Friday, 23 June 2017

কমলালেবুর রস ও স্বপ্নমায়া

কমলা লেবুর রস
“ চালো , জালদি চালো “
আন্তালিয়ার  সকাল । কী রোদ্দুর ! পুদিনা শশা গাজর লেবু চাকা চাকা করে জাগ ভর্তি জলে মেশানো । টাটকা কমলা লেবুর রস । হঠাৎ শুনি এক সহাস্য বদন কানের কাছে এসে বলছে চালো, জালদি ।
এর নাম হামদি ।  আন্তালিয়ায়   আমাদের এখানে ওখানে নিয়ে যাবে । একগাল হেসে বলল ইন্ডিয়া পাকিস্তানের ট্যুরিস্টরা নিজেদের মধ্যে যখন কথা  বলে তখনই এই কথাটা  খুব বলে , চালো জালদি চালো ,  আমি  তাই শিখে নিয়েছি ।
মনেমনে ভাবলাম শিখেই শুধু নাও নি , মোক্ষম লাগিয়েছও বটে ।
হামদি নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছে ।
আর কারা কারা যাবে ?
ও, দুটো ছেলে , ওদের তুলে নেব , চলুন ।
আন্তালিয়া একেবারে ঝলমলে উদ্দাম সুন্দরী । ভীষণ । রোমান সেলজুক অটোমান টার্ক দের ফেলে যাওয়া অতীতের ওপর সে বড় হয়েছে । তার নীল শিফনের অ্যাসিমেট্রিকাল পোশাকে সমুদ্রের ঢেউ , তার সোনালি চুলে সমুদের নুন , গলায় শঙ্খ মালা , চোখের নীল মাসকারায় কুচি কুচি অভ্র , তার হাতে ধরা মস্ত বড় একটা নীল ছাতা  । ছাতার ওপর রোদ্দুরের পায়রা উড়ছে ।  হাতে কাঁচের গেলাসে টলটলে তাজা কমলা লেবুর রস ।  দামাল মেয়ে ।






এমন রূপসী শহরের ভেতর দিয়ে চলেছি । মনটাও বেশ ফুরফুর করছে । প্রকৃতি পরিবেশের প্রভাব । সুদৃশ্য গলির মধ্যে খানিক খুঁজে টুজে হামদি ঘোষণা করল , ওই দুটো ছেলে মাতাল হয়ে বেহুঁশ হয়ে আছে । কাজেই ওরা আসবে না । হে হে হে , তোমাদের ভালোই হল।  কি বল ?
তাতো ভালোই হল । আমরা সমুদ্রের তটে ,বিভিন্ন  ঝর্নার ধারে এলিয়ে ঝেলিয়ে ঘুরতে লাগলাম । ইন্ডিয়া বা  ইন্দিস্তান থেকে  আসছি শুনলে সব্বাই খুব আন্তরিক ভাবে প্রায় বুকেই টেনে নেয় । ব্রাদার সিস্টার সব আমরা । হামদি যখন এ গলি সে গলি ঘুরছিল দেখলাম বেশ পুরোনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি চারদিকে । হামদি বলে ওগুলো সব অতোমান হাউস । এরকম অটোমান বাড়ি প্রায় হাজার তিনেক । বাড়িগুলো এখন হোটেল , ক্যাফে , দোকান এইসব করে ব্যাবহার করা হচ্ছে ।



অটোমান সাম্রাজ্যের কফিনে  শেষ পেরেকটা ঠুকে দেন মুস্তাফা কেমাল আতাতুরক । খলিফাতন্ত্রের অবসানে আধুনিক তুরস্কের জন্ম তার  হাতে । মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়েও সে দেশ সেক্যুলার হল পর্দা সরে গেল মেয়েরা পেল গনতান্ত্রিক অধিকার । আতাতুরক না থাকলে এই দীপ্ত , বহমান ও প্রাণবন্ত  তুরস্ককে হয়তো আমরা পেতাম না ।
হামদি খুব ভালোরকম আতাতুরক সমর্থক । উনি খুব মডার্ন , খুব  প্রগতিশীল , আজকে আমরা তো এখানে এসে দাঁড়িয়েছি ওনার জন্যই । আই হ্যাভ  গ্রেত  রেস্পেকত । গ্রেত রেস্পেকত

তুরস্কের ঝাঁকি দর্শন করে একটা বেশ লাভ হল । আনাতোলিয়া থেকে মেডিটেরানিয়ান , মেডিটেরা নিয়ান থেকে ইজিয়ান , ইজিয়ান  থেকে  মারমারা বোসফরাস কৃষ্ণ সাগর । মানুষের সামাজিক ধর্মীয় অবস্থান , তাদের চিন্তা ভাবনার সূত্র কেমন বদলিয়ে বদলিয়ে যাচ্ছিল লক্ষ করছিলাম  ।

