Tuesday, 23 August 2016

দিল্লি দাস্তান ৪



মুন্ডহীন ধড় গুলি (আহ্লাদে) চিৎকার করে

দেশ জোড়া বিদ্রোহ তখন । ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে  জান কবুল করে লড়ছে সিপাহিরা । অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষও বিদ্রোহে শামিল । আগুন জ্বলছে কোথাও দাউদাউ কোথাও ধিকি ধিকি । সবাই তাকিয়ে দিল্লির দিকে । কিন্তু বেশিক্ষণ আর অপেক্ষা করার দরকার হল না , ফিরিঙ্গি দিল্লি জিত লিয়া,এই খবরটাই দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে তখন । তখত থেকে নেমে তাজ খুলে ফেললেন বাহাদুর শাহ জাফর , হিন্দুস্তানের শেষ সম্রাট ।
হুমায়ুনের সমাধি ক্ষেত্রে তার দুই ছেলে আর নাতিকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করানো হল ফিরিঙ্গি সেনা ক্যাপটেন উইলিয়াম হডসনের হাতে । পল্টনরা পাহারা দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজ পরিবারের অনেক বন্দীদের নিয়ে চলেছে লাল দরওয়াজার দিকে।লাল দরওয়াজার সামনে সেদিন দারুণ ভিড় ।হাডসন দেখলেন মাথায় সাদা ফেট্টি বেঁধে গাজির দল চারদিক প্রায় ঘিরে ধরেছে । লাল দরওয়াজার এককোণে যে ছোট্ট তথ্য দেওয়া আছে তাতে লেখা আছে ,হাডসন ওই তিন যুবরাজকে ওপরের জামা খুলে ফেলতে বলে তারপর খাপ থেকে তলোয়ারের একটি শানিত ঝলক , আর টুপ টুপ খসে পড়ে তিনটি মাথা , “জমায়েত সব নারী পুরুষ শিশুদের মেরে ফেলা হোক “ এই আদেশ হেঁকে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়ে হাডসন । লাল দরওয়াজা সত্যি রক্তে রক্তে লাল হয়েছিল সেদিন । সবাই বলত খুনি দরওয়াজা । এই খুনি দরওয়াজার গেটেই ঝুলেছে দারা শিকোর দেহহীন মাথা ।তারও আগে জাহাঙ্গীরের আমলেও হত্যালীলার নীরব সাক্ষী এই খুনি দরওয়াজা । কেউ কেউ কলঙ্কের কিসমত নিয়েই জন্মায় । খুনি দরওয়াজাও তাই । শতকের পর শতক কেটে গেলেও তার বদনাম আর ঘোচে নি । ১৯৪৭ এর দাঙ্গায় রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে এইখানেই । এমনকি ২০০২ সালে এক মেডিক্যাল ছাত্রীকে দিন দুপুরে এখানে গন ধর্ষণ করা হয় । তারপর থেকে এর দরজায় তালা পড়ে যায় । ভুতুড়ে গপ্পো ও শোনা যায় অনেক । এমনও শোনা যায় ভূতদের টার্গেট সাহেব মেম । দেশের লোকদের তারা বিরক্ত করে না ।
ব্যস্ত বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ । একদিকে ফিরোজ শাহ কোটলা , অন্যদিকে মৌলানা আজাদ মেডিক্যাল কলেজ । রাস্তার দুদিক দিয়ে তির বেগে গাড়ি ছুটছে । তার পাশেই  শতকের পর শতক সারা গায়ে কলঙ্ক মেখে বেবাক দাঁড়িয়ে আছে শের শাহ সুরির বানানো খুনি দরওয়াজা । রক্তের গন্ধ , সারা গায়ে । অত্যাচারের কদর্যতা , প্রতিটি রন্ধ্রে । দেখলাম পাথুরে জমির ওপর পড়ে আছে একটা থ্যাঁতলানো লাল ফুল ।











                                                                                                 
 জামি বিবির খসম রাতে বাড়ি ফেরেনি , সাকিনারও তাই । তারা ঠগ জোচ্চুরি করে খায় । এখন কোতোয়ালি ভারি  উগ্রচন্ডা । সপাট মার আর মুখের রক্ত তোলা ছাড়া কোন কথা নেই বিবিদের চোখে রাতের ঘুম নেই অনেকদিন  ।মনটা কু গায় । সুলতানের প্রাণে তো মায়া দয়া নেই । কাক ভোর হতেই দু জনায় দৌড়ায় । ঘুরে ঘুরে মিনারটাকে দেখে , বুক দুরদুর করে । আর বাঁক ঘুরতেই বল্লমের খোঁচার মুখে ঝুলছে তাদের  মরদের কাটা মুন্ডু । চোর মিনারের ২২৫ টা গর্ত দিয়ে বল্লমের মুখে একটা করে মুন্ডু ঝুলে আছে । চোর মিনার বানিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খিলজি । আজ হজ খাসের যে অভিজাত পল্লিতে এই মিনার সেই জায়গাটা সেই সময় চোর ছ্যাঁচোড় ঠগ ডাকাতের  মহল্লা ছিল । লোকে দিনমানে চলাফেরা করতে ভয় পেত ।    
আলাউদ্দিন খিলজির আমলে সেনাবাহিনীর দারুণ রমরমা । হিন্দ নয় সমস্ত মধ্য এশিয়াতে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল । সুলতানের ছিল একটা তুখোড় গুপ্তচরবাহিনী , তৎপর আর অনুগতকোতোয়ালি গুলো ছিল খুবই তাগড়া , বলশালী  ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে আইনের চোখে সবাই সমান । অন্যায়ের শাস্তি  পেতেই হবে ।  বাইরের শত্রু মোকাবিলা করা তখন সুলতানের প্রধানতম কঠিন কাজ । তাই ঘরের ভেতরটাকেও পোক্ত করতে চেয়েছিলেন যাতে উটকো উৎপাত না আসতে পারে । চোর ডাকাতদের চোর মিনারে ঢুকিয়ে মাথা কেটে ,এমন আড়ং ধোলাই দিয়েছিলেন যে  আমির খুসরো লিখছেন, যে চোর আগে গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দিত , সে এখন বাতি জ্বেলে বড় রাস্তা পাহারা দেয় । যদি কোন পর্যটকের একটা সুতোও হারিয়ে যায় তাহলে কাছাকাছি লোকজনেরা হয় সেটা খুঁজেই দেবে নয়ত তার দাম মিটিয়ে দেবে ।  খুসরো আরো লিখছেন এইসব কড়া ব্যাবস্থার জন্য রাস্তাঘাট নিরাপদ থাকত ,শুধু তাই নয় সিন্ধুনদের মুখ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত চোর ঠগ ডাকাতের নাম আর শোনা যেত না ।
আলাউদ্দিনের বাইরের বিপদটা ছিল মোঙ্গল অভিযান । আট হাজার মোঙ্গল বাহিনীকে  তিনি মেরে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন চোর মিনারে । যাদের জায়গা হয় নি সেই দেহগুলোকে পাঁজা করে ঢিবি করে রাখা থাকত । এই ভাবে সুলতান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে তার ভয়ঙ্কর কঠিন  রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতেন লড়াক্কু মোঙ্গলদের কাছে ।   মোঙ্গলদের মোকাবিলার জন্যই বানিয়েছিলেন সিরি ফোরট ।
এককালের হাড় হিম করা চোর মিনার দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে হজ খাসের সাজানো পাড়ার মধ্যে । ২২৫ তা ঘুলঘুলির মধ্যে এখন চড়াই কাক লুকোচুরি খেলে, আঁশটে নোনতা  চটচটে  লাল রক্তে ভেজা জমিতে এখন সবুজ ঘাস । সেখানে লাল জামা পরে পরীর মতো একটা মেয়ে খেলে বেড়াচ্ছে , আরও দেখি স্টিলের বাটিতে নুন লঙ্কা দিয়ে ডুমোদুমো কালচে লাল জাম মেখে গোল হয়ে বসে খাচ্ছে একদল বাঙালি বউ । তাদের পেছন দিকে কতো মেয়ের মায়ের বোনের হাসি স্বপ্ন মুছে নেওয়া মিনার হতাশ ভাবে তাকিয়ে আছে । বউগুলোর মুখ জামের রসে টইটুম্বুর , সিঁথির লালে পলার লালে কি নিবিড় শান্তি ! 





