Sunday, 16 April 2017

খিড়কি রহস্য

দিল্লি যেন বুঢঢি বেগমসাহেবার হিরে জহরতের তিজোরি । সিন্দুকের পাল্লা খুললেই রাশি রাশি গয়না । তবে কিনা বেগম বুড়ো হয়ে গেছেন । চোখেও দেখেন না , কানেও শোনেন না , মাথার শাদা চুল সব জট পাকিয়ে গেছে । চলতে ফিরতে পারেন না । কোন রকমে এলিয়ে পড়ে আছেন । বাঁদি বান্দা খাদিম খিদমদ্গার সব ব্যাটা পালিয়েছে বুড়িকে ফেলে । গয়না গাটি গুলো ধুলো ময়লা ঝেড়ে সাফ সুতরো না করলে তাদের চেকনাই আসবে কেমন করে । আবার ব্যাবহার না করায় কোনোটা এক্কেবারে ভেঙে গেছে , রঙ চটে গেছে , মনি মুক্তো পাথর সব খসেখসে পড়ে গেছে । কাজেই ভালো ভালো জড়োয়ার গয়নাগাটি গুলোর দেখভাল কোনরকমে হলেও চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কতো যে পড়ে আছে তার হিশেব রাখা অসম্ভব । সে রকমই একটা আড়ালে লুকিয়ে থাকা জায়গা দেখলাম। খিড়কি মসজিদ । মানে জানালাওয়ালা মসজিদ । অনেক জানালা আর জালির কাজ ।মসজিদের চারদিকে গিজগিজে মহল্লা । উঁচু উঁচু বাড়ি । কাশীর মতো গলি । গলির গলি তস্য গলির এইরকম একটা ঘেরাটোপের মধ্যে কি অদ্ভুত একটা কাঠামো দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে । কেউ পাত্তাও দেয় না ।

মসজিদ, কিন্তু মসজিদের মতন একেবারেই দেখতে নয় । দেখলে মনে হয় দুর্গ । আকারে প্রকারে মাঝারি মাপের একটা দুর্গ । তুঘলকদের বেগমপুর মসজিদও তাই । চাকচিক্য লাবণ্য তুঘলক জমানায় আসেই নি । শুধু কেজো ব্যাপার । কাঠখোট্টা । ধর্মস্থানকে নিরাপত্তার জন্যও ব্যাবহার করার জন্যও কি? বাইরে থেকে,পাশ থেকে দেখলে হঠাত করে কেমন যেন লন্ডনের টাওয়ার হাউস মনে হয় । ভেতরে অসংখ্য খিলানের ভুলভুলাইয়া । আর জালির কাজ । আর মনে হয় অজস্র গল্প কিলবিল করে খিলানে খিলানে জালিতে জালিতে জড়িয়ে আছে । ধর্ম শক্তি বরাবরই রাজশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে । কিন্তু সমগ্র মধ্যযুগ চিহ্নিত হয়ে আছে ধর্ম আর রাজশক্তির আঁতাতে । ধর্মীয় ভাব থেকে ষড়যন্ত্র গা ছমছমে খুন খারাবির কথা কেমন যেন মনে হচ্ছিল । এটা বানিয়ে ছিলেন ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রধানমন্ত্রী । এমন ঢাকাঢুকো মসজিদ আমাদের দেশে প্রায় নেই বললেই চলে । জামা মসজিদের সাজ সাজাওট কিছুই এর নেই । একজন জাঁদরেল সেনাপতির মতো মাথা তুলে সময়কে টুসকি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে যেন । কিন্তু কি আশ্চর্য লোকজন কেউ ই প্রায় বলতে পারছিল না এর কথা ।







পড়ন্ত বিকেলের আলোয় সে কেমন বিষণ্ণ ভাবে আমাদের দিকে তাকালো । ভেতরে ঢুকে ভুলভুলাইয়ার গোলকধাঁধায় মনে হচ্ছিল হারিয়ে যাব । জালি দিয়ে তেরছা হয়ে পড়ছে ম্লান রোদ্দুর । ঝাঁক ঝাঁক পায়রার উড়োউড়ি । কি হত এখানে !এতো বড় মাপের দুর্গের মতো মসজিদে?

