Wednesday, 4 May 2016

খড়কুটো ২


 ছাতিমগাছের  ছাতার তলা দিয়ে সকালবেলায় যখন হাঁটতে বেরোই কানে একটা মধুর শব্দ, মানে আমার কানে মধুর  লাগে , ঘনঘন শুনতে পাই।  ট্রি কিচ ট্রি কিচ ট্রি কিচ ট্রি কিচ । না,ওটা পাখিসব করে রব, নয়। জহুরী কান বুঝে নেবে ওটা কাঠবিড়ালিদের ডাক । আমি যেখানেই যাই  না কেন,  তা সে যে রকম জায়গাই হোক না কেন অদ্ভুত ভাবে কাঠবিড়ালিদের দেখা পাবোই পাবো । আমাদের অরোবাবুও এইসেদিন নেহরু পার্কে পুরুষ্টু কাঠবিড়ালি দেখে তার নতুন শেখা শব্দে squirrel squirrel  বলে উত্তেজিত ভাবে চেঁচিয়ে আবার জিনগত কারণে কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালি বলে খুব হল্লা করেছিলেন । অবিশ্যি এই বুড়োবয়সে কাঠবিড়ালিদের গপ্পো শোনানোর কোন বাসনা আমার নেই ।  কিন্তু এমন একটা বয়সে  এসে পৌঁছেছি যখন সামনের বাঁক টা  বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তখন    কিছু  অমূল্য ঋণ,  শোধ না করা গেলেও    স্বীকার করে নিতে খুব ইচ্ছে করে ।

আজকাল বাচ্চা মানুষ করাটা রীতিমত গবেষণার বিষয় । অরোবাবুর বাপ মাও তার খুব ব্যতিক্রম নয় । বিজ্ঞান মনস্তত্ব দর্শন  আরো  কতকিছু মিলেমিশে একখানা জবরদস্ত মেল্টিং পটে  সবাই নাস্তা নাবুদ হচ্ছে , দেখতে পাই   । অথচ আমার  ক্ষেত্রে তখন একমাত্র মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমার বাবা মা কিন্তু সেই কাদার  তালের কুমোরের চাক হলেন না । সেই কাদার তাল টিকে তাঁরা যার  হাতে সমর্পণ করলেন তিনি হলেন গীতা সেন মানে আমার গীতা পিসি । তখন তিনি অবিশ্যি গীতা দেব ছিলেন । গীতাপিসি রামকৃষ্ণ মিশনের শিশু  বিভাগের টিচার  ছিলেন । আমাদের বাড়িতে নিয়মত ঘনঘন আসাযাওয়া ছিল । স্বভাব মাধুর্য যেন ঝরে ঝরে পড়ছে । কী  অপূর্ব কথা বলার ধরন ।  কে বলবে এ মেয়ে  মারকাটারি বরিশালের! এ  যেন নদের নিমাইয়ের বাড়ির  পাশের চালাঘরে জন্মেছে । আমি পিসির মেনি বেড়াল হয়ে গেলাম । পিসির পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করতাম । সেই থেকে  পিসির হাতে  আমার মানুষ হবার পালার  শুরু । পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে দেদার আজগুবি  গল্প শোনা , স্বপ্ন আর কল্পনার ফানুস উড়িয়ে দেওয়া । পিসি কেমন স্কুলে পড়ায়  আর নানা জায়গায়  একা একা ঘুরে বেড়ায় , ডাকঘরের অমলের মত আমিও   স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে থাকতাম । মনে মনে ভাবতাম    আমিও  ওরকম কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কেমন ঘুরে বেড়াব  ! সেই স্বপ্ন যে কিছুটা সত্যি হয়ে  কালে কালে এমন পৃষ্ঠব্রণ র  মত হয়ে উঠবে সেটা কি আর তখন জানতাম! পিসির আরও  একটা আকর্ষণ ছিল । দুপুরবেলায় পিঠভরতি এক ঢাল কোঁকড়া  কালো চুল মেলে দীঘল দুটো হরিণ চোখ আর শ্যামলা দুটো হাত দিয়ে পিসি জল রঙে ছবি আঁকত । আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছিল পিসি । আর সে কি দারুণ সব ছবি । আমাদের   ব সার ঘরে বাবা বাঁধিয়ে টাঙি য়ে রাখত ।  মোটা তুলির সবুজ ছোপ ছোপ কেমন গাছপালা হয়ে যাচ্ছে , একটু লাল কমলা রঙের আলতো আভাস   পাতায় রোদের  আলো বুলিয়ে দিচ্ছে,চোখের সামনে একের পর এক স্বপ্ন জগত খুলে দিচ্ছে পিসির সরু  মোটা তুলি , প্যালেটে গোলা রং ,তুলির টান । পিসি জলে তুলি ভিজিয়ে ভিজিয়ে নিচ্ছে । আর আমি কৃতার্থ হয়ে গিয়ে বলছি “ জলটা পালটে আনি? তুলিগুলো ধুয়ে আনি?”   সেই ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে ছবি আঁকার মুগ্ধ দর্শক হতে হতে , নিজে আঁকতে না পারলেও ছবির প্রতি একটা ভালবাসা জন্মে গেল । ভালবাসাটা দিল গীতা পিসি । চার ঘণ্টায় শ্রীরামকৃষ্ণের এক টা সুন্দর ছবি এঁকেছিল , এখনও  সেই ছবিটাকেই পিসি পুজো  করে । আজ সত্তর পেরিয়েও পিশেমশাই যখন বলেন “দেব বাড়ির বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটাকে আমি তুলে এনেছি “, তখন ভাল লাগায় গলা বুজে আসে ।