Monday, 22 August 2016

বেজে গেছে কখন, সে টেলিফোন

ঞ্চ কাঁপিয়ে আলো আর শব্দের তোলাবাজির দাপট তখন প্রায় সহ্যসীমার বাইরে । কোনাকুনি ডান দিক বাঁ দিক ওপর সব দিক থেকে নানান আলোর চরকি ঘুরপাক খাচ্ছে । সেই সঙ্গে বাজনদারদের শব্দঝঙ্কার । আলো বলে আমাকে দ্যাখ , শব্দ বলে আমাকে শোন । ডুয়েট না হয়ে এ যেন ডুয়েল হচ্ছে ।
 এখনো গায়িকা প্রবেশ করেন নি । তিনি স্টেজে আবির্ভূত হবার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে । যাত্রাপালা শুরুর আগে যেমন জগঝম্প হয় শ্রেয়া ঘোষাল দৃষ্টিনন্দন এবং শ্রুতি নন্দন দুটোই । কিন্তু হলে হবে  কি, এতো নন্দনতত্ত্বের চাপ আমি নিতে পারলাম না । সারাদিন অফিস করার পর এই আলো আর আওয়াজ আরো যেন ক্লান্ত করে দিল ।  সিরি ফোরট অডিটোরিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে এসে  রাজীবকে ডাকতে যাব , দেখি সে প্রচন্ড জোরে টার্ন নিয়ে ঘ্যাঁচ করে আমার সামনে গাড়ি থামিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে আমার দিকে আসছে । আমি তো হতবাক । সে কি , এখনো তো ওকে ডাকিই নি । রাজীব এসেই ওর ঘেমো চিটচিটে মোবাইলটা আমার সামনে তুলে ধরে  দম টম আটকিয়ে  কতগুলো শব্দ বের করল , বাত কিজিয়ে, জলদি জলদি , মা জি, মা জি কলকত্তা । “ এমনিতেই “মা জি কলকত্তা” শুনলেই আমার মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত উৎকণ্ঠার  কুলকুণ্ডলিনী তড়াক করে ফনা তুলে ওঠে । ফোনটা ধরা মাত্রই আমার মায়ের গলা খুব বিরক্তির সঙ্গে  বেজে উঠলো , কি ব্যাপার? তুমি আমার ফোন ধরছিলে না কেন? আমি এতোবার ফোন করলাম , ফোন না ধরলে কি রকম দুশ্চিন্তা হয়, দিল্লির মতন শহরে একা একা ইত্যাদি ইত্যাদি বলে মা তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন । আমিও দেখলাম গোটা দশ বারো মিসড কল ।  আর এদিকে শব্দের অত্যাচারে প্রায় বিকল স্নায়ু , মোবাইলের ভাইব্রেশনও বুঝতে পারে নি ।  অগত্যা এই বিপর্যয় ।
কিন্তু রাজীবের কাছে মায়ের ফোন গেল কি করে? আমাকে ফোনে না পেয়ে মা প্রথমে ঠিক করেন তাঁর পুত্রকেই জিজ্ঞেস করবেন। কেন মেয়েটা ফোন ধরছে না ?  সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মাথায় এলো তাঁর অতি ঠান্ডা মেজাজের পুত্র  কোন স্বর কম্পন না করে যে নিমপাতা বা কালমেঘের বড়ির মত উত্তর দেবে (যেমন –একটু পরে করব মা? অথবা আমি কলকাতায় বসে কি করে বলি বলতো?) সেটা তাঁর সেই মুহূর্তের উত্তেজনার পারদকে নামাবে তো না বরং আরো বাড়িয়ে দিতেও পারে ।  সব ভেবে চিন্তে তিনি তাঁর জামাতাকে ফোন করলেন। এ যেমন রসগোল্লা রাবড়ি দেবে না আবার নিম পাতাও দেবে না । সে হল মঝঝিম পন্থা । এর কাছে কিছু আশ্রয় প্রশ্রয় পাবার চান্স আছে ।  সে শুনে বলল “ কোথাও গেছে বোধহয় , বাজার হাট । ফোনটা শুনতে পাচ্ছে না । আপনি চিন্তা করবেন না।“ কাজ হল না । মা বললেন, বলো কি? দশ বারো বারও শুনতে পেল না ? দিল্লির মতো শহরে একা একা । মঝঝিম পন্থা বলে ওঠে, না মানে, হয়তো  কোনো কারণে শুনতে  পাচ্ছে না । এতো  বেশি ভাববেন না । “ ব্যাস এই কথাতেই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ল । মা এবার তাঁর অসুস্থ শরীরে যত টুকু তেজ ছিল তাই নিয়ে বেশ জোরেই বলে ফেললেন “ তুমি না ওর স্বামী ? কোন চিন্তা নেই ,হেলদোল নেই , কোন দায়িত্ববোধ নেই তোমার ?দশটা ফোনকলের একটাও সে ধরেনি ।  একটা মেয়ে দিল্লির মতন শহরে একা একা”এই হুমকি শুনে মঝঝিম পন্থা আরো গুরুতর বিপদ এড়াবার জন্য রাজীবের নম্বর মাকে দেয় , রাজীবও মায়ের প্রচন্ড দাপটে অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা  না করে সোজা আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে ।
