Saturday, 9 July 2016

দিল্লি দাস্তান ২


জামালি কামালি
গল্প পড়ার মতোই গল্প শুনতে ততোটাই আমোদ , একেবারে নেশার মতো ।  কাজেই  হেরিটেজ বৈঠক  শাম এ আওয়াধের  মৌতাত কাটতে না কাটতেই দাস্তানগো মানে গল্প বলিয়ে আসিফ ভাই কে ধরলাম , পরেরটা কবে হবে , হ্যাঁ ? আর এবারে  কি বলবে?  তা বলে যে উত্তরটা এলো সেটাও  আবার একেবারে  আশা করিনি ।
“রাত মে তা রোঁ কে ছাও মে ,জামালি কামালি ফরেস্ট মে ভূতো কি কহানিয়া “।
রহস্য ছমছমিয়ে উঠল ।  জামালি কামালি নামটাতেই যেন জমকালো শিরশিরানি ।  ঘন হয়ে উঠছে  নিশুতি   রাত , জঙ্গল ঝোপঝাড় ,তারার সলমা চুমকির চাদর , ভূত  রা  ঘুর ঘুর করছে  । কোনো রাতচরা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে ।
দিল্লির খাঁজে খাঁজে কোনে কোনে গল্প ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে । শুধু তুলে আনার অপেক্ষায় ।
এ ক শনিবার  মেহেরাউলির দিকে রওনা দিলাম । গন্তব্য জামালি কামালি মসজিদ । কোন গল্প বলা টলার বৈঠক  নেই,  স্রেফ নিজের কৌতূহল । বেশ খানিকটা নাকাল হবার পর একটা ডাব ওয়ালা বলল তিন নম্বর ডাব ওয়ালা যেখানে বসেছে তার পাশের রাস্তা ধরে চলে যান । এবারে ডাব ওয়ালা গোনার পালা । ঢিবি করে রাখা আছে  ডাব । তিন নম্বর সত্যি সত্যি পাওয়াও গেল । পাশ দিয়ে একখানা মাটির রাস্তা । ধুলো ধুলো । সন্ধে হয়ে আসছে , হালকা মলিন আলো । মেহেরাউলি আরকিওলজিক্যাল পার্ক আদতে একটা ঘেরা জঙ্গল । নানান দিক থেকে ঢুকে পড়া যায় । এই জঙ্গলের  মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে ইতিহাস । বাওলি(step well) , মকবারা , মসজিদ , বুলন্দ ইমারতের খন্ডহর । জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা গিয়ে দেখা পেলাম জামালি কামালির ।



চারদিকে লোকজন প্রায় নেই বললেই  চলে । খুব শুনশান । হয়ত সন্ধে নেমেছে বলেই । মসজিদের লোহার গেট বন্ধ । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি , জায়গাটা কেমন যেন ভুতুড়ে মতো । লম্বা লম্বা গাছ ,ঝুপসি  ঝুপ্সি ছায়া , উঁচু নিচু ঢিবি , কোন লোকজন নেই, শব্দ নেই । একটা  দুটো লোক দেখা যাচ্ছে ,তাদেরই   একজন কাছে  এসে বলল , মসজিদ তো এখন বন্ধ হয়ে গেছে । সাড়ে  পাঁচটার পর কেউ আর ঢোকে না ।
ঢোকা বারণ । যেই না বলল বারণ , অমনি গন্ধটা সন্দেহজনক ।
“ কেন? কেন? “
“ঢুকলেই থাপ্পড় খেতে হবে ।”
 “থাপ্পড় ?”
“ চুল ধরেও টানতে পারে । যেটা কপালে আছে ।”
 আমার বন্ধুবর(বন্ধু+ বর ) জয়ন্ত  বলল , সে একটা থাপ্পড় না হয় খেলামই ।
“একটা? একশটাও এসে পড়তে পারে । ভেতরে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত শিরশিরানি  টের পাবেন  । ব্লাড প্রেশারের ফারাক টা বুঝতে পারবেন । ওনারা এইসময় কেউ ঢুকলে বিরক্ত হন
“কারা ? জামালি কামালি ? “
“না না , ওনারা তো সুফি সাধক ছিলেন । এই সব  জায়গায় আস্তানা গেড়ে বসে আছে জিন রা । “
সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল পাঁচিলের ওপাশ থেকে অন্ধকার কুঠরিগুলো থেকে কারা যেন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে । আর ভারি বিরক্ত হচ্ছে ।
আর দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানেই হয় না । আবার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খন্ডহরের ভেতর   দিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ি ।
পরিত্যক্ত ভাঙা  চোরা বাড়ি ঘর নিঝঝুম লোক জন নেই এমন জায়গায় জিনেরা বাস করে । এই যেমন ধরুন  ফিরোজ শাহ কোটলা । চোখ ধাঁধানো আলো তুমুল হট্টগোলের মধ্যে বল্লেবাজি ক্রিকেট সোফায়
 বসে  কফি চিপস খেতে খেতে সবাই দেখে, সেই কোটলার অন্যএক পোড়ো জংলা  প্রান্তে  সন্ধে নামার  আগে লোকজন  অন্ধকার সব আনাচ কানাচে বাতি জ্বালিয়ে জিনের কাছে মনের কথা জানাতে আসে । চিঠি লিখে দরখাস্ত লিখে, প্লিজ লুক ইনটু দ্য ম্যাটার বলে দেওয়ালে সাঁটিয়ে দিয়ে আসে ।
আসিফ ভাই স্পিরিচুয়াল  তায় সুফি । তার সঙ্গে এসব জায়গায় ঘুরলে অনেকেই নাকি  গোলাপের চন্দনের গন্ধ পায় । অথচ ধারে কাছে কোন ধূপ বা সুগন্ধি নেই ।
তবে সেও নাকি বলে এইসব বৈঠকে লম্বাচুল ভালো করে বেঁধে আসতে হবে আর কোনো পারফিউম মাখা চলবে না কারণ ওই দুটোই জিনদের  খুব আকর্ষণ করে । মানুষের মধ্যে যেমন ভালমন্দ ,জিনদের মধ্যেও তাই । মন্দ জিনকে চটিয়ে লাভ কি !
কৌতূহল এমন মারাত্মক হয়ে উঠলো যে  আবার পরের দিন ঠিক দুপুর বেলা ভূতে মারে ঢ্যালা অর্থাৎ প্রচণ্ড ঝলসানো গরমে রোদ্দুরে গিয়ে দেখি মসজিদের গেট খোলা , তেতে পুড়ে ঝামা হয়ে আছে পাথরের চত্বর । পা দেওয়া যাচ্ছে না । চারদিক শান্ত , ভীষণ শান্ত । সন্ধের নিভে যাওয়া আলোয় যাকে দেখে গা ছমছম করে উঠেছিল সেই প্রশস্ত দালান আর  অপূর্ব নকশা তোলা বন্ধ দরজা গুলো যেন বলছে ,বসে দুদন্ড জিরিয়ে নাও বাপু ।