আমার জীবনে প্রথম শেখা গান , সুর তাল ছন্দ নিয়ে আস্ত একখানা গান খুব দুঃখ জনক ভাবে কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত ছিল না । অরোবাবুর  প্রথম গান “আলো আমার আলো” । এমনকি  অরো বাবুর বাবা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে “ আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি” আর “পাগলা হাওয়ায় বাদল দিনে” গাইতে গাইতে খেলার মাঠ থেকে বাড়ি ফিরত,একেবারে নিয়ম করে, এমনকি শীত গরমের  দিনেও  । আমার বাবা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলেই আপনা থেকেই তাঁর চোখ বুজে ফেলতেন  , এমনকি আমার তরুণী  মা কেও আমি “তৃষ্ণারও শান্তি”, “বসন্তে ফুল গাঁথল” এইসব গানের সঙ্গে নাচতে পর্যন্ত দেখেছি কোন এককালে। আর লোডশেডিং হয়ে গেলে বারান্দায় বসে বাবার ভয়ঙ্কর বেসুরো গলায় “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে “ আমাদের পাড়ার সক্ক লে শুনেছে । আমার ঠাকুরদা এস্রাজে সুর তুলতেন “করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে কোথা নিয়ে যায় কাহারে” ।  এইসব উজ্জ্বল উদাহরণের পাশে  আমার প্রথম শেখা  গানটা ছিল   কাঠবিড়ালিদের নিয়ে ।গীতা পিসি শিখিয়েছিল ।  গানটা  এইরকম  ঃ ইনটি বিনটি সিন্টি উঁকি মারে /গাছের আড়াল থেকে শনিবারে /একদিন নাকি সুরে গাইছিল গান /তাই শুনে ইনটি বিনটির উড়ে গেল প্রাণ । ইনটির খিদে পেল/ গাছ থেকে নেমে এলো / খিচুড়ি খাবে বলে কাঁদিল রে।
মা এসে দু ’ঘা দিল /খাওয়া তার ঘুচে গেল/ ইনটি বিন্টি  রাগ করে শুতে গেল রে ।

তাই ইনটি বিন্টি  সিনটি দের
দেখলেই   গানটা  আমার মনে পড়ে যায়  আর তখনি দেখতে পাই পুরনো ক্যানভাসে একটা  জল রঙের ছবি ।   গাঢ় গোলাপি লম্বা ডাঁটা ওয়ালা  হলিহক ফুল ,  বেগুনি হলদে কসমস ফুলের দল হাওয়ায়  দুলছে, রোগা টিংটিঙে ফ্রকপরা একটা মেয়ে দোলনায় দুলছে  আর বারান্দায় ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে আমার চিরকালের দিদিমণি , কোঁচকানো কালো চুল, হরিণের মত  চোখ আর শামলা রং । ক্যানভাসটা হলদে হয়ে গেছে  বটে  । ছবিটার রং কিন্তু এখন ও জ্বল জ্বল  করছে ।



 
আগেভাগেই জেনে গিয়েছিলাম যে এবার যাবার সময় মিডল সিট ছাড়া আর গতি নেই । প্লেনের মিডল সিট নিয়ে আমার একধরনের ফোবিয়া আছে । এই বুঝি দুপাশে দুই হিমালয় আর বিন্ধ্য পর্বতের  মধ্যে গিরিখাত হয়ে দম আটকে  যাব । উইন্ড সিট সমানেই টয়লেট যাবে । আইল সিট ছটর ফটর করবে , পান পরাগের সুগন্ধ ছড়াবে ।এইসব ভেবে  ভেবে নিজের অন্তহীন আহাম্মকির জন্য  মনে মনে দুগালে ঠাস ঠাস  করে দুই থাপ্পড় কশিয়ে গলাটা যতদূর সম্ভব মিহি করে সহযাত্রীকে অনুরোধ করলাম যে উনি অকারণ দয়া দেখিয়ে আইল সিট খানা আমায় ছাড়বেন কি ? ভদ্রলোক হিমালয় বিন্ধ্য তো দূরের কথা , বিহারিনাথ শুশুনিয়ার ও তুতোভাই নন ,অর্থাৎ এনাকে  পাহাড় গোত্রীয়  কোনমতেই বলা যাবে না । বেশ কাট ছাঁট ওয়ালা রঙ্গন ফুল গাছের মত ভদ্রলোক টি আমার চেয়েও  মিহি গলায় বললেন তাঁর হাঁটুতে একটা ব্যথা আছে, তাই পা লম্বা করে  ডাইনে বাঁয়ে ওপরে নিচে ঘোরাতে হয় , তাই...। অগত্যা আর কিছু করার ছিল না ।

 কিছুক্ষণ পরে দেখি সামনে মাধবীলতার আলুথালু লম্বা এক খানা ঝাড়ের মত উইন্ড সিট এসে গেছে । উড়ো ঝুরো চুল , লম্বা দুল , লুটিয়ে পরা আঁচল , ইয়া বড় টিপ ।   মুখে একটা আলগা হাসি । বডি ল্যাঙ্গোয়েজে কোন অদৃশ্য পাঁচিল তোলার চেষ্টা নেই । উনি সিটে বসার পরেই আর সবার মতোই মোবাইল ফোন  নিয়ে খুটুর খুটুর করতে শুরু করে দিলেন । এরপর খুব চাপা গলায় বলতে শুনলাম ,”সয়াবিনের তরকারি করবে। হ্যাঁ সয়াবিন ,আদা রসুন পিঁয়াজ টমেটো , বেশ মাখা মাখা , মাংসের মতন করবে । “ আবার ফোন চালু করে বলতে শুনলাম” মিক্সড ডাল করবে । সবরকম ডাল মিশিয়ে , হ্যাঁ হ্যাঁ ওইভাবে। “ আমি কান খাড়া করে রইলাম যাতে কিছু মিস না করি । “ চিকেন কাবাব গুলো ম্যারিনেশন করা আছে , চাপিয়ে দিলেই হবে “ । ওপরের কথাগুলো বার তিনেক নানাভাবে  রিপিট করে উনি ফোন বন্ধ করলেন । এই সময় আমার সঙ্গে একটা হাসি বিনিময় হল । সে হাসি প্রশ্রয়ের , সে হাসি আয়নার মত পরিষ্কার , সে হাসিতে অনেক কথা বলা হয়ে গেল । আর অমনি আমি গায়ে  পড়ে  জিজ্ঞেস করলাম , “দিল্লিতে কাজে যাচ্ছেন বুঝি ?”

