Friday, 18 August 2017

গদাধর সাহার শপিং মল


জকাল গদাধরের  ঘুম ভালো হয় না । আবছা আবছা , ছেঁড়া ছেঁড়া , হালকা মেঘের মত । ছায়ার মত , বাতাসের মত । খালি আসছে আর যাচ্ছে । আসছে আর যাচ্ছে ।  ঘুম আর ফাতনা গিলছে না । তাকে ধরি ধরি মনে করি ,ধরতে গিয়ে আর পারি না । আর ঠিক তখখুনি গদাধরের  কোঠা বাড়ির সমুখের রাস্তা দিয়ে  হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে । সংকীর্তন চলছে ,আবেগে মতোয়ারা  । খোল  বাজছে , ভোরের আলো প্রায়  ফুটি ফুটি । সাদা টগর লাল জবা সবে চোখ খুলছে । গদাধর  তড়িঘড়ি উঠে খড়খড়ি ফাঁক করে দেখে রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা  সোনা , তার বাড়ির সমুখ দিয়ে চলে গেল । ফরসা খোলা পিঠ ,লম্বা দুটি হাত আর কিছু দেখতে পেল না  । আপনা থেকেই হাত দুটো  প্রণামের মতো জড়ো হয়ে গেল গদাধরের । আর ঘুমনোর বালাই  নেই । সটান উঠে দিঘির ধারে দাঁড়িয়ে  গদা নিমের ডাল ভেঙে দাঁতন করতে লাগল । জলপিপি পানকৌড়ি ডুব মারছে ।ডানা ঝটপটিয়ে সাদা কালো হাঁসের দল জলে নেমে গেল । দিঘির পারের সব ঝুপসি গাছগুলোয় নিমাই পন্ডিতের কাঁচা সোনার আলো এসে পড়েছে । তারও ওপারে যেখানে ভোরের আকাশ আলতো ভাবে ফুটে উঠছে গদার মনে তখন কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে ওগো সুদূর বিপুল সুদূর তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি ...মোর ডানা নাই  । নাহ , গদার চোয়াল দুটো শক্ত হোল । তার দুটো অদৃশ্য ডানা আলবাত আছে । শ্যাম লাহিড়ী বনগ্রামের কী যেন হয় গঙ্গারামের মতই বাঙালির ছেলে বিজয় সিংহ , হেলায় লঙ্কা করিয়া জয় , তাদের কি যেন কি একটা হত বলে সে বাপ পিতেমোর মুখে বহুবার শুনেছে ।
বউ টা মারা যাওয়া  ইস্তক ঘরেও তার মন টেকে না । গদাধরদের বানিজ্যে বসত লক্ষ্মী এই শান্তিপুর নবদ্বীপের যত শাড়ি আর নানান তেজারতি ব্যাবসা সেই কোন জন্ম থেকে তারা করে আসছে । বাঙলার ব্যাবসা পত্তর মন্দ না । পায়ের উপর পা তুলে ফেলে ছড়িয়ে খাবার রসদ তার আছে । কিন্তু ওই যে গদার বদ রোগ , এক জায়গায় তার মন  বসে না । এ গ্রাম সে গ্রাম করে নদে শান্তিপুর সে চষে ফেলেছে । ঢাকা ফরিদপুরে  মসলিনের কারবার করতেও গেছে । কিন্তু  এই উড়ো স্বভাবটার জন্য তার তো বিশেষ কিছু করার নেই । সে মেষ রাশি মেষ লগ্ন । চরে বেড়ানোর জন্যই তার জন্ম । গদার যদিও জানার কথা নয় কারণ তার সময়ের আরো তিনশ  বছর পর অমনি এক মেষ রাশি মেষ লগ্ন এক চৌহদ্দির মধ্যে পাঁচ পাঁচ খানা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন , ওই এক কারণ, এক জায়গায় মন বসে না । আবার তিনিই লিখেছিলেন মায়েরা সন্তানদের বাঙালি করে রেখেছে । আস্ত মানুষ বানায় নি । তারা  সক্কলে বোতাম আঁটা জামার নিচে শান্তিতে শয়ান । ইহার চেয়ে হতাম যদি আরব বেদুইন । না,  গদা আরব বেদুইন হতে চায় নি বটে তবে আরবের ব্যাবসাদারদের সঙ্গে তার বিলক্ষণ  মোলাকাত হয়েছে  । তাদেরই একটা দলের সঙ্গে তার বেশ লাগে কথা কইতে । একটু অসুবিধে হয় , তবে  আকারে ইঙ্গিতে ভালোই কাজ চালানো যায় । হুশেন শাহি জমানায়  বাঙলায়  মোটের ওপর খুব কিছু অশান্তি নেই । সেই আরবি ভিনদেশিরাই  একটা প্রস্তাব দিয়েছে । দেশের লোক সঙ্গে থাকলে ভিনদেশিদের সুবিধে হয় । গদার মাথায় সেইটাই ঘুরপাক খাচ্ছে আজ প্রায় হপ্তা খানেক হবে ।
গদাধর মুখ ধুয়ে রাধা মাধবকে পেন্নাম ঠুকে উঠোনে  এসে বসে । রাধামাধবের প্রসাদ ,তার সঙ্গে ফেনা ওঠা দুধ , চিঁড়ে , কলা আর বাতাসা । গদাধরের মা আবার তার বিয়ে দেবেন বলে তোড়জোড় শুরু করেছেন । তিনি কি সব  বলে যাচ্ছেন গদার কানে তা এক বর্ণ ও ঢুকছে না । শুধু আমির  উল্লাহের  কথা তার কানে মাথায় বিজবিজ করছে
উঠোনে মালতী লতার ঝাড়ে ভোমরার বোঁ বোঁ  । বেলা বাড়ছে । সবাই যে যার কাজে লেগেছে । আড়তের লোকেরা বার দালানে জড়ো হচ্ছে । গদা বসেই আছে । যেন কোন হুঁশ নেই ।  শুধু একটা কুবো পাখি ডেকে যাচ্ছে কুব কুব কুব কুব ।আর গদার মাথার ভেতরে কে যেন বলছে ঘর থেকে  ছুট ছুট ছুট



