Tuesday, 19 March 2019

Nondano Soprano sojourn


Switzerland : Interlaken : Thun Lake:

জারবাইজানের বাকুতে নন্দানো একটা ন’তলা বাড়ির সাত তলায় পুবমুখো ফ্ল্যাটে থাকতো । আর ঠিক তার দুটো তলা নিচে থাকতো আমার আরেক বন্ধু ফারিদা । অবশ্য ফারিদা আমাকে মাঝে মাঝেই মুচকি হেসে বলতো যেমন তুমি সবজি sauté করো , আমার নাম টাও কিন্তু তেমনি ,ফারিদে । বাড়ি ছেড়ে আসা ইস্তক নন্দানো বেশ মনমরা হয়ে থাকতো , আমিই ফারিদার সঙ্গে ওর আলাপ করিয়ে দি । ফারিদাদের ওই ন’ তলার বাড়ির সামনে প্রত্যেক শনিবার একটা হুলুস্থুল লেগে যেত । একটা টালটোল খাওয়া সোভিয়েত রাশিয়ার বানানো জিগুলি , অনেকটা আমাদের দেশের ফিয়াটের মতো, এসে হাজির হতো।

আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেন এক মহিলা , বয়স ষাট পেরিয়েছে । কিন্তু খুব চনমনে । তিনি ঘটাং করে গাড়ির ডিঁকি খুলে দড়াম করে একটা বড় ট্রাঙ্ক মাটিতে নামাতেন । নিজেই । তারপর খটাং করে ট্রাঙ্কের ঢাকা খুলে ছাড়তেন একখানা ফলসেটো “সুদ ভার , গাটিইইইইইইইগ “ ( দুধ , দইইইইইইই)। দই দই ভালো দই ।

ফারিদারা ওনাকে আদর করে দইওয়ালি না বলে , সুদ সাতান খালা ( দই বেচা মাসি ) বলে ডাকতো ।
আজেরি তুর্ক ভাষায় গাতিগ মানে দই ,সুদ মানে দুধ ,আর তুর্কি ভাষায় সু মানে জল । মানে ওই দুধে জল মেশানোর ব্যাপারটা ভাষা গত ভাবেই জড়িয়ে সাপটে আছে । তা , দই মাসির হাঁক শুনে ফ্ল্যাট বাড়ির সব লোকজন নানান সাইজের পাত্র নিয়ে টাটকা দই নিতে আসতো । ফারিদাও আসতো । তারপর আবার দর দস্তুর চলতো । বড্ড বেশি বলছো , আরেকটু দাম কমাও । এইসব যখন শুরু হতো তখন দইমাসি রুটির দিব্যি ( আজারবাইজানিরা ঠাকুর দেবতা বাপ মা নয়, রুটির দিব্যি দেয়) দিয়ে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতো “আমার দই এক্কেবারে নিজের হাতে বাড়িতে বানানো , কোনো রকমের বাইরের জিনিশ মেশানো হয় না। । দাম মোটেই বে শি নিচ্ছি না, বাপু “ । তারপর দামটাম চুকিয়ে ফরিদারা সবাই সেই ঘন জমাট দই নিয়ে যে যার বাড়ি ঢুকে যেত । সেই দই এরও তেল চুকচুকে ক্রিমের মতো ফুটিফুটি একটা মাথা থাকতো , দই এর মাথা । ফারিদা আবার সেটা খেতে খুব ভালোবাসতো ।
দোভঘা আর আইরান না হলে আজেরিদের ভাত হজম হবে না । এবং তা বানাতে দই লাগবেই ।

