Sunday, 16 July 2017

এফেসাসের মেয়েরা

কটু আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে । এই পাথুরে ধ্বংস স্তূপে পায়ে পায়ে যত ধুলো জড়ো হয়েছিল সব ধুয়ে গেছে । ধুয়ে মুছে যায় নি কেবল একটি পায়ের ছাপ । মসৃণ , সামান্য নিষ্প্রভ মর্মর পাথরে একটি বড় বাঁ পায়ের ছাপ । একটি মেয়ের মুখ একটি মুদ্রা রাখার গর্ত আর উল্টো দিকের পথনির্দেশ । এফেসাসে জড়ো হয়ে থাকা ভাঙা চোরা পাথরের মধ্যে পৃথিবীর আদিমতম জীবিকার জন্য সম্ভবত প্রাচীনতম বিজ্ঞাপন ।  বড় পায়ের ছাপ মানে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই এসো , ওই যে গর্ত তার মধ্যে যত পারো মুদ্রা ঢালো , তাহলে পাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত মেয়েটিকে । যদি এসব না থাকে উল্টোপথে হাঁটো , সোজা চলে যাও সেলসাস লাইব্রেরিতে । যদি বয়স কম হয় যদি পয়সা না থাকে সেলসাস লাইব্রেরির জ্ঞান ভাণ্ডার তোমার  উপযুক্ত জায়গা । অন্তত নিজের মেধাকে শানিত করতে পারবে । 
এটি  ছিল একটি বন্দর শহর । তাই  ভিনদেশি বনিক নাবিকদের  অবাধ আনাগোনা ।




 মারিয়াম আনা বা মা মেরির বাড়ি দেখে এফেসাসে ঢুকেছি । একটা গোটা শহরের ধ্বংস স্তূপ । ইজিয়ন সমুদ্রের ধারে একটা প্রাচীন বন্দর শহর । খুব বড় নয় কিন্তু স্বয়ং সম্পূর্ণ । সব কিছু ছিল  এখনকার   এই ছোট প্রত্ন শহরে।    পেল্লাই সব মন্দির ,বড় বড় অ্যাম্পি থিয়েটার , গোসল খানা , ফোয়ারা , পাবলিক টয়লেট ,লাইব্রেরি , চওড়া রাস্তা , মিউনিসিপ্যালিটি ,দেড় হাজার বছরের পুরোনো  মোজেইকের  ফুটপাথ, বাতি স্তম্ভ যেখানে এককালে অলিভ তেলের বাতি জ্বলত,  মাইল ফলক , জিমনাসিয়াম ,  মাটির নিচের পাইপ , ভগ্ন খিলানে অপরূপ নক্সা , রাস্তার দু পাশে খুপরি খুপরি ঘর মানে সারি সারি  দোকান , মৃতদেহ রাখার কফিন ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ  সব  চিহ্ন ধরে রেখেছে সেই  “ ... শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়” ।
অ্যাম্পি থিয়েটারের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে খালি গলায় গান গাইছেন জাপান বা কোরিয়ার কোন এক পর্যটক । গমগম করে কানে বাজছে তার ভিনদেশি গান । বিস্ময়কর !  










Temple


Gate


Public Latrin

Celsus Library (1st Century AD)/ Underground pipes


 Mosaic Footpath 1st century AD





coffins


milestones 

বিশাল মন্দির স্তম্ভ  । দেবী কই ? কোথাও তাকে দেখতে পেলাম না ।  শূন্য মন্দিরে দেবী নেই ! এফেসাসের নির্যাস কিন্তু মেয়েদের হাতে ।
এশিয়া মাইনরের আনাতোলিয়ায় যুদ্ধ করত আমাজনরা । এফেসাসের প্রতিষ্ঠার মূলেও রয়েছে এই নারী যোদ্ধা দের দুর্দমনীয় বীরত্ব । মাজোস বা স্তন (ডান দিকের)  কেটে ফেলত তারা যাতে ভালোভাবে তির ধনুক চালানো যায় । স্তন হীন তাই আ মাজন । কন্যা সন্তানের জন্ম হলে তাকে নিয়ে যুদ্ধে যেত । ছেলের জন্ম দিলে বাপের কাছে ফেলে রাখত ।  খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকে গড়ে ওঠা এই ভরভরন্ত নগরীর টুটাফুটা মোহে আমি এতোটাই ভেবলিয়ে গেছিলাম  যে আমাজনদের প্রত্ন স্মারক  খুঁজে পেলুম না । একবারটি চোখে দেখার বড় ইচ্ছে ছিল ।
কিন্তু সেই আশ্চর্য দেবী কই ? আরটেমিস ? আনাতোলিয়ার আদিম কাল্টের মাতৃ দেবী কাইবেলে   মিশে গেলেন গ্রিক আরটেমিসের সঙ্গে । পুরোনো এবং নতুন আগ্রাসী সভ্যতার মেলবন্ধন ! এমন নজির আমাদের দেশেও আছে প্রচুর ।
 আরটেমিসের সাদৃশ্য পাওয়ায়া যাবে রোমান ডায়নার মধ্যে । উর্বরতা ও প্রাণিজগতের দেবী । প্রবল দাপুটে  ছিলেন আরটেমিস ।অন্তত এশিয়া মাইনরের গ্রিকদের কাছে । দৈহিক পবিত্রতা নিয়ে ভয়ানক ছুঁৎ মার্গ ছিল তাঁর । তাঁর সারা দেহ জুড়ে ডিম্বাকৃতি নকশাগুলো কি ?  মনে হতে পারে বক্ষদেশ , অনেকে বলেন ডিম্বাণু অথবা অণ্ডকোষ । জানি না কি ! তবে পাগান সভ্যতার রহস্যময়তা ধরা পড়ে । মানুষের জন্মই তখন বিরাট রহস্যের খনি । কিন্তু দেবী কোথায় ?

