ে ছিল বই , বই আর বই । স্মৃতির দেওয়ালে আটকে আছে দুটি বই ,এক্কেবারে ছোট্টবেলায় , শৈলেন ঘোষের “মিতুল নামে পুতুলটি” আর লীলা মজুমদারের “হলদে পাখির পালক” আটকে আছে কয়েকদানা ভাতও । বাচ্চাদের ওগুলো পড়ে ভাত খাওয়ানো হত । “ছোটা ভীম” তো তখন কল্পনার শত যোজন ওপারে ।  দক্ষিণা রঞ্জন মিত্রমজুমদার , উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী , সুকুমার রায় , লীলা মজুমদার  আমাদের ছোটোবেলাকে চিরকালীন করে খেছেন ।  আমাদের অবসরের  আরো সঙ্গী ছিল ঘনাদা , টেনিদা , কিকিরা, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের  গোয়েন্দা সিরিজ ।  পুজোর সময়  দেব সাহিত্য কুটির, সন্দেশ , আনন্দমেলা । আরো ছিল , যেন খনি গর্ভ থেকে উঠে আসা একেকটা রত্ন - ভোম্বোল সর্দার ,বাংলার ডাকাত ,পথের পাঁচালী , চাঁদের পাহাড় , যখেরধন আজকাল এই বই গুলো কেউ কি পড়ে?  ভয় বিস্ময় রহস্য রোমাঞ্চের কল্পনার রঙ আর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত আমাদের আটপৌরে ছোটবেলা । আরেকটু বড় হতেই হাতে এল ছোটগল্পের সম্ভার । বাংলা ছোট গল্প আর কবিতার ঐশ্বর্য  বাঙালির আত্মশ্লাঘা বললে বেশি বলা হয় না কালজয়ী সব উপন্যাস ।
 বাংলা কবিতা বাঙালির পৈতে , বাঙালির সনাক্তকরণ চিহ্ন ।এত কবি আর কবিতার কাগজ,লিটল ম্যাগাজিন দেশের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই । পকেটে রেস্ত নেই অথচ পত্রিকা বের করে চলেছে নিয়মিত । কে পড়ুক ছাই না পড়ুক তাতে কী এসে গেল?
 একে অনেক সময়  অনায়াস পটুত্বের ক্ষুদ্র কুটীর শিল্প  বলে মনে হতে পারে  কিন্তু এটাও সত্যি,কবিতা লেখে নি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া  দস্তুরমত কঠিন । এই দেওয়াল পত্রিকা লিখতে লিখতে, কবিতা লিখতে লিখতে একটা বড় উপকার হয়েছে বলে মনে হয়পরবর্তী কালে আমি দেখেছি বাঙালির হাতের লেখা অনেক ভিনভাষীর থেকে ভাল । এটাও একটা স্বাজাত্য লক্ষণ বৈকি ।  শুধু রবীন্দ্রনাথ পড়তাম না আমরা । ছোটো বেলায় আধোগলায় বীরপুরুষ আবৃত্তি করার সঙ্গে সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “আমরা যেন বাংলাদেশের চোখের দুটি তারা” ও শোনাতে হত । বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে পাশে পাশে থেকেছেন  জীবনানন্দ দাশ , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় , শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ
“কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে”  “আমরা ক’জন সৌরোলোকের বামন কয়েকটা রাত বাঁশির মত বাজি” বা “এক যে জোয়ান ছেলে কই সে ছেলে মা ? ঘর যে তোমার ঘরে ঘরে জননী যন্ত্রণা” , “অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা “ বা “ অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে” বাংলা কবিতায় কীর্ণ হয়ে আছে  এইসব অজস্র   অবস্মরনীয় পঙক্তি ।
আর ছিল সূর্যের রৌদ্রের উদ্দাম উল্লাসে মেতে ওঠা এক ঝাঁক পায়রার মত উজ্জ্বল সব বাংলা  গান ।
এই তো আমাদের উত্তরাধিকার । এই তো আমাদের শিকড় । “ জল দাও আমার শিকড়ে” উত্তরসূরিদের কাছে বাঙলার এই ভালোবাসার দাবী ।




আমি যত দূরেই যাই
আমার সঙ্গে যায় ঢেউ এর মালা গাঁথা
এক নদীর নাম,আমি যত দূরেই যাই
আমার চোখের পাতায় লেগে থাকে নিকনো উঠোনে
সারি সারি লক্ষ্মীর পা
আমি যত দূরেই যাই