পরের দিন আবার খোল বাজল , কীর্তন হল , নিমাই পন্ডিত পথ আলো করে  হেঁটে চলে গেলেন । কিন্তু গদাধর তার কিছুই শুনতে পেল  না , দেখতে পেল না ততক্ষণে রসদপত্র নিয়ে  আরবি বনিকদের সঙ্গে সে ধরেছে পশ্চিমের পথসার সার গোরুর গাড়ি । টুং টাং গলার ঘন্টা , গাড়ির নিচে লন্ঠন নিভুনিভু ।  তন্দুরের রুটি আর ঝলসানো ভেড়ার মাংস । তার এতোদিনের  নিদ্রাহারা রাত আজ ঘুমে ঢলে পড়েছে । অথচ মনের মধ্যে উত্তেজনার তোলপাড় । ওদিকে গদার মা শুয়ে শুয়ে ভাবছেন পান সুপুরি পাঠিয়ে  ছেলের বিয়ের পাকা কথা সেরেই  ফেলবেন রাত পোহালেই ।
গদাধরের জন্মগত বংশগত ব্যাবসাবুদ্ধি , সেয়ানা বুদ্ধি , অজানাকে জানার অদম্য কৌতূহল ,  ক্ষমতা আর অর্থ স্পৃহা কে বাঙলার ধান মাছ নারকেল  ঠান্ডা হাওয়া আর কীর্তন সুখী করতে পারেনি । কিছু লোক জন্মায় চির বুভুক্ষু । গদাধর সেই অদ্ভুত দলের । সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় !




উজ্জয়িনী ইন্দোর পেরিয়ে বছর দশেক  পর গদাধর হাজির হল এক  অদ্ভুত সুন্দর জায়গায় । এরমধ্যে  মাড়বার , কচ্ছ , সিন্ধ ও আরবি ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে মেলামেশায় তার কূপ মন্ডুকের  সীমানা অনেক অনেক বেড়েছে । বংশগত বুদ্ধি  হয়েছে  ছুরির ফলার মত ধারালো , কথাবার্তা হয়েছে তুখোড় , হাতে এসেছে বিস্তর অর্থ , চেহারায় তেল চেকনাই চলে গিয়ে এসেছে  একটা কেঠো আকর্ষণ রাজপুতদের সঙ্গে মিশে মিশে অনেকটা তাদের মত হাবভাব রপ্ত করেছে । অবিশ্যি এটা বঙ্গজদের জাতগুণ । নকল করতে তারা ওস্তাদ । গদাধর নাম টা এখন তার কানে বিচ্ছিরি শোনায় । তাই গদা নিজেকে পরিচয় দেয় মেদিনী রায় বলে । মেদিনী রায় রাজপুত ।  
এক ভরা বর্ষায় এক সবুজ মলমলে চাদরে ঢাকা সুন্দর জায়গায় গদা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাজির । এখানে সে ব্যাবসা করবেগত দশ  বছরে অনেক নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে । সে আগে কখনো এসব দেখেনি । সরু সরু উজ্জ্বল হলুদ  সোনালি রঙের সুতোর মত , দারুণ সুবাস , নাম জাফরান । পাহাড়ে বরফের দেশ থেকে আসে , আসে মৃগ নাভি কস্তুরি । তার সুরভি নেশা ধরিয়ে দেয় । বড় দুর্লভ । চড়া দাম নবাব বাদশাদের এগুলো না হলে চলে না ।  আরো একটা নতুন জিনিশের কারবার সে দেখেছে , হাতির দাঁত । এখানকার কারিগররা সেই দাঁত দিয়ে কী যে সব সূক্ষ্ম কারুকাজ করে, না দেখলে গদা বিশ্বাসই করত না । এ জায়গাটায় কোন সমুদ্র নেই , বন্দর নেই । কিন্তু বানিজ্যের স্বর্ণ সুযোগ । কারণ আরব দেশ থেকে আফ্রিকা থেকে লোকজন আনাগোনা করে অথচ পণ্য সরবরাহের তেমন প্রতিযোগিতা নেই । অনেক কৌশলে গদা এইসব খোঁজ খবর জোগাড় করেছে অনেকদিন ধরে  । বিস্তর  আট ঘাট বেঁধে গদা তাই  মালব দেশের এই নিবিড় সবুজ প্রান্তে এসে নোঙর বাঁধল  । পালকি করে পাকদন্ডী বেয়ে ভেজা সবুজের গন্ধ  মেখে মেখে গদা মান্ডু চলেছে । বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে মাঝে সুরম্য প্রাসাদ । ভুট্টার খেত । বড় বড় ফটক । কড়া নজরদারি । এত সবুজ গত দশ বছরে গদা দেখেনি । হঠাত গলার কাছে  দলা পাকিয়ে গেল । সেই দশ বছর আগে এমনই ভরন্ত সবুজ এক দেশ ছেড়ে সে চলে এসেছিল ।   দুনিয়া দেখবে বলে ।  
এমনই ঠান্ডা বাতাস বইছিল সেদিন  । প্রাণ জুরোনো , মায়ের মতো । অনেক দিন পরে গদার চোখে জল এলো । পালকি থামিয়ে গদা  খাড়াই পথ বেয়ে হাঁটতে থাকল । বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তার কোঁকড়ানো সামান্য লম্বা চুল , তার রেশমি পোশাক , দামি নাগরা । সেই মহার্ঘ পোশাক ছাড়াও  শ্রাবণ তখন গদাধরের হৃদয়ের একূল ওকূল ভিজিয়ে আকুল । চোখের জল ,  বৃষ্টির ধারাজলে কখন মিশে গেছে । গদার কান্না কেউ দেখতেই পেল না ।

