Sunday, 2 April 2017

আরেকটা বাজে গল্প

সেদিন সাত সক্কালে মিহির সর্দার এসে হাজির । পারমাদান । ওর বাড়ি ওখানে । সেখানে নাকি কেবলই হরিণ চরিতেছে । আমি অবিশ্যি কখনো যাই নি । তবে মিহির সর্দার বলল , চারধারেই হরিণ , বাঁকা বাঁকা শিং , ছিটছিটে শরীর , কাজল পরা ছটফটে দুটো চোখ । আহা , দিদি একবারটি চলেন । সে নাহয় হল ,তা তোমার হাতে ওই সব কি ঝুলিতেছে? মিহিরের সে কি হাসি! খেতের বেগুন ক’খানি নিয়ে এলুম দিদি ।  দেখলাম নধর , তেল চুকচুকে গাঢ় বেগুনি  রঙের বিটা ক্যারোটিনে ভরপুর রাশি রাশি বেগুন ফলিতেছে । মিহির সর্দার নাম শুনে আবার ডাকাত সর্দার মনে করবেন না যেন । বড্ড ভালোমানুষ । প্রাইমারি ইস্কুলের মাস্টার । সব সাবজেক্ট পড়াতে হয় । ছাত্র ছাত্রী কয়জনা গো ? একশ কুড়ি খাতায় কলমে। গড়ে সত্তর জনা আসে মোটামুটি । মিড ডে মিল দাও ? হ্যাঁ, তাতো দিতেই হবে। একদিন ভাত আর আলু ডালের ঝোল , একদিন ডিম আর একদিন খিচুড়ি , এটাই আবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় । শীতের সবজি সস্তা । তাই মিহির সব্জিও খাওয়াতে চায় ।

ছাত্র এতো কম কম আসে কেন? কি আর বলব দিদি? জিজ্ঞেস করলে বলে মাঠের কাজ ছিল । আবার মেয়েরা বলে মা মামার বাড়ি গেছিল, বলল ঘরদোর দেখবি, ভাই বাপকে খেতে দিবি , রাঁধবি । এই সব তো লেগেই আছে । তাই একদিন মায়েদের মিটিং ডাকা হল  , একচল্লিশ জন এলো , সব্বাই  গালে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল । আমরা মাস্টাররা যতই যা বলি যেন তাদের কানেই যাচ্ছে না । আমি এবারে বল্লুম ওই টিভি সিরিয়াল আর পটলকুমার গানওয়ালা না দেখে ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে একটু বসতে পারেন তো বউদিরা । শুনে তাদের কি হাসি , এ ওর গায়ে টিভি সিরিয়ালের নাম শুনেই ঢলে পড়লো । এইসব নিয়েই চলছে আমাদের ।
আমি প্রসঙ্গ বদলে নিতান্ত আকাঠের বললাম আচ্ছা হরিণের মাংস খেয়েছ? আপনা মাংসে হরিণা বৈরী । কেমন তা খেতে?
মিহির  বলল ভালো না , ছিবড়ে ছিবড়ে খেতে ,তাই বোধহয় মাটিতে রেখে একটু পচিয়ে খায় ।
একবার দুটো শিং ওয়ালায় খুব মারপিট হচ্ছিল । আমরা তখন বেশ ছোট । দূর থেকে দেখছিলাম । হঠাত দেখি একটার শিং আরেকটার পেটের ভেতর ঢুকে গেছে । সে কি ছটফটানি । খানিক পরে সেটা  মরেই গেলো । এদিকে বনবাবুদের কানে খবর চলে গেলেই তো সব মাটি । গ্রামের সবাই আমরা চুপ করে রইলাম । তারপর কাঠ কুটো দিয়ে ভালো করে ওটাকে ঢেকে রাখা হল । তারপর সন্ধে হলে গাঁয়ের জোয়ান রা সব গিয়ে হরিণ টাকে লুকিয়ে নিয়ে এলো । মাংস কেটে বাড়ি বাড়ি সব বিলি করা হল । আমি আবার ওকে থামিয়ে বললাম হরিণের চামড়া টা ? ওটার কি হল? সে তো সব মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল । কোন কিছুই ফেলে রাখা হয় নি । তবে খেতে ভালো নয়, এটুকু মনে আছে ।

আরেকবার কি হল জানেন? ইছামতীতে বান এলো । বাপরে কি ভয়ানক বান । সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । দেখি একটা শিং ওয়ালা হরিণও সাঁতরে চলেছে । আমরা কজনা ছেলে ওটাকে বড় করে ঘিরে ধরলাম । ওরে বাবা কি লাফ টাই মারল । আমরা একেবারে বেসামাল হয়ে গেলাম । চারদিকে জল আর জল । তার মাঝখানে একটা দুটো ঢিবি মাথা উঁচিয়ে আছে । প্রায় কাছাকাছি এসে কি দেখি জানেন ? দেখে আমরা তো তাজ্জব হয়ে গেছি । দেখি একই ঢিবিতে শেয়াল হরিণ সাপ ব্যাং,গোরু সব এক সঙ্গে । কেউ কাউকে খাচ্ছে না, কামড়াচ্ছে না , বিরক্ত করছে না । এমন দৃশ্য এতোদিনেও ভুলিনি ।

মিহির সর্দার এতো রোমাঞ্চকর  গল্প শুনিয়ে চলে যাবার পর ভাবলাম এই রাশি রাশি  বেগুন দিয়ে এখন কি করি? ভাবতে ভাবতে মনে হল পারমাদানের বেগুন দিয়ে তুর্কি লেবাননের বাবাগানুশ বানাই । বেগুনটা পোড়াতেই হবে । তারপর তিল আর অলিভ অয়েলের মসৃণ মিশেলে ( যাকে বলে তাহিনি) ঝলসানো বেগুনের নরম শরীরে সামান্য রসুন কুচি আর বেশ খানিকটা লেবুর রসের খুনসুটি দিয়ে এক জম্পেশ  কাহিনি বানানো হবে  , বাবাগানুশ । পুরো ব্যাপারটাকে গ্রাইন্ডারে দিলে আলতো ছোঁয়ায় একটা মোলায়েম সিল্কি এফেক্ট । রুটির সঙ্গে শীতের রাতে পারফেক্ট । নুন  নেবু নঙ্কার পরিমান   নিজের মতো মিশিয়ে নিতে হবে । এই বাবাগানুশ খেয়েই না জালালুদ্দিন রুমি অত ভালো ভালো মনোহারী কথা দিয়ে মসনভি লিখে গেছিলেন ।
বাঙ্গালির রসনা আন্তর্জাতিক । আজকাল এইসব মেলায় টেলায় নানারকম বিদেশি লোকজন এসে বিক্রিবাটা করে । হোয়াট ইস দিস? হোয়াট ইস দিস? ভুরু তুলে সে ব্যাটা খুব একখানা কায়দার উত্তর দেয় , বাকলাভা , টারকিশ সুইট ।

এই খোদ কলকাতায় ইহুদি নাহুম রা কতদিন ধরে বাকলাভা বিক্রি করে আসছে !

আমিও আর পিছিয়ে থাকি কেন? গরম রুটির মধ্যে দরাজ হাতে বাবাগানুশ মাখিয়েছি আর   চলেছি বসফোরাসের মাঝ বরাবর , জলে ছিটিয়ে উঠছে ফেনিল স্রোত একদিকে এশিয়া, অন্যদিকে ইওরোপ  আমার দুদিকে লুটিয়ে আছে । আহা পারমাদানের বেগুনের কি গুণ! দিশি বলে হেলা ফেলা করো না । 


No comments:

Post a Comment