Thursday, 27 October 2016

আলতাফি কিসসা/২


 রা অক্টোবর । গান্ধিজি ছাড়া আমার এক বন্ধুর জন্মদিন । সেদিন আমার খুব তাড়া । বাড়ি থেকে বেরুব । এমন সময় শিবানীর ফিনফিনে ফোন ,”ম্যাডাম ,আজ আমার জন্মদিন
আমিও একটা জন্মদিনের নেমন্তন্ন তেই যাচ্ছি কিনা , বললাম খুব ভালো কথা , ভালো থেকো , সুখে থেকো ..মেনি মেনি হ্যাপি রিটারন্স
কিন্তু সে তখন হু হু করে কাঁদছে । কেন গো ? গান্ধিজির সঙ্গে কেমন মিলিয়ে দেওয়া জন্মদিন । আরও আরও হু হু । , তাই বল ? গান্ধিজি না হয়ে ঋত্বিক রোশন হলে ভালো হত বলছ ? তবে এখন তো লেটেস্ট হার্ট থ্রব ফাওয়াদ খান , সেখানে আবার নানান পোলিটিকাল ঝামেলা , সে যাক গে , তুমি দুঃখ কর না ।
আমি খুব অসুস্থ , খুব শরীর খারাপ , “ঝমঝমিয়ে কান্না ,হু হু হু ।
একেবারেই বাচ্চা মেয়ে , বাড়ি থেকে বহুদূরে দিল্লিতে একা থাকে , চাকরিতে ঢুকেছে সবে পড়াশোনা শেষ করে ।
বললাম , আমার এখানে চলে এসো , আমি থাকছিনা , কিন্তু কোন অসুবিধে হবে না ।
ও বোধহয় সেটাই চাইছিল । বলল , ঠিকানা টা একবার বলে দিন , আমি ক্যাব নিয়ে চলে যাচ্ছি ।
আচ্ছা আচ্ছা ,বলছি ।
সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে হল , আরে , আরও একজনের গলা শুনতে পাবার কথা ছিল যেন , সেই পরোপকারী দিলদরিয়া আজ অনুপস্থিত কেন ?
কথার রেশ তখনো মিলিয়ে যায় নি , মোবাইল টা আবার বেজে উঠল , “ম্যাডাম , বাড়ির ঠিকানাটা বলুন প্লিজ , শিবানী যাচ্ছে তো , আমি যেতে পারছি না , আব্বু খুব অসুস্থ
হ্যাঁ , ঠিক । আমার ক্যালকুলেশন একেবারে ঠিক । জনাব আলতাফের গলা ।
এরপরই শিবানীর ঝটিকা আগমন এবং আমার নির্গমন ।
দিনটা কিন্তু ভয়ানক বাজে ছিল । অসম্ভব গরম । আমি ঝরঝর করে ঘামছি । ক্লান্ত হয়ে পড়ছি দ্রুত । ইশ , শিবানীর জন্য একটা কেক কিনলে হত । দেখেছ কেকের দোকান টা বন্ধ । শুধু কেক নয় , বহু দোকান বন্ধ । চিড়বিড়ে গরমে দেখতে পাচ্ছি না একটাও ফুলের দোকান । যাক গে , আমি আর পারছি না । মাথা ঘুরছে , বাড়ি যাই ।
বাড়ি ফিরে দেখি মুঙ্গ ডাল কি খিচড়ি খেয়ে শিবানী ঘুমিয়ে পড়েছে । আমি ধড়াম করে শুয়ে পড়লাম ।
ঘুম যখন ভাঙল , একটা অস্পষ্ট গলার শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি । সন্ধে হয়েছে । গীতাজি খুচরো কাজ করছে , বসার ঘরে একটা মস্ত ফুলের তোড়া ।
আলতাফ ভাই লায়া ,ওই ঘরে বসে আছে তো
ঘরে ঢুকে দেখি শিবানী উঠে বসে বেশ হাসি হাসি মুখে আলতাফের সঙ্গে কথা কইছে , আর আলতাফের বিখ্যাত কফি আর মারি গোল্ড বিস্কুট খাচ্ছে । বললাম , আরে আলতাফ , ফুলের বুকে টা ওকে দাও ।
আলতাফ চলে যাবার সময় আমাকে খুব করে থ্যাংকস জানালো , আমি শিবানীর খুব ভালো দেখভাল করেছি বলে । ও যেন শিবানীর বাবা , কাকা , দাদা ।
শিবানী বলল , জানেন , আলতাফ ভাই না একটা পাঁচশ টাকার নোট আমার মাথায় ছুঁইয়ে আমার হাতে দিল , আমি বললাম , এ এবার কি? আমরা তো বন্ধু , একই বয়স , একসঙ্গে কাজও করি । আলতাফ ভাই বলল তুমি আমার মেয়ে । কি অদ্ভুত বলুন তো?”
আমি খুব লজ্জা পেলাম ।চুপ করেই থাকলাম । গান্ডে পিণ্ডে নেমন্তন্ন খেয়ে দোকানপাট বন্ধ , উফ কি অসভ্যের মতো গরম এইসব ফাঁকা অজুহাত দিয়ে বাড়িতে এসে ধপাস করে শুয়ে পড়লাম । আর একটা ছেলে বাবার খুব খারাপ অবস্থা সত্ত্বেও সহকর্মী বন্ধুর দেখভাল করল , ফুলের দোকান ও খুঁজে পেল , আবার টাকা দিয়ে আশীর্বাদ জানিয়ে সন্ধে বেলা
তাকে দেখেও গেল ।
নিস্তব্ধতা ভাঙল শিবানী । আলতাফভাই এর সেই গল্পটা জানেন আপনি। ?”
কোনটা?
জানেন তো , আলতাফভাই না একজনকে ভীষণ ভালবেসে ফেলেছিল । ওদের ধর্মেরই । কিন্তু কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারেনি , অনেক চেষ্টা করেছিল । কিন্তু পারেনি । একদিন ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছে , হঠাত দেখে ওই মেয়েটা একটা দামি গাড়িতে করে পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল , আর আলতাফভাইও হুঁশ ফিরে হঠাত ই যেন বুঝল দুজনের সমাজে অনেক অনেক ফারাক ।
গল্পটা কেমন হিন্দি ফিল্ম মার্কা হয়ে গেল না?”
তবে হ্যাঁ , Life is more interesting than fiction .
তারপর শুনুন না , আলতাফভাই এর আম্মি তো আমাদের দেখলেই বলেন আমার বেটার সাদির জন্য মেয়ে দেখ না , ওর জন্য মেয়ে পাওয়া তো খুব শক্ত ।
একদিন হয়েছে কি , আলতাফ আমার বাড়িতে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে হাজির।
মিষ্টি কেন? তোমার সালগিরাহ নাকি ? না অন্য কোন খুশ খবর ?”
আলতাফ বলল , আগে একটা মিঠাই খাও । তারপর বলব ।
শিবানী মিঠাই খেল এবং মুখ তুলে দেখল আলতাফের চোখদুটো চিকচিক করছে
আজ উসকি ডোলি নিকাল গয়া ... নিকাহ হো গয়া । ওর এই খুশি আমি বাঁটতে এসেছি , মিঠাই নাও
না , আলতাফভাই , এমন ভাবছ কেন? তুমিও কাউকে খুঁজে পাবে , দেখো ।
না মুমকিন
কেন? এরকম ভাবতে নেই , ভাই
এই রকম দিন আমার জীবনে আসবে না । কেন জান?
ম্যায় দিলপে তালা লগাকে চাবি বহত দূর ফেক দিয়া
দূরত্বটা বোঝাবার জন্য শিবানী ছুঁড়ে ফেলার ভঙ্গি করে দেখিয়েছিল , আলতাফকে নকল করে ।