এই পাথরের মধ্যেই বসে আছেন জয়ের দেবী নাইকে ।  বেশ প্রসন্নভাবেই বসে আছেন এখনো । এখনকার নামকরা স্পোর্টস ব্র্যান্ড । সেই কোনকালে নাইকা নাইকা বলে চিৎকার করে বনিকের দল বিদ্রোহ করেছিল সম্রাট কনটান্টাইনের বিরুদ্ধে ।





এফেসাস এক অসাধারণ গ্রিক রোমান শহর ছিল , ভগ্নাবশেষ তার প্রমাণ । খ্রিস্ট ধর্মের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি পুজোয় প্রবল বাধা আসে । এই শহরের   অনেক সুন্দর কারুকাজ নাকি নতুন রোমানদের নতুন রাজধানী  কন্সটান্টাইন (ইস্তানবুল)  সাজাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । বহিরাগত শাসক , নতুন ধর্মের উত্থান , সমুদ্রের সরে যাওয়া , বন্দরের ব্যাবসায় ভাঁটা সব মিলিয়ে  এফেসাস ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে থাকে ।
এক গেট দিয়ে ঢুকে পথ ঘুরে ঘুরে আরেক গেট দিয়ে বের হওয়া । এই ভাবেই পুরো শহর টা  দেখা হয়ে যাবে ।
জায়গায় জায়গায় রেস্টোরেশনের কাজ চলছে । ছোট ছোট অন্ধকার কুঠরিতে গ্রিলের গেটে তালা । ছেনি বাটালির মতো যন্ত্রপাতি ডাঁই করে রাখা আছে , সবই সেকালে ব্যাবহার হত । ওমা , দেখি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে  তাকিয়ে আছে সেই দেবী , সারা গায়ে মুন্ডমালার মতো ডিম্বাকৃতি সাজ !  বলছে , আমাকে বের করো , সবাই দেখুক আমাকে । জানুক আমার মহিমা ! সেকালে দুনিয়া কাঁপাতাম আমি ! আমার মন্দির ছিল সেকালের সেরা ।





সেই অদ্ভুত আলো আঁধারের পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে আছে তালা বন্ধ আরটেমিস । কেউ ভিড় করছে না । কেউ দেখছে না । কোনও গাইড ,ট্যুরিস্ট দের দেখাতে নিয়ে আসছে না । কোনো রকমে হাত ঢুকিয়ে ছবি তুললাম।  অবহেলায় অগোচরে পড়ে রয়েছেন সেই প্রবল শক্তিময়ী নারী ,  এক অসাধারণ ঐতিহাসিক শিল্প স্মারক ।  ঠিক যেভাবে কোন অবহেলায় চাপা পড়ে যাচ্ছে তামাম দুনিয়ার মেয়েরা , ঠিক যেভাবে মেয়েদের  সমস্যা তুলে কথা বলতে গিয়ে  অপ্রিয় অবাঞ্ছিত উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে তকমা এঁটে দেওয়া হয় এক অধ্যাপক কে, আমার চোখের সামনে ।


আমি প্রেতিনীর মতো খুলে দিচ্ছি অপ্রিয় সকাল
তোমরা তো ভালো পারো প্রিয়মিথ্যা বলে পাশ ফেরা...



কবিতা যশোধরা রায়চৌধুরী
ছবি লেখক  



Friday, 23 June 2017

কমলালেবুর রস ও স্বপ্নমায়া

কমলা লেবুর রস
“ চালো , জালদি চালো “
আন্তালিয়ার  সকাল । কী রোদ্দুর ! পুদিনা শশা গাজর লেবু চাকা চাকা করে জাগ ভর্তি জলে মেশানো । টাটকা কমলা লেবুর রস । হঠাৎ শুনি এক সহাস্য বদন কানের কাছে এসে বলছে চালো, জালদি ।
এর নাম হামদি ।  আন্তালিয়ায়   আমাদের এখানে ওখানে নিয়ে যাবে । একগাল হেসে বলল ইন্ডিয়া পাকিস্তানের ট্যুরিস্টরা নিজেদের মধ্যে যখন কথা  বলে তখনই এই কথাটা  খুব বলে , চালো জালদি চালো ,  আমি  তাই শিখে নিয়েছি ।
মনেমনে ভাবলাম শিখেই শুধু নাও নি , মোক্ষম লাগিয়েছও বটে ।
হামদি নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছে ।
আর কারা কারা যাবে ?
ও, দুটো ছেলে , ওদের তুলে নেব , চলুন ।
আন্তালিয়া একেবারে ঝলমলে উদ্দাম সুন্দরী । ভীষণ । রোমান সেলজুক অটোমান টার্ক দের ফেলে যাওয়া অতীতের ওপর সে বড় হয়েছে । তার নীল শিফনের অ্যাসিমেট্রিকাল পোশাকে সমুদ্রের ঢেউ , তার সোনালি চুলে সমুদের নুন , গলায় শঙ্খ মালা , চোখের নীল মাসকারায় কুচি কুচি অভ্র , তার হাতে ধরা মস্ত বড় একটা নীল ছাতা  । ছাতার ওপর রোদ্দুরের পায়রা উড়ছে ।  হাতে কাঁচের গেলাসে টলটলে তাজা কমলা লেবুর রস ।  দামাল মেয়ে ।






এমন রূপসী শহরের ভেতর দিয়ে চলেছি । মনটাও বেশ ফুরফুর করছে । প্রকৃতি পরিবেশের প্রভাব । সুদৃশ্য গলির মধ্যে খানিক খুঁজে টুজে হামদি ঘোষণা করল , ওই দুটো ছেলে মাতাল হয়ে বেহুঁশ হয়ে আছে । কাজেই ওরা আসবে না । হে হে হে , তোমাদের ভালোই হল।  কি বল ?
তাতো ভালোই হল । আমরা সমুদ্রের তটে ,বিভিন্ন  ঝর্নার ধারে এলিয়ে ঝেলিয়ে ঘুরতে লাগলাম । ইন্ডিয়া বা  ইন্দিস্তান থেকে  আসছি শুনলে সব্বাই খুব আন্তরিক ভাবে প্রায় বুকেই টেনে নেয় । ব্রাদার সিস্টার সব আমরা । হামদি যখন এ গলি সে গলি ঘুরছিল দেখলাম বেশ পুরোনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি চারদিকে । হামদি বলে ওগুলো সব অতোমান হাউস । এরকম অটোমান বাড়ি প্রায় হাজার তিনেক । বাড়িগুলো এখন হোটেল , ক্যাফে , দোকান এইসব করে ব্যাবহার করা হচ্ছে ।



অটোমান সাম্রাজ্যের কফিনে  শেষ পেরেকটা ঠুকে দেন মুস্তাফা কেমাল আতাতুরক । খলিফাতন্ত্রের অবসানে আধুনিক তুরস্কের জন্ম তার  হাতে । মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়েও সে দেশ সেক্যুলার হল পর্দা সরে গেল মেয়েরা পেল গনতান্ত্রিক অধিকার । আতাতুরক না থাকলে এই দীপ্ত , বহমান ও প্রাণবন্ত  তুরস্ককে হয়তো আমরা পেতাম না ।
হামদি খুব ভালোরকম আতাতুরক সমর্থক । উনি খুব মডার্ন , খুব  প্রগতিশীল , আজকে আমরা তো এখানে এসে দাঁড়িয়েছি ওনার জন্যই । আই হ্যাভ  গ্রেত  রেস্পেকত । গ্রেত রেস্পেকত