কিন্তু গদা সফল হয়েছিল । খুব সফল । পাইকারি হারে ব্যবসার আড়ত খুলেছিল মান্ডুতে । বিশাল কারবার সরাইখানা । দুটো বড় বড় বাওলি , অন্ধেরা আর উজালা । এতো বড় ব্যাবসা , কত মাল এসে জমা হত । ছোট ছোট ব্যাপারীরা কিনে নিয়ে যেত । সার সার দোকান । খোদ রাজপ্রাসাদে হারেমে তার গুদাম থেকে রাশি রাশি জিনিশ  পাঠানো হত । পাইকারি আড়ত না বলে আধুনিক শপিং মল বললেই যেন ঠিক হয়কে না জানে বাঙালিরা বাঙলার বাইরে বেশি সফল । দেশের জন্য নাড়ির টানে কিনা জানিনা , গদা , মেদিনী রায় নামটা আর লেখেনি ।
ফটক



গদার দোকান







তা প্রায় সাড়ে চারশো বছর পরে আমাদের গাড়ি এক ভরা শ্রাবনের দুপুরে  পাহাড়ি পথ ঘুরে ঘুরে উঠছিল । আমরাও ফটক পেরিয়ে গেলাম একটা একটা । আমাদেরও চোখে পড়ল সবুজের ঢেউয়ের মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে থাকা  প্রাসাদের মসজিদের  ভাঙা শরীর , শ্যাওলা জমা ,  বিষণ্ণ । বর্ষার সঙ্গে রেণু রেণু ধোঁয়া , জলের বাষ্প । আর কি আশ্চর্য ! চারটি ফটক পেরিয়ে  শহরে ঢোকার ঠিক আগে  গদার শপিং মলের বিশাল চেহারা আমাদের থামিয়ে দিল । আড়ালে থেকে গদাই থামিয়ে দিল বোধহয় ।  কোনো প্রাসাদ নয় ,অট্টালিকা  নয়  মন্দির মসজিদ , বিলাস ঘর বা  প্যাভিলিয়ন নয় , কেল্লা নয় , এক বিপুলায়তন দোকানঘর । গদার দোকান ।







সেই নিস্তব্ধ শুনশান বর্ষার দুপুরে হঠাত দাঁড়িয়ে পড়লাম সেই পাথুরে  বাড়ির সামনে । কোন টিকিট লাগবে না । কেউ পাহারাও দিচ্ছে না । শুধু এ এস আই এর একটা ফলক । আমরা ভেতরে ঢুকি আর আর আমাদের বিস্মিত করে রাখে এর বিশাল আয়তন । অনেক কুঠরি । বোধহয়  পণ্য দ্রব্যের আড়ত । সারি সারি দোকান । মারোয়ারি গদি ধরনের । দেওয়ালের দু ধারে জিনিশ পত্র রাখার তাক বা র‍্যাক । ছড়ানো চাতাল । একটু দূরেই দুটো  বাওলি । জলের দরকার হত অবশ্যই । সেখানেই সার বাঁধা কয়েকটা ঘর । মনে হল গেস্ট হাউস । সবুজ ঘাসে ঘাসে আর শ্যাওলায় চাপা পড়ে আছে অজস্র বনিকের হট্টগোল , দরদাম , দর কষাকষি ।আরবি বাজার বা সুক (souk) ছিল এই জায়গাটা  বিস্তর মালপত্র জমা হল আড়তে   সৈয়দ মুজতবা আলীকে  কে একেবারে বসিয়ে দেওয়া যায়মজার  ই শরিফ থেকে কার্পেট এসেছে , বদকশান থেকে লাল রুবি, মেশেদ থেকে তসবি, আজারবাইজান থেকে …”
না ভাই এবারের মুক্তো গুলো তেমন ভালো ঠেকছে না ।
কি হল ? শান্তিপুরের দুকুল ঢাকার মসলিন ,আমার সাত গাঁঠরি লাগবে যে !
জাফরানের দাম কিন্তু এবারে বেশি পড়বে  । পারস্য থেকে এসেছে ভায়া , মুখের দিকে চেয়ে থাকলে কি হবে ? 
হাতির দাঁত অমন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছ যে ! এখানে বাজে জিনিশ রাখি না বুঝলে । আজ সকালেই সুলতানের খাস কারিগর চোখ বন্ধ করে কিনে নিয়ে গেছে ।
একবস্তা আখরোট ফাউ নেব কিন্তু!