সেই কাকভোরে হাওড়ার গ্রাম  থেকে আসছেন । বাড়িতে কিছু গুছিয়ে রেখে আসতে পারেন নি , তাই ছোট বাচ্চা মেয়ে , ছেলে , কর্তা সবার খাবার ব্যাবস্থা করছিলেন ।  যাবেন দিল্লিতে, সেমিনার আছে । একটা মহিলাদের এন জি ও র সেক্রেটারি । কোথায় কথা বাড়ে । কুরুশের লেস বোনার মত । মহিলাদের সেলফ হেল্প গ্রুপ গড়েছেন , স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে জোরদার কাজ করছেন, বিদেশি গ্রান্ট জোগাড় করেছেন , অনেকবার বিদেশ গেছেন কাজের সূত্রে । ওনার নাম রাহিমা খাতুন । দেখা গেল দুজনেরই অনেক মানুষ চেনা শোনা , সরকারি বেসরকারি দুই দিকেই । রোশনি সেন থেকে অঞ্চিতা ঘটক , দিলিপ ঘোষ , সুকুমার ভট্টাচার্য ,  আওধ কিশোর সিং , অনুরাধা কাপুর , পাপিয়াদি দীপঙ্করদা , লিস্ট বেড়েই চলছে । আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ছি । কখনো উনি তাজ্জব হয়ে যাচ্ছেন , কখনো আমার চোখ গোল গোল হয়ে যাচ্ছে । আরে পৃথিবীটা এত ছোট  নাকি !  কখন কেটে গেল দুঘণ্টা জানতেই পারলাম না । হঠাত পাশের রঙ্গন গাছের দিকে চোখ পড়ল । পুরো ব্যাপারটা উনি খুব লক্ষ করেছেন বোঝা গেল । বললেন, আমি যদি আপনাকে এই সিট টা ছেড়ে দিতুম এমন আড্ডা টা কিন্তু আপনাদের হত না । আসলে কি বলুন তো , আমার না একটা ফোবিয়া আছে । মাঝের সিটে বসলেই মনে হয় পা দুটো বুঝি আটকে গেল । আর কোনদিন খুলবে না , তাই...। কিন্তু কি জানেন , everything happens for a reason.



Monday, 25 April 2016

আলতাফি কিসসা

আলতাফ আমার বাড়িতে এলে একটা বড় কাপ কফি আর মারি গোল্ড বিস্কুট খায় । ডিমান্ড সাপ্লাই  ব্যাবস্থা মেনে আমার বাড়িতে খুব একটা রকমারি খাদ্যসম্ভার মজুত থাকে না । অনেক কিছু কিনে রেখে দেখেছি , হয় পিঁপড়ে লেগে যায় , নয় ছাতা ধরে যায় ,নরম হয়ে যায় , বা ডেট  পেরিয়ে যায়  বা আমি নিজেই বেমালুম ভুলে যাই  ।আলতাফের নিজেরও আসার ঠিক নেই । সেদিন হল কি ,বাড়িতে কিছু ভাল ভাল কুকি ছিল । আমি ভাবলুম ছেলেটা শুধু মারি  বিস্কুট খায় , আজ ওকে বেশ কুকি দিয়ে কফি দেওয়া যাবে । আলতাফের মত এমন নিঃস্বার্থ পরোপকারী ছেলে আমি খুব কম দেখেছি । কুকির প্লেট এসে গেল । বললাম “নাও আলতাফ , খাও “ । আলতাফ প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে । আমি ভাবলাম এইবার বলে বসবে বোধহয় , আজ হঠাৎ  কুকি? আপনি তো মারি বিস্কুট ছাড়া আর কিছু...। আলতাফ সে  সব কিছু  না করে সটান জিজ্ঞেস করল “আচ্ছা ,এই কুকির প্যাকেট বা বাক্সটা কি ফেলে দিয়েছেন না আছে? “ শোনো কথা , এতো মহা বিপদ! কি করবে রে বাবা প্যাকেট টা নিয়ে?  আমি আমতা আমতা করে বললাম, দাঁড়াও , দেখছি ।  খুব বরাত জোরে  প্যাকেট টা পাওয়া গেল । আলতাফ অমনি আলোর দিকে ধরে কি সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগল । তারপর খুব উজ্জ্বল চোখ মুখ নিয়ে বলল ,” ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই , এতে ডিমমেশানো  আছে । আমি তো খেতেই পারব না । তারচেয়ে বরং দুটো মারি বিস্কুট ই  দিন ।“ আলতাফ কট্টর নিরামিষাশী । অনেক ভেজিটেরিয়ানকে আমি সানন্দে ডিম খেতে দেখেছি । কিন্তু এর বেলায়  পেঁয়াজ রসুন মাংস মাছ ডিম মুর্গা কলিজা ভেজা কিছুই  চলবে না , এর গল্প আরো  জটিল । কোন অসুখ বিসুখ বা স্বাস্থ্যের কারণে নয়
,সে ছোটবেলা থেকেই এমন । রান্নাঘরে  মাংস রান্না হচ্ছে আর তার পাশে চা তৈরি হলে আলতাফ সে চায়ে ভুলেও  চুমুক দেবে না । কদাপি না । যদি চায়ের  মধ্যে মাংসের  ঝোলের ছিটে পড়ে যায় ? কে গ্যারান্টি দেবে? তোমার বাড়িতে এসব নিয়ে ঝামেলা হয় না ? খুব হত একসময়ে  । এখন সবাই  মেনে নিয়েছে ।আলতাফ বলেছিল ওর দুই বোন নাকি ডাকসাইটে রাঁধিয়ে ।  আমি মনে মনে ভাবতে থাকি, ছুটির দিনে আম্মি আব্বু সবাই মিলে লাল মেঝেতে বসে  জাফরানি পোলাও  , ভুনা গোস্ত , মুর্গ মখমলি কাবাব খাচ্ছে ,পুদিনার চাটনি দিয়ে।  চারদিকে খুশবু  ভুরভুর করছে ।জাফরিকাটা দরজার লাল সবুজ নীল কাঁচ  দিয়ে দুপুরের রঙিন রোদ যেন বেগম আখতারের  গজল ।  এমন স্বপ্নের মত দৃশ্যে  আলতাফ এক্কেবারে মূর্তিমান তালভঙ্গ,   আলাদা বসে আছে, রুটি আর ঘিয়া কি ডাল  মানে লাউ দিয়ে  ডাল নিয়ে । তাও আবার সেটা বানানো হয়েছে গ্যাসের উনুন ধুয়ে মুছে শোধন করে ।