 জামালি ছিলেন এক সুফি সন্ত এবং কবি। কামালির পরিচয় নিয়ে ধন্দ আছে ।  পাগল বাবরালির চোখের মত এলোমেলো আকাশের নিচে জামালি  কামালি মসজিদ , মেহেরাউলির জঙ্গল ,বিস্তীর্ণ ধ্বংসস্তূপ,  প্রশস্ত   বাওলি  জুড়ে  শুধু  পড়ে আছে  স্তব্ধতা   । অখণ্ড নীরবতা । এক সন্ত কবির প্রার্থনা।  সেখানে যার  কণ্ঠস্বর শোনা যায় তাতে কোন শব্দ নেই ,শুধু অনন্তের স্তবগান , যে শুনতে চায় সেই  কেবল শুনতে পায় । আর কেউ নয় ।   

 চন্দন রঙের আলো বুকে নিয়ে যে
মানুষ একা হেঁটে যায়
তুমি তাকে ডেকেছ কখনও?
তার কাছে বৃষ্টি আছে । আছে
দিন বদলের গান ।
ডাকো, তাকে ডেকে নাও কাছে
রয়েছে আখর যত শুদ্ধতম স্পর্শ দিয়ে
শোনো...।


কবিতা রেহান কৌশিক 







দিল্লি দাস্তান ১


শাম এ আওয়াধ
মোঘল সাম্রাজ্যের  রাজধানী দিল্লির সঙ্গে আন বান শান শওকত খানা পিনা গানা শায়েরি মুশায়েরা মহফিলে পাল্লা দিতে পারত একটি মাত্র  প্রদেশ যেখানে মুর্গাকে জাফরান আর কস্তুরীর বড়ি খাওয়ানো হত জবাই করার আগে ,যাতে খাবার সময় প্রতি পরতে পরতে মেহক ছড়িয়ে পড়ে মুখের ভেতর । এতো স্রেফ খাওয়া  নয় এ হল দস্তুর , পেশকশ ,  এ এক শিল্প । সেই প্রদেশটি হল আওয়াধ বা অযোধ্যা । আওয়াধ ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে একটি প্রদেশ ।  প্রদেশ শাসন করতেন একজন নবাব বা গভর্নর ।
দিল্লি শহরে বড় রাস্তা ছোট রাস্তা মহল্লার নামের মধ্যে বেঁচে আছেন অনের সুলতান সম্রাট , যারা দিল্লির মসনদে বসে ছিলেন । হয়তো ইতিউতি আছেন কিছু দিল্লির প্রভাবশালী রাজপুরুষ। সুফি সন্ত নিজামুদ্দিনের নামও বুকে আগলে রেখেছে এ শহর ।তার নামে আছে রেল স্টেশন , আছে লোকালয় । কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে দিল্লির বাসিন্দা  না হয়েও আজও ভীষণ ভাবে অস্তিত্বময় আওয়াধের দ্বিতীয় নবাব সফদরজং । মাত্র ছেচল্লিশ বছরের জীবন ছিল তার । কেন্দ্র রাজনীতি ও শাসনের  শিখরে উঠেছিলেন তিনি । সুবেদার হিশেবে নানান লড়াই যুদ্ধে সাফল্যের পর তার মাথায় উঠল ‘মীর এ আতশ” এর শিরোপা। সম্রাট মুহম্মদ শাহের আমলে পুরো শাসন ভার টাই তারই কব্জায় ছিল । কিন্তু এসবের মধ্যেও আওয়াধের উন্নতি ও শান্তি শৃঙ্খলা কখনোই ভুলে জান নি । একটা কথাই মাথায় থাকত তার তিনি আওয়াধের ।   দিল্লি মসনদের টালমাটাল ঝড়ো হাওয়ায় সফদরজং হলেন ওয়াজির উল মামলুক ই হিন্দুস্তান অর্থাৎ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান মন্ত্রী । তার ওই স্বল্প জীবন দেখেছে প্রচুর সাফল্য ও সম্মান । কিন্তু রাজনীতির কুহেলিকা জাল থেকে তিনিও বের হতে পারেন নি ।শেষপর্যন্ত আওয়াধেই ফিরে মারা যান আর তার সমাধি সৌধ গড়ে তোলে দিল্লি । আজ তার নামে রাস্তা , হাসপাতাল , সফদরজং এয়ারপোর্ট । সফদরজং  এনক্লেভ ,  সফদরজং টারমিনাস , এতোটা আর কারুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় নি । শোনা যায় আওয়াধের এই দ্বিতীয় নবাব খুব উদার ছিলেন,পন্ডিত কবি শিল্পী , গরিব অনাথদের  সাহায্য করতেন দরাজ হাতে । আজ তার  সমাধি ক্ষেত্রে খোলা প্রাঙ্গনে আকাশের নিচে পড়ন্ত বিকেলে  সফদরজঙ্গের সমাধির পাশে শুরু হল  শাম এ আওয়াধ ।
এককথায় আধুনিক কথকতা । হিন্দি উর্দু মেশানো ভাষায় কথক আমাদের নিয়ে চল্লেন আওয়াধ এবং লখনউ এর ইতিহাসে, হাভেলিতে, অলিন্দে অলিন্দে । অনুষ্ঠান শুরু হল লখনভি কেতায় । হাতে হাতে ঘসে দেওয়া হল খসখসের ইত্বর ,  তারপর এলো রুপুলি তবকে মোড়া  ভাজা ইলাইচি- নোশ ফরমাইয়ে। ঠান্ডা ভেজা মটকায় ছোট্ট ছোট্ট পানের খিলি,মুখে দিলেই মিলিয়ে যায় ,আবার –নোশ ফরমাইয়ে । খসখস মেশানো সোঁদা গন্ধ মাখা হাওয়া আর কথকের ধারা কাহিনি তে  ভেসে এল কখনো যুদ্ধের দামামা,রাজনীতির কুটিল চক্রান্ত , দেহলভি আর লখনভি কেতার মজাদার কিসসা, শের শায়েরি মুশায়েরার চমকদার লখনউ , তার জাঁক জমক , পায়রা মুরগি তিতিরের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো ,দস্তরখান বা খানা পিনার তাজ্জব করা গল্প , ভিস্তি ওলা র রাস্তায়  কেওড়া, ইত্তর,  গুলাব মেশানো জল ছিটানো , মিঠি বোলি আর তমিজ ,এতোটাই কেতা দুরস্ত ছিল  সেকালের চাল চলন ।


রাফতা রাফতা হর পুলিশ ওয়ালে কো শায়ের কর  দিয়া
মেহফিল এ শের ও সুখান মে ভেজ কর সরকার নে ।
এক কয়েদি সুবাহ কো ফাঁসি লগা কর মর গয়া
রাত ভর গজলে সুনাই উসকো থানেদার নে ।