কস্তুরি ,বিশেষ যত্ন করে রাখা থাকে । কাপড়ে ঢেকে । গুপ্তধনের মতো । ওদিকে সরাই খানায় রান্নার বন্দোবস্ত । জোব্বা জাব্বা খুলে বিশ্রাম নিচ্ছে পথ ক্লান্ত বনিকের দল । এদের মধ্যে কেষ্ট বিষ্টু গোছের কেউ কেউ যাবে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে , ভেট নিয়ে । গদা তাদের সাহায্য করে খুবই । আফ্রিকা থেকে এক ধরনের গাছ আনিয়েছেন সুলতান । মান্ডুর এই ঠাসা জঙ্গুলে আবহাওয়ায় সে গাছ দিব্যি বেঁচে গেল । আজ মান্ডুতে গেলেই চোখে পড়বে আফ্রিকার বাওবাব । সাতশো বছর বাঁচে । একেক টা গাছ বহু ইতিহাসের সাক্ষী , নেহাত কথা কইতে পারে না । প্রকান্ড  প্রকান্ড গুঁড়ি । ফল হয় ইয়া বড় বড় । নারকেলের মতো শক্ত খোলা । খোলা ফাটালে শুকনো রাম টক বিচিওয়ালা ফল । মান্ডুকি ইমলি । স্থানীয়  লোকেরা  তাই বলে । জামি মসজিদের সামনে রূপমতীর প্যাভিলিয়নে রাস্তার ধারে  সব জায়গায় যত্র তত্র এই ইমলি বিক্রি হচ্ছে ।
লে কে যাও লে কে যাও , মান্ডু কি ইমলি , মশহুর । সুলতান আফ্রিকা থেকে আনিয়েছিলেন , এটা পঞ্চাশ , ওটা চল্লিশ । দশ বছরেও কিচ্ছু হবে না । হাত  নাড়িয়ে পার্বতী দেবী এর গুণ আর ইতিহাস গড়্গড়িয়ে বলে গেল । আমাদের দেশে আপনারা এসেছেন। থ্যাংক ইউ । চলে আসার সময় দেখলাম পুরো গোন্দ স্টাইলে পায়ে রুপোর নক্সা করা মল আর ঝুমঝুমি লাগানো  বিছুয়া পরে আছেন সব কটা আঙ্গুলে ।

ইমলি 


বাওবাব গাছ


মান্ডুর সিগনেচার আইটেম কি কি?

রূপমতী বাজবাহাদুরের প্রেম ও সঙ্গীত গাথা ।  রূপমতী প্যাভিলিয়ন বানানো হয়েছিল শুধুমাত্র এই সুন্দরী গায়িকার নর্মদা দর্শনের জন্য । তার একেবারে ওপরের তলা থেকে গহিন জংগলের বুনোটে বাজবাহাদুরের প্রাসাদ দেখা যায় । আর এই ওপরের তলা থেকেই কাঙালের মতো  কুড়িয়ে নিতে হয় বর্ষা স্নাত মান্ডুর গভীর শ্যামলিমা , বিন্দু বিন্দু বাষ্প বয়ে নিয়ে আসে রূপমতীর সৌরভ আর সঙ্গীত ।  অদৃশ্য তরঙ্গ বয়ে নিয়ে আসে প্রেম সঙ্গীত সৌন্দর্যের অতুলনীয় বন্ধন । “পথ হতে আমি  গাঁথিয়া এনেছি সিক্ত যূথীর মালা / সকরুণ নিবেদনের গন্ধ ঢালা “।

সেই সোঁদালো সন্ধেয় যখন নেমে আসছি , সঙ্গের একজন বললেন, এই মেয়েটা আপনার সঙ্গে কথা বলবে । একটা হাসি হাসি মুখ । সরল কিশোরী ।  একটু অবাক হলাম বটে ! কেনই বা কথা বলবে ? কি নাম রে তোর ? বৈশ্নো । আমি বল্লুম দূর পাগলি , তুই তো রূপমতী । মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসে ।
রূপমতী দেখা দিয়ে গেল ! সেও তো গাঁয়ের মেয়েই ছিল ।

রূপমতীর প্যাভিলিয়ন

বাজবাহাদুরের বাড়ি

অজস্র বাওবাব গাছ আর মান্ডু কি ইমলি ।  হোসংগ শাহ সমাধি বা মিনি তাজমহল ,  দুটো কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝখানে বানানো জাহাজ মহল  যাকে বর্ষার ডুবন্ত  জলে  ভেসে থাকা জাহাজের মতো দেখাতো , হিন্দোলা মহল যার তেরছা দেওয়ালে ঝুলা বেঁধে তিজ উৎসব পালন  করতেন বেগম শাহজাদির দল আর বীনকার বাজাতেন রাগ হিন্দোল । আশরাফি মহল যেখানে নুরজাহান একেকটা সিঁড়িতে তার পদ্ম কমল বিছিয়ে দিতেন আর জাহাঙ্গির একটা করে আশরাফি রাখতেন । পরে ওই সোনার মুদ্রা বিলিয়ে দেওয়া হত গরিবদের মধ্যে । মোঘল শাসন কায়েম হবার পর মান্ডু তে জাহাঙ্গির সময় কাটাতে ভালোবাসতেন ।


জাহাজ মহল





থিয়েটার হল



এ ছাড়া আরো দুটো কথা খুব জরুরি । মান্ডুর বিভিন্ন প্রাসাদে শব্দ কৌশল বা acoustics এর ব্যাবহার । মনে হতে পারে এ এমন কি কথা ? যে কোন কেল্লা বা প্রাসাদে গেলে অমনি গাইড বলবে ওইখানে গিয়ে ফস করে একটা দেশলাই জ্বালছি  আপনি এইখানে  দাঁড়িয়ে পরিষ্কার শুনতে পাবেন । না, ঠিক এমন টা নয় । জাহাজ মহলে আছে গ্রিনরুম সমেত পুরোদস্তুর স্টেজ পারফরমেন্সের ব্যাবস্থা , অদ্ভুত ভাল শব্দব্যাবস্থা । গমগম করে উঠছে ।