তুরস্কের ঝাঁকি দর্শন করে একটা বেশ লাভ হল । আনাতোলিয়া থেকে মেডিটেরানিয়ান , মেডিটেরা নিয়ান থেকে ইজিয়ান , ইজিয়ান  থেকে  মারমারা বোসফরাস কৃষ্ণ সাগর । মানুষের সামাজিক ধর্মীয় অবস্থান , তাদের চিন্তা ভাবনার সূত্র কেমন বদলিয়ে বদলিয়ে যাচ্ছিল লক্ষ করছিলাম  ।

কাপাদোসিয়া তো ভীষণই আধুনিক চিন্তা ভাবনার দিক থেকে ।  তুরস্কে খ্রিস্ট ধর্মের আদিএবং শক্তিশালী  কেন্দ্র । আমাদের ট্যুর গাইড মেসুট ( মাসুদ) এরকানকে ধর্ম কর্ম নিয়ে সাবধানী প্রশ্ন করাতেই উত্তর এলো, আমি কিন্তু মোটেই কনজারভেটিভ নই । আমাকে একজন টিপিক্যাল টার্কিশ ভেবে বসবেন না যেননা, আমি রমজান করি না ।
হ্যাঁ আমি আতাতুরকে নিয়ে গর্বিত । হ্যাঁ , আমি নাজিম হিকমত খুব পছন্দ করি । না, অনুবাদের থেকে মূল টার্কিশ কবিতাগুলো অনেক বেশি ভালো ।
এখানে মেয়েদের  হিজাব তুলনামূলক ভাবে অনেক কম দেখলাম । কোনিয়াতে আবার পোশাকে রক্ষণশীলতা ভালই চোখে পড়লো । ধরা পড়লো আহমেট , আমাদের গাইডের কথাতেও । সে আধুনিকও হতে চায় আবার রক্ষণশীলতাও পুরোদমে  চায় । গাছেরও খাবো তলারও কুড়ুবো ।  আর এবার আন্তালিয়ায় তো সবই দখিন দুয়ার খোলা ।
সমুদ্রের নীলে গাং চিলের খেলা , নরনারীর সুখ দুঃখের বিলাস , সাদা চামড়া ট্যান হচ্ছে , মাতোয়ারা শ্যাম্পেন ওয়াইন । নীল জলের সাদা ফেনার ভেতর থেকে মৎস্য কন্যার মত অপ্সরার মতো সুন্দরী মেয়েরা , হাতে শরবত পাশে কবিতার বই ,
ঝর্নার উদ্দাম খেলা, রঙিন কাকাতুয়া পিঠে নিয়ে যুবকের পথ চলা, বাচ্চা কাচ্চার হুতোপাটি , দেদার সেলফি আর সেলফি স্টিক ,জীবনের সমুদ্র সফেনের কোলাজ । আমাদের হাতে টাটকা কমলালেবুর রস ।







 হামদি বলে দেয়  ঝর্নার ধারে ক্যাফেতে খাওয়া সেরে নিন এইবেলা  । রংচঙে এথনিক সোফার ঢাকা , পাশে রাখা হুঁকো বা শিশা । তুরস্কের  নারী পুরুষ সবাই বেশ ভালো ধূম্রপায়ী ।   ধোঁয়া ছাড়তে দু পক্ষই সমান ওস্তাদ । চালু রেস্তোরাঁয় চটপট কাজ হয় । পাশে বসে অর্ডার মতো নানান কিসিমের  রুটি বেলছে একজন মহিলা । তারপর তাওয়া চড়বে । অলিভওয়েল ব্রাশ করা হবে । এরপর   পড়তে থাকবে  কিমা কুচি , পুদিনা , জাতার , সুমাক ,দিল , পার্সলে , রোজমারির ছিটে , টমাটো অলিভ কুভি , দেদার চিজ ,অর্ডার মতো পরোটা নিপুন হাতে বেলা হচ্ছে । আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই ভিন দেশি মহিলার রুটি বেলা দেখছি । হঠাত শুনি হামদি আমার কানের কাছে এসে বলছে ,ওকে ডাকো আর বলো  বাবান্নে , বাবান্নে ।
বলা নেই কওয়া নেই এইসব ডেকে মারধোর খাই আর কি ! বললাম আগে বল কথাটার মানে কি ? মানে হল গিয়ে ঠাকুমা ।
বাবা মানে বাবা আর আনা মানে মা । বাবার মা ।
দেখো ঠাকুমা বলে ডাকলে কিরকম খেপে যাবে ।
আমি বললাম , তুমি ডাকো গে যাও ।
হামদি সত্যি সত্যি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকল  ঠাকুমা ঠাকুমা  আর ওই মহিলাও কপট রাগ দেখিয়ে কাঠের খুন্তি তুলে মারার ভঙ্গি করতে লাগলো । ভারি  রগড় । আশ্চর্য কথা , বেশ খানিকটা আসার পরেও হামদি আবার গলা তুলে রীতিমত চিৎকার করে ঠাকুমা... বলে গাড়িতে উঠে পড়লো ।

তুরস্কের এইগুলো ভারি মজার । এশিয়া ইওরোপের মেলামেলিতে ইওরোপীয় ঠাটবাটের সঙ্গে ঘোরতর দেশজ ব্যাপারগুলো মিলে মিশে নৌটঙ্কি একেবারে জোরদার । লোকজন যথেষ্টই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলে , আবেগের পাত্র একেবারে উথলে উঠছে । টিপিক্যাল পশ্চিম ইওরোপীয় হলে কল্পনাই করা যেত না ।

হামদির সঙ্গে  ঘুরে বেড়ানোর সময় দেখলাম বিশাল বিশাল ফার্ম । প্রচুর চাষবাস হছে । ফল সবজি একেবারে উপচে পড়ছে । সবই খুব আধুনিক ধাঁচে । হামদি বলল কমলা লেবু বেদানা কলা বেগুন  এখানে খুব বেশি হয় । এগ্রিকালচার এখানে প্রধান জীবিকা । হাতের কাছে টুকটুকে কমলালেবুর থোলো , নীল সমুদ্র আর নীল রোদালো আকাশ ,মাতাল হতে আর কিছু বাকি আছে কি?
পরেরদিন এয়ারপোর্টে যাবার জন্য ট্যাক্সি হাজির । আমরা একঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যাবো ইজমির । সেখানে দেখব এফেসাস ।
ড্রাইভার মোটে ইংরেজি জানে না । কিন্তু গল্পে আদরে সোহাগে একেবারে ফেটে পড়তে বাকি আছে ।  সে তার ভাষায় কথা বলছে অনর্গল , আমরাও বকে চলেছি নন স্টপ । সে যা বোঝাতে চাইলো তার সার মর্ম হল আন্তালিয়া স্বর্গের মতন জায়গা । কোনো কিছুর অভাব নেই । ইস্তানবুল ! বাপরে কি ভিড় ! আচ্ছা তোমারা তো ইন্দিস্তানি ।
হঠাৎ প্রচন্ড চেঁচিয়ে কোনো একটা কিছুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো আতাতুরক আতাতুরক ।
আমরা চোখ তুলে দেখলাম আতাতুরকের একটা বিশাল বড় ছবি ঝুলছে ।
সে উত্তেজিত হয়ে হাত পা ছুঁড়ে বলতে লাগল জান, জান । অর্থাৎ আতাতুরক তার হৃদয়ে । আমরাও প্রবলভাবে বোঝাতে চাইলাম আমরাও আতাতুরক কে ভালবাসি , আমাদের শহরে আতাতুরকের নামে রাস্তাও আছে ।
বোঝানোর কৌশল টা যদিও খুব সহজ ছিলনা , প্রতি মুহূর্তেই  অ্যাকসিডেন্টের চান্স ছিল শতকরা আশিভাগ । কিন্তু লোকটা এত্ত খুশি হল যে তার প্রার্থনার তসবি টা পর্যন্ত আমাদের দিয়ে দিল । আর এই প্রথম তার মুখ দিয়ে একটা মোক্ষম ইংরেজি বাক্য বেরুলো আই লাভ আতাতুরক । 