সাগর খইয়ামি সাহাবের এই কবিতাই বলে দিচ্ছে কি বিপজ্জনক ছিল সেকালের আওয়াধ বা লখনউ । মুশায়েরা তে পুলিশদের ডিউটি লাগানো হত । সারারাত ধরে শের শায়েরি শুনে সকালবেলায় লাল চোখ নিয়ে কোতোয়ালিতে গিয়ে সে ব্যাটার তখন বদ হজম  হয়ে নানান কিসিমের  শায়েরি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে । কাকে  সে শোনাবে ? কয়েদি গুলো ছাড়া আর তো কেউ নেই সামনে  । কানের কাছে নানান সুরে নামতা শোনায় একশ উড়ের মতো দিনের পর দিন থানেদারের গজল শুনে গলায় দড়ি ছাড়া কয়েদিদের  আর কোন গতি নেই ।   
লখনউ এর আগে আওয়াধের নয়নমণি ছিল ফইজাবাদ । গঙ্গা যমুনি তেহজিবের প্রাণকেন্দ্র । নবাব সুজাউদৌল্লার আমলে তার কী  সাজ সজাওট আর রৌনক  । শহর তো চার ক্রোশ দূর, ফটক থেকেই তার চমচমাহট শুরু হয়ে যেত । রঙ্গিলা বেফিকর জীবন । জলসা , মুজরা , মেহফিল । খেল তামাশা । এরপর ফইজাবাদের জলুস কমে গেলো কারণ ততদিনে আসফ উদ দৌলা লখনউতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেলেন । সন ১৭৭৫ । শুরু হল লখনভি  দাস্তান । মৌসিকি আর ফনকারের দলের মৌতান  শহর মাতিয়ে দিল  । দরিয়া কিনারে নবাব আর মোসাহেবের ঘুরে বেড়ান , নবাব দেখেন হায়দরি সাহেব মাথা নিচু করে হাঁটছেন । বড় ভালো গান করেন , নবাব বললেন , আমাকে গান শোনান । হায়দর সাহেব বলেন , আমি তো আপনার বাড়ি চিনি না । আমি যেতে পারি  তবে হালুয়া পুরি খাওয়াবেন তো ?প্রাসাদে ঢুকে  হায়দর  মিয়াঁ বুঝতে পারলেন আরে এতো নবাবের বাড়ি । হালুয়া পুরি তো খেলেনই , আবার বিবির জন্য ছাঁদা বেঁধে নিয়ে গেলেন । নবাবি মর্জি । গানা শুনে খুশ । এরপর ফরমায়েশ এলো , নবাবকে কাঁদাতে হবে , নাহলে উস্তাদ কে দরিয়ার পানিতে ডুবিয়ে দেবো । যাক সে যাত্রা হায়দরি প্রাণে বেঁচে গেছিলেন ।
আর ছিল দাস্তানগোই । গলপ বলা ।  দিল্লিতেও দাস্তানগোই ছিল । তবে সিধা সাদা । লখনউতে দাস্তান গোই ছিল শের শায়েরিতে ভরপুর । দাস্তান । ম্যায়খানা । হুক্কাখানা । আফসানা আর দাস্তানের মধ্যেই বুঁদ হয়ে থাকত সবাই । ছিল ভাঁড় , তাদের নৌ টঙ্কি । আর ছিল দস্তরখানের কেরামতি । বাবুর্চিখানা র মধ্যে ছিল নানান গ্রেড । নবাবি খানাপিনা মানে খাসা পেশ করা , দস্তরখান সাজানো বড় বাহাদুরির কাজ ছিল তখন । রকাবদার আর বাবুর্চি দের মেজাজ মর্জি ও ছিল তেমনি দেমাকি ফিনফিনে । দিল্লি আর লখনউ এর মধ্যে বেশ একটা পাল্লা দেবার ব্যাপার ছিল তখন বাদশা আর নবাবদের মধ্যে । মুর্গা কে খাওয়ানো হত জাফরান আর কস্তুরির গুলি, রান্না করার পর তার যা খোশবায় হত ! তবে লখনউ পছন্দ করত পুলাও ।  বিরিয়ানি ছিল বদনুমা খানা । লখনভি খানায় ইরানি প্রভাব বেশি ছিল । মশল্লার সুচতুর ব্যাবহার ।  যাকে বলে খানদানি রইস । সঙ্গে বাখরখানি রোটি । মোতি পুলাও । নবরতন পুলাও । আনারদানা পুলাও । ভাতের দানা অর্ধেক লাল , অর্ধেক শাদা । খাবার পেশকশ ও সেই রকম । রেকাব এগিয়ে দেবার সময় সমানেই বলা হত তসলিম , তসলিম , আদাব আদাব । যতটা খাওয়া হচ্ছে তার বেশির ভাগই আদব কায়দায় চলে যেত  । কোথায় জানি একবার পড়ে ছিলাম, নবাব তার খাস নফরকে নিয়ে দাওয়াতে গেছেন । নিমন্ত্রণ কর্তা সবাইকে নিয়ে খেতে বসেছেন । এমন সময় তার খাস বান্দা মিহিসুরে গেয়ে উঠলো ফুলের তলে বুলবুল ছানা ,তারে উড়িয়ে দেনা উড়িয়ে দে না । এই কথা কানে যাওয়া মাত্র সেই কর্তা তার দাড়ির মধ্যে আটকে থাকা  সরু লম্বা ভাতের দানাটি ঝেড়ে ফেলে দিলেন । এদিকে আমাদের এই নবাবের ব্যাপারটা খুব মনে ধরে গেলো । তিনিও একদিন সবাইকে দাওয়াতে ডাকলেন । নফরকে বললেন শোন , সেদিন অমুক মিয়াঁ র  বাড়িতে দেখেছিলি না ওনার নফর কেমন কায়দা করছিল? তুইও ওরকম করবি , কেমন? যথাসময়ে আমাদের এই নবাব তার দাড়ির মধ্যে একটা ভাত ফেলে দিয়ে তার নফরকে ইশারা করে কেরামতি দেখাতে বললেন । আর সেই নফর তখন বলে উঠল, সেই যে কাদের বাড়িতে কিসের না কিসের কথা হয়েছিল না? আপনার দাড়িতে তাই হয়েছে ।