মির্জা নজফ

সেটা ছিল দুঃস্বপ্নের রাত । দুর্যোগ আর দুর্ভাগ্য । ইসফাহানের (পারস্য) সাফাভি রাজবংশ ছারখার করে দিল নাদির শাহ । এই রাজপরিবারের ছেলে মির্জা নজফ কাউকে বাঁচাতে পারেন নি ঠিকই ,কিন্তু তার ছিল রাজপরিবারের রক্ত, যোদ্ধার রক্ত ।সে জন্ম যোদ্ধা । থামতে সে শেখেনি । পারস্য থেকে তাকে তাড়িয়ে দিল নাদির শাহ । রাতভোর জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে একরাশ অনিশ্চিতি মাথায় নিয়ে সাফাভি রাজ সন্তান পৌঁছলেন বালুচিস্তান । সেখান থেকে আওয়াধ । তুখোড় বুদ্ধির জোরে অনেক অনেক ওপরে উঠলেন । আওয়াধ তখন রমরমিয়ে চলছে দিল্লির ওপরে তার খুব প্রভাব
দিল্লিতে এলেন মির্জা নাজাফ । ১৭৬৪ সনে বক্সার যুদ্ধে তাকে দেখা গেলো । তখনও তিনি আওয়াধের ,তবে লড়াই করেছিলেন মোঘল পতাকার সম্মানে। মোঘল সাম্রাজ্য তখন ধ্বসে পড়ছে ক্রমশ । মির্জা নজফ হলেন মোঘল সেনাবাহিনীর প্রধান । কমান্ডার ইন চিফ । ৯০ হাজার সুদক্ষ সেনা আর ২৫০ টা কামান তার দখলে । দ্বিতীয় শাহ আলম তখন সম্রাট। নজফের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ভেঙে পড়া মহলের ফায়দা লুঠতে চান নি । কলাটা মুলোটা রত্নটা পোখরাজটা জায়গিরটা না হাতিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে নানান কলা কৌশল এনেছিলেন । অনেকটাই ইওরোপিয়ান ধাঁচে । বন্দুক গোলাগুলি এইসব নিয়ে । তখন ব্রিটিশদের থেকেও বড় শত্রু ছিল ঘরে । রোহিলা জাঠ আর শিখ । নজফ যতদিন বেঁচেছিলেন শাহজাহানাবাদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দেন নি । এদের উৎপাত থেকে রাজধানীকে নিরাপদ রাখতে তিনি শাহজাহানাবাদের কিছু দূরে নজফগড় দুর্গ তৈরি করেন । এখন অবশ্য সে সব ভেঙ্গেচুরে গেছে । সাম্রাজ্য ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে । বিপদ ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়ছে । সেনাবাহিনীর মনোবল যাতে না ভেঙে পড়ে , তারা যাতে বিদ্রোহী না হয়ে ওঠে মির্জা নজফ তার জন্য খুব সচেতন থাকতেন ।
মির্জা নজফ বালোচ , মোঘলদের শেষ প্রতাপশালী কমান্ডার ইন চিফ ।
কী নিরাভরণ তার মকবারা । অনেকে বলেন তখন ভাঁড়ে মা ভবানী । কাজেই অত ইলাহী কাজকারবার করা সম্ভব ছিল না । 

প্রশস্ত চারকোনা মকবারা । কোন মিনার নেই , গম্বুজ নেই । সবুজ সবুজে মাখা মাঠে দোল খাচ্ছে অজস্র মরসুমি ফুল । কাঠবেড়ালি । ছোট সিমেন্টের বসার জায়গা কানের মধ্যে ফিসফিসিয়ে বলছে, বোসো । যারা ভিড়ভাট্টা পছন্দ করেন না , তারা আসুন না এখানে । কি নিরালা , কি শান্ত । মির্জা নজফ বালোচ যেন বলছেন , অনেক যুদ্ধ করেছি অনেক রক্ত ঝরেছে । সেই সুদূর ইস্ফাহানের ঘর ছেড়ে কতো পথ ঘুরে বড় ক্লান্ত । এখন ঘুমুব ।



কতো মানুষের কান্না হাহাকার পরাজয় আর অপমান
আহা কতকাল ঘুমোয়নি সে
আজ সে ঘুমুবে ,আমার মোমবাতি