স্বপ্ন মায়া


কাশ , তুরস্কের ফিরোজা উপকূলে একটা ছোট্ট বন্দর । তুর্কি ভাষায় কাশ  মানে  ভুরু । মাত্র ২০ মিনিটের ফেরি নিয়ে যাবে আরেকটা অন্য  দেশে ,ছোট্ট একটা অন্য  দ্বীপে , তার নাম মেইস । গ্রিসের দ্বীপ । গ্রিক ভাষায় যার মানে চোখ । ভুরুর নিচে দীঘল নীল চোখ । ভুরু আর চোখ ,  দুই দেশের দুটো দ্বীপের নাম মাত্র ২০ মিনিটের ফেরি ।  কি কাছাকাছি, পাশাপাশি ,তাই না ? আমাদের সঙ্গে গ্রিসের কতো মিল ! বাকলাভা কারা  বানিয়েছিল ? তুর্কি না গ্রিক ? তুমি কি এটা নিয়ে ফালতু তর্ক করবে না আরেক টুকরো বাকলাভা খাবে বলে প্লেট এগিয়ে দেবে , বল?
আর মুসাকা ? খাওয়া দাওয়া, গান বাজনা সবেতেই তো মিল!  নীল রঙা ইভিল আই ওরাও ব্যাবহার করে, আমরাও । রাকি আওজু ? সেই মৌরি গন্ধী কড়া মদ ? গ্রিসে যা আরো হালকা করে খায় ? আমার কি মনে হয় জানো , যত দিন ধরে আমরা ঝগড়া করছি তার অনেক অনেক বেশি সময় আমরা অতীতে পাশাপাশি একসাথে ছিলাম ।
ওপরের কথাগুলো বলছিল মেসুট এরকান । আমাদের গাইড । ইজিয়ন সমুদ্র থেকে ঠান্ডা হাওয়া বুনো ল্যাভেন্ডারের গন্ধ মেখে ভেসে আসছিল যেন । এতো চেনা এই কথাগুলো ।ভেতরটা কেমন শিরশিরিয়ে উঠলো । ছোটবেলায় বাবা শিখিয়েছিল সুভাষ মুখুজ্জের কবিতা  “ আমরা যেন বাংলাদেশের চোখের দুটি তারা / মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে থাকুক গে পাহারা/দুয়োরে খিল টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানলা/ এপারে যে বাংলাদেশ ,ওপারে সেই বাংলা”।  আজ চারদিকে সব উত্তাল । দেশ বিদেশ সর্বত্র । জাতি ধর্মের ঝগড়া । কতদিন ধরে চলছে গ্রিস তুরস্ক মন কষাকষি  ।  কতো মৃত্যু কতো রক্তপাত ! পপুলেশন এক্সচেঞ্জের সময় গ্রিকরা  তুরস্কের ভিটে মাটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল গ্রিসে ।

 কোথাও দেওয়াল নেই,কাঁটাতার নেই,পর্দা নেই ,সীমানা নেই
এমন একটা বাড়ি একটা দেশের কথা ভাবত সে
তার চারদিকে ঝুঁকে পড়ত বিষণ্ণ অন্ধকার, মানুষের তৈরি
সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একরাশ জোনাকি তুলে এনে
ছুঁড়ে দিত চুমকির মতো, ঢুকে পড়ত তারা
মানুষ জনের ঘর সংসারে চিন্তা ভাবনায়...(বাসুদেব দেব)
  
ইজিয়নের সেই নীলচে হাওয়ায়  বুনো ল্যাভেন্ডারের  গন্ধের ভেতরে মেসুটের চারদিকে তার স্বপ্নের জোনাকিরা জ্বলে উঠল দেখতে পেলাম । আমরা চলেছি মেরিয়াম আনা , মেরিয়ামানা  ।ইজিয়নের ধারে মেরিয়ামানা । ইজিয়ানের ধারে এফেসাস ।প্রাচীন গ্রিক রোমান বন্দর শহরের ধ্বংসাবশেষ।   জেরুসালেম থেকে এফেসাস কদ্দূর ? প্রায় ২০০০ কিলোমিটার এখনকার হিশেবে ।
ম্যাপল গাছের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা  পাথুরে রাস্তা ।  উঁচুনিচু । কিছু আয়েসি পর্যটক ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে বেড়াচ্ছেন । আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে , টিপিটিপি বারিষ । ম্যাপল গাছের পাতা থেকে বিন্দু বিন্দু ঝরে জল ,শ্যামল বনান্তভূমি করে ছলছল । এসেছিলে তবু আসো নাই ,সমুখের পথ দিয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে



একটা ছোট্ট ঘরে সন্ন্যাসিনী শুয়ে আছেন । প্রায় চলতে ফিরতে পারেন না । দুর্বল ক্ষীণ শরীর । আজীবন রুগ্ন । বিছানার সঙ্গে লেপ্টে থাকেন অ্যানা কাথেরিনা এমেরিচ । ঘোর লাগে  তার । আজ থেকে নয় ,অনেক ছোটবেলা থেকে ঘোর লাগে । সেই ঘোরের মধ্যে প্রভু যিশু আসেন তার কাছে । তাঁর দেশ জার্মানির বাইরে তিনি কোথাও কোনো দিন যান নি।
উপরন্তু তার শরীরে ছিল বিশেষ কিছু চিহ্ন । stigmata ..
ঠিক যেন কেউ পেরেক পুঁতেছে ,সেই রকম দাগ । ফুলে ওঠে , রক্তও পড়ে । ডাক্তার দেখে যায়আবার কিছুদিন পরে একই রকম ব্যথা , যন্ত্রণা , রক্ত পড়া । অ্যানা স্বপ্নের মধ্যে , ঘোরের মধ্যে একটা পাথুরে বাড়ি দেখতে পান । চারকোনা পাথুরে বাড়ি , পাহাড়ের ওপর । সরু পাথুরে রাস্তা । ঝোপঝাড় । সব তিনি দেখতে পান ।এলাকাটা কি রকম তা তিনি স্পষ্ট দেখতে পান ।  দেখতে পান মাতা মেরি যিশু মারা যাবার পর সেন্ট জনের সঙ্গে এই বাড়িতে চলে এসেছেন  । কিন্তু বাড়িটা কোথায় , জায়গাটা কোথায় পুরোটাই ধোঁয়াটে থেকে গেলো যে  । ১৮২৪ সালে অ্যানা মারা যান ।  





জেরুসালেমে যিশু ক্রুশবিদ্ধ হলেন খুব অশান্ত সময়ে । ইহুদি পুরোহিত তন্ত্র,  রোমান শাসকদের ঈর্ষা ষড়যন্ত্র । অন্ধকার বিভীষিকা । ঠিক সেই সময়ে এফেসাসের পরিস্থিতি ছিল একেবারে আলাদা । এফেসাস তখন খ্রিস্টানদের শক্ত ঘাঁটি । বাইজানটাইন আনাতোলিয়া যিশুর জীবদ্দশায় তাঁর ধর্মকে গ্রহণ করেছিল ।  জেরুসালেম যখন ধর্মীয় রেষারেষিতে অস্থির সেই সময় কতো দূরে এশিয়া মাইনরের এই অঞ্চল আঁচল পেতে যিশুকে গ্রহণ করেছিল । নতুন খ্রিস্টানরা জেরুসালেমে মোটেও স্বস্তিতে ছিলো না , কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে ছেলের মৃত্যুর পর মা মেরি কাউকে সঙ্গে নিয়ে এফেসাসের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছিলেন । যিশু , জনের হাতে মায়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছিলেন । তাই জনের সঙ্গেই মা মেরি এখানে চলে আসেন ।
এরপর ঝঞ্ঝার মতো আছড়ে পড়ে ক্রুসেড । আনাতোলিয়া চলে যায় মুসলমান অটোমান টার্ক দের অধীনে ।  কিন্তু এই এফেসাস আর তার আশেপাশের ভিটেতে  খ্রিস্টানদের প্রভাব থেকেই  যায় ।    বহু বছর পরে ১৮৯১ সনে অ্যানার স্বপ্নকথা শোনার পর  এক ধর্মযাজক ভয়ানক কৌতূহলী হয়ে পড়েন । জায়গাটা এমনিতেই পাথুরে, পাহাড়ে ।  আন্দাজ করে খুঁজতে খুঁজতে তিনি পাহাড়ের মাথায় একটা চারকোনা পাথুরে বাড়ির সন্ধান পেলেন । সেখানে প্রাচীনপন্থী উপাসনা চলছিল কয়েকশ বছর ধরে । তারপর হৈ চৈ , হট্টগোল , বিশ্বাস অবিশ্বাসের গলিঘুঁজি পেরিয়ে ভ্যাটিকান রোমের মহামান্য  মোহর এসে পড়লো, যে ঘটনাটি সত্য । তারপর ষাটের দশকের পর থেকেই মেরিয়ামানা সারা পৃথিবীর খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমি । তবে এখানে খ্রিস্টান এবং ইসলাম দুই ধর্মের মানুষরাই আসেন । বাইবেলের থেকে নাকি কোরআনে মা মেরির বেশি উল্লেখ আছে । মেরিয়াম । আরবিতে মূর্তির নিচে কিছু লেখাও আছে , ঠাহর হল
গাছপালা ঢাকা ভিজে ঘাসে ঘাসে সবুজ পথ পাকদণ্ডী বেয়ে বেয়ে উঠে গেছে । বেশ প্রশস্ত জায়গা । প্রচুর গাছপালা । গাছের নিচে দাঁড়ালে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগছে না । সেই বর্ষণ স্নিগধ প্রাক মধ্যাহ্নে কোরেসস পাহাড়ের ওপর  একটা সাদাসিধে চারকোনা এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দু কামরার ছোট্ট সহজ সরল  ঘর আমাদের বিহ্বল করে রাখলো বেশ কিছুক্ষণ । ভেতরে ছবি তোলা বারণ । বড় শান্ত পরিবেশ । সাদা লেসের পোশাক পরে এক সন্ন্যাসিনী মালা জপছেন । মুখে একটা আলগা হাসি প্রথম ঘরটি মাঝারি, পরের ঘরটি আরেকটু ছোট , মনে হয় রান্নাঘর । জানলা গুলো বেশ উঁচুতে ।  ব্যাস এইটুকুনই । 







আরকিওলজিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে বাড়িটা খ্রিস্টিয় প্রথম 
শতকে তৈরি কাজেই প্রমাণের দিক থেকেও তথ্য টি জুতসই । অনেকে মোমবাতি জ্বালাচ্ছে, বোতলে জল ভরে নিচ্ছেঝর্না থেকে বয়ে আসা এই জল নাকি খুব জোরালো । অসুখ বিসুখ সেরে যায় । বাইরে সুন্দর বসার ব্যাবস্থা । খোলা আকাশের নিচে বসে বসে প্রার্থনা করা যায় ।
উইশিং ওয়ালে লোকজনেরা মনের কথা টিসু পেপারে লিখে বেঁধে দিচ্ছে , যেমন আমাদের দেশে মানত করে, সুতো বাঁধে , ঢিল বাঁধে । এই কাগজে পাতলা কাপড়ে মনের কথা লেখার ব্যাপারটাকে নাকি শামান প্রথা বলে । তুর্ক রা ইসলাম হবার আগে নাকি শামান ছিল । এ ব্যাপারে বিশদ জানা নেই অবিশ্যি । খ্রিস্টান ,ইহুদি ,ইসলাম কতো নামের বাইরের বাহারি  আচ্ছাদন পরে মানুষ এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রার্থনা করছে  । আর আমি ভাবছি চুয়ান্ন বছর বয়সী এক মহিলার কথা । কতটা পথ পাড়ি দিয়ে কতো ধকল সয়ে  ,মাটি থেকে ১২০০ ফুট উঁচু এই জঙ্গলে নিভৃতচারী হয়ে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ কয়েকটা বছর ।
 কেমন আছো মা ?  ইজিয়ন সাগর ধুয়ে দিচ্ছে তোমার পা । ম্যাপল  পাতা ছড়িয়ে আছে মাথার ওপর ।কেমন আছো  মোমবাতির আলোয় অজস্র ফুলে ফুলে ঢাকা এই নির্জন আবাসে?