“তুমি দাওয়াত বা শাদি তে যাও না ? সেখানে কি কর? “  
“ খুব যাই , আমার কত রিস্তেদার বন্ধুবান্ধব আছে, জানেন ? যাই তো ।অনেক কাজকর্ম করে দি । কিন্তু খাই না । “
“ কেন? মিঠাই সিমুই শাহি টুকরা , ফালুদা এগুলো কি ক্ষতি করল? “
“  কে জানে , গোস্তের পাহাড়ের পাশেই হয়ত মিঠাই এর থালি রাখা আছে । ওরে বাবা, আমি কোন চান্স নিই না ।”
আলতাফ  বলেছিল  আপনার বাড়িতে একদিন পরাঠা খায়েঙ্গে । আমি সোৎসাহে হ্যাঁ হ্যাঁ , এ আবার কোন ব্যাপার নাকি? বলেই মনে হল ,এটা সত্যিই একটা ব্যাপার । কারণ আলতাফকে পরোটা খাওয়াতে গেলে আমার ঘোরতর আমিষ পাকশালের পলেস্তারা খসিয়ে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না । এদিকে আমার আবার মেজপিসির গল্প মনে পড়ে গেল । পিসিকে (চিত্রা ঘোষ) নিয়ে আমার ব্লগে একটা লেখা আছে । পিসির তো পায়ের তলায় সর্ষে।  একবার ট্রেন লেট , হরতাল, কি সব মিলিয়ে মিশিয়ে খাবারের খুব সমস্যা হয়েছিল । বহুত ঝুটঝামেলার পর শেষে খাবার পাওয়া গেল  । ঢাকা খুলে পিসি দেখে মোটা মোটা করে কাটা আলু  পিঁয়াজের তরকারি । পিশেমশাই চলে যাবার পর তো পিসির নিরিমিষ । আমরা জিজ্ঞেস করলাম ইশ , তুমি তাহলে কি  করলে ? পিসি বলল “কি আর  করুম? প্যাঁজ গুলান ফ্যালায়ে দিয়া খাইয়া থুইলাম কোনমতে “। আলতাফ হলে মনে হয় মারা যেত । একবার বেশ শরীর খারাপ হয়েছিল, আলতাফ খুব মোলায়েম করে বলেছিল ,”একটু ফোন করে দেবেন, আমি সাবুত মুংগ কি খিচড়ি নিয়ে আসব, খুউব পুষ্টিকর ”। শুনে আমি এতো বিরক্ত হয়েছিলাম, ভাবলাম একবার বলেই ফেলি, কেন রে? মাটন পায়া ,নিহারি এইসব উমদা খাবারের কথা কি তোর মনে পড়ে না? ওই সাবুত মুংগ দিয়ে আন্ডা ভুরজি,কিমা, বড়া ইলাইচি আর কসুরি মেথি দিয়ে তড়কার ডাল রাঁধিয়ে আন দেখি ।
এই তো গেল খাওয়া দাওয়া । আলতাফের আরো অনেক গুণ । সে গড়গড়িয়ে সংস্কৃত বলতে পারে , ইতিহাসের বৈদিক যুগ তার খুব পছন্দের,  কেনোপনিষদে কত নম্বর সূক্তে যম নচিকেতাকে কি কি বলেছিল সে সব তো বটেই উর্দু আরবি কোরান হাদিসও একই রকম ভাবে হজম করে ফেলেছে মহাভারতের ইল্বল বাতাপির মত । তারপর আগেই বলেছি তার পরোপকারের তুলনা  নেই ।  আলতাফের খুব পছন্দের শব্দ হল ইত্তেফাক অর্থাৎ কিনা কো ইন্সিডেন্স অর্থাৎ কিনা সমাপতন । ওতেই জীবনের সব  রহস্য  লুকিয়ে আছে বলে ওর মনে হয় । এই যেমন আমার বন্ধু রিনা আর্কাইভের গবেষণা  করতে দিল্লিতে  না এলে আলতাফের সঙ্গে আমার দেখাই হত না । এরকম অজস্র ইত্তেফাকের কাহিনি নিয়ে আলতাফের সোজা সরল মজার জীবন ।  আমি বললুম, চলো , হজরত নিজামুদ্দিনের দরগায় একদিন যাই । যেখানে উনি সাধনা করতেন সে নাকি  খুব শান্তির জায়গা ।আমার বন্ধুরা বলেছে ।  আলতাফ একটু চুপ করে রইল , বলল , আপনি বলছেন, আমি নিশ্চয়ই যাব কিন্তু আমি  মসজিদ দরগায় যাই না , তাই আপনাকে হয়ত ভাল করে গুছিয়ে সব বলতে পারব না ।আমি বললাম সে তো আমিও  নিয়মিত  মন্দিরে যাই না । তাতে কী এসে গেল ? মেহবুব- এ- ইলাহি এই  সুফি সাধকের  দরগায় সব ধর্ম আর  জাতের মানুষরা যায়। আর এখানেই পাশাপাশি চিরশান্তিতে শুয়ে আছেন  মুরীদ আর মুর্শিদ , শিষ্য আর গুরু । চিস্তি সুফিয়ানা সিলসিলা ধরে রেখেছে বিখ্যাত শায়ের ,সঙ্গীতজ্ঞ  , কাওয়ালির স্রষ্টা ,ভাষার জাদুকর আমির খুসরো আর তাঁর  গুরু নিজামুদ্দিন আউলিয়ার গভীর প্রীতিময় আখ্যান ।