সেদিন মাথার ওপরে ছিল কোজগরী লক্ষ্মীপুজোর চাঁদ । কলসি উপুড় করা জ্যোৎস্না । বাড়ি ছেড়ে বহু দূর ,অন্য রাজ্যে । বদলে যাচ্ছে তার চার পাশের  চেনা জগত । বড় হচ্ছে অভিজ্ঞতার পরিধি বাঙালি গুটিপোকা তার  খোলস ছেড়ে মিশে যাচ্ছে ক্রমশ এক ভিন্ন জীবন স্রোতের সঙ্গে । সবাই বলেছিল কালচার শক খেতে হবে । বাঙালি বড় কালচার নিয়ে বড়াই করে ।  শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির অবস্থান একটা অদ্ভুত জায়গায় । ইংরেজ আধিপত্য ও বাংলা রেনেসাঁ র (রেনেসাঁ বলা যাবে কিনা তা নিয়েও ঐতিহাসিক কূট কচালি আছে) ক্ষীণ উত্তরাধিকার , রবীন্দ্রনাথের দুর্লঙ্ঘ্য প্রভাব ,রাজনৈতিক চরমপন্থা , কমিউনিজমের প্রগতিশীল প্রতিবাদী রঙ্গ , দেশভাগ এইসব যুগান্তকারী টানা  পোড়েনে বাঙালি পেয়েছিল একটা শানিত , স্বতন্ত্র ,মুক্ত  সচেতন আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাতে যুক্তিবাদ থাকলেও , সঙ্গে সঙ্গে ছিল রোমান্টিসিজম , আবেগ ও ভাবালুতার প্রতি তার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ । আর এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের বৃহত্তর অংশের সামন্ততান্ত্রিক বা আধা সামন্ততান্ত্রিক বা প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যবোধের সঙ্গে তার প্রধান বিভাজন রেখা । সেই বিভাজনরেখার মূল  স্তম্ভ তার ভাষা , সংস্কৃতি আর মূল্যবোধ
চলমান পাথরের গায়ে  শ্যাওলা পড়ে না । বাংলা ভাষাও সেরকমই চলিষ্ণু  । অসম্ভব ব্যাপ্ত তার গ্রহণ ক্ষমতা, প্রকাশ ক্ষমতা ।  নিজেকে কতো ভাবে সে বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত । আজ সে একটি অন্যতম বলিষ্ঠ আধুনিক ভাষা । আত্তীকরণ করেছে কতো ভাব ,কতো অর্থ ।
ভুবনেশ্বরে থাকবার সময় সেখানকার ভাষার চলন লক্ষ করছিলাম । ভাষাটি মিষ্টি একদিন কানে এসে বাজল, মুন্ড ঢাকি নিও ,পবন পশিব নি । মনে হল যেন অন্নদামঙ্গল কাব্য শুনছি  । শুধোনো , কদলী ,পনস প্রচুর তৎসম শব্দের ছড়াছড়ি ।  তার পাশাপাশি বাংলা ভাষা চূড়ান্ত রকমের আধুনিক । নানা সংস্কৃতির মিশেলে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে এবং করে চলছে অথচ তার স্বকীয়তা এতটুকু মলিন হয়ে যায় নি এসেছে কথোপকথনের চলতি ভাষা , অর্বাচীন শব্দ । ভাষার প্রকাশভঙ্গিমায়  ক্রমশ বিম্বিত হয়ে চলেছে আজকের চলমান জীবন।
  এই ভাষার কাছে বার বার নতজানু হয়ে ফিরে আসি। মায়ের মত আশ্রয় , মায়ের মত শান্তি ।  ঘুড়ি হয়ে যতই ওপরে উড়ে যাই না কেন লাটাই এর মত এই ভাষা আবার আমাকে নামিয়ে আনে তার কোলের  উষ্ণতার মধ্যে ।



বুকের ভেতর থাকে তো সেই দিন
পুব বাগানে স্মৃতির আনাগোনা
বদলে গেছে জগত, আলাদিন
এক লহমায় পিতল করে সোনা