বাজবাহাদুরের প্রাসাদে একেবারে ওপরের তলা থেকে নিচের ছোটখাটো বসতি দেখা যায় । ওই খানে দাঁড়িয়ে উনি  দর্শন দিতেন আর কথা কইতেন সাধারণ  মানুষের সঙ্গে । দর্শন দিতেন , না হয় মানা গেল । কথা কইতেন কি করে? সামনেই পাহাড়ি ঢালে জঙ্গলের মধ্যে ছুটকো ঘর বাড়ি । কিছু ইন্টিবিন্টি খেলে বেড়াচ্ছে । তাদের দেখাচ্ছে লিলিপুটের থেকেও ছোট । আমাদের গাইড মোহম্মদ কুরেশি হাল ছাড়বেন না ।
তিনি একেবারেই না চেঁচিয়ে খুবই  স্বাভাবিক ডেলিমালে  বাচ্চাগুলোকে ডেকে, হ্যাঁ রে  ইস্কুল যাস নি ? তোরা ক’ভাই বোন রে ? এইসব হালাং তালাং বকতে লাগলেন । আর ওই নিচ থেকে পরিষ্কার সব শোনা যেতে লাগল ।

“ আসিছে সে ধারাজলে সুর লাগায়ে ,নীপবনে পুলক জাগায়ে “।বাজবাহাদুরের ছিমছাম প্রাসাদে একটা সুন্দর ভাইব্রেশন ছিল ।  খুব ইচ্ছে করছিল আরো কিছু সময় থাকি । যেন মাথার জট খুলে যাচ্ছে , মনটা শান্ত । কেউ যেন ভালবাসছে অন্তরাল থেকে । যেন আপনা থেকেই পা দুটো আটকে থাকছে , সরছে না ।  ভালো লোক ছিলেন তো । প্রেমিক , গায়ক । সুর তাল ভালোবাসার তরঙ্গ  আজো রয়ে গেছে বাতাসে ।


্বাজবাহাদুর প্রাসাদ

মান্ডুর আরেকটা আকর্ষণ হল , জল বন্টন ব্যাবস্থা । বছরের সব সময় এমন ধারা জল সিক্ত থাকে না সে । গরমে সব রুখা শুখা । শুকনো খাঁ খাঁ । তাই প্রতিটি জায়গায় বর্ষার জল ধরে কিভাবে তাকে ব্যাবহার করা যায় , তয়খানা কেমন ঠান্ডা রাখা যায় তার নজির ধরে রাখা আছে । কিছু শুনলাম। কিছু ভুলে গেলাম । ঘোরতর ইঞ্জিনিয়ারিং । প্রাসাদের মধ্যে সুইমিং পুল । বড় বড় তালাও । তালাও মধ্যে বসে ঢালাও আমোদের আয়োজন প্রচুর জলঘোলা হল


হিন্দোলা মহল

পরের দিন ফিরে আসছি , কেন জানি না গদার দোকানের সামনে আবার থামলাম । আসলে ওর গড়নটাই খুব বলিষ্ঠ ,  সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না ।
আমাদের মুখ ভরতি মান্ডুর ভুট্টার দানা ।  আমাদের রূপমতী বাজবাহাদুর , গদাধর সবার সঙ্গেই দেখা হয়েছে , নানান মাধ্যমে, নানান ভাবে  । একটা একটা করে চারটে ফটক পেরিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছি , বারিশ কা বুন্দ আর হরিয়ালি মেখে মেখে নিয়ে । ড্রাইভার রাজেশ এসি বন্ধ করে জানলা খুলে দিয়েছে । হাওয়া লুটোপুটি খাচ্ছে । আর পেন ড্রাইভে বাজছে

কতরা কতরা মিলতি হ্যাঁয়
কতরা কতরা জিনে দো
জিন্দগি হ্যাঁয় , বেহনে দো
পিয়াসি হুঁ ম্যায় , পিয়াসি রহনে দো
রহনে দো না………
হলকে হলকে কোহরে কে  ধুঁয়ে মে
শায়দ আসমান তক আ গয়ি হুঁ……