কবিতা বাসুদেব দেব


মন ফকিরা

হাম্মামে দেরি গিয়েছিল আজ ।  গুগগুলের ধোঁয়ায় চুল শুকোনো হয়ে গেলে জান্নি একটা স্ফটিকের গ্লাসে টুকটুকে লাল তরমুজের রসে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছেন আর সামনে খোলা বিরাট নক্সাটায় একটু একটু অদল বদল করছেন । এই শখ টা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে । নিছক শখ বলা বোধহয় ঠিক নয় । একে প্যাশন , তীব্র আবেগ বলা বরং ভালো । ভালো ছবি স্থাপত্য শিল্পকলায় রসবোধ ও রুচি বাবাই দিয়েছেন কিনা !
যাক, এতোদিনের চেষ্টা তার সফল হতে চলেছে । চকের মধ্যিখানে একটা বড় জলাধার , তার থেকে বেরিয়েছে ছোট ছোট খাল । চাঁদনি রাত, ঝিকমিকিয়ে উঠবে খালের জলে, যেন বিবিজানের মাথার হিরের তাজ ।মহতাব । লাগানো হবে সারি সারি গাছ । তার .মধ্যে মধ্যে অর্ধচন্দ্রাকারে দোকান বসবে নানান পশরা সাজিয়ে । শাহজাহানাবাদের সবচেয়ে বড় বাজার । চাঁদনি চক । বাদশা বেগম সাহিবা জাহনারার স্বপ্ন । জান্নি শুধু চাঁদনি চক করেই থেমে থাকেন নি ।শাহজাহানাবাদের অনেক সুন্দর প্রাসাদ আর স্থাপত্য তার কল্পনা থেকে জন্ম নিয়েছে । অসম্ভব সুন্দর একটা বাগান বানিয়েছিলেন , বেগম কা বাগ । সেখানে রাজপরিবার আর বড়বড় আমির পরিবারের মহিলা আর শিশুরা গাছপালা ফুল ঝর্নার মধ্যে হেসেখেলে বেড়াত ,ঝুলায় দোল খেত, গান গাইত । আজকাল যে রকম হস্তশিল্প মেলা হয় সেইরকম মেলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জান্নি , পাঙ্খো কা মেলা । জামা কাপড় খাবার দাবার শৌখিন জিনিশের রকমারি সম্ভার সাজিয়ে বসা পুরোদস্তুর মেলা শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য । সাহিবি নামের একটা জাহাজের পুরো নক্সা করেছিলেন জাহানারা । সেই সময়ে ভাবা যায়!
এমন নাজনিন কবি , বিদুষী , গুণবতী দিলদরাজ ও দিলনশী বেগম সাহিবা , তার প্রণয় প্রার্থী থাকবে না তাও কি হয়? বেচারা শিবা আবাদ পারভেজ পারস্য থেকে এসেছিলেন শাহজাহানের সভায় । রাজকুমারীকে এক ঝলক দেখবার জন্য বোরখা পরে ঢুকে গেলেন বেগম কা বাগে । জাহানারার রূপ মাধুরী বর্ণনা করে একখানা শায়েরিও নামিয়ে ফেলেছিলেন ,কিন্তু ধরা পড়ে গেলেন খোদ বেগম সাহিবার হাতেই । তাকে কিছু সোনার মুদ্রা দিয়ে তখনই চলে যেতে বলেন জাহানারা । কিন্তু তার বাপের কানে কথাটা ঢুকতে কতক্ষণ? আর তার ফলে পারভেজ পাত্তারি গুটিয়ে আবার পারস্যে ।
প্রেমিকেরা সব লুকিয়ে চুরিয়ে আসত , মেহফিল মৌসিকি আশিকি সিরাজি সবই ছিল অফুরান ভরা পেয়ালা ।এক প্রেমিককে তো শাহজাহান বিষ মেশানো খাবার দিয়ে তার ইহলীলা সাঙ্গ করান , আরেক প্রেমিক তো ভয়ের চোটে বাথটাবের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে , কিন্তু বাপের ঝানু চোখ এড়ানো অত সহজ হয়নি । জাঁদরেল আব্বু হুকুম দিলেন ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দাও । আবার ইহলীলা সাঙ্গ । ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়া বারনিয়ে আর ইটালির পর্যটক নিকোলো মানুচ্চি কিছু কিছু লিখে গেছেন এই প্রসঙ্গে ।মেয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত কট্টর ছিলেন, যাকে বলে কিনা পসেসিভ । তবে মদিরামোহ ছিলো বিবিসাহিবার । উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারতেন না , টলে টলে পরে যেতেন । জীবনের সফেন সমুদ্র আকন্ঠ পান করতে এসেছিলেন তিনি , তাতে নানা রঙের মিশেল ছিল ,বিষাদ ছিল , প্রেম ছিল , রাজনীতি ছিল , ছিল দরিয়ার মতো হৃদয় ,আকাশের মতো ব্যাপ্ত ঔদার্য ।
 
সে যাই হোক , এরকমই এক প্রেমিকের সঙ্গে ছদ্মবেশে ঘুরছিলেন বেগম সাহিবা । পর্যটকদের , ভিনদেশীদের এই শহরে থাকা খাওয়ার হাল হকিকত খানিকটা মালুম হল তার । জাহানারা যাই করেছেন সারা জীবনে, সকলের ভালোর জন্যই করেছেন । গড়ে উঠল সরাইখানা , জাহানারা সরাই । এমন ভাবেই তৈরি করেছিলেন অনেক মাদ্রাসা , চালচুলোহীন লোকদের জন্য আশ্রয় । জান্নির বেইনতাহা ইশক আর মোহব্বতের ছায়ার তলায় ছিল অনেক অনেক মানুষ ।


আব্বাহুজুর , আয়নায় আপনার চেহারা দেখেছেন? কতো বুড়ো হয়ে গেছেন মাত্র এই কদিনে? “ বাবাকে যত্ন করে আরামকেদারায় বসিয়ে হারেমের খুঁটিনাটি কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো সতেরো বছরের জান্নি ।
সেদিন কমলালেবু রঙের রোদ লুটোপুটি খাচ্ছিল প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে । চবুতরায় দানা খাচ্ছে পায়রার দল । কিন্তু প্রাসাদ থমথমে । হারেমের সক্কলে , দাসী বাঁদি সবাই নিঃশ্বাস চেপে অপেক্ষা করছে । সূতিকাঘরে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মুমতাজ মহল । হেকিমসাহেব বেরিয়ে এলেন , কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠলো চলি মুমতাজ জন্নতাবাদচোদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মুমতাজ মারা গেলেন । শাহজাহান ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন । আর বেরোলেন না । এই একটি মৃত্যু সতেরোর কিশোরীকে হঠাত ই এক লহমায় একটা পোক্ত কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিল । বাবার অন্য বেগমরা থাকলেও তাকেই দেওয়া হল সাম্রাজ্যের ফার্স্ট লেডি বা পাদিশাহ বেগমের সম্মান। প্রচুর সম্পত্তি এল , এল তার নিজের সীলমোহর । আব্বাহুজুর তার মতামতকে সম্মান করতেন ।তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান । মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বিগ্ন থাকতেন সম্রাট । দায়িত্বও কিছু কম ছিল না জাহানারার । প্রত্যেকটা খাবার তার নজরদারিতে বানানো হত । বিরাট হারেমের প্রায় সমস্ত কাজ রান্না বান্না ,জামাকাপড়, লেখাপড়া সব কিছুই তাকে দেখতে হত । 