কোনকিছুই একরকম থাকে না । বর্তমান অতীত হয়ে যায় । খাদ্য, পোশাক, রীতিনীতি , আচার বিচার  উৎসব,  পুজো পালা পার্বণ , সাহিত্য সংস্কৃতি ভাষা  সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে এই যে জমকালো
বাঙালিয়ানার বিশাল চালচিত্র তাতে সময়ে সময়ে কতবার কতরকম ভাবে বদল এসেছে । কতো নতুন বাঁক এসেছে আর কতো আসবে ভবিষ্যতে ।  এই ঐতিহ্য পরম্পরার প্রাণপ্রতিমাটি তৈরি হয়  সে দেশের জল আলো  হাওয়া মাটির স্নিগ্ধতা  দিয়ে  । কতো কতো শতাব্দী,প্রজন্ম ধরে  নদী মাতৃক বাঙলার সরস পলি উর্বর মাটি , তার সবুজ প্রান্তর ,  বর্ষার জলধারা ,ঠান্ডা হাওয়া ,ক্ষেতের ধান , পুকুর নদীর মাছ, নারকেল নলেন গুড়ের সুঘ্রাণ, কোকিলের কুহুতান  তার সুখী, পেলব  , মধুর  ,আয়েশি অন্তঃকরণটি গড়ে দিয়েছে ।  বাঙালির জীবনে তিন ঠাকুর ,চৈতন্য ঠাকুর, রামকৃষ্ণ ঠাকুর আর রবি ঠাকুর  তার রক্তে আবহমান কাল ধরে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে রেখেছেন । সময়ের সরণী পথে কতো স্মৃতিকাতরতা  আমাদের দাদু ঠাকুরদা করে গেছেন , বাবা কাকারা করে গেছেন , এখন আমাদের পালা ।  প্রত্যেকটা সময়ের সন্ধিক্ষণে সেই গেল গেল রব । আবার একপ্রস্থ নস্ট্যালজিয়া ।


 ৪
স্নায়ুর ভিতর নানান রঙের  বুদবুদ ফাটে শব্দে
প্রবল বৃষ্টি আবেগমন্দ্র ভালোবাসা দাও বাঙলা
উড্ডীন নীলে উৎসব হোক ভাঙা এ বুকের পাত্র
ভরে দিক ঘন মেঘের বৃষ্টি আছি বড় পিপাসার্ত

বস্তুতন্ত্র ও ঐতিহ্য পরম্পরা  এই দুটির মধ্যে একটা বিরোধ আছে । একটি বাড়লে অন্যটি কমে । এ কোন কল্পনাপ্রসূত মতামত নয় । ইতিহাস সাক্ষী ।  যতো বস্তুতান্ত্রিক উৎকর্ষ বাড়ছে মেধা মনন সৃজনশীলতা এবং ঐতিহ্য আনুগত্য, আনুপাতিক হারে নামতে থাকে ।  মধ্যমেধার হাতে  দোলাচল তার সংস্কৃতি। সমবেত প্রতিভার যুগ , কবি নয় যেন কবিসম্মেলন । গজভুক্ত কপিত্থ   বাঙালি জীবনের সর্বস্তরে  অন্তঃসার শূন্য পল্লব গ্রাহিতা ,উন্নাসিকতা  আর বাক সর্বস্বতা  আজ যেন বড় প্রকট বাংলা বলতে না পারা , পড়তে না পারা আজ তো সোচ্চার অহমিকা। অহমিকার মধ্যে লুকিয়ে আছে কোথাও একটা  চাপা হীনমন্যতা ।  মুখেন মারিতং জগত আর সংস্কৃতির শূন্যগর্ভ আস্ফালন
বাঙালির চিরকালীন ম্যাটিনি আইডল  রবীন্দ্রনাথ  বরং আরব বেদুইন হতে চেয়েছেন । মুগ্ধ জননীর মানুষ না হওয়া বাঙালি সন্তান হতে চাননি । আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যে স্তরে পৌঁছতে পারত আমরা তাকে সে জায়গায় নিয়ে যেতে পারিনি । আজকের চটুল  বিনোদন  ও বিজ্ঞাপন বানিজ্যকেন্দ্রিক লঘু  সংস্কৃতিতে বাঙলার প্রাণ প্রতিমা  আজ বিষাদ প্রতিমা । হিন্দি বলয়ের দৌরাত্মে লুঠ হয়ে যাচ্ছে  তার সত্তা  ও সম্পদ কথায় বলে,যে অনুকরণ করে সে সবচেয়ে খারাপটাই অনুকরণ করে । এত যে কর্তাভজার মত করে সেই কবে থেকে ইংরেজদের তোষামোদ করে আসছে , অথচ সময় জ্ঞানটাই শেখা হল না ।
তাদের কাছ থেকে স্বাজাত্য প্রীতিও শেখা হল না ।  আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নানান বর্গীআক্রমণের মুখে দেখিয়েছে চূড়ান্ত উদাসীনতা । “জাগো বাঙালি “, শ্লোগানের পাশে মস্করা করে লেখা হত “কাঁচা ঘুম ভাঙাইও না”।
এই যে আমরা এত সংস্কৃতি সংস্কৃতি করে চলছি এই বঙ্গ সংস্কৃতি কি জাত ধর্ম  শহর গ্রাম নির্বিশেষে সব বাঙালির ? না কি তার চরিত্র শুধু নাগরিক শীলিত মধ্যবিত্ত ? এটা ভেবে দেখার বিষয় । সংগীত সাহিত্য  ফিল্ম ,থিয়েটার এসবের যারা প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তি তারা সবাই মূলত শহর কেন্দ্রিক উচ্চ বর্ণের । আজও । সমস্ত সামাজিক স্তর বা শ্রেনী কি এর সঙ্গে একাত্মতা বা সাযুজ্য বোধ করে ? কিন্তু দেখা যায়  লোকায়ত ধর্ম সংস্কৃতি সমাজ তার সমস্ত উপকরণ ও বর্ণাঢ্যতা নিয়ে সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলে । ভাটিয়ালি,  জারি গান  ,আলকাপ , ভাদু টুসু বাউল , মুরশিদ্যা , যাত্রার সহজিয়া মরমিয়া সুর ধরে রাখে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাটির সন্তানদের অনুভূতি ও যাপন   ।
 কেবলমাত্র বাংলা সংস্কৃতি নয় সমস্ত  দেশীয় ভাষাসংস্কৃতি আজ কঠিন সময়ের মুখে ।  সারা বিশ্বে জাল বিছোনো পণ্যসংস্কৃতি এবং তার এক ছাঁচে ঢালাই করার নিরন্তর পদ্ধতি ও বাজারু প্রলোভন আজ স্বাতন্ত্র স্বকীয়তা কে যেন ছিনিয়ে নিতে চায়। প্রযুক্তি আজ  হাতের মুঠোয় । বাঙালি জীবনের পরিধি আজ অনেক ব্যাপ্ত । শিকড় ছাড়িয়ে অনেক দূর ।অনেকে সেই শিকড় আবার নিজে হাতেই উপড়ে দিয়েছে ।