আলতো মোমবাতি নিভে যাচ্ছে
বিস্মৃতির কোন চিহ্ন ছাড়াই ,
কুয়াশা- বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে
মাঝ রাতের ঘন ক্যাফেইন

এই নির্জন অন্ধকারে
হয়তো ধ্যানই ছিল আমার একমাত্র গন্তব্য,
তবু ক্রমাগত ভেসে চলেছি জলে
পুরনো মাছের মতো

একটা বিশাল পুরাণ ঘুমিয়ে পড়ছে
আমার বুকের ভেতরে,
আমি ফিসফিসিয়ে জানতে চাইছি-
সভ্যতা ভালো আছে কিনা !




কবিতা প্রমিতা ভৌমিক


Friday, 9 June 2017

ভালোবাসার শহর

“খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে বনের পাখি ছিল বনে
একদা কী করিয়া  মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে
......এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালবাসে তবুও কাছে নাহি পায় ।
খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে নীরবে চোখে চোখে চায় ।“

আমরাও খাঁচার পাখি , তাই থেকে  যাবো বরাবর  , এই জীবনে । বাবার কবিতায় আছে  “সভ্য মানুষ পদ্য লেখো / ঝরনা হতে অনেক মানা । “
কিন্তু বহুকাল  আগে এমনই দুজনার দেখা হয়েছিল । একজনকে সত্যিই পাখি বলে ডাকা হত ।  দেশে দেশে সে ঘুরে বেড়াতো ,চালচুলো  নেই , ভবঘুরে  বাউন্ডুলে । কোন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারতো না । পাখির মতই উড়ে উড়ে বেড়াতো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ।

এদিকে আমাদের বাস ছাড়লো কাপাদোকিয়া থেকে  । চলেছি কোনিয়ায় । আড়াই ঘন্টা মতন লাগবে । বিকেল ছ’টা হবে  পৌঁছতে বিকেল, কারণ সূর্য থাকবে তখনও টগবগে । আরামদায়ক বাস । যে যার মতন বসে আছে ।  সিল্কের মতো মখমলি রাস্তায় বাস চলছে । একটু জোরে চালালে পারত কিন্তু  ।

যে কথা হচ্ছিল, ওই ভবঘুরে বাউন্ডুলের বুকের মধ্যে একটা সোনার খনি লুকোনো ছিল । এমনিতে উলিঝুলি চেহারা , কিন্তু ঝুলির মধ্যে অনেক রসদ । সে এক চির পথিক । এক সন্তের মতো । বে ইন্তাহা ইশক , সীমাহীন ভালোবাসার আকাশে পাখির মতো ডানা মেলত । সে লিখেছিল ,”ভালোবাসা যেন জীবনদায়ী জল  ,হৃদয় দিয়ে আত্মা দিয়ে একেবারে তলানিটুকু পান করো ।
ওগো প্রেমিকেরা ,সময় এসেছে বেরিয়ে পড়ার । নক্ষত্রের গহিন থেকে যে শব্দ ভেসে আসছে আমার হৃদয় তা কান পেতে শুনছে প্রতিনিয়ত । আমাদের উট চালকেরা তৈরি ,যাত্রা শুরু হল বলে । ওরা জিগ্যেস করেছে যাত্রীরা এখনও ঘুমিয়ে কেন? “
এই পাগল খিটকেল লোকটির নাম শামস । ইরানের শামস এ তাব্রিজি ।  আরবি ভাষায় শামস মানে সূর্য । সেই আলোয় সত্য সুন্দর আর ভালবাসার সন্ধান ।   সে আবার শুধু বনের পাখিই ছিল না , ছিল বুনো পাখি , কথায় কথায় মুখ খারাপ করত , রেগে যেত । কিন্তু আদতে মানুষটা ছিল আগাগোড়া সোনার আর  তার ছিল  জহুরির চোখ ।  অলৌকিক ক্ষমতা এবং  গভীর প্রজ্ঞা  তার উলিঝুলি পোশাকের  দুই পকেটে পোরা থাকতো ।

ড্রাইভারের সহকারী চা কফি ঠাণ্ডা পানীয় জল দিয়ে যাচ্ছে ।  আমাদের যাচ্ছি কোনিয়ায় । জালালুদ্দিন রুমি মেভলানা ( মৌলানা) র দেশ । 

রুমির প্রতিভায় হিরের জৌলুস ত্রয়োদশ শতকের এই মানুষটি আজও অন্যতম বেস্ট সেলার । টুকরো টুকরো  স্ফটিক খন্ডের মতো দ্যুতিময় তার প্রতিভা , তার কবিতা আজও সমানভাবে জনপ্রিয় , বিশেষ করে পশ্চিমের দেশ গুলোতে । বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ।
কিন্তু এই  রুমিকে,  প্রেমিক কবি রুমি দিওয়ানা রুমি যিনি  বানিয়েছেন তিনি হলেন সেই  খ্যাপা শামস । পরশ পাথর খুঁজতে খুঁজতে একদিন  কোনিয়ায় এসে হাজির হলেন , জানতেন বিলক্ষণ যে পরশ পাথরটি এখানেই আছে ।

রুমি  ছিলেন আদ্যন্ত একজন এলিট । বড়লোক , ক্ষমতাবান ।  শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে  মাখামাখি । ঈশ্বর সব দিয়েছেন,  প্রতিভা , অগাধ পান্ডিত্য , তত্ত্বজ্ঞান । সমাজের উঁচু তলা । উদার মন , বন্ধুবৎসল । এমন একজন এলিট ক্লাসের সঙ্গে বনিকসমাজের মেলামেশা ভালো নজরে দেখা হত না । রুমি প্রগতিশীল , স্বর্ণ বনিক বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক পাকা করলেন বন্ধুর মেয়েকে তার নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে । বেশ একটা রেভ্যুলুশনারি  উদ্যোগ , সেই সময়ে তো বটেই ।
বাস এসে থামল কোনিয়া বাস ( হাভাস) টার্মিনালে । আমরা যাবো রুমি হোটেলে । কথামত আহমেটকে ফোন করি । আমরা এসে গেছি যে ।
একটু অপেক্ষা করো , রাস্তায় জ্যাম আছে । পনেরো মিনিট লাগবে
সত্যি কথা বলতে কি এই জায়গাটা সম্মন্ধে আমার ভালো ধারণা ছিল না । কেমন যেন পুরনো দিল্লির নিজামুদ্দিন আওলিয়ার দরগার ছবি ভেসে উঠছিল । ওই রকম গলি ঘুঁজি , হৈ হট্টগোল , ধর্মানুরাগীদের ভিড়, গোলাপ ফুল আগরবাতি  । কিন্তু এতো তা নয় । ঝকঝকে আধুনিক  ইওরোপের মতো । বাস ট্রাম  বাড়ি ঘর সব চক চক করছে । কত্ত বড় ট্রাম । ট্রেনের মতো । বেশ ঠান্ডা  হাওয়া । শীত শীত করছে । সামনেই গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের মতো মসজিদ । খুব সুন্দর দেখতে । সামনে দিয়ে যে লোকজনেরা হেঁটে যাচ্ছে তাতে আন্দাজ, এটা একটা মধ্যবিত্ত শহর ।