আমার কাছে এখনো পড়ে আছে
তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি
কেমন করে তোরঙ্গ আজ খোলো ?

অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো
লিখিও উহা ফিরত চাহো কিনা

কবিতাঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়




দিল্লি দাস্তান ৫


শিকারগাহ
বেশ ঘুসঘুসে ঠান্ডা পড়ত , জম্পেশ করে আংরাখা পশমিনা গায়ে দিয়ে সুলতান আমির দের দল শিকারগাহ তে( হান্টিং লজ)  গিয়ে উঠতেন । শিকারগাহ এর চারদিক খোলা , প্রচুর রোদ হাওয়া , অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে  খোলা চত্বরটায় উঠতে হয়। আবার গর্মির দিনেও কোন অসুবিধে নেই , চারদিকে সুন্দর গাছ গাছালির ফুরফুরে মিঠে হাওয়া , পাখিরা না চাইতেই শিস দিত , শীতকালে আগনগারের ধিকিধিকি আগুন , অম্বুরি তামাকের বুড়বুড়ি , আর গরমে আম পান্নার সরবত , ইস্পাহানি কার্পেটে দাবার ঘুঁটি , শের শায়েরি ।
পুরাকালে শরতকালে রাজারা মৃগয়ায় বের হতেন । সে রকমই শখের শিকার নবাব সুলতানরা হামেশাই করতেন হয়তো এবং সবচেয়ে বড় কথা এই শিকারের জন্য খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতেন না বলে মনে হয় কারণ দিল্লির মধ্যেই প্রায় গোটা চারেক শিকারগাহ দেখতে পাচ্ছি ।
নিচে অনেকগুলো কুঠুরি আর জল নিকাশের ব্যবস্থা দেখে মনে হয় এগুলোতে  শিকার করে আনা পশু পাখি জবাই করে রান্না করা হত, কাবাব বানানো হত , আর উঁচু সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে খানসামার  দল সেই ধোঁয়া ওঠা খুশবুদার খানা পরিবেশন করে আসত । এইসব করতে করতে রাত কাবার । কয়েক পাত্তর সিরাজি ।  কখনো দুএক দিন থেকেও যাওয়া হত । ব্রিটিশ আমলের ইন্সপেকশন বাংলোর প্রথম সরলীকৃত চেহারা বোধহয় শিকারগাহ ।
ফিরোজ শাহ তুঘলক শিকারপ্রিয় ছিলেন কিনা জানি না । তার নিজের লেখা ফুতুহাত এ ফিরোজশাহিতেও এ ব্যাপারে কিছু বলেন নি তিনি । একটা হালকা সূত্র ছেড়ে গেছেন , তিনি আমির ওমরাহদের চটাতে চাইতেন না । তার আমলে তৈরি তিনটি চারটি হান্টিং লজ দিল্লিতে আছে । এখানে হয়তো ওমরাহ্‌রা মাঝে মাঝেই দিলখুশ করতে , গুলতানি করতে আসত
তিনমূরতি ভবনের চৌহদ্দির মধ্যে আছে কুশক মহলওই লম্বা খা ড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে বসে পড় । শেষ ধাপে উঠেই মনে হল আরে এটা তো আমার  জায়গা সাদাসিধে গড়ন এবং বেশ ছড়ানো ছিটানো মজলিশি ধরনের ।   বেশ জায়গাটা , ল্যাপটপ , কফি স্যান্ডউইচ নিয়ে ঘন্টা কয়েক দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় । কেউ বিরক্ত করবে না , ট্যুরিস্ট যদিও আসে, তিন মিনিটের বেশি থাকবে না , সেলফিও তুলবে না । অথচ আমি জানি আমার সামনে এখনি খসে খসে  পড়বে ওই লতানে গাছটার হলুদ ফুল, লেজ নাচিয়ে পাখিরা আসবে , শ্যাওলা ধরা খোলা চাতালে আমার সঙ্গে আমি থাকব, আর কেউ না ।