রইসি আরো ধরা পড়ত পানদানের আকারের ওপর । যতবড় পানদান তত বেশি রইসি । বিশেষ করে মেয়ের বিয়ের সময় বিরাট বিরাট পানদান দিয়ে পাঠানো হত । চার কাহার ডোলি সাজিয়ে যখন দুলহনকে শশুরাল ছাড়তে যেত , দেখা যেত , পালকির মধ্যে এককোণে গুটিসুটি মেরে ছোট্ট বউ বসে আছে। পুরো পালকিই জুড়ে রাজত্ব করছে বিশাল পানদান ।  জলে ভেজানো  মাটির পাতলা পাতলা ভাঁড়ে পান ঠান্ডা করে রাখা হত ।
এইছিল সেকালের মিঠে পানপাতার মতো গপ্প গাছা । চলতেই থাকে , ফুরোয় আর না । এই অঞ্চলেই গঙ্গা যমুনি তেহজিবের কেন্দ্র ছিল । তেহজিব মানে এটিকেট অযোধ্যার নবাবরা এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । হিন্দু মুসলমান যৌথ ভাবে এই  তেহজিব মেনে চলত ।  বেনারস আর মথুরার ব্রাহ্মণরা সরকার বাহাদুরের পতনের পর একবছর কোন তেওহার পালন করেনি ।  
গল্প জমে উঠেছে । দেখি  আমাদের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কেমন জোনাকি জ্বলে ওঠে , ইতিহাস কেমন ফিসফিসিয়ে ওঠে, নানান দিলচস্পি কিসসা কহানির মধ্যে  আসর জমে উঠছে । আজ  আওয়াধের  “মীর এ আতশ” সবার অগোচরে  তার খুশির রোশনাই জ্বালিয়ে দেবেন, যদিও আমরা কেউ দেখতে তা  পাব না ।


সফদরজঙ্গের সমাধি
কাহিনি সূত্রঃ আসিফ খান দেহেলভি

Friday, 24 June 2016

আয়েশা


ধীরেন্দ্র এস জাফা ভারতীয় বায়ু সেনার ফাইটার পাইলট এবং উইং কমান্ডার ছিলেন । ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময়  তিনি পাকিস্তানের হাতে যুদ্ধবন্দী হন । পরে মুক্তি পাবার পর তাঁকে বীর চক্র পুরস্কার দেওয়া হয় । বন্দীদশার সেই কাহিনি তিনি লিখছেন তাঁর  Death Wasn’t Painful  বইটিতে । এই বইটির  ১৯ নম্বর পরিচ্ছেদ টির নাম   
 ” আয়েশা” ।
তাঁর পরিবারের সম্মতি নিয়ে সেই পরিচ্ছেদটির কিছু অংশ অনুবাদ করা হল ।
কয়েকমাস পরের কথা । খুব গরম ছিল সেদিন  । একেবারে ভোরবেলায়  ধীরেন্দ্রর জেলকুঠরির  লোহার গ্রিল দরজাটা গার্ড এসে খু লে দিল । অথচ এমনটা হবার কথা নয় । শুধুমাত্র বাথরুমে যাবার দরকার হলেই দরজাটা খোলা হয় ।    ধী রেন্দ্র তাই একটু সতর্ক হয়ে বসলো  । ভোরবেলার আলো আঁধারির মধ্যে ভুতুড়ে একটা চেহারা কুঠরির মধ্যে সেঁধিয়ে এলো । কে এটা ? ওহ সেই অফিসার ,মুমতাজ ।
“দূর ছাই,যাচ্ছেতাই একেবারে ”, রাগে গরগর  করতে করতে নিজের মনেই বলতে থাকে মুমতাজ , এদিকে গলা চড়িয়ে হাঁক ছাড়ে ,  “সুপ্রভাত” । ও পাশ থেকে কোনও উত্তরই এলো না । এক মিনিট ধী রেন্দ্রর  চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে , তারপর হিসহিসিয়ে বলে ওঠে “আমি তোমার নাড়ি নক্ষত্র জানি ”।
খুব মৃদু গলায় ধী রেন্দ্র বলে “এ কথা তো আগেও বলেছেন “।
“হ্যাঁ , আমাদের বড়কর্তারা জানেন না বটে , কিন্তু আমি জানি , সব জানি । “ ক্ষোভ গলায় ঝরে পড়ছে মুমতাজের  । “ তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে গেছিলে । যখন কয়েদ এ আজম , ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে র ডাক দিলেন তোমরা সবাই বিরুদ্ধে ছিলে, আমাদের জমি  বাড়ি  বেচা , আমাদের সব কিছুতে বাধা দিয়েছিলে । কিন্তু বন্ধ করতে পেরেছ কিছু ? দেখো , ভালো করে দেখো , আমরা কত ভালো আছি। বাড়ি আর জমি বেচে ভালো দাম পেয়েছি আর নিজেদের মুলুকে চলে আসতে পেরেছি। তোমরা কিসসু করতে পারো নি । ইনশা আল্লাহ্‌ “।
ধী রেন্দ্র মনের গভীরে তলিয়ে ভাবতে থাকে । এ কে ? এ কে হতে পারে? তার শহরের ওপর তলার মুসলমানেরা বেশির ভাগই পাকিস্তানে চলে গেছিল । ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে , লুঠ তরাজ , মারামারি দাঙ্গা , দুই ধর্ম গোষ্ঠীর বিরোধ শুরু হয়েছিল ।  সম্ভ্রান্ত লোকেরা সম্পত্তি জমি বেচে ভালোরকম পয়সা নিয়ে নতুন দেশে চলে গিয়ে বেশ জমিয়ে বসেছিল । এরা সবাই প্রায় সমাজের উঁচু তলার লোক  , আর এইসব দাঙ্গা হাঙ্গামায়  লুঠপাটে যাদের ব্যাবহার করা হয়েছিল সেই নিচুতলার লোকগুলো তাদের পুরনো মহল্লাতেই রয়ে গেছিল । মুমতাজ ওইরকমই বড়লোক বাড়ির কেউ হবে হয়তো । ধী রেন্দ্র খুব করে ভাবতে থাকে , যদি কোনও সূত্র পাওয়া যায় , যদি সেও একদিন তার চোখে চোখ রেখে বলতে পারে ,” আমি তোমার নাড়ি নক্ষত্র সব জানি “।