আমি ভাই মা বাবা এই চারজনের মধ্যে ফোন একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল । এমনো অনেক সময় গেছে যখন দুই ছেলেমেয়ের সঙ্গে ওই টেলিফোনটুকুই ভরসা ছিল । মা আরো দুর্বল হলেন গৃহবন্দী হলেন, আরো বেশি করে  মোবাইল আঁকড়ে ধরলেন ।  অফিসেও ভাই সবসময় ফোন ধরত,হয়ত বেশি কথা বলার সময় থাকত না । এমনই একদিন প্রচন্ড ব্যাস্ততার মধ্যে মায়ের ফোন । ভাই বলতে যাবে একটু পরে করছি, তার আগেই মা বলতে শুরু করল শোন জয় , আজ আমার মনটা  ভীষণ খারাপ । সকালের চা টা ভালো হয় নি । তুই খেতে পারলি না , দেখতে পেলাম ।
ওগুলোতো শুধুই নিছক ফোন কল নয়, মাইলের পর মাইল  পাড়ি  দেওয়া সাতটা রঙের তরঙ্গ । কোনো তরঙ্গ নিয়ে আসছে মায়ের গন্ধ, উত্তাপ, রাগ অভিমান , ছেলেমানুষি, অসম্ভব উৎকণ্ঠাঅলস দুপুর ঘুঘুর ডাক লেবুর শরবত, লালশাক চিংড়ি , নারকেলপোস্ত বাটা। সন্ধেবেলার পুজোর ঘন্টা, লক্ষ্মীপুজোর গুজিয়া ,শীতকালের পালং সুপ, বিট মাটন রোল,মায়ের প্রিয় গান মহাবিশ্বে মহাকাশে,  বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা ...। সঅঅব ভেসে ভেসে আসত ।
ওই ফোনটা নিয়েই মা তাঁর জবরদস্ত পাবলিক রিলেশন চালাতোকলের মিস্ত্রি , রঙের মিস্ত্রি কাঠের মিস্ত্রি, ইস্তিরিওয়ালা , জগা ইলেকট্রিশিয়ান , বাদল জমাদার , বিশ্বনাথ মুদি ,রিনা দরজি   চালওয়ালা, গ্যাস , মুচি মুটে মজুর সব্বাই হাতের মুঠোর মধ্যে জো হুকুম হুজুর  হয়ে থাকত । তবে মা তো মোটেও  কড়া মানুষ ছিলেন না, সব্বাই তাই মাসিমা জ্যাঠাইমা কাকিমা বলে বলে আসত, সব্বাই জল চা মিস্টি খেত আর মাকে বিস্তর ঠকাতো ।
  একবার পুজোর সময় আমরা সব একসঙ্গে আছি ক’টা দিন ভাই গেছে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে । রাত হয়েছে । আমি মায়ের সঙ্গে শুয়ে পড়েছি। মা জানেন জয় এখনো বাড়ি আসেনি । অথচ মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে সেই নিমপাতা উত্তর পেতে হবে , মা মঝঝিম পন্থাকে মোবাইলে ফোন করলেন, সে পাশের ঘরেই  টিভি দেখছে । ফোনটা পেয়ে একটু অবাকই হলসান্ত্বনা দিল ,পুজোর সময় তো একটু এরকম হবেই মা । মা সেখানেই শান্ত হলেন না , তিনি এবার ছেলেকে ফোন করতে শুরু করলেন, সে একসময়  জানালো শ্রীভূমি স্পোর্টিং এর ঠাকুরের জন্য গাড়ি প্রায় চালাতেই পারছি না , তুমি এভাবে ফোন করলে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলব কিন্তু । একটা নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাবার পর ছেলে ফিরছে না দেখে মা তাঁর অসুস্থ শরীর টেনে  নিয়ে সোজা মঝঝিম পন্থার দোরগোড়ায় । আদেশ হল,শোনো, আমাদের এখখুনি পুলিশে খবর দিতে হবে কারণ...।

এখন আর সেই ফোন গুলো আসে না, যেগুলোকে অনেক সময় মনে হত, উফ মা পারেও বটে, জানো আজ একটু হলেই শান্টু অ্যাকসিডেন্ট করছিল তোমার ফোনের গুঁতোয় ।
  সকালে না, দুপুরে না , সন্ধেয়  না, রাতে না । কেউ পথ চেয়ে বসে থাকে না ।
  কখন ফিরলাম, কি খেলাম ,মন খারাপ করছে কি না, গলাটা খুস খুস করছে কিনা  কেউ খবর নেয় না । কলকাতায় ফিরলে যত রাত্তিরই হোক সেই মিস্টি গলায় “ওয়েলকাম হোম”  কেউ বলে না । আমাদেরও তড়িঘড়ি কাউকে কিছু  জানানোর কোন প্রয়োজন নেই । এস এম এস এ একটা দুটো ছুঁড়ে দেওয়াই   যথেষ্ট ।
এখন তো কেবল “বুকের মধ্যে ধূ ধূ মরু ঢুকে পড়ে হঠাৎ দুপুর/তখন শুধু আকুল বিকুল দিখির জলের কাঁপন শুনি...”