কুশক মহল ছেড়ে এবার যেদিকে চললাম সেটা কিছুটা চমকপ্রদ । হান্টিং ছাড়াও এটা আবার দিল্লির অন্যতম হন্টেড হাউস ও বটে । ভুলিভাটিয়ারি কি মহল । ঘন ঠাসা  জঙ্গলের মধ্যে যখন ঢুকলাম মনে হল লম্বাপানা  কেউ তার লম্বা  চুল খুলে সাদা শিফনের সাড়ি পরে একখানা মোমবাতি জ্বালিয়ে একটু একটু করে দেখা দিচ্ছে আর গাইছে ,”ও ভুলি দাস্তান , লো ফির ইয়াদ আ গয়ি” ।।
কেউ বলে বু আলি বাখতিয়ারি নামে এক সাধুর নাম থেকে ভেঙেই এই নাম । আবার শোনা যায় ভাটিয়ারিন বা রাজস্থানের আদিবাসী মেয়ে পথ হারিয়ে এই খানে আস্তানা গেড়ে ছিল । আবার  বু আলি ভাট্টি নাকি এখানকার মহিলা কেয়ার টেকার ছিল , আর আত্মা নাকি আজও ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে । এখন ভুলি ভাটিয়ারিতে দিনমানে একা যাওয়া যায় না , বেশ গা ছমছমে , খন্ডহর আর জঙ্গল ।  মজবুত প্রাচীর দিয়ে ঘেরা , অনেক ছোট্ট ছোট্ট কুঠুরি , কি হত কে জানে, দারোয়ান রান্নার বাবুর্চি খানসামা এরা সব থাকত বোধহয় ।  মচমচ করে আমাদের পায়ের শব্দ হচ্ছে । ও হরি , মূল দরজার সামনে দাঁড়ানো মাত্র দেখলাম স্কুল পালানো এক দঙ্গল বখাটে ছেলেমেয়ে কোন খান থেকে বেড়িয়ে ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেলো আর আমাদের সঙ্গীর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ,  তওবা , কেয়া জমানা।



এরপর চল্লাম আরেক শিকারগাহ দেখতে । সেটাও ওই ফিরোজশাহ বানিয়েছেন । এটা আবার দোতলা, সিলিন্ড্রিকাল । এখানে নাকি অবসারভেটরিও  ছিল ।  খুব সাদামাটা গঠন । শিকারগাহ তে কারিকুরি নকশা করে  লাভ কিছু নেই । প্রত্যেকটাই খুব কাঠখোট্টা , ফাংশানাল । এবারেরটা বেশ মজার । এটার নাম পীর গায়েব ।সত্যি  একজন পীর এখানে তার সাধনার জায়গা বানিয়েছিলেন আর একদিন নাকি হঠাত রহস্য জনকভাবে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যান , কেউ আর তাকে দেখতে পায়নি । আজও প্রচুর লোকসমাগম হয় ,দূর দূরান্ত থেকে লোক আসে , প্রার্থনা করে, একটা দমবন্ধ ঘুপচি সরু অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখি অপ্রশস্ত ঘরে জ্বলছে একটা প্রদীপ । আর নিচ থেকে এখানকার দেখভাল করেন  এক হিন্দু মহিলা তারস্বরে চেঁচাচ্ছেন  জুতা খোলকে, জুতা খোলকে ।




কোথা থেকে কে কখন সুতোয় টান দেয় বোঝা  মুশকিল । শিকারগাহ কুশক মহল যে আমাদের ভালবেসে ফেলেছে সেটা বুঝলাম ওই টান থেকে । আহা রে, সুলতান মুঘল এমনকি সাহেবরা চলে যাবার কেউ বিশেষ আড্ডা মজলিশ বসায় নি বোধহয় ।
“মাস আলা যব ভি চিরাগোঁ কা উঠা
ফ্যায়সালা সিরফ হাওয়া করতি হ্যাঁয়”(পরভিন শাকির)
তা এখানে শুধু হাওয়া নয় , শ্যাওলা ধরা  চওড়া ছাদটা , ছাদ ছুঁয়ে নেমে আসা নিম গাছটা, বুড়ো অশ্বত্থ গাছ ,   সবুজ পাতা আর রোদের ঝিলিমিলি সবাই ঠিক করে দিল যে আমাদের একবার ওখানে বসে গুলতানি করাটা খুব দরকার। বেশ শরত কালের আবহাওয়া । নিমগাছের ছাতার তলায় সেই তুঘলকি চাতালে বসে ছাদের আলসেতে মাথা ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে ভারি একটা আমোদ পেলাম । হঠাত দেখি একদল লোক এসেছে , তাদের সঙ্গে যেন অরুণা চলের  জঙ্গল থেকে ধনেশ পাখি এসে হাজির হয়েছে । তার একটা ছবি নিলাম । কতকালের শিকার গাহ , কতো কাহিনির পটভূমি । বাড়িটারও মনে হল আমাদের পেয়ে সে খুশি বেশ  হয়েছে । চা , স্যান্ডউইচ খাওয়া হয়ে গেলো, দেদার কবিতা পড়া হয়ে গেলো , ঝিমনোও হয়ে গেলো । এবারে যেতে হয় । ইয়া বড় বড় পাথুরে সিঁড়ি একটু এবড়ো খেবড়ো ।
সিঁড়িটাও যেন বলে উঠল, ধীরে ধীরে চলো , বাছা । এখন তো আর সে মানুষ নেই , আর বড় বড় পাও নেই । সাবধানে আস্তে আস্তে নামো ।