২

জল যেমন তার স্তর সমান  রাখে , সমাজটাও তেমনি । মেলামেশা সব   সমানে সমানে । হিন্দু জমিদার আর মুসলমান জমিদার , দুই ধর্মের কবি লেখক শিল্পী ,আবার দুই গোষ্ঠীর আমুদে আয়েসি শৌখিন।  আবার খেটে খাওয়া বিড়ি ফোঁকার দল একসঙ্গে  বসে মহাজনের চড় থাপ্পড় , ফসল , জল বৃষ্টি নিয়ে গুলতানি করত । পণ্ডিত আর মোল্লার দল গোল হয়ে বসে লোকজন সব উচ্ছন্নে গেল , কারুর কিছু বিশ্বাস , ধম্ম কম্ম নেই ,এই নিয়েই আলোচনা করে চলত । এইসব মিলেজুলে থাকতে থাকতেই সাম্প্রদায়িক উষ্মা বা মন কষাকষি খুব মাথা চাড়া দিতে পারত না । কিন্তু সব ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করল ,ভিন্ন দেশের প্রস্তাব এলো , একটা সন্দেহ আর অবিশ্বাসের হাওয়া যেন সব কিছুকে ঘিরে ফেলতে লাগল ।
ছোটবেলায় ,ধীরেন্দ্রর  বেশ মনে আছে ,তারা প্রতিবেশী  মুসলিম ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশত । মাসুদদের বাড়িতে ভালোই যাতায়াত ছিল । নানান ছলছুতোর মধ্যে একটা ছিল দূর থেকে ঘারারার ঢেউ তোলা সেই মেয়েটিকে একবার শুধু একবারের জন্য দেখা ।
তারপরে আচমকা সেই খবরটা এলো  । মাসুদরা রাতের অন্ধকারে শহর ছেড়ে চলে গেছে । কেউ বলল আলি গড় কেউ বলল পাকিস্তান । কিছুদিন পরে ওদের আত্মীয়দের,   যাদের খুব বেশি পয়সার জোর ছিল না  তাদের কাছ থেকে জানা গেল ওরা করাচি   চলে গেছে  । এরপর থেকে ধীরেন্দ্র ওদের প্রতিটি খবর জানবার জন্য  একরকম মুখিয়ে থাকত , বিশেষ করে একজনের খবর  । বছর ঘুরতে খবর পেল মাসুদদের বড় মেয়ের পাকিস্তান এয়ার ফোরসের কোন এক অফিসারের সঙ্গে নিকাহ হয়ে গেছে । তারপর থেকে ওদের কোন খবর আর রাখত না সে । 
আজ চকিতেই  তার  চোখ সরু হয়ে এলো , মুমতাজের দিকে সটান তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল , “আয়েশা  ?”
মুমতাজ কিছুই না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ।