মোবাইলটা ছিল শেষদিকে মায়ের একমাত্র খোলা জানালা । ওই মোবাইলটা দিয়েই ঠিক তিনবছর আগে মা প্রথম আঁচ করে ফোন করেছিল “এই শোন, একটু আয় তো, তোর বাবার শরীর টা মনে হয় ভালো নেই”
ভেবেছিলাম মার সঙ্গে মোবাইলটা দিয়ে দেব । অন্যরা রাজি হল না । তবে মা এখনো ফোন করে, ফোনগুলো বেজে বেজে বন্ধ হয়ে যায় । আমরাই শুনতে পাই না ।

কথা ছিল হেঁটে যাব ছায়াপথ
কিছু মিছু রাত পিছু পিছু টান অবিকল
আলো আলো রঙ জমকালো চাঁদ ঝলমল
আজও আছে গোপন ফেরারি মন
বেজে গেছে কখন সে টেলিফোন
গুঁড়ো গুঁড়ো নীল রঙ পেন্সিল জোছনার জল
ঝুরো ঝুরো কাঁচ আগুন ছোঁয়া আজ ঢেকেছে আঁচল
আহা ফুটপাথ এ ভিড় জাহাজের ডাক ফিরে চলে যায়
আহা হা আহাহা
কথা ছিল হেঁটে যাব ছায়াপথ




Sunday, 10 July 2016

দিল্লি দাস্তান ৩


দাদি পোতি
দাদি আম্মা, কিসসা সুনাও না । ছোট্ট রুকবানু ঝাঁপিয়ে পড়ে দাদি আম্মার কোলে।
পশমিনা শালের গরম । রঙদার কার্পেট চারপায়ার ওপর  পেতে দাদি তখন গুরগুর করে তামাক টানছে , অম্বুরি তামাকের গন্ধ , দাদির চুলের মেহেন্দির গন্ধ মিলেমিশে সে একটা ভারি মিঠে আমেজ তৈরি করেছে , রুকবানুর খুব পছন্দ । দাদির নাকে হিরের নাকছাবি , সুর্মা টানা চোখে কিসসা ঝিকঝিক করছে ।  সামনে রাখা জর্দা পানের খোপকাটা রেকাবি । ফেলে আসা আফঘানিস্তানের গল্প , তার টলটলে নীল হ্রদ , তার ওপর নীল আকাশ , ঝকঝকে রোদ্দুর , জাফরান খেত , পাহাড়ের মাথায় বরফ ,পাখতুনি গান তারপর এদেশে চলে আসা । রুকবানুর দু’চোখের নীল তারায় তার ফেলে আসা দিনের ছবি দেখতে থাকেন দাদি আম্মা ।  তারপর কোথা থেকে কি হয়ে গেলো কেউ জানে না , কেউ না ।  শুধু আজ সকালে জমজমাট হৌজ খাসে রাস্তার বাঁকে হঠাৎ চোখে পড়ল শতাব্দীর পর শতাব্দী এক ঠাকুমা আর নাতনি পাশাপাশি শুয়ে সবুজ ঘাসে ঘাসে মিশে মিশে অনন্তকাল ধরে গল্প করে চলেছে । লোকজন ভিড়ভাট্টা গরম শীত বৃষ্টি শহরের ইতিহাসের কতো পালাবদল  তাদের আলাদা করতে পারে নি । সেই চকিতে দেখা নিরালা সবুজ ঘাসের দুপুর হঠাৎ ভাসিয়ে নিয়ে গেলো ভিক্টোরিয়া পাহাড়ের মাথায় । ওয়েলিংটনের শনশনে বাতাসিয়া দুপুরে ওইরকমই এক নিরালা কোণে বসেছিল তিনজনে ঘন  হোয়ে, দাদু দিদুন আর নাতি । কতো লোক ক্যাফেটারিয়ায় মাছ ভাজা আর বিয়ার খাচ্ছিল, বাচ্চারা বল খেলছিল , সুগন্ধি গাছপালারা ছায়া দিচ্ছিল । আর ওরা নিজেদের মধ্যে খুনশুটি করছিল, সেবার ক্রিসমাসে কত্ত মজা হয়েছিল , বরফ জমা রাত, তারা ভরা রাত, বাতি জ্বলা রাত - Silent night, holy night!
All is calm, all is bright.
Round yon Virgin, Mother and Child.
Holy infant so tender and mild,
Sleep in heavenly peace,
Sleep in heavenly peace







এই দিল্লি শহরের আনাচে কানাচে পরতে পরতে দানা দানা আফসানা লুকিয়ে আছে ,তুলে নাও , কুড়িয়ে নাও , তুলোর বীজের মতো ,মেঘের মতো ,  পাখির পালকের মতো হাওয়ায় উড়ছে তারা । কোথাও বাসা বাঁধে না , কোথাও থিতু হয় না । “ছায়া দেয় , মায়া দেয় , দুঃখ দেয় , হারিয়ে যায় । স্বপ্নবীজ কাপাশের মতো রোদ্দুরে জ্যোৎস্নায় ছড়িয়ে পড়ে “ এক অদৃশ্য  স্বপ্নের চাদর মুড়ে আছে  শহরটাকে চারদিকে ব্যস্ততা , শোরগোল , হাঁকাহাঁকি , দর কষাকষি , নতুন উদ্ধত ইমারত , আধুনিক দুরস্ত মানুষ , গতিশীল যানবাহন ,ঝাঁ চকচকে জীবন,রাজনীতির কূট কচালি   এসবের মধ্যে আজও অমলতাসের হলুদ রঙা নিঝুম দুপুরে মেহেরাউলির রাস্তায় অথবা ঠিক সন্ধে নামার মুখে হজ খাস বা আজিম খান মকবারা ,  সফদারজং বা পুরানা কিল্লার আশেপাশে  ভুঁইফোড়ের মতো হাজির হবে এক উস্কোখুস্কো    দাস্তানগো । শ্যাওলাধরা গম্বুজের  গায়ে হেলান দিয়ে নিচে তুমুল শহরকে বিন্দুমাত্র  নজর না করে কুতুবমিনারেরে পেছনে ওই ডুবে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে চলবে