জাহানারা আর দারাশিকো দুই ভাই বোনই সুফি সাধনা করতেন , দুজনেই কবিতা লিখতেন । দুজনেই একে অন্যের সহমরমী ছিলেনআজমের শরিফে জন্ম হয়েছিল জাহানারার ।
তার জীবন দেখেছে উপচে পড়া বিলাস আর শৌখিনতার । বেহিসাবি প্রাচুর্য । কিন্তু সেই রঙিন ফোয়ারায় খেলা করা এক ঝাঁক রঙিন মাছের মধ্যে একটা শূন্য বুদবুদ , স্ফটিক স্বচ্ছ । এক নিঃসীম বেদনার মুক্তো । সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে, চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগেসেই সহজিয়া অনুরাগ খুঁজে নেয় সুফি মরমিয়া সাধনার পথ ।
তিনি নিজের জীবনী লিখে গিয়েছিলেন আর সেটা আশ্চর্য ভাবে চলে আসে প্রায় দুশো বছর পরে এক বিদেশিনী পর্যটকের হাতে । সময় রাজনীতি ধর্ম কবিতা ছাড়াও সেই লেখায় একনিষ্ঠ ব্যর্থ প্রেমের করুণ হাহাকার !
 অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা / সে ভুলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে / আমি ভুলিব না আমি কভু ভুলিব না

কে সেই প্রেমিক?

Saturday, 15 April 2017

মছলি বিবি

রে সেদিন এক কান্ড ! সক্কালবেলার নরম রোদ আর বেশ ঠান্ডা হাওয়ায় লোধি গার্ডেনে তো মোচ্ছব বসে গেছে । লোকজন  হুপহাপ  হুপহাপ করে হাঁটছে , ঝোপের ধারে একপাল নারী পুরুষ মাথার ওপর হাত তুলে হো হো করে হাসছে, সেই হাসির গমকে  ভয় পেয়ে এক ঝাঁক টিয়া  ছোলার দানাটানা  ফেলে ঝটপট উড়ে পালিয়ে গেলো , ওদিকে দুটো শালিক ,তিনটে পায়রা কাঠবিড়ালির সঙ্গে খুনসুটি করছে , বড়া গুম্বদের সামনে ইয়োগা ম্যাট বিছিয়ে আরেক দল ব্যায়াম করছে । কোথা থেকে আবার একটা বাঁশির  মধুর সুর ভেসে ভেসে আসছে । তাকে হ্যামলিন ভেবে নিয়ে আমি খুঁজতে বেরুলাম । বাঃ দেখেছ , এমন রসিকও আছে , সকালবেলায় বাঁশিতে ভৈরবী বাজিয়ে বাজিয়ে  লোধিদের এবং তাদের দাদা, পরদাদা, মৌলভি , মুন্সি যারাই মাটির তলার ঘুমিয়ে আছে তাদের ঘুম ভাঙাচ্ছে ! হঠাত এক লম্বা লাল গাউন আর স্যুট কোট  কোথা থেকে উদয় হয়ে নানান রকম ভঙ্গিতে ( সবটাই খুব নান্দনিক বলা যাবে না) ছবি তুলতে লাগলো । আস্তে আস্তে আরো চোখে পড়লো লেহেঙ্গা চোলি শেরওয়ানি । আমি চিরকালের বাঙাল , ধীরে ধীরে  বুঝলাম ফোটো তোলা হচ্ছে , প্রাক বিবাহ । ওই বাঁশি টা ওই প্যাকেজের মধ্যেই ঢোকানোঅতখানি গদগদ হবার কোন কারণই ছিল না ।  খানিক দূর এগিয়ে দেখি এক মিনিস্কার্ট স্ফীতোদরা  ঘুরে ঘুরে পোজ দিচ্ছেনইনি শিগগিরি মা হতে চলেছেন । সব কিছু ধরে রাখতে হবে যে  । কিছুই অমৃত নয় তবু চাই সব ।
একই রঙ্গমঞ্চে মাজি হাল মুস্তকবিল বা বিষ্ণু দে ধার করে  স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যতের নাটক দেখতে দেখতে আমি একেবারে হাঁসেদের মধ্যে  বকের মতো গিয়ে হাজির হলাম । সেখানে একটা বুনো সোঁদা জোলো গন্ধ । একটা ঝোপঝাড় । আর সেইখানে একটা হাত , নগ্ন নির্জন নয় , গম রঙা , মেহেন্দি লাগানো , রুলি রুলি চুড়ি ,সোঁ করে কোনখান থেকে বেরিয়ে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলদিল্লি খারাপ জায়গা সবাই বলে।  আমি ভয় পেলাম । খুব ভয় । মুখে  বললাম , মানে হিন্দিতেই বললাম