নন্দানো প্রথমটায় অত দই ভালো বাসতো না । বিশেষ করে টক দই । কিন্তু ফারিদার সঙ্গে মিশে মিশে ও আস্তে আস্তে দই মাহাত্ম্য বুঝতে শিখল ।
এত ক্ষণ ধরে দই দই করছি কেন তাই বলছি ধীরে ধীরে । সেবারে আমি আর নন্দানো ইন্টারলাকেনে গেছি । কার যেন একটা চিলেকোঠার ঘরে আমাদের দয়া করে থাকতে দেওয়া হয়েছে । ভেতরটা বাপু ভালোই , গরমটরমের ব্যাবস্থা আছে । খাওয়া দাওয়া নিজেদের । ঘর টা যে পাওয়া গেছে , সেই বা কম কি । কিন্তু সকাল থেকে বরফ পড়ছে । আমাদের সে কী মন খারাপ !
বাইরে বেরুতে পাচ্ছি না । রোদ ওঠে নি মোটে । নন্দানো বলল , সোপ্রানো ঘরে শুধু দই , বেগুন আর চিকেন কিমা পড়ে আছে । আরে দুচ্ছাই ! রোদের দেখা মিলছে না । স্লেটের মত ছাইছাই আকাশ । হলই বা সুইটজারল্যান্ড । দই এর নিকুচি করেছে । বললে বিশ্বাস করবেন না । এরপর একটা ঘটনা ঘটলো । এই ইন্টারলাকেনের আশেপাশেই দিলওয়ালে দুলহানিয়ার শুটিং হয়েছিল । আর সেই ফিলিমে ,মানে সব সুপারহিট সিনিমার মতো কিছু তোলপাড় করা ডায়ালগ ছিল।




অগর ইয়ে তুঝে পেয়ার করতি হ্যাঁয় তো ইয়ে পলট কর দেখেগি...পলট...পলট “ ,আর সিমরনও ট্রেনে ওঠার আগে পলট ...পলট । ঠিক সেই ভাবে বিবস্বান বসু পলট করে আলো খেলিয়ে দিলেন । বরফের ওপর ঝিকঝিকিয়ে উঠল ভালোবাসার আলো । আর নন্দানো , চল সোপ্রানো বেরিয়ে পড়ি, বলেই চশমা মুছতে লাগল ।
নন্দানো , বাইরে খাওয়া যাবে না কিন্তু । রেস্ত নেই । কি করা যায় ?
খুব চটপট আমরা বেগুনগুলোকে ছাল ছাড়িয়ে টুকরো করে ভেজে হালকা পিটিয়ে দিলাম । ঘন থকথকে দই এ মিশিয়ে দিলাম রসুন কুচি ভাজা আর কিমাটাকেও একটু ফারিদের মতো করে sauté করে টিপিনকারিতে পুরে “ যা সিমরন যা ,জি লে অপনি জিন্দাগি “, ওই সিনিমাটার আরেকটা ডায়ালগ হয়ে স্রেফ হাওয়া হয়ে গেলুম মাউন্ট টিটলিস ।
আমরা কেবল কারে করে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছি । বাড়িগুলো ছোট্ট ছোট্ট খেলনার মতো দেখাচ্ছে । টিটলিসের ওপরে কী ঠান্ডা । শনশন করে হাওয়া । মাথার টুপি প্রায় উড়ে যায় । এর হাইট দশ হাজার ফিটেরও বেশি । কিন্তু আমাদের তখন দারুণ ফুর্তি । চারদিকে আল্পসের ভ্যানিলা আইসক্রিমের ফ্যাক্টরি । একটু চকোলেট সস হলেই হয় ।

জরা সা ঝুম লু ম্যায় /আরে নারে নারে না/জরা সা ঘুম লু ম্যায়/ আরে নারে নারে না।/ ম্যায় চলি বনকে হাওয়া...”। আমরা তখন হাওয়া হয়ে গেছি ।
বাতাসে ঘুরে ঘুরে পাক খেয়ে এসে পড়েছি থুন লেকের ধারে । এবারে আমরা খাবো । বাড়িতে বানানো সেই স্ম্যাশড এগপ্ল্যান্ট উইথ চিকেন কিমা অ্যান্ড গারলিক ইয়োগারট । দই কিমা বেগুনের ঘ্যাঁট বললে চলবে না বস !
থুন লেক !
  