 ৫

নিজের বৃত্তে নতুন জীবন
খেলছে খেলুক ছেলেমেয়ে
আমরা চিরকালের খেলা
জানলা দিয়ে দেখি চেয়ে
বাইরে থেকে মেঘের ছায়া
পড়ছে এসে ঘর বিছানায়
গাছের পাতায় বিকেল হাওয়া
সেই সাবেকি গানই শোনায়

গ্রাম , গ্রাম থেকে শহর , শহর থেকে শহরান্তর, দেশ থেকে দেশান্তর । ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালি । বদলে যাচ্ছে তার মুখের ভাষা , জীবন যাপন , মূল্যবোধ ।  আগের থেকে তার মলাট  অনেক বেশি বহির্মুখী , সাহসী  ঝকঝকে ,অনেক বেশি  গ্রহণশীল ।  কিন্তু সূচিপত্রে সেই পুরনো বাড়ির ঠিকানা  ঠিক যত্ন করা  রেখে দিয়েছে  
বনেদি বাড়ির রোশনাই । প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসেছে , নতুন লোকেরা  নিজেদের সুবিধে মত বাড়িটিকে সাজিয়েছে , কেউ দালানে পুরোনো টালি বদলে দিয়েছে , ঝুল ঝেড়ে দিয়েছে কেউ , পুবের ঘরগুলো ভেঙ্গেই ফেলেছে একদল , দক্ষিণের গাড়িবারান্দার শার্সি গুলোর ডিজাইন বদলে দিয়েছে কেউ , বৈঠকখানায় নিয়ে এসেছে নতুন আসবাব , নতুন রঙ, হাট করে খুলে দিয়েছে কতদিনের বন্ধ জানালা ,কতো অন্ধকার কুঠুরিতে নিয়ে এসেছে আলো, কোন কোন ঘর আবার  একই রকম রেখে দিয়েছে ,কেউ ঘন ঘন আসে, কেউ হয়ত বা আসেই না , কিন্তু বাড়িটাকে কেউ আজও ছেড়ে যেতে পারে নি । জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যতই ঝড়ঝাপ্টা , ফিউশন , বাউন্ডুলে পনার এলোমেলো ঘূর্ণি আসুক না কেন, যত দূরেই যাক না কেন  নতুন বোতলে পুরোনো মদের মত সে বাড়ির আকর্ষণ আজও অমলিন ।
বাঙালির ভৌগোলিক পরিসর যত বাড়বে সেই প্রবাসীদের ভিতর দিয়ে আরও ব্যাপ্ত হবে বাংলা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের আকাশ । পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে নয়, নতুন চোখে ,নতুন মনে  নতুন হয়ে সেজে উঠুক আমাদের ভালোবাসার ধন ।




আমি যত দূরেই যাই , সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

বাকি কবিতা  কবি বাসুদেব দেবের।