“ কি হচ্ছে কি? লোক ডাকবো ? দিনে ডাকাতি করবে নাকি? আমি কিন্তু বরিশালের মেয়ে। এমন দোবো না“? ফস করেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো, জানেন?
তাকিয়ে দেখি ধানি রঙের ওড়নায় মুখ ঢাকা ।ওড়নার ভেতর থেকেই বলল
জানি , আমিও অইখানকারি ।
ওমা , এযে বাংলা বলে ?
তুমি বাঙালি?
হ্যাঁ তো ।
তা আমি বাঙালি বোঝলা কি কইরা?
বোঝোন যায়মাছের গন্ধে ।
অ্যা ই , বাজে বোকো না ।  কি দরকার তাই বোলো , নাম কি ? কোথায় থাকো ? হাত টা চেপে ধরে আছ কেন?
আমার নাম মছলি বিবি , থাকি এখন লাল কেল্লায় । আপনার লগে কাম আসে, শোনেন না?
বাঁদরামি হচ্ছে ?  লাল কেল্লায় থাক? মছলি বিবি ? এই, তোমার মতলব কি বলতো? আমার আছে কোন পয়সা কড়ি নেই কিন্তু ।
শোনেন না , আপনি তো লখনউ যাচ্ছেন । আমার হাতের চুড়ি , এই দেখুন কেমন ভেঙে ভেঙে গেছে , যাবে না? কতো কতো দিন হয়ে গেলো!
আমি লখনউ যাবো তুমি কি করে জানলে ? আর চুড়ি  দিল্লিতে পাওয়া যায় না ? ন্যাকামি হচ্ছে ?
আমি কি জানি, আর কি জানি না  অত জিগাইবেন না । এই দ্যাহেন , এই এমন চুড়ি এখানে পাবেন না ।  এটা পাওয়া যায় গড়বড়ঝালায় ।
আবার বানিয়ে বানিয়ে  কথা? এই , সব কথা খুলে বল তো । হেঁয়ালি ছেড়ে সোজা সাপটা

সাপ টাপ আনেন কেন? আমাগো দ্যাশে তার বড় উৎপাত । ডর লাগে ।
উফ, আমাকে অফিস যেতে হবে , তোমার গুলতাপ্পি যা বলার বলে ফেলো । আর তাড়াতাড়ি আমাকে ছেড়ে দাও দিকি  ।

ধানি ওড়নার ফাঁকে সে মেয়ে বলতে থাকল তার কথা ।

সেদিন বাবার জন্য পান্তা ভাত , মাছ ভাজা একটা বাটিতে গুছিয়ে ঠাণ্ডা  গামছায় জড়িয়ে চাষের খেতে নিয়ে যাচ্ছিল সে । দূর থেকে সেই সবুজ ধানি মাঠে নদীর হাওয়া খেলে বেড়াচ্ছিল । দুলকি চালে  চলছিল , আলগা খোঁপা খুলে গিয়ে এক ঢাল চুল তার পিঠ ছাপিয়ে পড়লো , পা বুঝি সামান্য টাল খেলো , বুকটা কেন তিরতির । বাঁ চোখটা কেন কাঁপে!  চোখের সামনে একরাশ ধুলো । ধুলোর ঘূর্ণি । ঘোড়ার খুড়ের খটাখট । মাথার খোলা চুলে মুঠি পাকিয়ে কে যেন টানে ! কে যেন তুলে নেয় ঘোড়ায় ।  ছিটকে পড়ে মাছ ভাজা , পান্তা ভাত । কিছু মনে নেই । আর কিছু মনে নেই ।
একটা খুব সুন্দর মহল ।  যত্নের কোন অভাব নেই । তাকে বিশেষ তালিম দেওয়া হচ্ছে নবাবের জন্য । গান । মৌসিকি । ধীরে ধীরে নবাবের সঙ্গে আশনাই । মানুষটা বড় ভালো , কিন্তু খাবারের বড় কষ্ট । মাছ ছাড়া সে খেতে পারত না । এরা শুধু মাংস খায় ।
তাদের গ্রামে কত মাছ , ন্যাদোশ , পুঁটি , কালবোস , খলশে, শোল , চিতল মৌরলা দুটি ভাত মাছ এইতো ছিল  খাওয়া । স্বপ্নের মধ্যে মেঘ হয়ে ভেসে যায় তার গ্রামে । খড়ের চালে  দু ফোঁটা চোখের জল ফেলে আসে । এখানে নবাবের হুকুমে তার জন্য তালাও থেকে  মচ্ছি জোগাড় হয় । সে ভারি ঝঞ্ঝাট । এরা আবার রাঁধতে জানে না । পেঁয়াজ রসুন মশল্লায় ,মাগো! কান্না পায় । এরা শুধু জানে জায়কা , খুশবু আর পেশকারি । আর  তার মা এইটুকুনি তেলে কালো জিরে কাঁচা লংকা দিয়ে রাঁধত ,  যেন অমৃত
নবাব তাকে মজাক করে মছলি বিবি বলে ডাকে । মছলি বিবি ডাগর কালো চোখ এক ঢাল চুল আর  গমের মতো রঙ , গ্রাম বাংলার নয়নতারা ফুল এখন  নবাবের নয়নমণি ।  সে জেনেছে জায়গাটার নাম ফইজাবাদ । চারদিকে গোলাপের মেহেক  । কতো সুখ তার চারদিকে । একদিন নবাব তাকে খুব বড় একটা প্রাসাদের সামনে নিয়ে হাজির করে , বলে , দিলদার , চোখ তুলে দেখ ! মছলি বিবি দেখে প্রাসাদের গায়ে সুন্দর সুন্দর মাছের নক্সা ।
দেখ বিবি ,চোখ ভরে মছলি দেখ । তোমার জন্য আমাদের সব সব জায়গায় এই মছলি থাকবে । তোমাকে মনের মতো মাছ খাওয়াতে পারছি না , কিন্তু বুঝতে তো পারি তোমার কষ্ট ।