নীল কপোতাক্ষ । টলটলে । আলপাইন বন । সুইশ আল্পসের মাথায় বরফ জমে আছে । নির্ভেজাল সুন্দরী । সে সুন্দরী বসেছিল নন্দানো সোপ্রানোর জন্য । আমরা ব্যাগ মাটিতে ফেলে দৌড়ে তার কাছে চলে গেলাম । ছবিতে দুটো ব্যাগ দেখা যাচ্ছে । ধুমসোটা আমার , ওর মধ্যে ওই ঘ্যাঁট থুড়ি স্ম্যাশড ইত্যাদি আছে । আমরা চুপ করে বলে থাকলাম । ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ উঠছে জলে । মৃদু বাতাসে তিরতির করে সেই জল কাঁপছে । স্বর্গের হাঁসেরা মা সরস্বতীর কাছ থেকে ছুটি নিয়ে দু দন্ড খেলে বেড়াচ্ছে । আমরা কথা ভুলে গেছি । খাওয়া ভুলে গেছি ।

নন্দানো স্প্যানিশ ভাষায় কী ভাবছে জানিনা । আমার ভেতর ছেঁচে উঠে আসছে “ তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি ,আমি ডুবতে রাজি আছি , আমি ডুবতে রাজি আছি ...”







একবার আমি আর নন্দানো হায়দ্রাবাদে ঘুরছিলাম । না, না শশধরবাবুকে সেদিন আর ডাকিনি । নন্দানো বার বার বলছিল , সোপ্রানো, আমি এখানে আইস্ক্রিম খেয়েছিলাম,ওপরটা মুচমুচে ক্রিস্পি আর ঠোকা মারলেই ঠান্ডা আইস্ক্রিম বেরিয়ে আসছে । চল সেটা খাই । কিন্তু নিজামদের শহর ছাপ্পা ছাপ্পা ঘুরেও সে আইস্ক্রিম দেখতে পেলুম না । কিন্তু একটা অদ্ভুত আইস্ক্রিম আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসেছিল । ম্যাসকটি আইস্ক্রিম । ম্যাসকটে এই আইস্ক্রিম পাওয়া যায় কি না, জানিনা বাপু। দু ধরনের আইস্ক্রিম নিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে , আজ্ঞে হ্যাঁ , পিটিয়ে পিটিয়ে একটামিশ্রণ বানিয়ে বেশ একখানা ছড়ানো ফুলের মতো বিস্কুটের কাপে ঢেলে খেতে দেয় । এই পিটিয়ে বানানোর রহস্যটা সত্যি এখনো ধরতে পারিনি । তবে আমার ঐ বুদাপেস্টের সোপ্রানি কফিশপে চিমনি কেক আইস্ক্রিম রাখছি আজকাল । খোলটা গরম মুচমুচে গুঁড়ো চিনিলাগানো রুটি ,পাতলা পাতলা ,আর ভেতরে উমম মম আইস্ক্রিম । দেখুন দেখুন ছবি দেখুন। কফিশপ থেকে বুদাপেস্টের ছবি । আর ছবি দেখতে দেখতে চিমনি আইস্ক্রিম। বুদাপেস্ট গেলে আমার দোকানে যাবেন কিন্তু।










এই প্যাঁচালো রাস্তাটা আরো দুবার পাক খেয়ে যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে নন্দানোর বাড়ি । নন্দানো আগে স্প্যানিশ ছাড়া কোনো ভাষাই ভালো করে বলতে পারতো না । এখন ইংরেজি আর একটু একটু বাংলা বলে । তাছাড়া ও নাইরোবিতে জন্মেছিল আর সোয়াহিলি আয়ার কাছে মানুষ । সোয়াহিলি ভাষায় বাবাকে বলে বাবা ,তুর্কিদের মতোই, কি আশ্চর্য! মা কে মামা আর ফুল কে উয়া । নন্দানো সেগুলো আগেই শিখেছিল । তারপর অবিশ্যি রিকি মারটিনের মারিয়ার ভাষা উন দোস ত্রেস ,ওটাই ওর প্রধান ভাষা হয়ে দাঁড়ায় । আর সেই কারণেই আমাকে প্রথম থেকেই ও সোপ্রানো বলেই ডাকে , মানে ওতে ওর উচ্চারণের সুবিধে হয় আর কি! সোপ্রানোর সঙ্গে গানের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে । তাই আমার ভালই লাগে । নইলে নিজের নামকে বিকৃত করতে কেই বা চায় !