ছবি লেখক

Saturday, 29 July 2017

মেরহাবা, আওয়ারগি / শেষ পর্ব


ব কিছু কি আর মুছে ফেলা যায় ? অনেকটা উঁচুতে  ছাদের ডোম । ১৮০ ফুট লম্বা বাড়ি ।  ঘাড় উঁচু করে চোখ কপালে  তুলে দেখি সেই কোথায় ওপরে কাঁচের ভেতর দিয়ে সকালের রোদ্দুর এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মা আর শিশুর কোমল শরীর । পবিত্র প্রজ্ঞা ,আয়া সোফিয়ার আলো বিকীর্ণ হচ্ছে সেই প্রাসাদের মত বিশাল বাড়িটার ।  একেবারে ওপরে মা মেরির কোলে যিশু । মোজেইকের কাজ । “করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে কোথা নিয়ে যায় কাহারে /সহসা দেখিনু নয়ন মেলিয়ে এনেছ তোমারি দুয়ারে”গলা আপনিই  বুজে আসে , চোখ আপনিই বন্ধ হয় , আঙুলে আঙুল ঢুকে দুটো হাত আপনিই জড়ো হয়ে থুতনির কাছে উঠে  আসে । আয়া  সোফিয়া । পঞ্চম শতব্দী থেকে ইতিহাসের পালাবদলের সাক্ষী , বিশ্বের অন্যতম মহিমময় স্থাপত্য । আয়া সোফিয়ার মধ্যে সেই পুরোনো সময় পুরোনো  পরিবেশের একটা অতীন্দ্রিয় মোহজাল । প্রত্যেকটা অলি গলি সিঁড়ির বাঁকে  ছমছমে রহস্য । ফেলে আসা সময় যেন যেতে গিয়েও যাচ্ছে না । নিজেকে প্রচ্ছন্ন অথচ  প্রকট করে রেখেছে সব জায়গায় । পুরোনো নকশায় , রঙ চটা মোজাইকে , আর্চের কারুকাজে , ফ্রেস্কোতে ,  পাথুরে পাকদন্ডীতে , চক মিলানো মেঝেতে  সব জায়গায় সময় যেন থমকে আছে ।  এর বিশাল আয়তনে আজো ভিজে ভিজে  হয়ে রয়েছে   মধ্য যুগের ইতিহাসের গন্ধ  । সেই গন্ধ  আজো মুছে ফেলা যায় নি আয়া সোফিয়ার দেহ থেকে । সাতশ বছর ধরে কনস্টান্টিনোপল ছিল দুনিয়ার সেরা শহর । চতুর্থ ক্রুশেড  তছনছ করে দিল এই শহরটাকে । খ্রিস্টান এবং জেরুসালেম সমেত মধ্য প্রাচ্যের ইসলামদের এই ক্রুশেডে খ্রিস্টানরাই অর্থোডক্স আর রোমান ক্যাথলিকে ভাগ হয়ে নিজেদের দুর্বল করে দেয় । আয়া সোফিয়া এই তুলুম দলবাজি থেকে রেহাই পায় নি ।  প্রথমে ছিল গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ । তারপরে রোমান ক্যাথলিক ।  আয়া সোফিয়ায় রোমান ক্যাথলিকদের তাণ্ডব । ধর্ম বশ মানে অর্থের । কন্সটান্টিনোপলের ধন সম্পদ লুটে নেওয়া ধর্মীয় সংহতির চেয়ে পরম রমনীয় মনে হয়ে ছিল  তাই “সুদূর নতুন দেশে সোনা আছে বলে/মহিলারি প্রতিভায় সে ধাতু উজ্জ্বল/  টের পেয়ে দ্রাক্ষা দুধ ময়ূর শয্যার কথা ভুলে “চার নম্বর ক্রুশেডে তিন দিন ধরে শহর লুঠপাট ।








 প্যারিস ,ভেনিস মিলানো জেনোয়া সব নগর থেকে  পিছিয়ে পড়ে কনস্টান্টিনোপল তখন ধুঁকছে , সেই তেরো শতকের প্রথম দিকে । সিল্ক রুটের পথও ঘুরে গেলো ।  তারপর ১৪৫৩ সনে অটোমান টার্কের হাতে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়লো বাইজান্টাইন রোম । এইসব  দামাল পালাবদলের ক্ষত আয়া সোফিয়ার সারা গায়ে । ভেঙে চুরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলা হয় অনেক  মূর্তি , অনেক  মহার্ঘ শিল্প কীর্তি । চারটি মিনার তুলে মসজিদ হয়ে গেল গির্জা । কিন্তু সব কি আর মুছে ফেলা যায় ? অনেক অনেক ওপরে দেওয়ালে ছাদে অপরূপ মোজেইকের বর্ণিল বিষণ্ণতার আড়ালে এক ধ্বংসের বিষাদ গাথা ।  বড় বড় ফলকে সোনালি অক্ষরে আল্লাহ্‌র নাম , সুলতানদের নাম  । মক্কামুখী মিরহাব । পাথুরে বিশালাকার পাকদন্ডী বেয়ে দোতলায় উঠি । পাহাড়ের ঢালের মত পথ ।  স্তম্ভ।খিলান, গম্বুজ ফ্রেস্কো , রঙিন নকশি কাঁচ । আলো আঁধারে সেই গুমগুমে বিশালের মধ্যে আচ্ছন্নের মত কিছু সময় মিশে যাওয়াএখন এটা মিউজিয়াম । কোন ধর্মীয় কাজকর্ম হয় না ।  






আয়া সোফিয়া থেকে বেরিয়ে বাইরের রোদ্দুরে ভেসে  যেতে যেতে টাটকা কমলালেবুর রস খেতে খেতে ব্লু মস্কের দিকে হাঁটা লাগালাম । এই জন্য সুলতান আহমেট স্কোয়ার জায়গাটা এতো ভালো লাগে । এখানে ট্রাম আসে কিন্তু যান জট এড়াতে বাস আসে না ।  সবকিছুই যেন হাতের নাগালে । তুরস্কে ব্লু মস্কে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসেতারপরেই কোনিয়ার রুমি ।
ব্লু মস্কে মোট ছটি মিনার । ব্লুমস্ক বা সুলতান আহমেট মসজিদে বড় জাঁক । প্ল্যাস্টিকের জুতোর খোপে পা ঢুকিয়ে ভেতরে যাও । কিছুদিন আগেও তো যথেষ্ট আধুনিক ছিল । এখন অবিশ্যি পুজোপাঠের জায়গা রয়েছে । ফুল প্যান্ট না পরার জন্য একটা মেয়েকে ঢুকতে দিলো না । খুব কারু কাজ চারদিকে । খুব সুন্দর । নীল টালির ব্যাবহার । বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলুম ।