ধীরে ধীরে চল চাঁদ গগনমে
কহিঁ ঢল না যায়ে রাত,টুট না যায়ে সপনে...।














Saturday, 10 September 2016

জাইনাবাদি



কোন খসে পড়া তারা
মোর প্রাণে এসে খুলে দিল আজ
সুরের অশ্রুধারা

গায়ের রঙ ছিল একেবারে সাদা ফ্যাটফেটে । মনের মধ্যে ছিল জিলিপির  ঘোরতর  প্যাঁচ । অসম্ভব ধূর্ত , চিতার মতো ক্ষিপ্র , গোপন খবর চালাচালিতে তুখোড় , মনের মধ্যে নেই  মায়াদয়ার লেশ । তীক্ষ্ণ শকুনের মতো  এতো কঠিন  ধার্মিক যে লোকে বলতো জিন্দা পীর । ভাই , ভাইপো দের একের পর এক খুন করে , কাউকে কয়েদবন্দী করে বিষ খাইয়ে বুড়ো বাপকে আগ্রা দুর্গে বন্দী করে মসনদে বসে কট্টর পন্থা কায়েম করলেন তিনি । বিধর্মী কাফের বলে বড় ভাই এর গলা টা কেটে বুড়ো বাপের কাছে পাঠিয়েও দিলেন সম্রাট । বড় বোন কেঁদে কেঁদে শামদানের নিভু নিভু কাঁপা কাঁপা  আলোয় সেই ভ্রাতৃ দ্রোহ আর নির্মমতার কাহিনি লিখে রাখলেন । যদিও দরবারের ওয়াকিয়া নবীশ রা খুঁটিনাটি সবই লিখে রাখত ।
এক সন্ন্যাসীকে একবার শাহজাহান জিজ্ঞেস করেছিলেন সন্তানদের কাছ থেকে তাঁর কোন বিপদ আছে কি না । উত্তর এসেছিল সবচেয়ে ফর্সা যে সেই হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক । তখন থেকেই বাবার স্নেহ টলে গেছিল । আওরংজেবের  বয়স তখন মাত্র দশ । ছেলেকে  তিনি আড়ালে ডাকতেন সাদা সাপ ।
আওরংজেব ফরমান জারি করলেন যে তাঁর মুলুকে কোনরকম গান বাজনা , নৃত্য এইসব আমোদ প্রমোদ করা চলবে না । যারা  সঙ্গীত সাধনা করে , গান বাজনা যাদের পেশা সেইসব শিল্পীর দল মহা বিপদে পড়ল । দিন গুজরান আর হয় না ।
নবাব আমিরদের মজলিশ জলসা আর সব ফুটানি বন্ধ । 
 ইটালির পর্যটক নিকোলো মানুচ্চি অনেক গপ্পগাছা লিখে গেছেন এই ব্যাপারে । তিনি লিখেছেন এমন ফরমান জারি হয়েছিল যে যদি কোনো বাড়ি থেকে সামান্য গান বাজনা শোনা যায় সঙ্গে সঙ্গে কয়েদ , বেদম মার , এমনকি মেরেও ফেলা হতে পারে । প্রচুর বাদ্যযন্ত্র এই সময় ভেঙে ফেলা হয়েছিল । গাইয়ে বাজিয়ের দল ঠিক
 করল তারা কোন না কোন ভাবে সম্রাটের কাছে বিক্ষোভ জানাবে।
এক জুম্মাবারে সম্রাট মসজিদে যাবেন । তিনি দেখলেন প্রায় খান কুড়ি সুসজ্জিত কফিন বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । স্বাভাবিক ভাবেই তিনি একটু উৎসুক হলেন, সার সার শবদেহগুলো কাদের ? জানতে চাওয়া হল কার ইন্তেকাল হল হে  ? গাইয়ে বাজিয়ের দল ভাবল খুব একটা প্যাঁচে ফেলা গেছে । উত্তর এলো মৌসিকির , জাঁহাপনা  । মৌসিকির  ইন্তেকাল হয়েছে । তাই কবর দিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । খুব ঠান্ডা গলায় আওরংজেব বলেছিলেন , আহা আহা ওনার আত্মার শান্তি কামনা করি , ভালো করে গোর দিও, ভালো করে। কোন ফাঁক যেন না থাকে ।
যে পরিবারের রক্তে  এতো রসবোধ , নাচ গান বাজনা , ছবি , স্থাপত্য বাগ বাগিচা , খানা পিনার এতো অপরূপ নকশা এতো   জমকালো ঝঙ্কার , এতো মহার্ঘ শখ শৌখিনতা  প্রজন্মের পর প্রজন্ম লালিত হয়েছে  , হঠাৎ  এমন বেতালা কেন হল , এমন বেসুরো কেন হল ? যে পরিবারের নানান প্রেমগাথা কালজয়ী হয়ে আছে আর এনার মনে তাঁর এতোটুকু দোলাও লাগে নি  কেন? 
লেগেছিল ।
তখন তিনি মধ্য তিরিশ , একাধিক বিবাহ  , ছয় সন্তানের বাবা ।


ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে

বুরহানপুর । তাপ্তী নদী । দক্ষিণ ভারতের প্রবেশ দ্বার । তাপ্তীর ওপারে জাইনাবাদ । জাইনাবাদের আহুখানায়( হরিণ পার্ক )  মাটির নিচে শুয়ে আছেন আম্মিজান । মুমতাজ মহলকে প্রথমে এখানেই গোর দেওয়া হয়েছিল । আওরংজেব , দক্ষিণ ভারতে অনেকদিন শাসন কাজ সামলেছেন । তিনি একবার বুরহানপুরে মাসির বাড়ি গেছিলেন । মেসোমশাই , বুরহানপুরের প্রদেশ কর্তা , গভর্নর । সইফ খান । বেজায় খিটকেল লোক । মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি, আওরঙ্গজেবও বেশ খোশ মেজাজে  মহলের ভেতরে ঢুকে পড়লেন । আড়াল আবডাল নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামালো না । উপরন্তু বদ মেজাজি সইফ খান আবার বাড়িতেও ছিল না । ঠিক সেই সময়ে চন্দনের নয় , আম বাগানে ডান হাত দিয়ে একটা ডাল ধরে দুলতে দুলতে নিচু গলায় গুনগুন করে গান গাইছিল হিরা বাঈ , হারেমে তাঁর নাম ছিল জাইনাবাদি । বেশ কম বয়সের হিন্দু মেয়ে । ওই যে আকবর নিয়ম করেছিলেন হারেম সুন্দরীদের সঙ্গে তাদের জায়গার পরিচয়ও জুড়ে দিতে হবে । আওরংজেব  সেই ভ্রূ পল্লবের ডাকে আর হিরা বাঈ এর সুন্দর মুখ খানা, তার  কটাক্ষে  আর গানের সুরের বিদ্যুৎ ঝলকে একেবারে সটান তড়িতাহত হয়ে মাটিতে দড়াম করে পড়ে মুচ্ছো গেলেন । মহলের ভেতরে খবর গেলো , মাসি তখন দস্তরখান সাজাচ্ছিলেন রকাবদারদের দিয়ে , বোনপো বলে কথা । তিনি তো পড়িমরি করে দৌড়ে এসে কান্না কাটি জুড়ে দিলেন । এতো সাধ করে কতো আয়োজন করেছেন । বেশ অনেক ক্ষণ পরে আওরংজেবের হুঁশ ফিরে এলো ।  ততক্ষণে মাসি নানা দরগায় মানত করে ফেলেছেন । মাসি জিজ্ঞেস করল , হ্যাঁ বাছা , তুমি কি  প্রায়ই এরকম মুচ্ছো যাও?
“আমি যদি আমার অসুখের কথা তোমাকে বলি, তুমি সারাতে পারবে তো ?”
“সে কি? কী যে বলিস? আমার জান কুরবান”।
আওরংজেব বললেন তিনি হিরা বাঈকে চান । মাসির মুখ দিয়ে আর আওয়াজ বেরোয় না । ভয়ে ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে মাসি বলে তোর মেসো তো এসে প্রথমে আমাকে কাটবে , তারপর জাইনাবাদিকে । আমার কথা ছেড়ে দে, ও বেচারা কি দোষ করেছে বল যে বেঘোরে প্রাণ টা দেবে?
শাহজাদা বললেন ঠিক আছে , আমি অন্য রাস্তা দেখছি । সেই সময় দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খানকে ডেকে পাঠানো হল ।অনুগত মুর্শিদ কুলি তখখুনি সইফ খানকে কচুকাটা করতে বেরিয়ে যায় আরকি । শাহজাদা তাকে থামিয়ে বললেন, আমার মাসিজান বিধবা হবে তা  তো আমি চাই না । ভগবানের ওপর ভরসা রাখো , মেসোর সঙ্গে কথা বল গিয়ে
সইফ খান খিটকেল রগচটা হওয়া সত্ত্বেও  বললেন এ আর এমন কি কথা ? শাহজাদাকে আমার সেলাম দিও । মোঘলহারেমের ছত্তর বাঈকে পাঠিয়ে   দাও আর হিরাকে নিয়ে যাও ।


প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস
তোমার চোখে দেখে ছিলাম আমার সর্বনাশ