 আহমেট এসে হাজির হয় । তার হাতে আমাদের কোনিয়া ভ্রমণের ভার । আমরা চলেছি রুমি হোটেল । গাড়িটাও আহমেটের । বড় বিনয়ী । বন্ধুবর কিন্তু হাল ছাড়েন নি । তিনি বলেই চলেছেন এখখুনি ঘিঞ্জি শহর শুরু হয়ে যাবে । এদিকটা আসলে নতুন । খুব আত্ম প্রত্যয় নিয়ে জিগ্যেস করলেন, আহমেট আমরা পুরোনো শহরের দিকে যাচ্ছি , তাই না ?
যেন ধর্মের সঙ্গে  ঘিঞ্জি , গলি , আবর্জনার   একটা রাজযোটক হতেই হবে ।
হ্যাঁ , আমাদের হোটেলটা পুরোনো শহরে , মেভলানার একেবারে পাশেই ।
কিন্তু শেষ অবধি দুয়ে দুয়ে চার হল না । পুরনো শহরে এলাম বটে , ওই একটু পুরোনো বাড়িঘর আর বেশ শুনশান এলাকা ।  তাছাড়া আর কিচ্ছু  মিলল  না । 








রুমি হোটেল থেকে মেভলানার সমাধি ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ।  ইস্তানবুলের ব্লু মস্কের পরেই সবচেয়ে বেশি  দর্শনার্থীর ভিড় এখানেই ।
 আমাদের ঘর থেকে মেভলানা , যেন ” অকূল সুপুরি বন স্থির জলে ছায়া ফেলে একমাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে” ।  নীল আকাশের মাঝখানে ফিরোজা রঙের স্তম্ভ আমাদের স্বাগত জানালো সিটি অফ লাভ , ভালোবাসার শহরে ।

  একটু পরে বাইরে বেরুলাম । লোকজন অল্পই । বেশ ভালো লাগছে হাঁটতে । চারদিকে অনেক দোকান বাজার । স্যুভেনির শপে উপচে পড়ছে  সুফি দরবেশ , দরবেশ আর দরবেশ ।  । নানান মাপের নানান ধরনের । একটা কাবাবের দোকানের নাম “ সুফি কেবাব “।   আর সন্ধের মুখে শেষ  অস্তরাগ মেখে ঘন বেগুনি পিটুনিয়ার ঝাড় বলছে “ইশক , ইশক , ইশক “ ।কে শেখাল অভিজাত ধনী রুমিকে এই  মাতাল করা  ইশক ।







শামসের  সঙ্গে রুমির যখন দেখা হল তখন  শামস ষাটের কোঠায় আর রুমি চল্লিশ ছুঁই ছুঁই । তাদের প্রথম কি ভাবে দেখা হয়েছিল তাই নিয়ে অনেক ধরনের গল্প চালু আছে । কিন্তু আসল কথাটা হল  একে অন্যকে চুম্বকের মতো টেনেছিলেন । শামস ভবঘুরে অথচ নিবিড় অধ্যাত্ম শক্তি । সামাজিক রীতিনীতি কে তোয়াক্কা করেন না । রুমি যিনি একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করতেন , নিজেকে সমর্পণ করেন শামসের হাতে শামস হয়ে  গেলেন তাঁর গুরু । পন্ডিত রুমি, অভিমানী রুমির  হৃদয় খুঁড়ে তিনি বের করে আনলেন ভালোবাসার ফল্গুধারা । রুমি ততদিনে অন্তরের অনিভান আলোর সন্ধান পেয়ে গেছেন । সেই থেকে পথে পথে ভালোবাসার মোহর ছড়াতে ছড়াতে চলেছেন তিনি, এমনকি আজও।
এমনো শোনা যায় রুমি তার বালিকা সৎ মেয়ের সঙ্গে সামস এর বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিলেন যাতে শামস কে হারাতে না হয় ।
কিন্তু মেয়েটি অকালেই মারা যায় ।  লোকে বলে রুমির ছোটছেলেই শামস কে মেরে ফেলে কারণ সৎ বোনের ওপর তার দুর্বলতা ছিল । আবার অনেকে বলে শামস নিজেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছিলেন । যাই হোক না কেন ,  বুনো পাখিকে বেঁধে রাখতে পারেন নি রুমি কিন্তু নিজে বদলে গিয়েছিলেন আগাগোড়া ।
নিজেকে উজাড় করে  দিয়েছেন কবিতায় । অজস্র অগুন্তি কবিতার জন্ম , ভালোবাসার শিশিরে ভেজা । শামসের মৃত্যুর পর  রুমির গভীর শোকমগ্নতা জন্ম  দিল মসনভি বা মথনবি  কাব্য । ঈশ্বর যে সখা , প্রভু আমার প্রিয় আমার ।












শামস না থাকলে রুমি পূর্ণতা পেতেন না । শামস তাকে  অতীন্দ্রিয় রহস্যে ভরা নক্ষত্র পথের সন্ধান দিয়েছিলেন । একজন তত্ত্বজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন মরমিয়া পথের পথিক । ঘূর্ণায়মান দরবেশ একহাতে প্রেমসুধা আহরণ  করে অন্য হাতে তা ছড়িয়ে ছড়িয়ে চলেছে,  সেই চির খ্যাপা । সমা এ মেহফিল  বসে প্রত্যেক শনিবার । আমাদের দেখা হয় নি ।
এই মুরিদ মুর্শিদ প্রেম দেখা গেছে শেখ জামালি কামালি, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া আর আমির খসরুর মধ্যেও
পরের দিন সকালে মেভলানার উদ্দেশে রওনা হলাম , পায়ে হেঁটে । খুব বড় সমাধি গৃহ । সঙ্গে মিউজিয়াম ।