আমি মাঝপথে থামিয়ে বললাম , গুল দেবার জায়গা পাও না? মাছ একটা শুভ চিহ্ন । শুধু আমাদের কেন অন্য অনেক দেশে , অনেক ধর্মে ।  তা ছাড়া আমি তো পড়েছিলাম নবাব যখন নদী পার হচ্ছিলেন তখন তার কোলে দুটো মাছ ঝাঁপিয়ে পড়ে । তাকে শুভ মনে করেই এই কাজ । তাছাড়া নবাবরা এসেছিলেন ইরান থেকে , সেখানেও মাছকে শুভ মনে করা হয় ।
ধানি ওড়না  কিছু ক্ষণ চুপ করে রইল । তারপর আমার তাড়া খেয়ে বলল, যা যা পড় তার সবই সত্যি ? যা যা দেখ সবই সত্যি?  তাই কখনো হয় ? যে দেশ মাছের দেশ নয় সে দেশে মাছ উড়ে এসে জুড়ে বসল?  যে দেশ খাল বিলের নদীর নয় সে দেশের নিশানে মাছ এসে বসে গেলো? আসল কথাটা জানতে পেরে মেনে নিতে পারছ না ?
“ তা নয়, তবে খুব খটকা লাগছে তা , এখন বলে ফেলো কী বলতে এসেছিলে?”
“ রাজধানী চলে এলো ফইজাবাদ থেকে লখনউ । আমাদের খিদমত খাটত গফুর । সে আমাকে সরুসরু গালার চুড়ি এলে দিল । নবাবের সে  কী রাগ ! আমার কিন্তু ওই চুড়ি গুলো বেশ লাগত ।
আপনজন আপনজন লাগত। আদতে তো গরিব ঘরের মেয়ে ।
 এদিকে দিল্লির বাদশাদের সঙ্গে নবাবদের খুব খাতিরদারি শুরু হল দিন গড়িয়ে  চলল আর আমি হয়ে গেলাম খেলার মোহরা । গানের জন্য চালান হয়ে গেলাম মহম্মদ শাহ রঙ্গিলার কাছে। লখনউ ছেড়ে যাবার আগে গফুরকে দিয়ে কয়েক গাছি চুড়ি আনালাম আর নবাবের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে  গাইলাম “অ্যায় মোহব্বত তেরে আনজাম পে রোনা আয়া” ।
“ ভ্যাট , এই গানটা  অনেক পরে লেখা হয়েছে । লিখেছেন শকিল বাদায়ুনি  বেগম আখতার ,আরো অনেকে গেয়েছেন।”
ধানি ওড়না বলল , আর কথা বাড়িয়ে কী ই বা হবে ? তুমি তো কোন কথাই বিশ্বাস করবে না ।  তুমি যদি  কয়েকগাছি চুড়ি  এনে দিতে পারো  তো দাও আমি এইখানে এসে নিয়ে নেব




সত্যিই মাছের নক্সায় ছয়লাপ লখনউ এর অপূর্ব সব বাড়িঘর । কেশর বাগ , নহবত খানা ,  বড়া ইমামবাড়া , ছোটা ইমামবাড়া , সাদাত আলির মকবারা ,আরও নানান জায়গা । নবাবের সরকারি মোহরে মাছ , পতাকায় মাছ । ভারি ইন্টেরেস্টিংকোথাও আবার উড়ুক্কু মাছ ! নাহ , মছলি বিবি মাছের গল্প শুনিয়ে নবাবকে পাগল করে ছেড়েছিল দেখছি !