শাহজাদার সব নিষ্ঠা সংযম চুলোয় গেলো । হিরাবাঈ জাহানাবাদি তাঁর সমস্ত মনপ্রাণ জুড়ে চৈতি বসন্তের আগুন ধরিয়ে দিল । হিরাবাঈ ছিল সুকন্ঠী শাহজাদার প্রাণে খুশির তুফান । জাইনাবাদ একটা ছোট্ট জায়গা ।  এতো সরু সরু রাস্তা যে পালকি বা ঘোড়া চলতে পারে না । হিরাবাঈ জাইনাবাদে কখনো গেলে হয়তো পায়ে হেঁটে চলছেন , আওরংজেব ও ঘোড়া থেকে নেমে পড়তেন । পায়ে হেঁটে চলতেন । একদিন   মদিরার পেয়ালা শাহজাদার দিকে  এগিয়ে দিল হিরা বাঈ  , আওরংজেব তার ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা জীবনে  কখনও সুরা স্পর্শ করেন নি । কিন্তু হিরা বাঈ যদি সে পেয়ালা এগিয়ে দেয়  তাহলে জেনেশুনে বিষ টাই পান করে নি । তিনি হাত বাড়ালেন । ঠোঁটের সামনে ধরলেন , এবার চুমুক দেবেন । হিরাবাঈ ছোঁ মেরে পেয়ালা সরিয়ে ফেলে দিয়ে বলল , আমি আপনার মোহব্বত পরীক্ষা করছিলাম । আপনার ধর্ম নষ্ট  করা আমার উদ্দেশ্য নয়  ।
এই বিভোর প্রেমের কথা শাহজাহানের কানেও পৌঁছেছিল। কিন্তু খুব দুর্ভাগ্য,  ফুলটি অকালে ঝরে গেলো , অনেকে বলেন শাহজাদার ছোট বোন রোশেনারার নাকি এ ব্যাপারে হাত ছিল ।  ইতিহাসের কলঙ্কিত নায়কের শুকনো  চোখে জল এনে ফেলল ভালোবাসা । শামদানের নিভু নিভু কাঁপা কাঁপা আলোয় জাহানারা লিখেছিলেন আওরংজেব অন্তত একজনকে ভালবেসেছিলেন । জাইনাবাদির জন্য অন্তত কিছুক্ষণ আওরংজেব বিশ্বজগত ভুলে থাকতে পারতেন। প্রেমের খেলা করে সঙ্গীতের মাধ্যমে সে আওরংজেবের হৃদয়ের গোপন কক্ষে ঢুকতে পেরেছিল । “প্রেমময়ী জাইনাবাদীকে আমি চিরকাল স্মরণ করব “
আওরঙ্গাবাদে জাইনাবাদিকে  সমাধিস্থ করা হয় । আওরংজেব কাঁদলেন  তো বটেই, অসুস্থও হয়ে পড়লেন । বেরিয়ে পড়লেন শিকারে । পারিষদরা সব বলল,  এ অবস্থায় কি না গেলেই নয়?  শাহজাদা বললেন ঘরের মধ্যে হাহুতাশ আমাকে শান্ত করতে পারবে না , একাকিত্বের মধ্যে যদি তাকে খুঁজে পাই ।
এরপর থেকেই নাকি কট্টর পন্থা প্রবল ভাবে আওরংজেবকে চেপে ধরে । সমস্ত আমোদ প্রমোদ হাসি কলতানকে গলা টিপে মেরে ফেলাই তার  কাজ হয়ে দাঁড়ালো । প্রেমহীন শুষ্ক জীবন আশিক কে করে তুলল ইবলিশ ।


ছবিঃ শিরিন শাহবা

Wednesday, 24 August 2016

দারাদিল রানাশুকো


 ভোরের আলোয়   গাছের  পাতায় পাতায় জমে  থাকা  শিশির বিন্দুর রামধনুতে  টলটল করে উঠছে   দারাদিল রানাশুকো , প্রথম বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের মাটির ভাপে গুমগুমিয়ে উঠছে দারাদিল রানাশুকো , যমুনার ঢেউ এ  অস্তরাগের রঙে রাঙিয়ে গেল দারাদিল রানাশুকো , আগ্রা কেল্লার লাল পাথরে পাথরে নিঃশব্দে খোদাই হল দারাদিল রানাশুকো ,  গুলরুখ বাঈয়ের ঘুঙুরের বোল গেয়ে ওঠে  দারাদিল রানাশুকো , জ্যোস্নার ভেতরে হাসনুহানার ঝোপে জোনাকির জ্বলা নেভায়  দারাদিল রানাশুকো ,মটর গাছের খেতে এক ঝাঁক টিয়াপাখির সবুজ ডানায় উড়ে যায় দারাদিল রানাশুকো ,অপরূপ খিলান আর গম্বুজের বেদনাময় রেখা ধরে রাখে দারাদিল রানাশুকো ,পর্দায় গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ জমা করে রাখে দারাদিল রানাশুকো , কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে সময় সরণি বেয়ে বিস্মৃতির গভীরে তলিয়ে যাওয়া এক আশিক আর তার মাশুকার নাম দারাশুকো রানাদিল



আল্লাহ্‌ কে তিনি বলেছিলেন সচ্চিদানন্দ মির্জা রাজা জয় সিংহ কে লেখা চিঠিতে ফারসিতে লিখেছিলেন সচ্চিদানন্দ আল্লাতালার মুখের দুপাশে দুই গুছি চুলের একটি ইসলাম অন্যটি হিন্দু ধর্ম হাতের আংটিতে দেবনাগরীতে খোদাই করেছেন পরভু (প্রভু) কানের ভেতরে বাজতে থাকে অপরূপ ঘণ্টা ধ্বনি , চোখের সামনে উড়ে বেড়ায় অজস্র আলোর বিন্দু হৃদয়ের গভীরে এক অনন্তের সঙ্গে মিশে যাবার সমুদ্র উচ্ছ্বাস  অনুভব করেন হিন্দুস্তানের শাহজাদা ,নাদিরা বেগমের স্বামী , সলোমন শুকো র আব্বা , সম্রাট শাহজাহানের বড় আদরের ছেলে  , জাহানারার বড় ভালবাসার ছোটে ভাইয়া দারাশুকো তিনি যেন এই দুনিয়ার মানুষ নন , বেহেশ্ত থেকে আসা এক ফরিস্তা মোঘল হারেম তাকে টানে না , তিনি  সাধু সন্ত পীর ফকির দরবেশ আর সুফিয়ানা সিলসিলায় আত্মমগ্ন স্বপ্নাতুর ,যেন এই দুনিয়ায় দুদিনের মেহমান ,কিন্তু তবু শাহী আদবকায়দা মানতে হয়, যুদ্ধে যেতে হয় , তলোয়ার ধরতে হয় বে  শরিয়তি কাফের বলে নিন্দের কাদাও  গায়ে মাখতে হয়