  ৩                                
আয়েশা   , ঘারারার ঢেউ তোলা সেই মেয়ে ,কালো মিশমিশে চুলে হালকা করে বাঁধা  মোটা বিনুনি ,মাখন আর পিচ রঙা সেই মেয়ে মিশন স্কুল আলো করে থাকত ।
সবাই হাঁ করে সেই সুন্দর মুখ খানার দিকে তাকিয়ে থাকত , বড় বড় কাজল টানা চোখ কখনো সখনো ধীরেন্দ্রর ওপর এসে পড়ত ,আবার অনেকটাই ধী রেন্দ্র নিজে থেকে ভেবে নিতেও  ভালোবাসতো ।
মিশন স্কুলে নানা রকমের ফাংশান হত । কবিতা নাটক গান । কিন্তু সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ছেলেমেয়েদের বিতর্ক । সেবারে বিষয় ছিল “মেয়েদের স্থান গৃহকোণে “।
ডায়াসের ওপর ছেলেমেয়েদের  আলাদা আলাদা  লাইন করে দাঁড়াতে হত  । সেই দিন কয়েকজনের পরে এলো আয়েশার ডাক  । আলো ছড়িয়ে এসে দাঁড়ালো সেই মাখন পিচ ফল রঙা মেয়ে । সবাই তাকিয়ে আছে হাঁ করে । হাঁটু থেকে কপাল পর্যন্ত হাত তুলে অভিজাত ভঙ্গিতে কোমর ঝুঁকিয়ে লম্বা বিনুনি দুলিয়ে কোহল মাখা দুটি চোখ তুলে  দর্শকদের বলল “আ-দা- ব “। তারপর তার ঝঙ্কারময় সুন্দর গলায় তার বক্তব্য রাখল  , শুনেই মনে হল খুব যত্ন করে অনেক খেটে নিজেকে এই অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করেছে । কে জিতবে তার ফয়সালা যেন হয়েই আছে , শুধু নাম ঘোষণার অপেক্ষায় । ধীরেন্দ্র চোখ ফেরাতে পারছিল না । যেন তার ঘোর লেগেছে , জাদু করেছে কেউ তাকে ।
 এবারে ধীরেন্দ্রর পালা আসে । ডায়াসে উঠে সে  বলতে  শুরু করে “ মাননীয় বিচারপতিগণ , অভিভাবক “এবং    ‌,” বলতে বলতে ডানদিকে চোরা চাউনি দেয়  আর কোহল চোখ তার সব শক্তি শুষে নেয় । গলা শুকিয়ে কাঠ । দর্শকদের মধ্যে ততক্ষণে গুনগুনানি শুরু হয়ে গেছে , টিচাররা কঠিন ভাবে তাকিয়ে আছে , লজ্জায় লাল হয়ে তোতলাতে তোতলাতে ধীরেন্দ্র বলে “আমার   ‌,আমার  আর  কিছু  মনে পড়ছে না “। ধুপধাপ করে স্টেজ থেকে নেমে অন্ধকারে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে । লজ্জায়  ধিক্কারে নাস্তানাবুদ । অল্প কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা ধীরেন্দ্রর  পাশ দিয়ে হেঁটে গেল সেই রানি সাহিবা , হাতে ঝকঝক করছে বিজেতার পুরস্কার । মস্ত বড় একটা কাপ ।
এর পর থেকে আয়েশার ভাই এর সঙ্গে ভাব পাতায় ধী রেন্দ্র । নানান ছলছুতোয় ও বাড়িতে যায় , হোলি আর ঈদ এর জন্য অধীর অপেক্ষা । কারণ এই দুটো পার্বণে খুব মেলামেশা হত । আর ছিল তিজ । হিন্দু মুসলিম মেয়েরা নিজেদের বাড়ির বাগানে আমগাছে ঝুলায় দোল খেতো । আর ছেলেদের কাজ ছিল গাছে দড়ি বাঁধা , আর পেছন থেকে দোলনা ঠেলে দোল দেওয়া ।