যা বলছিলাম , ওই রাস্তাটা শেষ হয়েছে জঙ্গলের ধারে , সেখানে দূর থেকে নীল পাহাড় দেখা যায় । প্রচুর সাদা কাকাতুয়া গাছে গাছে বসে থাকে । সব চেয়ে বড় কথা ওখানে নন্দানোর অনেক প্রতিবেশী থাকে । তারা মাঠে বাস্কেট বল খেলে , ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরাঘুরি করে , লুকিয়ে প্রেমট্রেম করে , উদাসীন ভাবে বসে পদ্যটদ্যও লেখে কেউ কেউ । রেগে গেলে তক্কাতক্কি তো বটেই হাতাহাতিও হয় । মানুষকে বিশেষ পাত্তা দেয় না । মানুষরাই বরং একটু সমঝে চলে ওদের । সেবারে ওর বাড়িতে গেছিলাম । ঝিলের ধারে বসে লাঞ্চ করেছিলাম । আর হেমন্তের অরণ্যে প্রচুর ক্যাঙ্গারু দেখেছিলাম । নন্দানো বানিয়েছিল চিকেন পেরিপেরি । বেশ ঝালঝাল । নন্দর(Nando) রেসিপি । নন্দর টাইটেল ঘোষ কি না জানিনা তবে এদেশেও তার দোকান খুলেছে । কনট প্লেসে দিল্লিতে । তবে ওই পিরিপিরি ,বিটকেল ঝাল আফ্রিকান লংকার সস দিয়ে ঝলসানো চিকেন , রসুন মাখন টোস্ট আর ব্ল্যাক ফরেস্ট পেস্ট্রি আমরা সেদিন ব্লু মাউন্টেনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খেলুম । সব বাড়িতে বানানো । আর চারধারে ক্যাঙ্গারুরা খেলা করছিল । আমাদের খাওয়াও শেষ হোল আর বাপ মা বাচ্চার একটা ছোট্ট সুখি পরিবার রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলে চলে গেল ।



A Nandano Soprano endeavour to discover Bong link in the ruins of Pompeii ,

রোমের চারদিকে গিজগিজে বাঙালি । আরে বাঙাল , কাঠ বাঙাল । আমি আর নন্দানো দুজনেই বরিশালের। কিন্তু নন্দানো তো জন্মেছে আফ্রিকায় , বাংলার বদলে সোয়াহিলি ভাষায় ওর কথা বলা শুরু ।প্রথমে বলতে শিখেছিল মাজি । মা নয়, মাইজি নয়। মাজি মানে জল । তারপর স্প্যানিশ ভাষা , যেটা তে ও সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ । এই হালে একটু বাংলা বলতে পারে ।
আমরা এতো বাংলা শুনছি রোমে যে আর বলার নয় । রোম থেকে আড়াইঘন্টার পথ পম্পেই তে গিয়ে আমরা সেই লাভায় পুড়ে যাওয়া মৃত শহরে খানিকটা বেবাকের মতো ঘুরছিলাম ।নন্দানো বলল সোপ্রানো , দেখ দেখ চারদিকে কত কিছু লেখা । আগুনে পুড়ে গেছে সব, অক্ষর পোড়ে নি ।
অক্ষর ব্রহ্ম । চারদিকে লাটিন ভাষায় লেখা গ্রাফিতি । শ্লীল অশ্লীল , চুটকি , মজাদার কৌতুক , রাজনীতি কী নেই । কে বলবে মৃত নগরী । হাজার হাজার সাধারণমানুষের গলা কে ভিসুভিয়াসের গলন্ত লাভা গিলতে পারেনি । নন্দানো বলে, কলকাতার পাড়াগুলোর মতন না ? চারদিকে খালি লেখা আর লেখা ।
পম্পেই তে সর্বত্র গ্রাফিতি, । একটা গ্রাফিতির সামনে আমরা নীরবতা পালনের মতো দাঁড়িয়ে গেলাম।

“দেওয়াল , আমি আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে যে এই বোকা বুদ্ধুদের লেখার ভারে তুমি এখনো কেন ভেঙে পড়ছো না ?”