ঘরে জমানো  তরল ঘি , তাতে এক চুটকি সিঁদুর গুলে দিলে যে একটা অদ্ভুত আদুরে রঙ তৈরি হয় রানাদিল ছিল সেই রঙের একটা মেয়ে বেমিসাল তার খুবসুরতি তার চালচুলো নেই ,জাত ধর্মের ঠিক নেই , বাপ মায়ের হদিশ নেই অনাথ মুখের ভাষা ও সেইরকম নেই সহবত , নেই লজ্জা , বেপর্দা বেহুদা আওরৎ খুচরো পয়সা জমিয়ে দিনের শেষে রুটি কাবাব কেনা ই তার বেঁচে থাকা রাক্স অর্থাৎ নাচ তার পেশা না, সে মুজরো জমানো বেল জুঁই মালায় সাজা বাইজি বা তবায়েফ নয় তার জন্য কোন তবলচি কাহারবা দাদরার বোল তুলত না , কোন ঝাড়বাতির রোশনাই এর  নিচে  তার সুর্মা টানা চোখ কথা কইত  না , ছিল না গলায়  ঠুমরির  দানাদানা  নক্সার কাজ , ছিল না গোলাপদান , আতর দান পানদানের বাহার     থাকবে কিকরে ? রানাদিল ছিল রাস্তার নাচিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মান্ডিতে মান্ডিতে ঢোলকের সঙ্গে সে নেচে বেড়াত কাঁকর পাথর ছড়ানো রাস্তায় , সাঁঝের বেলায় , যমুনার ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বইত , নানান ব্যাপারী পরদেশি দেহাতির দল জমা হত , ন্যাকড়া জড়ানো সস্তা চর্বি মাখানো  মশাল দাউদাউ করে জ্বলে উঠত আর সেই সময়খোলা আকাশের নিচে এক রাশ লোকের সামনে আলোআঁধারির মধ্যে  লচক আর ঠুমক নিয়ে ঘাগরায় অশান্ত ঘূর্ণি তুলত রানাদিল আমজনতার নাচিয়ে আমজনতার মেহফিল । আমজনতার দিল কি রানি  সবাই তাকে চিনত সব্বাই অফুরান ছিল তার প্রাণশক্তি সমস্ত রক্তবিন্দু দিয়ে নাচত রানা তাকে ঘিরে চলত সাধারণ পথচলতি মানুষের উদ্দাম ফুর্তি আর হাততালি , যে হাত তালিকে দেওয়ানি খাসের দরবারি নাচের শাহী মজলিশে বে সহবত মনে করা হত


দারাশুকোর শান্ত গেরস্থালি  ছিল নাদিরা বেগমকে নিয়ে  তাতে মাধুর্য থাকলেও    উচ্ছ্বাস ছিল না শাহী সহবতের বাইরে কোনোদিনই যায় নি নাদিরা নাদিরা নাজুক শরমিলি আওরৎ দারা ছিলেন তার কাছে হজরত , শরতাজ , বা কখনো বন্দেগান বরং দারার অতিরিক্ত ধর্ম চর্চা সাধুসঙ্গ আর পড়াশুনো তাকে ভাবিয়ে তুলত এর থেকে বন্দেগান যদি আরেকটা বিবি আনত বা হারেম নিয়ে ব্যস্ত থাকত তাহলে সে
 বেচারা  খানিকটা স্বস্তি পেত যে তার খসম একজন স্বাভাবিক মানুষ


শাহী মহল ছেড়ে ছদ্মবেশ পরে দারা মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়তেন সাধারণ মানুষের ভিড়ে এমনই একদিনে রানাদিলের সঙ্গে তার দেখা হয় সেদিনও রানা কে ঘিরে চলছিল হই চই আর হুল্লোড় ঘটনাচক্রে দুজনের সাক্ষাৎ হয় অসম্ভব সাবলীল তার কথা , বাজার চলতি ভাষা , নেই কোন কুরনিশ , তসলিম , কদমবোসি , সিজদা
কিন্তু সস্তার নাচুনি রানাদিলের মধ্যে  এমন একটা উষ্ণতা ছিল যা শাহজাদার কাছে ছিল একদম অন্য রকম, ভানহীন , আন্তরিক, একদম স্বাভাবিক   রাজধানী আগ্রায় মরদের কঠিন দুনিয়ায় গায়ের ঘাম  ঝরিয়ে রুটি কামায় যে মেয়ে এতো প্রাণশক্তি কোথা থেকে পায় সে? শাহজাদা দারার অন্তরের মহব্বতের পাত্রটি পূর্ণ হয়ে উপচে পড়েছিল , সেই ভালবাসার স্রোত রানাদিলকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায় রাস্তার সেই ধুলোকে হৃদয়ে মেখে নিলেন দারা রানাদিলের নতুন আস্তানা হল যমুনা পারের রানি হাভেলি মরদ আর আওরৎ যে সমানে  সমানে ভালবাসতে পারে একথা নতুন করে শিখলেন দারা  
কিন্তু রানি হাভেলি, রানাদিলের মতো মুক্ত আজাদ পঞ্ছির কাছে কয়েদখানার মতো মনে হত দরজায় পাহারা ফৌজদারি মনসবদারির কাজ সেরে ছদ্মবেশ পরে  মাপা সময়ের জন্য শাহজাদার তার কাছে আসা এসবই না পসন্দ ছিল রানাদিলের উপরন্তু নেই কোন রাখঢাক ভান ভণিতা , কোনোদিন শেখে নিও সে টানাপোড়েনে  বিভ্রান্ত দারা কে সে বলেই বসে , “আমার সঙ্গে রাস্তায় নেমে এসো , চলো হাত ধরাধরি করে শাহী সড়কে মিশে যাই , গোয়ালিয়রের রাস্তা ধরে বাগোয়ানের জঙ্গলে গিয়ে উঠি
মোঘল খানদানে আটপৌরে  জীবনের এই স্বাদ শাহজাদা আগে কখনো পান নি রানাদিলের বিয়ের প্রস্তাব বারবার পিছিয়ে যায় শাহী দায়িত্ব সামলানোর কাজে , কান্দাহার যুদ্ধ , রাজধানী জাহানাবাদের বিপুল কাজ ,আব্বাহুজুর  শাহজাহানের শখ মিনার মসজিদ কেল্লা সমাধি , নকশা , পাথর রানাদিল অমন শাহীর মুখে রোজই  ঝাঁটা মারে , শাহীর পাথুরে খোয়াবে তার দম আটকে আসে
দারা তাকে জিজ্ঞেস করেন , তুমি হিন্দু না মুসলমান, রানা  ?
“তা তো জানি না তবে আমি ইনসান , এইটুকু জানি
“আমিও  তাই ,রানাদিল