শোনো , একটা গল্প বলি । কোন এক কালে  একটা কবুতর ছিল, কুঁড়ের বাদশা ,খ্যাপাটে আর বুদ্ধু । না আছে আজকের চিন্তা , না গতকালের জন্য কোন আফসোস । হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়, মেঘের সঙ্গে গল্প করে ।আর সন্ধে হলে কোন একটা উঁচু গাছের মগডালে চড়ে ঢলে পড়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ও বলত, মেঘের ওপাশ থেকে কেউ একজন আসবে তার জন্য, তাকে নিয়ে ও চাঁদের দেশে পাড়ি দেবে । বাকি পাখিরা এসব শুনে  ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতসময় এইরকমই  এলোমেলো ভাবে কেটে  যাচ্ছিল । কিন্তু একদিন হোলো কি , আমাদের এই পাখি একজনের সঙ্গে ধাক্কা খেল ,তারপর কি হল জানো, চোখে চোখে দেখা হল ,বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে গেল,রক্তের তেজ বেড়ে গেল, একে অন্যের নিঃশ্বাসে জড়িয়ে গেলোআর আমাদের এই আওয়ারা কবুতরের জীবনটাই কেমন  পালটে গেলো , রামধনুর সাতটা রঙ রাঙিয়ে দিল সেই পাগলাটাকে । আমাদের কবুতর নেশা জড়ানো আধবোজা চোখে নতুন সঙ্গীকে বলে কে তুমি সুন্দরী? যাকে দেখে আমি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি ।
আমি? আমি তো মেঘের ওপাশ থেকে এসেছি”।
“আচ্ছা বলতো, তোমার চোখের এই কাজল তুমি কোত্থেকে পেলে ? আমি যেন আগে কোথাও দেখেছি ।“
“সত্যি বলব? কাল চুরি করে এনেছি কালো মেঘের কাছ থেকে “।
“তুমি না , তুমি এক্কেবারে আমার মতো “।
“হি হি হি হি ,তোমার মতো ? কি যে বলো ? তুমি কোথাকার একটা পাগলাটে ছোকরা , উস্কোখুস্কো , চেহারা দেখেছ নিজের? এসো তো আমি ঠিক করে দি “।
এরপর দুজনায় একসঙ্গে থাকতে শুরু করে । বর্ষার টুপটাপ ঝরা জলে , ভরা শ্রাবনের ঘনঘটায়, বসন্তের রঙে , ঝরে পড়া পাতায়, সবসময় । সবচেয়ে উঁচু গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে নতুন স্বপ্ন দিয়ে এক ঘরন্দা বানানো হল । 
এরপর জানো কী হোলো? আমাদের সেই পাগলা পরিন্দা বিলকুল বদলে গেলো । এখন শুধুমাত্র নিজের স্বপ্ন নিয়েই মেতে থাকত না । আলসেমি কুঁড়েমি  কোথায় উধাও হল ।
একদিন খুব ঝড় বাদল শুরু হল । খুব শোঁ শোঁ করে হাওয়া বইছিল । সঙ্গী বলল “ তোমাকে কয়েকটা কথা বলার ছিল “।
 “হুম, বল না , আমি শুনছি”।
“এই রাগ করবে না বলো?আমি মেঘের ওপারে যেখান থেকে পালিয়ে এসেছি , সেখানে আবার ফিরে যেতে হবে,জানো? আমি তো ওদেশের রাজকুমারী । ওখানে একদিন দম আটকে এলো , আমি তাই খোলা হাওয়ায় উড়ে চললাম । তারপর তোমার সঙ্গে দেখা আর তোমার বাউন্ডুলেপনায় কেমন জড়িয়ে ভেসে গেলাম । কিন্তু এখন আমাকে যেতেই হবে । এই , তুমি শুনছ তো?”
কিন্তু আমাদের বেচারা ভালোমানুষ কবুতর তার সঙ্গীর ডানার ওমের মধ্যে ততোক্ষণে ঘুমে ঢলে পড়েছে । গভীর রাতে সবচেয়ে বড় তুফান এলো , সেই সময়ের সবচেয়ে ভয়ানক তুফান, সব কিছু ভেসে গেলো ,  সব কিছু উজাড় হয়ে গেলো । সকাল বেলা তুফান থেমে সব শান্ত হয়ে  গেলো ।





আমাদের কবুতর ঘুম থেকে উঠে  চারদিক দেখল , কিন্তু সঙ্গীকে খুঁজে পেল না ,সব জায়গায় খুঁজে খুঁজে বেড়াল , কোথাও সে নেই । আর আমাদের সেই বিন্দাস পরিন্দা যে নিজেকে নিয়েই খুশি থাকত সবসময়, সে একদম ভেঙে পড়ল, ভেঙে ভেঙে একেবারে  চুরমার হয়ে যেতে লাগলো ।


  কবুতরের গল্প আসিফ খান দেহেলভি



Saturday, 9 July 2016

দিল্লি দাস্তান ২


জামালি কামালি
ল্প পড়ার মতোই গল্প শুনতে ততোটাই আমোদ , একেবারে নেশার মতো   কাজেই  হেরিটেজ বৈঠক  শাম এ আওয়াধের  মৌতাত কাটতে না কাটতেই দাস্তানগো মানে গল্প বলিয়ে আসিফ ভাই কে ধরলাম , পরেরটা কবে হবে , হ্যাঁ ? আর এবারে  কি বলবে?  তা বলে যে উত্তরটা এলো সেটাও  আবার একেবারে  আশা করিনি
“রাত মে তা রোঁ কে ছাও মে ,জামালি কামালি ফরেস্ট মে ভূতো কি কহানিয়া “
রহস্য ছমছমিয়ে উঠল  জামালি কামালি নামটাতেই যেন জমকালো শিরশিরানি   ঘন হয়ে উঠছে  নিশুতি   রাত , জঙ্গল ঝোপঝাড় ,তারার সলমা চুমকির চাদর , ভূত  রা  ঘুর ঘুর করছে  কোনো রাতচরা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে ।
দিল্লির খাঁজে খাঁজে কোনে কোনে গল্প ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে শুধু তুলে আনার অপেক্ষায়
এ ক শনিবার  মেহেরাউলির দিকে রওনা দিলাম গন্তব্য জামালি কামালি মসজিদ কোন গল্প বলা টলার বৈঠক  নেই,  স্রেফ নিজের কৌতূহল বেশ খানিকটা নাকাল হবার পর একটা ডাব ওয়ালা বলল তিন নম্বর ডাব ওয়ালা যেখানে বসেছে তার পাশের রাস্তা ধরে চলে যান এবারে ডাব ওয়ালা গোনার পালা ঢিবি করে রাখা আছে  ডাব তিন নম্বর সত্যি সত্যি পাওয়াও গেল পাশ দিয়ে একখানা মাটির রাস্তা ধুলো ধুলো সন্ধে হয়ে আসছে , হালকা মলিন আলো মেহেরাউলি আরকিওলজিক্যাল পার্ক আদতে একটা ঘেরা জঙ্গল নানান দিক থেকে ঢুকে পড়া যায় এই জঙ্গলের  মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে ইতিহাস বাওলি(step well) , মকবারা , মসজিদ , বুলন্দ ইমারতের খন্ডহর জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা গিয়ে দেখা পেলাম জামালি কামালির