ছবিছাবা ঃ লেখক


উড়ো কথা


দেশের কথা খুব মনে পড়ছিল বলেই ওই অর্বাচীন পটুয়াকে ডেকেছিলেন। দরজার ওপর একটি আঙুর পাতা , শুধু এইটুকুই । সে ব‍্যাটা আঁকলো একটা তিন্তিড়ী পাতা। তাও ঠিক মতো না।
গঙ্গা রিডি দেখার খুব ইচ্ছে । মহামহিম সম্রাট বিপাশা নদীর পুবদিকে আর এলেন ই না। গঙ্গারিডির রাজাদের বিপুল প্রতাপ, সম্রাট কে বিচলিত করেছিল বৈকি! তাই তার এই অঞ্চল টি দেখার বড় সাধ।তিনি তাই সেলুকাসের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। যাত্রাপথে একটি মশা মাছি ও দুর্গন্ধ যুক্ত কর্দমাক্ত জনপদে কিঞ্চিত অসুস্থ হয়ে পড়েন । আমাশয় আর অম্বলে । একটি গৃহে বেশ কিছু দিন বাধ্য হয়ে কোনমতে বাস করেন। সেই সময় পত্র পেটিকায় গ্ৰিক বর্ণ মালায় তার নামের প্রথম অক্ষর টি অঙ্গার চূর্ণ আর বিল্ব ফলের আঠা মিশিয়ে লিখে দেন। সেই সময় তাঁর মায়ের হাতের আঙুর পাতায় মোড়া দোলমার কথাও তীব্র ভাবে মনে হত ।এরপর সুস্থ হয়ে যাত্রা পুনরায় শুরু করার সময় সেই যে দরজায় তালা ঝুলিয়ে উধাও হলেন মেগাস্থিনিস, আর প্রত্যাবর্তন করলেন না।



2
স্যান্দ্রোকোট্টাসের কী অদ্ভুত ভাইগ্য ! সবসময় চরম শত্রুর মেয়েকে বিয়ে করতে হয় ! নন্দ রাজার মেয়ে ধুরধরা । তাঁর প্রিয় পত্নী হয়ে গেলেন । সুখেই ছিলেন । কিন্তু ভূতে কিলোতে কতক্ষণ ? ইদিকে আলেকজান্দারের মারা যাবার পর তাঁর পুব দিকের রাজত্বের ভার নিলেন সেলুকাস । খ্রিস্টের জন্মের তিনশ বছর আগে । গ্রিক হিদেন সব মিলেজুলেই চলছিল । এর মধ্যে বয়সে প্রায় চল্লিশের স্যান্দ্রাকোটাস ঝিলাম নদীর ধারে হেলেনাকে দেখে ফেললেন । হেলেনা তখন একটা গ্রিক গান গাইছিল । ডো রে মি লা , ওরকম কিছু একটা হবে । স্যান্দ্রা তাঁর পায়রার পায়ে বেঁধে চিঠি পাঠাতে শুরু করলেন । হেলেনাও খুব একচোট প্রশ্রয় দিলেন । কিন্তু তার বাপ সেলুকাস চটে একেবারে গরম লাল মুসাকা হয়ে গেলেন । স্যান্দ্রা হিদেনের ছেলে ! লাগল যুদ্ধ । সেলুকাস হেরেও গেলেন । সন্ধি হিশেবে মেয়েকে সেই হিদেনের হাতেই তুলে দিলেন । সেই মেয়ে গ্রিক ছেড়ে সংস্কৃত শিখল , এদেশের নাচ শিখল । এর মধ্যে স্যান্দ্রা জৈন ধর্ম নিয়ে গৃহত্যাগ করলেন । সাঁচি স্তূপের ভিজে দুপুর সেই সব কথা ফিরিয়ে আনল । স্তূপ গঠনে কত গ্রিক ছাপ । ব্রাহ্মী খরোষ্ঠী লিপিতে স্তূপ বানানোর জন্য বিভিন্ন দাতাদের নাম লেখা । উর্দুর মত ডান দিক থেকে বাম দিকে পড়তে হয় । পেটমোটা যক্ষ মূর্তি , দেখলেই মনে হয় লাফিং বুদ্ধা । ভারতবর্ষ একটা উমদা খিচুড়ি । এটা নিয়ে ঝগড়া না করে উপভোগ
করাই বুদ্ধিমানের কাজ । তাই আলেকজান্দার বলেছিলেন , সত্য সেলুকাস। কি বিচিত্র এই দেশ !