সারা সন্ধে আবার সেই গুলতানি করেই কেটে গেলো । সত্যি কথা বলতে কি ইস্তানবুলের সন্ধে বেলার  আড্ডাগুলো প্রচন্ড আওয়ারগির । ভোলা কঠিন । তার মাদকতাই আলাদা । আসলে তুরস্কের নিজস্ব ঘরানাটা এতো বর্ণ ময় আর মজবুত, ওদের কারুর থেকে ধার নেবার ব্যাপারটা বিশেষ চোখে পড়ে না । মশলা কেনার সময় মশলা ভাই  বলছিল পেঁয়াজ কেটে লেবুর রস মাখিয়েএকটু সুমাক ছড়িয়ে দেবে , আঃ , যেন অমৃত । বন্ধুবরের মুখে যেন নিমের পাঁচন । আর পারিনা বাপু , সেই এক ঘেয়ে দইএর ঘোল ,বোরেক ,  গুচ্ছের স্যালাড , মোটা মোটা বাদামি ভাত,  ঝলসানো মাংস মাছ ।মেডিটেরানিয়ান খাবার ! নিকুচি করেছে । অন্য কোন ধরনের খাবার সহজে  পাওয়াই যায় না । ওমা ! যেমন বলা , ঠিক দেখি একটা কোরিয়ান রেস্তোরাঁ , হংস মধ্যে  বক যথা । সেখানে বন্ধুবর বেশ খানিকটা গারলিক চিকেন ,সাদা ভাত ,কিমচি খেয়ে  মুখে একশো পাওয়ারের বাতি জ্বেলে বলল  , উফ একটু স্বস্তি পাওয়া গেল ।
সেই স্বস্তি সঙ্গে করে নিয়ে ট্রামে চাপা হল । নেমে গেলাম গালাটা ব্রিজ । ওরে ব্বাবা , সেখানে তখন আরেক মস্তি । ওপরে নীল চকচকে আকাশ , গালাটা ব্রিজের নিচে চকচকে নীল মারমারা সাগরএই নীলের ক্যানভাসে ছোট্ট ছোট্ট সাদা ফেনার ঢেউ , ছোট বড় স্টিমার জাহাজ ,দূরে দূরে লম্বা লম্বা মিনার , কিন্তু সব্বাইকে ছাপিয়ে গেছে ব্রিজের ওপর দিয়ে ঝুলে থাকা রাশি রাশি ছিপ । অদ্ভুত মেছো গন্ধে চারদিকটা ভুরভুর করছে । মেছুয়াদের চাঁদের হাট । পোকা, কেঁচো , মাছের টোপ । গলা খেলিয়ে খেলিয়ে গানের তানকারি করার মত ছিপ খেলিয়ে খেলিয়ে মাছের পকড় আনাও একটা সাঙ্ঘাতিক ক্লাসিক্যাল ব্যাপার । বড় মাছ ধরা পড়লে ভালো , ছোট মাছ গুলো ওরা ছুঁড়ে মারছে আকাশে , ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে সি গালের দল । মাছ , পাখি , মেছুয়া , বড়শি ফাতনা ,পাশে আবার লেবুর রস নুন দিয়ে শামুক গুগলির ফাস্টফুড কিয়স্ক । আমরা খুব খানিকটা মজা দেখে , এর পাশে ওর পাশে খানিকটা দাঁড়িয়ে , দু একটা মন্তব্য দু এক ফালি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে ব্রিজের নিচে নেমে যাই ।