চারদিকে লোকজন প্রায় নেই বললেই  চলে খুব শুনশান হয়ত সন্ধে নেমেছে বলেই মসজিদের লোহার গেট বন্ধ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি , জায়গাটা কেমন যেন ভুতুড়ে মতো লম্বা লম্বা গাছ ,ঝুপসি  ঝুপ্সি ছায়া , উঁচু নিচু ঢিবি , কোন লোকজন নেই, শব্দ নেই একটা  দুটো লোক দেখা যাচ্ছে ,তাদেরই   একজন কাছে  এসে বলল , মসজিদ তো এখন বন্ধ হয়ে গেছে সাড়ে  পাঁচটার পর কেউ আর ঢোকে না
ঢোকা বারণ যেই না বলল বারণ , অমনি গন্ধটা সন্দেহজনক
“ কেন? কেন? “
“ঢুকলেই থাপ্পড় খেতে হবে
 “থাপ্পড় ?”
“ চুল ধরেও টানতে পারে যেটা কপালে আছে
 আমার বন্ধুবর(বন্ধু+ বর ) জয়ন্ত  বলল , সে একটা থাপ্পড় না হয় খেলামই
“একটা? একশটাও এসে পড়তে পারে ভেতরে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত শিরশিরানি  টের পাবেন  ব্লাড প্রেশারের ফারাক টা বুঝতে পারবেন ওনারা এইসময় কেউ ঢুকলে বিরক্ত হন
“কারা ? জামালি কামালি ? “
“না না , ওনারা তো সুফি সাধক ছিলেন এই সব  জায়গায় আস্তানা গেড়ে বসে আছে জিন রা
সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল পাঁচিলের ওপাশ থেকে অন্ধকার কুঠরিগুলো থেকে কারা যেন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে আর ভারি বিরক্ত হচ্ছে
আর দাঁড়িয়ে থাকার কোন মানেই হয় না আবার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে খন্ডহরের ভেতর   দিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ি
পরিত্যক্ত ভাঙা  চোরা বাড়ি ঘর নিঝঝুম লোক জন নেই এমন জায়গায় জিনেরা বাস করে এই যেমন ধরুন  ফিরোজ শাহ কোটলা চোখ ধাঁধানো আলো তুমুল হট্টগোলের মধ্যে বল্লেবাজি ক্রিকেট সোফায়
 বসে  কফি চিপস খেতে খেতে সবাই দেখে, সেই কোটলার অন্যএক পোড়ো জংলা  প্রান্তে  সন্ধে নামার  আগে লোকজন  অন্ধকার সব আনাচ কানাচে বাতি জ্বালিয়ে জিনের কাছে মনের কথা জানাতে আসে চিঠি লিখে দরখাস্ত লিখে, প্লিজ লুক ইনটু দ্য ম্যাটার বলে দেওয়ালে সাঁটিয়ে দিয়ে আসে
আসিফ ভাই স্পিরিচুয়াল  তায় সুফি তার সঙ্গে এসব জায়গায় ঘুরলে অনেকেই নাকি  গোলাপের চন্দনের গন্ধ পায় অথচ ধারে কাছে কোন ধূপ বা সুগন্ধি নেই
তবে সেও নাকি বলে এইসব বৈঠকে লম্বাচুল ভালো করে বেঁধে আসতে হবে আর কোনো পারফিউম মাখা চলবে না কারণ ওই দুটোই জিনদের  খুব আকর্ষণ করে । মানুষের মধ্যে যেমন ভালমন্দ ,জিনদের মধ্যেও তাই । মন্দ জিনকে চটিয়ে লাভ কি !
কৌতূহল এমন মারাত্মক হয়ে উঠলো যে  আবার পরের দিন ঠিক দুপুর বেলা ভূতে মারে ঢ্যালা অর্থাৎ প্রচণ্ড ঝলসানো গরমে রোদ্দুরে গিয়ে দেখি মসজিদের গেট খোলা , তেতে পুড়ে ঝামা হয়ে আছে পাথরের চত্বর পা দেওয়া যাচ্ছে না চারদিক শান্ত , ভীষণ শান্ত । সন্ধের নিভে যাওয়া আলোয় যাকে দেখে গা ছমছম করে উঠেছিল সেই প্রশস্ত দালান আর  অপূর্ব নকশা তোলা বন্ধ দরজা গুলো যেন বলছে ,বসে দুদন্ড জিরিয়ে নাও বাপু ।


 জামালি ছিলেন এক সুফি সন্ত এবং কবি। কামালির পরিচয় নিয়ে ধন্দ আছে ।  পাগল বাবরালির চোখের মত এলোমেলো আকাশের নিচে জামালি  কামালি মসজিদ , মেহেরাউলির জঙ্গল ,বিস্তীর্ণ ধ্বংসস্তূপ,  প্রশস্ত   বাওলি  জুড়ে  শুধু  পড়ে আছে  স্তব্ধতা   অখণ্ড নীরবতা । এক সন্ত কবির প্রার্থনা।  সেখানে যার  কণ্ঠস্বর শোনা যায় তাতে কোন শব্দ নেই ,শুধু অনন্তের স্তবগান , যে শুনতে চায় সেই  কেবল শুনতে পায় আর কেউ নয়    

 চন্দন রঙের আলো বুকে নিয়ে যে
মানুষ একা হেঁটে যায়
তুমি তাকে ডেকেছ কখনও?
তার কাছে বৃষ্টি আছে । আছে
দিন বদলের গান ।
ডাকো, তাকে ডেকে নাও কাছে
রয়েছে আখর যত শুদ্ধতম স্পর্শ দিয়ে
শোনো...।