তারপর যে কথা থেকে কি হয়ে হেল । একটা উদ্ভ্রান্ত সময় গিলে নিলো সব কিছু ।এলো নতুন দেশের দাবি, দেশ ভাগ । জীবন যাপন , সংস্কৃতি, সমাজ জীবনে সম্ভ্রমবোধের যে একটা পারস্পরিক মেলবন্ধন ছিল সে টা কেমন যেন ঘোঁট পাকিয়ে গেল। আর   মানবিকতার ঘোরতর  পচনের মধ্যে একদিন হঠাৎ  মাসুদরা চলে গেল ।
 ৪
কিছুদিন বাদে মুমতাজ জেলখানায়  এলো । বেশ অস্থির এবং বিরক্ত । এসেই ধীরেন্দ্রর দিকে সেই নিয়ম মাফিক চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকল । তারপর শুরু করল একটা বিরাট স্বগতোক্তি “মগজ বুদ্ধি কল্পনা সবই আমাদের আছে ‌   , পাটনা থেকে লখনউ , ইলাহাবাদ থেকে আলিগড় , বেরিলি  থেকে ভোপাল সর্বত্র  ,। ইত্যাদি ইত্যাদি ।  
ধীরেন্দ্র বিমর্ষ ভাবে বলে ওঠে “ আপনি এভাবে বলছেন কেন? এভাবে ভাবছেনই বা কেন? আপনারা তো দেশ পেয়েছেন , সবকিছুই পেয়েছেন। তাহলে আর সমস্যা কোথায়? “
“তুমি বুঝবে না “, দুম করে উঠে দাঁড়ালো মুমতাজ । ধী রেন্দ্র তার পথ আটকে দাঁড়াল ,জিজ্ঞেস করল ,”আয়েশা কেমন আছে?”
ধীরেন্দ্রকে আর কিচ্ছু বলার সুযোগ না দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মুমতাজ ।
পরের দিন এসে ধীরেন্দ্রকে হতবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করল ,”আমির চাঁদ রা এখনো আছে ? আর সেই জজ সাহেব , ব্রিজ নারায়ণ ?”
ধীরেন্দ্রর কাছে ব্যাপারটা এবারে পরিষ্কার হল । এতদিনের এই রাগ টা মুমতাজ বেশ মাথা খাটিয়ে ভেবেচিন্তে দেখিয়ে এসেছে ,তাতে হৃদয়ের সমর্থন ছিল না হয়তো । সেই ভেজা  শৈশব , নরম কৈশোর , সেই সব বড় হওয়ার দিনের মন ভালো  করা স্মৃতির ঝাঁপি , তার ফেলে আসা দিন তাকে বীরেন্দ্রর কাছে টেনে এনেছিল , ভালবাসা এবং তাচ্ছিল্য দুটোই মেশানো ছিল তাতে । কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলো মুমতাজ । আবার শুরু করে দিল তার রাগ ঝাঁঝ মেশানো কথাগুলো । ধী রেন্দ্রর মন আর এসবের মধ্যে ছিল না । এই সব অর্থহীন এবং অন্তহীন  তর্ক বিতর্কে  তার আর কোন সায় নেই । এতদিন ধরে যে কথাটা বলি বলি করে বলা হয়ে ওঠেনি এবারে সে বলেই ফেলল ,” আমি আয়েশার সঙ্গে দেখা করতে পারি?  একবার মাত্র একবারের জন্য?”
মুমতাজ তাকিয়ে রইল । তারপর কি যেন ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল । ধী রেন্দ্রর মন তোলপাড় । মুমতাজ কি রেগে গেল? তার অনুরোধটা কি ও ভালো মনে নিতে পারল? কি জানি? হয়তো হ্যাঁ , হয়তো  বা ,না ।