3
সারনাথের মৃগদাবে তথাগত ধর্ম প্রচার করেন। প্রথম বার। হরিণের বন। ধর্ম প্রচারের সময় দুটি হরিণ তার দুপাশে শান্ত হয়ে বসেছিল। সঙ্ঘের চারপাশে তারা ঘুরঘুর করতো সবসময়। গোতমচন্দ্রমা স্নেহ করে তাদের নাম দিয়েছিলেন অভিলিখ আর অনিমিখ।

এই তথ্য অন‍্য কোথাও পাওয়া যায় না। রাঢ়দেশীয় ভিক্ষুনী সুপ্পন্না একটি ক্ষীণ কায় পুঁথি তে লিপিবদ্ধ করেছিল। মৃগদাব থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বারানসী তে এক ভাঙা মন্দিরে সেই পুঁথি আবিষ্কার করা গেলে ও মালদা যাবার পথে অনুরাধা নাম্নী এক গবেষকের ঝোলা থেকে সেটি লোপাট হয়েছে।



4
অদিতি ব্যাগের চেইন খুলে ঝপ করে দুটো কথার ফালি ভেতরে ঢুকিয়ে মুখটা সাঁ করে টেনে দিল।খুব ধারালো কথা।মিহিন ছুরি। ঝিরিঝিরি একমুঠো ফাজলামি আলগোছে ছোট পকেটে ছুঁড়ে মারে।পাতলা করে কাটা চারটে গোপন তেরছা কথা ভেতরের ছোট খোপে রাখা আছে।রাখা আছে বনের ছায়া র আচ্ছাদনের মতো তার ব্যাগের মধ্যে কিছু খুচরো অভিমান। এভাবে অদিতি ওর ব্যাগ টার মধ্যে খন্ড খন্ড টুকরো টুকরো ফালি ফালি মিহি মিহি নানান সাইজের ঝাল মিষ্টি তিতকুটে কষা ব্যঙ্গ শ্লেষ রাগ রসিকতা বিরক্তি দুষ্টুমি খুনসুটি ভরে ভরে রাখে। সারাদিন ধরে। এবার হলো কি, ব্যাগ টার ও তো ভার বইবার একটা লিমিট আছে। গেল ফেটে একদিন ফটাস করে।আর যত কথা র দঙ্গল জানালা দিয়ে বাথরুমের নালি দিয়ে বেরিয়ে পড়তে চাইছে। পর্দা বেয়ে নেমে এসে খাটের তলায় সেঁধিয়ে যাচ্ছে। বেগতিক দেখে অদিতি পড়িমরি করে একটা নতুন ব্যাগ কিনতে ছুটলো। কিন্তু যে সে ব্যাগের কম্মো তো এটা নয়। একমাত্র সুরুল শ্রীনিকেতনের ব্যাগ ই তার কথাগুলো কে আঁটসাঁট করে ধরে রাখতে পারে। তেমনি একটা ব্যাগ পাওয়া গেল । নতুন ব্যাগ। অনেক খোপ।কথাগুলো ও যে যার খোপে ঢুকে যাবে।
অদিতি মহসিনের গলায় তখন বাজছে" খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার ব্যাগের ভিতরে...."
মারবেন না। পষ্ট শুনলাম।