কবিতা রেহান কৌশিক 







দিল্লি দাস্তান ১


শাম এ আওয়াধ
মোঘল সাম্রাজ্যের  রাজধানী দিল্লির সঙ্গে আন বান শান শওকত খানা পিনা গানা শায়েরি মুশায়েরা মহফিলে পাল্লা দিতে পারত একটি মাত্র  প্রদেশ যেখানে মুর্গাকে জাফরান আর কস্তুরীর বড়ি খাওয়ানো হত জবাই করার আগে ,যাতে খাবার সময় প্রতি পরতে পরতে মেহক ছড়িয়ে পড়ে মুখের ভেতর । এতো স্রেফ খাওয়া  নয় এ হল দস্তুর , পেশকশ ,  এ এক শিল্প । সেই প্রদেশটি হল আওয়াধ বা অযোধ্যা । আওয়াধ ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে একটি প্রদেশ ।  প্রদেশ শাসন করতেন একজন নবাব বা গভর্নর ।
দিল্লি শহরে বড় রাস্তা ছোট রাস্তা মহল্লার নামের মধ্যে বেঁচে আছেন অনের সুলতান সম্রাট , যারা দিল্লির মসনদে বসে ছিলেন । হয়তো ইতিউতি আছেন কিছু দিল্লির প্রভাবশালী রাজপুরুষ। সুফি সন্ত নিজামুদ্দিনের নামও বুকে আগলে রেখেছে এ শহর ।তার নামে আছে রেল স্টেশন , আছে লোকালয় । কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে দিল্লির বাসিন্দা  না হয়েও আজও ভীষণ ভাবে অস্তিত্বময় আওয়াধের দ্বিতীয় নবাব সফদরজং । মাত্র ছেচল্লিশ বছরের জীবন ছিল তার । কেন্দ্র রাজনীতি ও শাসনের  শিখরে উঠেছিলেন তিনি । সুবেদার হিশেবে নানান লড়াই যুদ্ধে সাফল্যের পর তার মাথায় উঠল ‘মীর এ আতশ” এর শিরোপা। সম্রাট মুহম্মদ শাহের আমলে পুরো শাসন ভার টাই তারই কব্জায় ছিল । কিন্তু এসবের মধ্যেও আওয়াধের উন্নতি ও শান্তি শৃঙ্খলা কখনোই ভুলে জান নি । একটা কথাই মাথায় থাকত তার তিনি আওয়াধের ।   দিল্লি মসনদের টালমাটাল ঝড়ো হাওয়ায় সফদরজং হলেন ওয়াজির উল মামলুক ই হিন্দুস্তান অর্থাৎ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান মন্ত্রী । তার ওই স্বল্প জীবন দেখেছে প্রচুর সাফল্য ও সম্মান । কিন্তু রাজনীতির কুহেলিকা জাল থেকে তিনিও বের হতে পারেন নি শেষপর্যন্ত আওয়াধেই ফিরে মারা যান আর তার সমাধি সৌধ গড়ে তোলে দিল্লি । আজ তার নামে রাস্তা , হাসপাতাল , সফদরজং এয়ারপোর্ট । সফদরজং  এনক্লেভ ,  সফদরজং টারমিনাস , এতোটা আর কারুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় নি । শোনা যায় আওয়াধের এই দ্বিতীয় নবাব খুব উদার ছিলেন,পন্ডিত কবি শিল্পী , গরিব অনাথদের  সাহায্য করতেন দরাজ হাতে । আজ তার  সমাধি ক্ষেত্রে খোলা প্রাঙ্গনে আকাশের নিচে পড়ন্ত বিকেলে  সফদরজঙ্গের সমাধির পাশে শুরু হল  শাম এ আওয়াধ ।
এককথায় আধুনিক কথকতা । হিন্দি উর্দু মেশানো ভাষায় কথক আমাদের নিয়ে চল্লেন আওয়াধ এবং লখনউ এর ইতিহাসে, হাভেলিতে, অলিন্দে অলিন্দে । অনুষ্ঠান শুরু হল লখনভি কেতায় । হাতে হাতে ঘসে দেওয়া হল খসখসের ইত্বর ,  তারপর এলো রুপুলি তবকে মোড়া  ভাজা ইলাইচি- নোশ ফরমাইয়ে। ঠান্ডা ভেজা মটকায় ছোট্ট ছোট্ট পানের খিলি,মুখে দিলেই মিলিয়ে যায় ,আবার –নোশ ফরমাইয়ে । খসখস মেশানো সোঁদা গন্ধ মাখা হাওয়া আর কথকের ধারা কাহিনি তে  ভেসে এল কখনো যুদ্ধের দামামা,রাজনীতির কুটিল চক্রান্ত , দেহলভি আর লখনভি কেতার মজাদার কিসসা, শের শায়েরি মুশায়েরার চমকদার লখনউ , তার জাঁক জমক , পায়রা মুরগি তিতিরের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো ,দস্তরখান বা খানা পিনার তাজ্জব করা গল্প , ভিস্তি ওলা র রাস্তায়  কেওড়া, ইত্তর,  গুলাব মেশানো জল ছিটানো , মিঠি বোলি আর তমিজ ,এতোটাই কেতা দুরস্ত ছিল  সেকালের চাল চলন ।


রাফতা রাফতা হর পুলিশ ওয়ালে কো শায়ের কর  দিয়া
মেহফিল এ শের ও সুখান মে ভেজ কর সরকার নে 
এক কয়েদি সুবাহ কো ফাঁসি লগা কর মর গয়া
রাত ভর গজলে সুনাই উসকো থানেদার নে ।