 অহং ধুয়েধুয়ে গুরুর পায়ে জল হয়ে বয়ে গিয়েছিলেন খুসরো, সব নাম যশ  সম্মানের শিরোপা ছাপিয়ে একটাই সত্য ছিল তাঁর জীবনে , তিনি এক সাচ্চা মুরীদ , এক অতীন্দ্রিয় অধ্যাত্ম পথের কলন্দর, এক অনুগামী  ভক্ত ছাড়া আর কিছু নন ।হজরতই তাঁর আকাশ , তাঁর পৃথিবী । একবার নিজের খুব প্রিয় ভাইপোর ইন্তেকালে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন নিজামুদ্দিন । তাঁকে কেউ  শান্ত করতে  পারছিল না, এমনকি খুসরোও না ।  
ভক্তদের মুখ মলিন। এইসময় একদিন খুসরো দেখলেন মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে একদল মেয়ে,গাঁদা ফুলের মালা পরে।


সোনালি রোদ্দুর, হলুদ সর্ষে খেত  গাঁদা ফুলের মালায় তখন  লেগেছে বসন্ত উৎসবের আবির । খুসরো পেয়ে গেলেন একটা দারুণ  ফন্দি । তিনি ওই মেয়েদের মত ঘাঘরা  চোলি পরে সেজেগুজে  নিজামুদ্দিনের কাছে গিয়ে নিজেই গান বেঁধে  গাইতে আর নাচতে  শুরু করলেন “আজ বসন্ত মনালে সুহাগন” । সব জানতে পেরে নিজামুদ্দিনের অট্টহাসি। শোকের পাথর নেমে গেল। সেই থেকে সুফি বসন্ত উৎসবের  শুরু । সুফিয়ানা মস্তি,  প্রত্যেক বছর। যেখানে থাকে শুধু ইশক আর ইবাদত, ভালবাসা আর প্রার্থনা ।

 বললাম, এমন জায়গায় তোমার মত সাচ্চা ইনসান যাবে না তো যাবে টা কে ? তবে হ্যাঁ , আমি  তো পুণ্যযাত্রা শেষ করব  দস্তরখান- এ- করিমের কাবাব খেয়ে । তুমি তখন কি করবে শুনি? খুব রহস্যের একখানা হাসি দিয়ে আলতাফ বলে,  আমি বাইরে একদমই খাই টাই না তবে  ওখানে করিম চাচা যেমন আছে তেমনি শুদ্ধ শাকাহারী খানা ,পরান্ঠাওয়ালে, দহি  ভাল্লা আর  হালয়াই কা দুকান ভি  তো হ্যাঁয় না ? ইত্তেফাকসে । 

ছবির উত্স :গুগল   

Sunday, 20 March 2016

খড়কুটো


 সেদিন এক শিখ সর্দারনী   আর বাঙালি পুত্তরের বিয়ের নেমন্তন্ন পেলাম । মেয়ের বাবা  আমাকে বাঙালি বলে খুব ঘটা করে যেতে বললেন । এদিকে দিল্লির রাস্তা  ভালভাবে  না চেনার জন্য একজন ভদ্রলোককে আমার সঙ্গে জুড়েও দিলেন । কিন্তু  দেখা গেল উনিও জায়গাটা ভাল চেনেন না । তিনি প্রায় প্রত্যেকটা অটোওয়ালা ঠ্যালা ওয়ালা  সব্বাইকে জিগ্যেস করতে করতে চলেছেন আর তারাও ইস গলিসে উস গলিসে পতলি গলিসে  বাঁয়ে ডাইনে আগে পিছে এইসব বলে ভদ্রলোকের কালঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে । এইরকম করে আমরা নানান অলিগলি ,ফোরড গাড়ির শোরুম ঘুরতে ঘুরতে চলেছি । আর ভদ্রলোক সমানে “দিল্লি আব রেহনে কা লায়েক নহি হ্যাঁয়” বলতে বলতে নভেম্বরেও কপালের ঘাম মুছছেন । শেষ পর্যন্ত বিয়েবাড়ির দেখা পাওয়া গেল । প্রচুর সর্দার আর সর্দারনীর জনস্রোত । আমরা যখন পৌঁছলাম তখন গুরুদ্বার থেকে আনন্দ কারজ অর্থাৎ কিনা বিয়ে সেরে বর বউ সবে এসেছে । বর বউ খুব ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে ।  তাদের পেছনে একটা ছোটখাটো ভিড় । আমি সেই ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়লাম । হলঘরে ঢুকতে হবে তো ।  এমন সময়ে সেই ভদ্রলোক হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললেন ম্যাডাম মনে হচ্ছে ভুলভাল জায়গায় এসে পড়েছি । দামাদ মানে বর তো বঙ্গালী হবার কথা । কিন্তু এতো পাগড়ি কৃপাণ গালপাট্টা ওয়ালা শিখ সর্দার । চলুন মারধোর খাবার আগে কেটে পড়ি । আমি বললাম কেটে পড়লেই হল । এতো সাজুগুজু করে এসেছি , মাথার ওপর সুজ্জিমামা উঠে বসেছেন , পেটে  ছুঁচোয় ডন মারছে ।  আবার ওই কৌন গলি গয়ো  শ্যাম করে ফিরতে হবে । কই দেখি কি ব্যাপার ? সত্যিই দেখলাম নব বিবাহিত সর্দার দম্পতি এগিয়ে চলেছেন , সর্দার আবার কৃপাণ তুলে ধরেছেন । ভদ্রলোকের  ঘামে ভেজা করুণ মুখ । আমি তখন তুরুপের তাসটি ফেললাম , বললাম চিন্তা করবেন না ।  ভিড়ের মধ্যে আমি আড় চোখে দেখে নিয়েছি একজনের হাতে ধরা ব্যাগে গোটা গোটা বাংলায় লেখা আছে  শ্রী চৈতন্য বস্ত্রালয়  মেদিনীপুর ।
যাক , ভুল হয় নি শেষ মেষ কিন্তু দামাদ?  আরে বিয়েটা প্রথমে হল শিখমতে । তাই বরের  এই শিখ বেশ । তবে মানিয়েছিল বেশ ,শিখী পাখা না পরেই ।
হলঘরে ঢুকে কান মাথা চোখ সব
ধাঁ ধিয়ে গেল । ভাংরার দাপট আলোর রোশনাই আর উপচে পড়া খাদ্য সম্ভারে আমার তখন মাথা ঘুরছে । তার মধ্যেই দেখলাম ঘরের এককোণে টিমটিম করে ছাদনাতলা তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে । এক গাদা কাঁঠালি কলা আর গাঁদা ফুল জড়ো করছেন কয়েকজন লাল সাদা শাড়ি । সসুরাল গেন্দা ফুল। দ্বিতীয় দফার বাঙালি বিয়ে বিকেল বিকেল শুরু হবে ।
এর মধ্যে একজন এসে আমি মিসেস চাওলা বলে আলাপ করে আমাকে রসগোল্লা খাওয়াবেনই । এদিকে আমি জলেবি আর রাবড়ি খাব বলে কখন থেকে বসে আছি ।
আরেকজন বয়স্ক মহিলা অনেক
  কিছু বলে চলেছেন ,বলতে বলতে আবার পিঠে চাপড় মারছেন । আমি সম্যক বুঝলাম এরা আমাকে বরের বাড়ির লোক বলে ভুল করছেন ।
আর বেশি ভুলভ্রান্তি যাতে নাহয় তারজন্য এবার সত্যি কেটে পড়লাম । একটা আপশোস থেকে গেল বর বউ এর বাঙালি অবতার দেখা
  হল না । আমার এক অত্যুৎসাহী সহকর্মী সেটারও একটা ছবি আমাকে মোবাইলে পাঠিয়েছিলেন । ধুতি কুর্তায় বরকে লাজুক লাজুক দেখাচ্ছে । পঞ্চনদের তেজ আর ফুটে উঠছে না । সবই ভাল ছিল কিন্তু ওই যে ,ওই শোলার টোপর টা , সেটার ডিজাইন টা একেবারে যা তা  