৫
মুমতাজ তার রুটিন ভাঙল । একদিন এলো বিকেলবেলা । শুধু তাই নয় , জেলকুঠরির বাইরে অফিসঘরে তাকে ডেকে পাঠাল । মুমতাজ চেয়ারে বসে ।      ধী রেন্দ্রকে একটা চেয়ার দেখিয়ে ইশারায় বসতে বলল। মুমতাজ কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময়ে একটা পুলিশ দুমদাম করে ঘরে ঢুকে মুমতাজের কানে কানে কি সব ফিসফিস করে বলতে শুরু করল  । মুমতাজ ব্যাস্তভাবে উঠে দাঁড়াল, যেন এখখুনি বেরিয়ে যাবে ।
“একজন সিনিয়র অফিসর এসেছেন এখানকার আরেঞ্জমেন্ট দেখতে ,আমি আর এক মিনিট ও এখানে থাকতে পারব না “। মুমতাজ দৌড়ে বেরিয়ে গেল । পুলিশটা ধীরেন্দ্রকে কুঠরিতে ফিরে যেতে বলল। ঘর থেকে বেরিয়েই সে  শুনতে পেল একটা গাড়ির  স্টার্ট দেবার শব্দ  , একটা বাঁক নিতেই গাড়িটাকে সে পরিষ্কার দেখতে পেল। গাড়িটা চলে যাচ্ছে  ,‌গাড়ির জানালাটা ,  জানালার ওপাশে সেই মাখন পিচ রঙা মুখ , কাঁধ বেয়ে নেমে আসা মোটা বিনুনি , কোহল কালো দুটো চোখ তার দিকে তাকিয়ে । বিভ্রান্ত , হতচকিত ,স্মৃতি মেদুর ।
হতভম্ব ধী রেন্দ্র হাত তুলে বলতে চাইল থামো থামো ,একটু দাঁড়াও ,আমি আসছি ।
গাড়ি স্পিড নিয়ে বেরিয়ে গেল । আবার আয়েশা হারিয়ে গেল তার কাছ থেকে ।