আমি কিন্তু নিজের অজান্তেই দোকানে ঢুকে গালার চুড়ির কথা জিগ্যেস করি । কেউ বোঝে না । একেবারেই না ।  হাবিজাবি জিনিস বের করে এনে দেখায় । শেষে থামের পাশে বসা এক খুনখুনে বুড়ো বলল ওই রকম চুড়ি পেতে পারো একমাত্র গড়বড় ঝালায় । আমি চমকে উঠলাম । আরে! এটা তো শোনা নাম ! কেন এমন নাম ? আরে মোহতরমা , সারা দুনিয়ার লোক ওখানে বাজার করতে যায় । এর জিনিস ওর জিনিসে মিশে যায় । ভিড়ভাট্টা ঠেলাঠেলিতে সব গড়বড় । তাই তো গড়বড়ঝালা ।
মছলি বিবি খুব ভালবাসত ওখানকার চুড়ি । লোকটা বিড়বিড় করে বলে ।
কি বললে ? আবার বোলো ।
কেয়া  মোহতরমা? কুছ তো  কাহা নহি ।



তখন দিনের শেষ আলো মেখে হজরতগঞ্জ মায়ামদির রাস্তার দুপাশে সাদা কালো সাইনবোর্ড আর সারি সারি বাতিদান এখানকার সিগ্নেচার মার্ক । রেস্তোরাঁর কাঁচ থেকে আবছা ছত্তরমঞ্জিল । ওখানেই কোথাও হয়তো মছলি বিবি থাকত, পাশে বইছে শীর্ণ গোমতী । গরমকালে তয়খানায় শুয়ে শুয়ে মৌরলা মাছের টকের কথা ভাবত হয়তো ।  
মুরগ মখমলি , গালাউটি কাবাব আর উলটে তাওয়া কি পরাঠার  সুচতুর মশলার মিশেলে গলে গলে পড়ছে ফয়েজের গজল ।
“গুলো মে রঙ্গ ভরে / বাদ এ নওবাহার চলে / চলে ভি আও কে গুলশন কা কারবার চলে “ ।
গায়ক দরদ ঢেলে মেহফিল জমিয়েছেন । যেমন জমাতো মছলি বিবি ।
 দিন যত গড়িয়েছে মাছ তত বেশি বেশি  নক্সাদার হয়েছে । ওয়াজিদ আলি শাহ্‌র আমলে সে আরও সুন্দর । মাছ থেকে সে তখন মৎস্য কন্যা । সত্যি ভারি অদ্ভুত শিরশিরে লাগছে ভাবতে ।

দিন ফুরোয় । আমিও ফেরত আসি । গড়বড়ঝালায় যাওয়া হয় নি, আনা হয় নি লাল লাল সরু  সরু গালার চুড়ি । লোধি গার্ডেনে যাই । কিন্তু ভুলেও আর হাঁসেদের দিকে যাই না ।


“পাথর,অসাড় নয় ভালবেসে ছুঁয়ে দেখ, তাকে ।

পাথর, পাথর নয়  বিগত জন্মের যত কথা
একাকী পথিক হয়ে ঘোরে ফেরে মহলে মহলে

প্রতিটি খিলান আর গম্বুজের মায়াবী চূড়ায়
প্রত্নস্বর তুলে আনে আলো জ্বেলে যতখানি সুর
সমস্ত তোমারি কথা
দু হাতে উজাড় করে ঢেলে দেয় নীল-কুয়াশায়

পাথর, পাথর নয়  বিগত জন্মের যত কথা
একাকী পথিক হয়ে ঘোরে ফেরে মহলে মহলে



নওবত খানা


গেট বড়া ইমামবাড়া


গেট ছোটা ইমামবাড়া


নবাবের পতাকা

নবাবের সিলমোহর






কবিতা  রেহান কৌশিক
মাছের অলঙ্করণ শুভ জোয়ারদার
ছবি  লেখক/গুগল


Sunday, 2 April 2017

মিয়াঁ বিবি


বিবির বয়স চোদ্দ আর মিয়াঁর বয়স তেত্তিরিশ । মিয়াঁ বিবি রাজি হলে কাজির কিছু করার থাকে না । কিন্তু এখানে ব্যাপারটা অত সোজা ছিল না । বিবির মন পেতে মিয়াঁ কে রীতিমত সাধ্য সাধনা করতে হয়েছিল । শের শাহ সুরির হাতে হেরে গিয়ে বাবার রাজত্ব হারিয়ে মিয়াঁ পালিয়ে পালিয়ে ঘুরছেন এখানে সেখানে । এমনই ঘুরতে ঘুরতে সিন্ধের থাট্টায় থিতু হলেন কিছুদিন । সেখানে এই কিশোরীর রূপ আর চঞ্চলতা তেত্তিরিশ বছরের বিদ্বান , প্রাজ্ঞ , কবি আবার রাজ্য থেকে উৎখাত পালিয়ে বেড়ানো সম্রাটকে একেবারে পাগল করে দিল । কিশোরীর মনে তখন তার স্বপ্নের রাজকুমার । ইয়া লম্বা চওড়া তায় আবার প্রায় বুড়োকে তার কিছুতে মনে ধরে না । তখন সে সুকুমার রায়ের লাইন গাইছিল বুড়ো তুমি লোকটি ভালো/চেহারাও নয়তো কালো /তবু কেন তোমায় ভালো বাসছিনে
বিবি হামিদা বানু আর মিয়াঁ হুমায়ুন । চেষ্টার কসুর করেন নি হুমায়ুন এই রূপসী কিশোরীর মন পেতে । আমি যার গলা জড়িয়ে ধরতে পারব না তাকে কি করে নিকাহ করব ? ওই অত উঁচু লম্বার গলার নাগালই তো পাব না । তার তো একটা সঙ্গী দরকার, সম্রাট নয় । হুমায়ুনের বোন গুলবদন বেগমও কিছু কিছু ঘটনা লিখে গেছেন হুমায়ুন নামায় । দিলদার বানো , হুমায়ুনের সৎ মা , হামিদাকে বিস্তর বোঝালেন যে বুড়োটা কিন্তু সত্যি সত্যি খারাপ লোক নয়। দুষ্টু নয় । মানুষ টা বেশ ভালো । শায়েরি ,সিরাজি আর আফিমে একটু বেশি ভালোবাসা । 