সাগর খইয়ামি সাহাবের এই কবিতাই বলে দিচ্ছে কি বিপজ্জনক ছিল সেকালের আওয়াধ বা লখনউ । মুশায়েরা তে পুলিশদের ডিউটি লাগানো হত । সারারাত ধরে শের শায়েরি শুনে সকালবেলায় লাল চোখ নিয়ে কোতোয়ালিতে গিয়ে সে ব্যাটার তখন বদ হজম  হয়ে নানান কিসিমের  শায়েরি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে । কাকে  সে শোনাবে ? কয়েদি গুলো ছাড়া আর তো কেউ নেই সামনে  । কানের কাছে নানান সুরে নামতা শোনায় একশ উড়ের মতো দিনের পর দিন থানেদারের গজল শুনে গলায় দড়ি ছাড়া কয়েদিদের  আর কোন গতি নেই ।   
লখনউ এর আগে আওয়াধের নয়নমণি ছিল ফইজাবাদ । গঙ্গা যমুনি তেহজিবের প্রাণকেন্দ্র । নবাব সুজাউদৌল্লার আমলে তার কী  সাজ সজাওট আর রৌনক  । শহর তো চার ক্রোশ দূর, ফটক থেকেই তার চমচমাহট শুরু হয়ে যেত । রঙ্গিলা বেফিকর জীবন । জলসা , মুজরা , মেহফিল । খেল তামাশা । এরপর ফইজাবাদের জলুস কমে গেলো কারণ ততদিনে আসফ উদ দৌলা লখনউতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেলেন । সন ১৭৭৫ । শুরু হল লখনভি  দাস্তান । মৌসিকি আর ফনকারের দলের মৌতান  শহর মাতিয়ে দিল  । দরিয়া কিনারে নবাব আর মোসাহেবের ঘুরে বেড়ান , নবাব দেখেন হায়দরি সাহেব মাথা নিচু করে হাঁটছেন । বড় ভালো গান করেন , নবাব বললেন , আমাকে গান শোনান । হায়দর সাহেব বলেন , আমি তো আপনার বাড়ি চিনি না । আমি যেতে পারি  তবে হালুয়া পুরি খাওয়াবেন তো ?প্রাসাদে ঢুকে  হায়দর  মিয়াঁ বুঝতে পারলেন আরে এতো নবাবের বাড়ি । হালুয়া পুরি তো খেলেনই , আবার বিবির জন্য ছাঁদা বেঁধে নিয়ে গেলেন । নবাবি মর্জি । গানা শুনে খুশ । এরপর ফরমায়েশ এলো , নবাবকে কাঁদাতে হবে , নাহলে উস্তাদ কে দরিয়ার পানিতে ডুবিয়ে দেবো । যাক সে যাত্রা হায়দরি প্রাণে বেঁচে গেছিলেন ।
আর ছিল দাস্তানগোই । গলপ বলা ।  দিল্লিতেও দাস্তানগোই ছিল । তবে সিধা সাদা । লখনউতে দাস্তান গোই ছিল শের শায়েরিতে ভরপুর । দাস্তান । ম্যায়খানা । হুক্কাখানা । আফসানা আর দাস্তানের মধ্যেই বুঁদ হয়ে থাকত সবাই । ছিল ভাঁড় , তাদের নৌ টঙ্কি । আর ছিল দস্তরখানের কেরামতি । বাবুর্চিখানা র মধ্যে ছিল নানান গ্রেড । নবাবি খানাপিনা মানে খাসা পেশ করা , দস্তরখান সাজানো বড় বাহাদুরির কাজ ছিল তখন । রকাবদার আর বাবুর্চি দের মেজাজ মর্জি ও ছিল তেমনি দেমাকি ফিনফিনে । দিল্লি আর লখনউ এর মধ্যে বেশ একটা পাল্লা দেবার ব্যাপার ছিল তখন বাদশা আর নবাবদের মধ্যে । মুর্গা কে খাওয়ানো হত জাফরান আর কস্তুরির গুলি, রান্না করার পর তার যা খোশবায় হত ! তবে লখনউ পছন্দ করত পুলাও ।  বিরিয়ানি ছিল বদনুমা খানা । লখনভি খানায় ইরানি প্রভাব বেশি ছিল । মশল্লার সুচতুর ব্যাবহার ।  যাকে বলে খানদানি রইস । সঙ্গে বাখরখানি রোটি মোতি পুলাও । নবরতন পুলাও । আনারদানা পুলাও । ভাতের দানা অর্ধেক লাল , অর্ধেক শাদা । খাবার পেশকশ ও সেই রকম । রেকাব এগিয়ে দেবার সময় সমানেই বলা হত তসলিম , তসলিম , আদাব আদাব । যতটা খাওয়া হচ্ছে তার বেশির ভাগই আদব কায়দায় চলে যেত  । কোথায় জানি একবার পড়ে ছিলাম, নবাব তার খাস নফরকে নিয়ে দাওয়াতে গেছেন । নিমন্ত্রণ কর্তা সবাইকে নিয়ে খেতে বসেছেন । এমন সময় তার খাস বান্দা মিহিসুরে গেয়ে উঠলো ফুলের তলে বুলবুল ছানা ,তারে উড়িয়ে দেনা উড়িয়ে দে না । এই কথা কানে যাওয়া মাত্র সেই কর্তা তার দাড়ির মধ্যে আটকে থাকা  সরু লম্বা ভাতের দানাটি ঝেড়ে ফেলে দিলেন । এদিকে আমাদের এই নবাবের ব্যাপারটা খুব মনে ধরে গেলো । তিনিও একদিন সবাইকে দাওয়াতে ডাকলেন । নফরকে বললেন শোন , সেদিন অমুক মিয়াঁ র  বাড়িতে দেখেছিলি না ওনার নফর কেমন কায়দা করছিল? তুইও ওরকম করবি , কেমন? যথাসময়ে আমাদের এই নবাব তার দাড়ির মধ্যে একটা ভাত ফেলে দিয়ে তার নফরকে ইশারা করে কেরামতি দেখাতে বললেন । আর সেই নফর তখন বলে উঠল, সেই যে কাদের বাড়িতে কিসের না কিসের কথা হয়েছিল না? আপনার দাড়িতে তাই হয়েছে ।


রইসি আরো ধরা পড়ত পানদানের আকারের ওপর । যতবড় পানদান তত বেশি রইসি । বিশেষ করে মেয়ের বিয়ের সময় বিরাট বিরাট পানদান দিয়ে পাঠানো হত । চার কাহার ডোলি সাজিয়ে যখন দুলহনকে শশুরাল ছাড়তে যেত , দেখা যেত , পালকির মধ্যে এককোণে গুটিসুটি মেরে ছোট্ট বউ বসে আছে। পুরো পালকিই জুড়ে রাজত্ব করছে বিশাল পানদান ।  জলে ভেজানো  মাটির পাতলা পাতলা ভাঁড়ে পান ঠান্ডা করে রাখা হত ।
এইছিল সেকালের মিঠে পানপাতার মতো গপ্প গাছা । চলতেই থাকে , ফুরোয় আর না । এই অঞ্চলেই গঙ্গা যমুনি তেহজিবের কেন্দ্র ছিল । তেহজিব মানে এটিকেট অযোধ্যার নবাবরা এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । হিন্দু মুসলমান যৌথ ভাবে এই  তেহজিব মেনে চলত ।  বেনারস আর মথুরার ব্রাহ্মণরা সরকার বাহাদুরের পতনের পর একবছর কোন তেওহার পালন করেনি ।  
গল্প জমে উঠেছে । দেখি  আমাদের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কেমন জোনাকি জ্বলে ওঠে , ইতিহাস কেমন ফিসফিসিয়ে ওঠে, নানান দিলচস্পি কিসসা কহানির মধ্যে  আসর জমে উঠছে আজ  আওয়াধের  “মীর এ আতশ” সবার অগোচরে  তার খুশির রোশনাই জ্বালিয়ে দেবেন, যদিও আমরা কেউ দেখতে তা  পাব না ।


সফদরজঙ্গের সমাধি
কাহিনি সূত্রঃ আসিফ খান দেহেলভি