Monday, 11 March 2019

পূর্ণমিদং



নয়না চলে যাবে আজ ওর ফেয়ারওয়েল বিদায় সম্মিলনী আমাদের ব্যাচমেট।  আমার বাবারও বদলির চাকরি ছিল তখন বদলির অর্ডার এলে প্রায় সাত দিন বাড়িতে রাঁধা বাড়া হত না খাওয়াচ্ছে , খাওয়াচ্ছে আর গান শুনতে হতো , একরকম বাধ্যতামূলকভাবেই,  ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানিযে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা , এই লাইনটাতে ছোটোবেলায় একটু ধন্দে পড়ে যেতাম তখন তো মুভারস প্যাকারসের দল  ছিলোনা , গাদা গাদা প্যাকিং বাকসো , নারকেল দড়ি খড় দিয়ে জিনিশপত্র দশদিন আগে থেকেই বাঁধা শুরু হয়ে যেত মা মোড়াতে বসে তদারকি করতেন   রে রে করে মালপত্র লরিতে তোলা হত একা একা যাবার প্রশ্নই তো নেই !


রোদের জেদ  বাতাসের   তেজ বদলাচ্ছে দ্রুত তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যায় বাতাস শিরশিরে শেষ রাতে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে শহর জুড়ে দেওয়ালির রোশনাই উৎসব আলোর ঝলমল করছে সব আনাচ কানাচ শুকনো ফল বাদাম পেস্তা কিশমিশ কাজুর ছোটবড় টুকরি তিলমাখানো গজক , মোতিচুর লাড্ডু , বালুসাই   রাস্তা জোড়া জ্যাম এই সময় খুব জ্যাম  হয় একবার জিগ্যেস করায় জেনেছিলাম , গিফট বাঁ টনা হ্যাঁয় না ? ইসি লিয়ে সবাই উপহার দিতে ব্যস্ত আলো জ্বালাতে ব্যস্ত নতুন পর্দা নতুন জামা কানের ঝুমকো , নতুন ডিনার সেট হাত ভরা মেহেন্দি কুনালজি আর জামার  অর্ডার নেবে না বলেই দিয়েছে আমার আসা যাওয়ার পথে সেই ছোট্ট ভাঙাচোরা ঝুল বারান্দায় মানিপ্ল্যান্টের গা ঘেঁসে লাল নীল টুনি বাতি

আমরা যাচ্ছি নয়নার ফেয়ার ওয়েলে রাস্তা জ্যাম অল্প রাস্তা তাও কত সময় লেগে যাচ্ছে দ্যাখো !



আমারো বদলির চিঠি এসেছে ,জানেন হঠাৎ নিজেরই ভালো করে মালুম হল না , ওদিকে প্রচুর ফোন আসতে শুরু করেছে  কবে আসছো ? কবে আসছেন ? কবে আসছিস রে ? যাক , ভালোই হল , কী বল ? কতদিন বাইরে বাইরে   ভাবে কি থাকা যায় ?

এতো ভালোবাসা  কি আগরওয়াল মুভারস প্যাকারস বাক্সো বেঁধে নিয়ে যাবে? একটা বদলির শারীরিক মানসিক ধকল কত,জানেন  ? আবার আমার যে সবকিছু লাগবে জয়পুরি ঝুল্লুরি , রঙদার কিলিম , হুনার হাটের ঘন্টা , রামানন্দের ছবি , পেতলের ঘড়া , মীরাবাঈ আঁকা সাইড টেবিল  আমি কিচ্ছু টি ফেলে আসব না কেউ প্রজাপতি এঁকে দিয়েছিল , কেউ ক্যায়ফি আজমি দিয়েছিল , কেউ রাগ করেছিল , খুচরো মজা , দেদার হাসি , কেউ ফোন তোলেনি , কলাপাতায় ভাপা ইলিশের ওম আর পাটিসাপ্টার জবজবে স্বাদ অনুপম  সরোদে রাগ কিরোয়ানি বাজিয়ে শুনিয়েছিল ,  অদিতির সাথে বুধাদিত্যর সুরবাহার , শৈলীর মায়ের কোমল স্নেহ আর এন্তার গানের গল্প  ,কামানি অডিটোরিয়ামের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে  আমি আর গীতালি ঝালঝাল মটর খেয়েছিলাম নন্দনার সঙ্গে  ছাতিমগাছের তলা দিয়ে হাঁটা , গীতালি আর  আসিফের সঙ্গে শিকারগাহ তে শীতের সকালগুলো  আর চিকেন স্যান্ডউইচ ,  পান্ডারা রোডের পুজোয় ধুনুচি নাচ , ছাতিম ফুলের ঘন গন্ধ , সব আমি ছাঁদা বেঁধে নিয়ে যাবো
ঝড়ের মতো আমিও খেয়ে ফেল্লুম  ফেয়ার ওয়েল ডিনার, ফেয়ার ওয়েল লাঞ্চ  