পরিচ্ছন্ন চারদিক । অনেক মানুষজন এসেছে । তবে কোন গোলমাল কোলাহল নেই । নব দম্পতি এসেছে আশীর্বাদ নিতে ।  অনেক ছাত্র ছাত্রী এসেছে ।  হজরত মেভলানার সমাধি ও চারপাশে  অসাধারণ কারুকার্য । বড় সুন্দর । বড় বেশি রকমের সুন্দর । অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি চিত্রকলার অভাব পুরিয়ে দেয় ।  সুফি দরবেশের প্রতিদিনের জীবন মায় রান্না করা বাজার করা  গুরুর কাছে মার খাওয়া সবই পুতুলের  মাধ্যমে প্রদর্শনীর মতো করে রাখা । রাখা আছে তাদের টুপি পোশাক বাদ্যযন্ত্র জপমালা ।
রুমির প্রশস্ত পরিসর চত্বরে   একটা  অবাক করা জিনিস লুকিয়ে ছিল । বলছি না ভালোবাসার শহর ! হঠাৎ চোখে পড়লো একটি স্মারক , মহম্মদ ইকবাল “ সারে জাঁ হা সে অচ্ছা , হিন্দোস্তা হমারা ...” । তিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় কবির সমাধিস্থলে যেন তাঁর কোন একটা চিহ্ন থাকুক  ।
রুমি থেকে সামান্য দূরে  শামস  এ তাব্রিজির সাদাসিধে অনাড়ম্বর সমাধি । খুব সাদা মাটা । এখানেও সমান শান্তি শৃঙ্খলা ।
নিজের  জীবনটা যেমন ছিল , শেষ  আশ্রয়ও সেই রকম । ভানহীন সরল ।












কিছু কেনাকাটি করি , দোকানে ঢুকি ।  পেছন থেকে কে যেন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে । কি ব্যাপার দেখতে পাচ্ছ না যে ? ওমা আপনি ? গাধার পিঠে উলটো করে  বসে ইয়া বড় পাগড়ি মাথায়  নেসরুদ্দিন হোচা বা আমাদের মোল্লা নাসিরুদ্দিন ।  ভালোবাসার বাটি ততোক্ষণে উপচে পড়ে আর কি !




আমাদের আবার আন্তালিয়া যেতে হবে । ওই  আহমেটের গাড়িতে করে  । প্রায় পাঁচ ঘন্টার পথ । আহমেট একজন সাদাসিধে ছাপোষা লোক । গাড়ি চালিয়ে পয়সাটা নিজের ঘরে তুলতে চায় । তাই হোটেল থেকে ছুটি নিয়েছে । একটু কিন্তু কিন্তু মুখ করে  বলল আমার ন’বছরের ছেলে তায়েব সঙ্গে গেলে কোন অসুবিধে নেই তো ? মানে বাচ্চাদের নিয়ে বিশেষ
বেরোনো হয় না কিনা ।

ভারি মিস্টি ছেলেটি। আপেলের মতো টুকটুকে । ইংরেজি জানে না । ছাত্র হিশেবে ভালো , ওর বাবাই বলল ।
আমরা কোনিয়ার একটা সুন্দর মতন  পাড়ায় রোদ ঝলমলে দুপুরে একরাশ গোলাপ ঘেরা রেস্তোরাঁয় আইরান মানে বিশুদ্ধ নোনতা ঘোল,বুল্গুর  আর আদিনা কাবাব খেয়ে গাড়িতে চাপলুম ।



কাপাদোকিয়ার মায়াজগত থেকে কোনিয়ার সুন্দর শান্ত  স্নিগ্ধ শহর ছেড়ে  এবার ভূমধ্যসাগরের দিকে পাড়ি । আনাতোলিয়া থেকে মেডিটেরানিয়ান । এই ক’দিনে আমরা তুরকিশ চায়ের ভয়ানক ভক্ত হয়ে গেছি । চা নিয়ে আসলে আমাদের অনেক সমস্যা । বেশির ভাগ জায়গায়  চা খেয়ে সুখ নেই ।  একমাত্র  সমস্ত তুর্কি ভ্রমণে এখানকার চা আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড ।
কাপাদোকিয়া, ধরা ছোঁয়ার বাইরে এক স্বপ্নের কুহকিনী  , সে পাগল করে খেপিয়ে মারবে  সবসময় কোনিয়া ছিমছাম আটপৌরে মধ্য বয়সী মা মা সুন্দরী । সে আশ্রয় দিতে জানে , ভালোবাসা দিতে জানে । সে তো ভালোবাসারই শহর ।

অনেকটা পথ । সুযোগ বুঝে আমি মাঝবয়সী  সাদাসিধে ছাপোষা  আহমেট কে জিগ্যেস করি ,  কামাল আতাতুরক একজন কামাল লোক ছিলেন। কী বলুন ?
বেশ কিছুক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলল ।
আহমেট যা বলল তা এইরকম, আপনি দেখবেন বেশির ভাগ মানুষ এখন আতাতুরক কে পছন্দ করে না । তিনি একেবারে সব কিছুর মূল কেটে ফেলতে চেয়েছেন । আধুনিকতা ভালো  কিন্তু তাই বলে আমাদের ঘাড় ধরে   বাপ পিতেমোর সবকিছু জলে ফেলে দিতে হবে, সেটা ঠিক নয় । এখনকার প্রেসিডেন্ট  কিন্তু যথেষ্ট করিতকরমা  । সব কিছুই আমরা পারি   । কী নেই আমাদের ? তাই বলে ছেলেপুলেরা ধর্ম কী ,  রীতিনীতি কী জানবেই না , সেটা মেনে নেওয়া যায় না বাপু  ।

মুখে এসে গেলেও বলতে পারলাম না যে রুমি তাব্রিজ তারা কেউই কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না । আজকে রুমি পশ্চিম দুনিয়ার মন জিতে নিয়েছে  সে কি এমনি এমনি ? কতো আধুনিক ছিল তার ভাষা , চিন্তার ব্যাপ্তি ।  কতো রক স্টার পপ গাইয়েকেও অনুপ্রাণিত করেছে তের শতকের এই কবি ।
গাছেদের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে । বেলা গড়িয়ে এলো । দূর থেকে যেন সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস শোনা যায় । একটা প্রাণবন্ত ঝলমলে শহরের মধ্যে ঢুকে গেছি তায়েবের সঙ্গে চোখ আর হাসি ছাড়া ভাষায় কথা হয় নি । ভারি ভব্য ছেলে ।
আমাদের হোটেল, সমুদ্র ঘেঁষা । সবুজ গাছের মধ্যে নীল রেখা দেখতে পাচ্ছি ।

আহা, এতো দূরের পথ । আবার ফিরে যাবেন । অনেক রাত হয়ে যাবে । ছেলেটার বড় কষ্ট হবে আজকে । ওকে না আনলেই পারতেন ।

নিয়ে এলাম এই জন্য , ও কোনোদিন সমুদ্র দেখে নি তো !






ছবি  সুপর্ণা দেব
শামস /ইকবাল ছবি জয়ন্ত নারায়ণ
রুমির কবিতা গুগল