“দারুণ হার-বাত-এ জান-ইস্ত পিনহান
বা-জের-ই কুফার ইমান-ইস পিনহান
সাধনায় প্রতিটি মূর্তি সজীব হতে পারে। অবিশ্বাসের নিচেই লুকিয়ে আছে বিশ্বাসের ফল্গু । রুবাইটি ঘোরে পাওয়া মানুষের মতো লিখে রাখতে রাখতে দারা মনে মনে বলে উঠলেন কাবা আর সোমনাথ আমার একই লাগে। আমি না হিন্দু—না মুসলমান । তাহলে আমি কী? “


শেষমেশ রানাদিলের সঙ্গে বিয়ে হয় দারা শুকোর অনেক বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও কারোরই পছন্দ ছিল না , না শাহজাহানের , না জাহানারার রানাদিল , দারার তৃতীয় এবং শেষতম বেগম নাদিরা ছাড়া জর্জিয়ার স্বেতলানা বা উদিপুরিকে দারা বিয়ে করেন সেলিম আনারকলি , জাহাঙ্গীর নুরজাহান , শাহজাহান মুমতাজের নক্ষত্র খচিত অতিরঞ্জিত প্রেম কাহিনীতে কোথায় চাপা  পড়ে  গেছে রানাদিল অথচ ওইসব জাঁক জমক প্রেমের মধ্যে মিশে  মিশেআছে  ক্ষমতার লোভ , স্বার্থ , পরনারীতে আসক্তি কিন্তু ঘুঁটে কুড়ুনি আর রাজার দুলালের এই আশ্চর্য ভালবাসা কোথায় গুম হয়ে গেছে তার হদিশ কেউ রাখে নি

আওরঙ্গজেবের হাতে দারার হত্যার পরে নাদিরা বিষ খায় , উদিপুরি চলে যায় মোঘল  হারেমে কিন্তু বাগ মানানো যায়নি রাস্তার সেই জিদ্দি নাচনেওয়ালিকে বড় মজবুত ছিল তার ইশক আওরঙ্গজেব রানাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন সেখানে বসে রানা চোখের জলে ভেসে ভেসে গান বাঁধত আর গাইত সেই গানে আওরঙ্গজেবের যত কুকীর্তি আর অত্যাচারের  কথাই মনে করাতো সে শাহী হুকুমে গানবাজনা বন্ধ হয়ে যায় এইসময় রানাকে মেরে কুকুর দিয়ে খাওয়াবার ভয় দেখানো হয় কিন্তু রানা ছিল এক রোখা , বেপরোয়া দারার সঙ্গে ভালবাসার যে জিদ সে বজায় রেখে ছিল , দারাহীন জীবনেও সেই জিদ থেকে একচুল সরে আসেনি  
আওরঙ্গজেব খবর পাঠালেন তিনি রানার অন্ধকার বিদিশার নিশার  মতো চুল নিয়ে খেলা করতে চান রানা তার সব চুল কেটে মাথা ন্যাড়া করে সেই রেশমের  মতো চুল বাদশাকে পাঠিয়ে দিয়ে বলে এই নাও শাহী , সেই চুল যা তুমি বড্ড ভালবেসেছিলে আওরঙ্গজেব এবারে বলে পাঠালেন ওই শ্রাবস্তীর কারুকার্য মুখ তিনি দেখতে চান , রানা যেন তার কাছে এসে থাকে
ছোরা দিয়ে মুখ ক্ষত বিক্ষত করে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত একটা পাত্রে জমা করে রানা ছোরাখানাকে ভালো করে রক্ত মাখিয়ে আওরঙ্গজেবের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে এবারও বলল এই নাও শাহী সেই চাঁদমুখ ,যা তুমি দেখতে চেয়েছিলে
দারা , রানার জন্য কোন তাজমহল বানান নি , রানার কোন সন্তান ও ছিল না

কোন এক সূত্র থেকে জানা যায় একদিন যমুনার কিনারে এক কোনে একটা  জ্বলন্ত চিতায় কোন এক ফকিরকে দেখা গিয়েছিল ,সে  বসেছিল  চিতার ওপর ,তার মাথা ন্যাড়া , ক্ষত বিক্ষত তার মুখ ময়লা চাদর ।
সেদিন সন্ধের মুখে বেহেস্তের সুগন্ধ মেখে একরাশ নক্ষত্রের কাঁপনে সে শেষ বারের মতো শুনেছিল দারাদিল রানাশুকো

সেই কথা ভালো ,তুমি চলে এসো একা ,
বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে -
স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা ,
সন্ধ্যা তারাটি শিরীষ ডালের  ফাঁকে


ঋণ স্বীকার ঃশাহজাদা দারাশুকো -শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ,আসিফ খান দেহেলভি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন নেওয়া হয়েছে

ছবির উত্স : গুগল , শিরিন শাহবা , আসিফ খান দেহলভি