এতোটাই ভালো যে শের শাহ সুরি তার সেনাপতি আর ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে ,তার শত্রুকে কোনোমতেই মেরে ফেলা যাবে না । শত্রু হলেও তিনি হুমায়ুনকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন ।
হুমায়ুন নানা বিষয় পড়াশুনো করতেন । তার মধ্যে জ্যোতিষে তাঁর প্রবল আকর্ষণ । দিন ক্ষণ চুলচেরা হিশেব করে হামিদা বানুকে বিয়ে করলেন হুমায়ুন । তাদের ঘরকন্নার বয়স মাত্র পনের বছর । এই পনেরো বছর চূড়ান্ত অস্থিরতা তাদের কোথাও থিতু হতে দেয় নি । পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন হুমায়ুন , সঙ্গে হামিদা । আকবরের জন্মও হয়েছে এই অশান্ত সময়ে ।
সিন্ধ , কান্দাহার পারস্য সব জায়গায় সঙ্গে ছিলেন হামিদা । জঙ্গলে জঙ্গলে লুকিয়েছেন , মরুভূমির মধ্যে তেষ্টার জল পান নি , ভাল করে হাম্মাম করেন নি কতদিন । দিনের পর দিন কঠিন কষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন হুমায়ুনের সঙ্গে । কোনো আরাম নেই , বিলাস নেই , স্বাচ্ছন্দ্য নেই । বাঁদি গোলাম নেই । সেই সব দিনে তিনি ছিলেন হুমায়ুনের আশার আলো , প্রেরণা । ভেবেছিলেন হারেমের এক কোনায় পড়ে থাকবেন । কিন্তু বাস্তবে হল ঠিক উলটো ।
 
পনেরো বছর পর মসনদ ফিরে পেলেন হুমায়ুন কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুনিয়া ছাড়তে হল তাকে । দুই হাতে ছিল ভারি ভারি বই , আজান শুরুর ডাক শুনতে পেলেন , সেই অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসতে গিয়ে টাল সামলাতে পারলেন না । লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে মারা গেলেন । পুরানা কিলার শের মন্ডল সেই লাইব্রেরি ।
তাঁর উত্তরসূরি শাহজাহান সারা জীবন বিলাসে ডুবে ছিলেন , হারেমে সময় কাটত বেশি । বুরহানপুরের সমাধি থেকে মুমতাজ মহলের দেহ তুলে এনে বানালেন তাজমহল । তার অনেক অনেক বছর আগে এক ভাগ্যহত বেচারা স্বামীর জন্য মকবারা বানিয়েছিলেন হামিদা বানু, হুমায়ুনের তরুণী ভার্যা । কপালে সুখ ছিল না , কিন্তু ভালবাসা ছিল অঢেল ।





এই খানে আছে আরেক ভাগ্যহত মুঘলের সমাধি । দারা শিকোহ । তিনিও ছিলেন পন্ডিত , উদার হৃদয় এক সুফি সাধক ।
প্রতারণা ও দুর্ভাগ্যও সারাজীবন তাকেও তাড়িয়ে বেড়িয়েছে ।
১৮৫৭ সনে বিদ্রোহের সময় ইংরেজরা রক্তের যমুনা বইয়ে দিয়েছিল । শেষ মুঘল বাহাদুর শাহ জাফর এইখানেই পালিয়ে এসেছিলেন ,সঙ্গে ছিল আরো অনেকে । এখান থেকেই তাকে এবং শেষ মুঘলদের গ্রেপ্তার করে ইংরেজরা ।
হুমায়ুনের মকবারা নতুন সাজে ঝলমল । সবাই সেলফি তুলছে , হি হি করে হাসছে । অলিন্দের সূক্ষ্ম কাজ ক্যামেরায় তুলে রাখছে জাপানি মহিলা । অদ্ভুত আমেরিকান অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলে গাইড, বিদেশিদের এর মহিমা বোঝাচ্ছে ।
এরই মধ্যে দেখি উপরের জালির মধ্যে দুই পায়রা ঘন হয়ে বসে মজা দেখছে , যেন হামিদা আর হুমায়ুন ।