প্রবাসে  দৈবের বশে   জীবতারাটিকে না খসিয়ে তাকে রসেবশে রাখবার জন্য   কতরকম যে কান্ডকারখানা  করতে হয় ! তার মধ্যে একটা হল  , চেনা  পরিচিতির গণ্ডি বাড়ানো । প্রবাস কে যতটা  সহনীয় করে তোলা  যায় আর কি । তবে কিনা   এসব করতে গেলে সূত্র লাগে । দুম করে তো আর গায়ে পড়ে আলাপ করা যায় না । সুতো ধরে ধরে এগিয়ে যেতে হয়  । সেই সুতোর কথাতেই আসছি । তার আগে দু একটা বাড়তি কথা ।
আমাদের পুরো ছোটবেলাতেই intelligent quotient বা IQ রমরমিয়ে রাজত্ব করেছিল । আই কিউ কার কতটা আছে , কি ভাবে মেজে তাকে  আরও  চকচকে করা যায় , অমুকের ছেলে তমুকের মেয়ে কি ঝকঝকে ব্রাইট ,কি বুদ্ধিদীপ্ত ,  কি তেজালো তাদের আই কিউ ।  চাকরির পরীক্ষা , টেস্ট অফ রিজনিং , পাজল আর অঙ্কের বুদ্ধির মারপ্যাঁচে আই কিউ শানিত করার সেই সব সংগ্রামী  দিনগুলো মনে  পড়লে আমি আজও  শিউড়ে উঠি । আই কিউ এর খেলায় অগাধ  হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে একসময়  পায়ের তলায় বরাত জোরে    নিজের জমি হল । এবার সেই জমি যখন শক্ত হতে শুরু করেছে তখন দেখি আই কিউকে হটিয়ে বাজারে নেমে গেছে emotional quotient বা EQ.  মানুষ হতে গেলে বুদ্ধিবৃত্তি যথেষ্ট নয় , দরকার মায়া দয়া অনুকম্পা মূল্যবোধ  । শুধু মস্তিষ্ক নয় চাই হৃদয় । যন্ত্র নয় হতে হবে সৃষ্টি শীল ।   আই কিউ  ধুয়ে ধুয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বাবা মায়ের দল কেমন কাঁধ উঁচিয়ে হাত ঘুরিয়ে বলতে থাকল, ছেলেমেয়েরা ওদের যা পছন্দ  তাই করুক ,মন যা চায়, প্রাণ  যা চায় তাই করুক, আগে তো ভাল মানুষ হোক , তাহলে ক্যানেস্তারা পেটাও  , বা কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে পুতুল বানাও কিছুতেই কোন আপত্তি থাকতে পারেনা । যথেষ্ট ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বাড়ি গাড়ি রেখে গেলুম , এবার  EQ দিয়ে সেগুলোর সদব্যাবহার কর ।  
সারা জীবন ধরে emotional quotient  এর কট্টর সমর্থক মদীয় পিতৃদেব  মনে করতেন আমার  EQ তেও যথেষ্ট ঘাটতি আছে ।
আমার ব্যক্তিত্বের প্রকৃতিটা খানিকটা প্যানপেনেগোছের   । এই প্যানপেনে স্বভাবটা নিয়ে আমি আমার কাছের লোকজনকে  নিরন্তর   জ্বালিয়ে মারি । আর বেশি জ্বলতে চায় না বলে আমার একমাত্র ভ্রাতা তড়িঘড়ি করে কিছু কলকাঠি নাড়ল । যার ফল হিসেবে মোবাইলে ঘন ঘন ফোন । “ আমরা বন্ধুরা আপনার
কাছেই আছি” ।  কাছে মানে জানা গেল একেবারে খোদ আমার নিচের ফ্ল্যাটেই । এই সূত্রেই আলাপ হল পড়শি দিদি আর তার মেয়ের সঙ্গে । মেয়েটির সঙ্গে কথা কইতে গেলে চোখদুটো কপালে তুলতে হয় অথচ সে আমার হাঁটুর বয়সী । আমাদের আলাপের মধ্যে এবারে  সূত্র ধরিয়ে দিল একটি পদ্মফুল  ।রাজনীতির নয় ,তার  থেকে বহু যোজন দূরে এই পদ্ম ফুটেছিল খ্রিস্টের জন্মেরও আগে ।   পদ্ম সূত্র ।
অর্থাৎ মহাযান বৌদ্ধদের  লোটাস সূত্র ।  জানলাম এই পদ্মই তার সুতোয় জড়িয়েছে , এক বিপুল সংখ্যায় ,সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে । এই সূত্র  ধরে আমিও   জড়িয়ে পড়লাম অনেক  নতুন  বন্ধুর সঙ্গে । একগুচ্ছ হাসিখুশি পরোপকারী ঝলমলে উদার সামাজিক মানুষ ।  এদের একটা মূলমন্ত্র আছে , পুরনো চিনে ভাষায় । মন্ত্র  একাধারে শক্তি ও রহস্য। এর অর্থ বুঝে নেওয়া যেমন দরকার তেমনি পড়বার সময় মূলভাষাতে  পড়াই  বাঞ্ছনীয় ।