 সেখানে দেখি  সার সার খাবারের দোকান । সবাই প্রায় হাত পা ধরে ইন্দিস্তানি  ইন্দিস্তানি বলে মাছ খাওয়াতে চায় । এর মধ্যে একটা লোক বন্ধুবরের দিকে এগিয়ে এসে বলল ব্রাদার ,আমার নাম তুমি ভুলে গেছ , তাকিয়েও দেখলে না পর্যন্ত । আমি কিন্তু তোমাকে ভুলিনি । এসো ভাই , খাবে এসো । ভালো চিংড়ি এনে রেখেছি । এসো বসো । আমরা বললাম আমাদের অলরেডি খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছে । পরে আসবো কেমন? লোকটা এসে বন্ধুবরকে জড়িয়ে ধরে বলল নিশ্চই আসবে । তুমি ভুলে গেলে কি হবে, আমি যে ভুলিনি ভাই ।
 আহা ! নাটক দেখে মন জুড়িয়ে গেল । হোক না নাটক , দরদ খানা দেখার মত । বন্ধুবর মাথা চুলকায় । কপালে ভাঁজ , চিন্তায় পড়েছে মনে হচ্ছে ।  ইতিমধ্যেই দুয়েকটা ট্যাক্সি ড্রাইভার বন্ধুবরকে ইরানি বলেছে । কাপাদোকিয়ার আজুরে কেভের মালিক ফারহাদ বলেছে তুমি আমার এক নিকট আত্মীয়ের মত দেখতে কিন্তু । সে কে , জিগ্যেস করায় বলেছিল, আমার শ্বশুর । কোনিয়ায় গাইড আহমেটকে দেখতে প্রায় বন্ধুবরের বাবার মত । তাই সে তার উৎস নিয়ে একটু ধন্ধে পড়ে গেল , মনে হল ।
হঠাত শুনি বোস্ফোরাস বোসফোরাস বলে কারা হাঁকডাক লাগিয়ে দিয়েছে এমিনোনু  স্কোয়ার থেকে বোসফোরাস ক্রুজ শুরু হবে । ভরন্ত বিকেল । চারদিকে যেন উৎসবের রোশনাই  । আমরাও টিকিট কেটে মিনি জাহাজের ছাদে চড়ে বসলুম । রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে চারদিক  । নীল জলের রোদ মাখা  কুড়মুড়ে হাওয়া । উড়ে যাচ্ছে চুল , গলার উড়নি । মিনি জাহাজ বেশ খানিক পরে সময় মত ছাড়লো । আমার পাশে বসেছেন এক মহিলা , কি যেন বলছেন । আমি বললাম , নো তুরকিশ, ওনলি ইংলিশ । মহিলা কাকে একটা ডাকলেন , একটা সোনালি রঙ করা লম্বা চুল এসে হাজির । সেই মেয়েটা এক্কেবারে আজকের মেয়ে । সার কথা হল পাঁচ জন মহিলার একটা গ্রুপ এরা । সবাই এক পরিবারের । এরা থাকে তেহরানে । ইরানে সব জিনিসের  খুব দাম  । তাই সস্তার বাজার হাট করতে আমরা যেমন লেকটাউন থেকে হাতি বাগান যাই , এরা তেমনি মাত্র তিন ঘন্টার ফ্লাইটে তেহরান  থেকে ইস্তানবুল এসেছে । হপ্তা খানেক থাকবে । তারপর ফেরত । ইরান যেতে চাই শুনে বলল , চলে এসো , আরে দারুণ লাগবে । তবে হ্যাঁ , মাথাটা ঢেকে রাখতে  হবে ।  সমুদ্রের হাওয়ায় শঙ্খ চিলের মত উড়ে যাচ্ছে তার সোনালি রঙা খোলা চুল,  রঙচঙে সানগ্লাসে উপচে পড়ছে ক’দিনের লাগাম ছাড়া আনন্দ ।আহা , দেশে ফিরে গেলে এই সাধের চুল ঢেকে রাখতে হবে ।  সেলফি উঠছে পটাপট । ইনিবিনিইনিবিনি করে মহিলা কিছু বললেন , পেস্তা ভরা হাত এগিয়ে এলো । মেয়েটা বলল আমার দাদু একটা ইন্ডিয়ার গান  গাইতো , ইচক দানা বিচক দানা , দানে উপর দানা ইচক দানা । পাঁচ টা কৌতূহলী মুখ আমার দিকে চেয়ে । গানটার মানে কি বলতো ?
ইচক দানা বিচক দানা,  দানে উপর দানা  ইচক দানা/ ছজ্জে উপর লড়কি নাচে , লেড়কা  হ্যাঁয় দিওয়ানা ।
 আমি মানে  করে করে বলছি আর মেয়েটা ইনিবিনিইনিবিনি করে তর্জমা করছে । আর পাঁচটা মুখ খিল খিল করে হেসে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে , যেন টিউলিপ বাগানে বাতাস বয়ে গেল মহিলা বলে দিলেন ইরানে গেলে  কোথায় কোথায় যাবো । সিরাজ , ইশফাহান , পারসেপোলিস । কোনো প্রবলেম নেই তো ? মেয়েটা হেসে কুটোপাটি, প্রবলেম ? হোয়াত প্রবলেম ?
দুদিনের প্রমোদ । ফুলের বনে যার পাশে যাই, তারেই লাগে ভালো । দুদিন পরেই ইরানে বোমা ফাটল ।
একদিকে এশিয়া অন্যদিকে ইওরোপ । বসফোরাসের দুদিকে চোখ জুড়োনো একের পর এক ছবি। আমার মাথার ভেতরে আওয়ারগির জোনাকি । বুকের মধ্যে তোলপাড় ।







গাইড মেসুট  বলেছিল ইভিল আই এর কথা ।তুরস্কে নেমেই দেখবে তোমাকে কারা যেন সবসময় দেখছে । ভালোর জন্যই দেখছে অবিশ্যি  । ওরা ইভিল আই । আজকাল আবার শুনতে পাই, গ্রিকদের মত ওদেরও ইভিল আই আছে । মেসুদ টিপ্পনি কাটে , তবে আমি বলি কি ? তুর্কি ইভিল আই, গ্রিসের চেয়ে ইভিলকে বেশি ঠেকাতে পারে!
রঙ্গরসিকতায় তুর্কি দের জুড়ি মেলা ভার । বাঙালিদের মত । তার ওপর দুধ ছাড়া তুরকিশ চা ,আমরা যার প্রতি ভক্তিতে একেবারে ভেসে গেছি । এক্সট্রা মালাই মারকে ,ইলাইচি চায়ের পায়েস খেতে হচ্ছে না ।

সারাদিন পর্যটনে পা টন টন । অসাড় ঘুম । পরদিন সোজা তোপকাপি প্যালেস । হয়তো বিপুলায়তন নয় কিন্তু মারাত্মক  গ্ল্যামার ।  রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ভালো । অটোমান সুলতানদের প্রাসাদ । এখানে হজরত মোহম্মদের দাঁত আরও অনেক দুষ্প্রাপ্য জিনিশ পত্র রাখা আছে । আমিতো প্রাসাদ সৌন্দর্যের প্রেমে তখন পাগল  আওয়ারা । 









 আবার প্রশস্ত চাতাল থেকে গোল্ডেন হর্ন দেখা যায় , মারমারা  বোসফরাসের নীলে নীলে  প্রাসাদের সাদা বারান্দায়  সোনালি নীল সবুজ সেরামিকের নকশায়  নকশায় স্বপ্নের জাল বুনে তাকে রেখে এসেছি । কেউ তাকে ভেঙে দিও না । ছিঁড়ে  ফেলো না । আমাদের ভালোবাসাগুলো বেঁচে থাক । আমাদের স্বপ্ন গুলো বেঁচে থাক । আমরা যেন আবার অবাক হতে পারি , বিস্মিত হতে পারি , ভালবাসতে পারি ।এমনই সুন্দর থাকো , শহর আমার !
 “ থেঁৎলানো ফুল ,আইসক্রিমের ওপর রক্তের ছিন্টে ... গোলাপ বাগান জ্বলছে,সেখানে, ট্যাঙ্কের তলায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আরব্য রজনীর বাঁকা চাঁদ “,আমাদের যেন দেখতে না হয় ।




কবিতা নাজিম হিকমত 

ছবি লেখক