এদিকে ফোন আসার শেষ নেই কবে গ্যাসের লাইন কাটবেন ?  আমাদের আবার পাইপের গ্যাস কি না   টেলিফোনের ?  বিজলির ? বাড়ি ছাড়ছেন কবে ? কবে? কবে? কবে? অফিসের কিছু ফারনিচার ছিল যে ফেরত দেবো কবে ? না কি নন্দনার বাড়িতে ঢুকিয়ে দেব একদিকে খালি হবে , অন্য দিকে ঠেসে ভরে যাবে

ম্যাডাম , আপনার এল পি সি , জিপিএফ,  ইনকামট্যাক্স ফাইল , ছুটির হিশেব  আমার কাছে আছে সব বুঝিয়ে দেব, কবে?
আমরা প্রায় এসে পড়েছি একটু দেরি তো হয়েইছে ভেতরে ঢুকছি আবার ফোন গীতা এবং লছমি ম্যাডামজি , থোড়া বাত কিজিয়ে না? আপনি ঘর ছাড়লে আমাদেরও সঙ্গে সঙ্গে  ছাড়তে হবে একটা ঘরের খবর আছে   মুম্বাই থেকে সবে এসেছে একটু কথা বলুন না দেওয়ালির আগে যদি কথাটা পাকা হয়ে যায় , তাহলে সাঁ বাবার ছবিটা ওই নতুন ঘরে ঢুকিয়ে দেবো ম্যাডামজি , এক সার্টিফিকেট ভি লিখ দিজিয়ে । একভি শিকায়ত 
 এখন কথা বলতে পারবোনা, গীতা  বাড়ি  ফিরিতারপর ফোন কেটে দি



বাতাস শিরশিরে , ন্যাতানো রোদ্দুর খসখস করে দু একটা হলুদ পাতা খসে পড়লো সবাই দাঁড়িয়ে ছিল অনেক লোক চুপচাপ কোন শব্দ ছিলোনা গাছের তলায় একটা বেদিতে নয়না শুয়ে আছে ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না একটা সুতোর নকশা তোলা চাদর ঢাকা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম , জানিনা কেউ এসে আমার হাতে চাপ দিলো , কেউ কাঁধে হাত রাখলো বোধহয়

মুভারস প্যাকারস আমার সব মালপত্র নিয়ে কলকাতার বাড়ি ভরিয়ে ফেলবে গীতাজির সাঁ ইবাবা , ঘিয়ের প্রদীপ , ফ্যামিলি গ্রুপ ছবি , তোবড়ানো টি ভি  নতুন খুপরি ঘরে ঢুকে যাবে ব্যাঙ্কের পাশবই বাড়ির চাবি  অল্প কিছু গয়না আমি হাত ব্যাগেই রাখবো ক্যামেরা আর হার্ড ডিস্ক টাও
আমি এক শহর থেকে আরেক শহরে , গীতা লছমি এক খুপরি থেকে আরেক খুপরি ঘরে আর নয়না এক জগত ছেড়ে আরেক  ভিন জগতে একে একে চলে যাচ্ছে ওর সঙ্গে  অবিশ্যি কিছু নিয়ে যায় নি কিচ্ছু না চলে গেল, একা ।টিপি টিপি আলো আর শিরশিরে হাওয়া তাকিয়ে রইলো বেবাক  

গাড়িতে বসার পরে একটা মেসেজ এলো দেখলাম , পাঠিয়েছে আমাদের দরজি , কুনালজি   লিখেছে ম্যাডামজি , আপকা সপনা রেডি হ্যাঁয় , লে জাইয়েগা বুঝলাম মোবাইল ফোনের অটো কারেক্ট কপড়া কে সপনা টাইপ করে দিয়েছে ইশ ….