যাই হোক, ওনারা আমাকে জানালেন যে কোন অসুবিধে যে কোন সমস্যায় ওরা সব্বাই আমার পাশে আছেন । ওদের সঙ্গে একটা বড় মিটিঙে গেলাম ।  সন্ধে বেলায় হাসনুহেনা ফুলের ভরাট গন্ধমাখা জমাট অন্ধকার পেরিয়ে ঘরে ঢুকলাম । এক ঝাঁক হাসি হাসি মুখ , মুখের রেখা মসৃণ , দেখলেই মন ভাল হয়ে যায় । এখন তো লোকে হাসতেই ভুলে গেছে । গৃহকর্ত্রী আকর্ণ হেসে হাত দিয়ে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন । অনেকে মাটিতেও বসেছে । আমার ষষ্ঠে ন্দ্রিয় কিছু একটা জানান দিচ্ছে । ঠিক তাই , চোখে পড়ল  , দেখলাম আমার পায়ের বুড়ো আঙুল টার মাথা ছুঁয়ে লুটিয়ে আছে একটা নধর লোমশ লেজ , মাটিতে শুয়ে আছে একটা পুরুষ্টু অতিকায় ল্যাব্রাডর । ঘুমোচ্ছে যদিও  , কিন্তু জাগতে কতক্ষণ ! আমার সারমেয় ভীতি একটু মেলোড্রামাটিক । অতি নাটকীয়  যা ত্রাপালা গোছের  ।
এই নিয়ে ভুবনেশ্বরে আমার বন্ধু নন্দনার কম  গঞ্জনা আমাকে সইতে হয় নি !   নন্দনার বাড়িতে ছিল তিনটে কুকুর ।  দুটো সুখ দুঃখের  কথা কইতে গেলে তারা আমাকে দেখা মাত্রই এমন হাঁক ডাক  লম্ফ ঝম্ফ শুরু করে দিত । আর দেখেছি কুকুরের মালিক মালকিনরা তাদের একেবারেই বেঁধে রাখতে চায় না । যেন কুকুরে ভয় পাওয়াটাই একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার । জানতে পারলাম  ওর নাম লারা ।  যে ব্যাপারটা আরও আমার কৌতূহল জাগালো   সেটা হল অল্পবয়সীদের ভিড় । অসম্ভব প্রাণবন্ত সব মুখ । খুব উৎসাহী আর সব কাজ খুব ভালবেসে করছে  । এতগুলো কচি কাঁচা দেখব , আশা করিনি । তাই আমার হাঁ  হয়ে যাওয়া মুখ দেখে হাঁটুর বয়সী পাশে সরে এসে বলল ,”  বুঝলে না , এটা হল এস কিউ এর যুগ ।” এস কিউ ? “হ্যাঁ , এস কিউ , spiritual quotient । এদের রিচুয়ালে বিশ্বাস নেই ।” মগজ পেরিয়ে হৃদয় উজিয়ে এখন আত্মানম বিদ্ধি ।  হাঁটুর বয়সী আরও  জানালো এই নব্য এস কিউ ধারকদের  দুটো জনপ্রিয় জায়গা  আছে ।  “কোথায় “ ? একটা ধরমশালা আরেকটা পন্ডিচেরি । দুটোতেই কোন রিচুয়াল লাগে না ।
  এ দিকে  মন্ত্রোচ্চারণ শুরু হয়েছে । শান্ত পরিবেশে মন্ত্রধ্বনি ।ঘরে মৃদু আলো ,  সুগন্ধি মোম গলে গলে পড়ছে  , কাঁচের পাত্রে ভাসমান ফুল । বাইরে হিম পড়ছে ঘাসের ওপর ।  মাঝে মাঝে  লারা সুন্দরী নড়ে চড়ে উঠছে , আমারও ধুকপুকুনি বেড়ে যাচ্ছে । হঠাৎ  খেয়াল করলাম আমার পরিচিত মূলমন্ত্র টা এখন আর পড়া হচ্ছে না । তার জায়গায় সবাই মিলে যা বলে চলেছে সেটা আমার অশিক্ষিত কানে শুনতে লাগছে “গরম চায়ে লেঙ্গে , গরম চায়ে লেঙ্গে , গরম চায়ে লেঙ্গে” । তালে তালে সুরে সুরে সবাই বলে চলেছে ।  আমি ওভাবেই মুখ নেড়ে যেতে পারতাম । কিন্তু এই সুন্দর মানুষ গুলোর সঙ্গে শঠতা করতে মন সায় দিল না । আমি চুপ করে বসে থাকলাম । আমি নবীনতম সদস্য  । অনেক কিছুই জানি না । এদিকে লারার ছটফটানি বেশ বাড়ছে ।লোমশ লেজটা মাঝে মাঝে ঝাপটা  মারছে পায়ের ওপর ।  বুকের ভেতরটা গুর গুর করে উঠছে । লারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেছে , আমি পা দুটো সটান তুলে ফেলেছি চেয়ারের ওপর । আবার এদিকে  মন্ত্রও  বদলে গেল  , আবার আমার অশিক্ষিত কান শুনতে লাগল , ‘’আপনি কোথাও যাবেন না, আপনি কোথাও যাবেন না ,আপনি কোথাও যাবেন না “ । তালে তালে সুরে সুরে সবাই বলে চলেছে ।

একদিকে কোথাকার ফালতু একটা কুকুরকে  ভয় অন্যদিকে অজ্ঞ হয়ে থাকার বিচ্ছিরি লজ্জা  আর কোনও ধরনের   quotient অর্জন করতে না পারার   ন্যক্কার জনক  আত্মধিক্কার নিয়ে আমি  হাস্নুহেনার ভরাট গন্ধ মাখা জমাট অন্ধকার গলি দিয়ে একরকম পালিয়ে বাঁচি ।   




     দিল্লির কামানি অডিটোরিয়ামে  থিকথিকে ভিড় । চলছে তিন দিন ধরে মার্গসঙ্গীতের অনুষ্ঠান । কোপার্নিকাস মার্গ ছাড়িয়ে সর্পিল লাইন । একেবারে সেই লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়ালাম । ইতিমধ্যে গীতালি ও এসে পড়েছে । সরকার বাহাদুরের সেবা করতে গিয়ে প্রথম দিন পরভিন সুলতানা শোনা হয় নি । শেষ  দুদিন শুনতেই হবে । এদিকে  লাইন আরও  লম্বা হচ্ছে ।  আধঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে । সন্ধে নেমে আসছে দ্রুত । অফিস ফেরতা আসছি । দুটো  সরু লম্বা ঠোঙা ভরতি  ঝাল ঝাল মটরভাজা কিনে দুজনে  খেতে থাকলাম । ভিড়, কিন্তু সুশৃঙ্খল । মারামারি  গুঁতো গুঁতি আর চেঁচামেচি নেই ।  এইসব অনুষ্ঠানে এলেই আমার তিনটে জিনিশ মনে  পড়ে । এক, আমার তানপুরাটা , যেটা এককালে খুব যত্ন করে চার থেকে ছয় তার করা হয়েছিল । দুই , উস্তাদ আমির খান সাহেবের পায়ের তলায় বসে গান শেখা শাগিরদ আমার মাস্টারমশাই , কোন তহজিব এ মৌসিকি বা কুদরৎ রঙ্গ  বিরঙ্গি তে যার কোন উল্লেখ কোনদিন থাকবে না আর তিন হল আমাদের আশাবরী ফ্ল্যাটের শিমুল কদম আর কৃষ্ণচূড়া গাছ ঘেঁষা ঘরে রবিবারের সেই উজ্জ্বল দিনগুলো ।
  সময়মাফিক  হলে ঢুকে বেশ মনের মত একটা জায়গা স্রেফ কপালের  জোরে পেয়ে গেলাম । চারদিকে শুধু বিপুল জনগণ । আট থেকে আশি । লাঠি হাতে দাদু দিদা , কপালে দু টাকা সাইজের  টিপ , কাজল লেপা চোখ , তসর শাড়ির  খস খস, ঘামে ভেজা টি শার্ট জিনস পিঠে বোঁচকা , কত রকম পোশাকের চলমান প্রদর্শনী   ,দিশি বিদেশি দলে দলে ঢুকছে , বসার জায়গা আর নেই । সবাই মাটিতে   বসে পড়েছে ।  আমার সামনেই হন্ত দন্ত হয়ে ঘুরছেন আর অসহায়ভাবে চারদিক দেখছেন একজন হাঁসফাঁশ কোট টাই প্যান্ট , মাথায় টাক । খুব বিরক্ত । কেমন যেন  বোঝাই যাচ্ছে মেজ কর্তা  সোজা শাস্ত্রী ভবন বা সাউথ ব্লক থেকে আসছেন । নিরঘাত  শেষ বেলায়  বকা খেয়েছেন বড়কর্তার কাছে । দুটো ইম্পরট্যান্ট ফাইল ছাড়া হয় নি ।  দু চার জন  নাছোড় ভিজিটরকে হ্যাঁ না বলে   বিদায় দিয়ে দিল্লির ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে কোনরকমে এসে পৌঁছেছেন ।এখন আর বসার জায়গা পাচ্ছেন না ।   মঞ্চে এসেই পণ্ডিত রাজন সাজন মিশ্র দাঁড়িয়ে থাকা শ্রোতাদের মঞ্চে উঠে এসে বসতে বললেন ।  নিঃশব্দে ডায়াসের চারদিক ভরে গেল । মেজ কর্তা  স্টেজের  সিঁড়ির ধাপে বসে মাথার টাক মুছলেন । পকেট থেকে মোবাইল বের করে রেকর্ড করা  চালু করে দিলেন যদিও একটু আগেই আদুরে ঘো ষিকা  মাখন মাখন গলায় রেকর্ড করতে মানা করে গেছেন । বাতাসে তখন সুরের  রংমশাল ফুলঝুরি  আর তুবড়ি  ।   অব হুঁ না আয়ে শ্যাম , শুদ্ধ মধ্যমের সৌন্দর্য   খেলিয়ে খেলিয়ে রাগ নন্দ গাইছেন শিল্পী ,বিরহিণীর দুঃখ টুপটাপ ঝরে পড়ছে , মেজ কর্তা আমার দুহাত দূরে মাথা নিচু করে ফেলেছেন । শ্যাম এসে গেছে । এরি জানে না দুঙ্গি , এখন তো আর যেতে দেওয়া যায় না , চমকে বিজুরি মেঘা  বরসে  ,নন্দ থেকে অনায়াস চলনে তিলক কামোদ । আহা কি মিষ্টি রাগ । সেই পুরবৈয়া ঠাণ্ডা বাতাসে ভিজে যাচ্ছে সবাই । মেজ কর্তা মাথা দোলাচ্ছেন , গোঁফের তলায় হাসি টা আস্তে আস্তে চওড়া  হচ্ছে । আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি । এবার পুরো শরীরটা দুলছে ।   চোখ দুটো বোজা  । সুরে অবগাহন  করছি সবাই । কখন অজান্তে লেগে গেল হামীরের সুর । সময় যে  পেরিয়ে গেছে । প্রিয়মিলনের পর এখন বাড়ি যাবে  কেমন করে  সেই বিরহিণী  , বড় উৎকণ্ঠা । ক্যায়সে ঘর জাঁউ লঙ্গরবা। তীব্র মধ্যমের কম্পনে  আকুলি বিকুলি করছে উত্তেজনা । সে এক জাল বিছানো  ব্যাকুল ধুকপুকুনি । আর সেই ঘোরের মধ্যেই দেখলাম মেজকর্তা  খিটখিটে  খ্যাঁক শেয়াল থেকে   কেমন আস্তে আস্তে নধর চিত্রল হরিণ হয়ে গেলেন ।