কাপাদোসিয়া তো ভীষণই আধুনিক চিন্তা ভাবনার দিক থেকে ।  তুরস্কে খ্রিস্ট ধর্মের আদিএবং শক্তিশালী  কেন্দ্র । আমাদের ট্যুর গাইড মেসুট ( মাসুদ) এরকানকে ধর্ম কর্ম নিয়ে সাবধানী প্রশ্ন করাতেই উত্তর এলো, আমি কিন্তু মোটেই কনজারভেটিভ নই । আমাকে একজন টিপিক্যাল টার্কিশ ভেবে বসবেন না যেননা, আমি রমজান করি না ।
হ্যাঁ আমি আতাতুরকে নিয়ে গর্বিত । হ্যাঁ , আমি নাজিম হিকমত খুব পছন্দ করি । না, অনুবাদের থেকে মূল টার্কিশ কবিতাগুলো অনেক বেশি ভালো ।
এখানে মেয়েদের  হিজাব তুলনামূলক ভাবে অনেক কম দেখলাম । কোনিয়াতে আবার পোশাকে রক্ষণশীলতা ভালই চোখে পড়লো । ধরা পড়লো আহমেট , আমাদের গাইডের কথাতেও । সে আধুনিকও হতে চায় আবার রক্ষণশীলতাও পুরোদমে  চায় । গাছেরও খাবো তলারও কুড়ুবো ।  আর এবার আন্তালিয়ায় তো সবই দখিন দুয়ার খোলা ।
সমুদ্রের নীলে গাং চিলের খেলা , নরনারীর সুখ দুঃখের বিলাস , সাদা চামড়া ট্যান হচ্ছে , মাতোয়ারা শ্যাম্পেন ওয়াইন । নীল জলের সাদা ফেনার ভেতর থেকে মৎস্য কন্যার মত অপ্সরার মতো সুন্দরী মেয়েরা , হাতে শরবত পাশে কবিতার বই ,
ঝর্নার উদ্দাম খেলা, রঙিন কাকাতুয়া পিঠে নিয়ে যুবকের পথ চলা, বাচ্চা কাচ্চার হুতোপাটি , দেদার সেলফি আর সেলফি স্টিক ,জীবনের সমুদ্র সফেনের কোলাজ । আমাদের হাতে টাটকা কমলালেবুর রস ।







 হামদি বলে দেয়  ঝর্নার ধারে ক্যাফেতে খাওয়া সেরে নিন এইবেলা  । রংচঙে এথনিক সোফার ঢাকা , পাশে রাখা হুঁকো বা শিশা । তুরস্কের  নারী পুরুষ সবাই বেশ ভালো ধূম্রপায়ী ।   ধোঁয়া ছাড়তে দু পক্ষই সমান ওস্তাদ । চালু রেস্তোরাঁয় চটপট কাজ হয় । পাশে বসে অর্ডার মতো নানান কিসিমের  রুটি বেলছে একজন মহিলা । তারপর তাওয়া চড়বে । অলিভওয়েল ব্রাশ করা হবে । এরপর   পড়তে থাকবে  কিমা কুচি , পুদিনা , জাতার , সুমাক ,দিল , পার্সলে , রোজমারির ছিটে , টমাটো অলিভ কুভি , দেদার চিজ ,অর্ডার মতো পরোটা নিপুন হাতে বেলা হচ্ছে । আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই ভিন দেশি মহিলার রুটি বেলা দেখছি । হঠাত শুনি হামদি আমার কানের কাছে এসে বলছে ,ওকে ডাকো আর বলো  বাবান্নে , বাবান্নে ।
বলা নেই কওয়া নেই এইসব ডেকে মারধোর খাই আর কি ! বললাম আগে বল কথাটার মানে কি ? মানে হল গিয়ে ঠাকুমা ।
বাবা মানে বাবা আর আনা মানে মা । বাবার মা ।
দেখো ঠাকুমা বলে ডাকলে কিরকম খেপে যাবে ।
আমি বললাম , তুমি ডাকো গে যাও ।
হামদি সত্যি সত্যি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকল  ঠাকুমা ঠাকুমা  আর ওই মহিলাও কপট রাগ দেখিয়ে কাঠের খুন্তি তুলে মারার ভঙ্গি করতে লাগলো । ভারি  রগড় । আশ্চর্য কথা , বেশ খানিকটা আসার পরেও হামদি আবার গলা তুলে রীতিমত চিৎকার করে ঠাকুমা... বলে গাড়িতে উঠে পড়লো ।

তুরস্কের এইগুলো ভারি মজার । এশিয়া ইওরোপের মেলামেলিতে ইওরোপীয় ঠাটবাটের সঙ্গে ঘোরতর দেশজ ব্যাপারগুলো মিলে মিশে নৌটঙ্কি একেবারে জোরদার । লোকজন যথেষ্টই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলে , আবেগের পাত্র একেবারে উথলে উঠছে । টিপিক্যাল পশ্চিম ইওরোপীয় হলে কল্পনাই করা যেত না ।

হামদির সঙ্গে  ঘুরে বেড়ানোর সময় দেখলাম বিশাল বিশাল ফার্ম । প্রচুর চাষবাস হছে । ফল সবজি একেবারে উপচে পড়ছে । সবই খুব আধুনিক ধাঁচে । হামদি বলল কমলা লেবু বেদানা কলা বেগুন  এখানে খুব বেশি হয় । এগ্রিকালচার এখানে প্রধান জীবিকা । হাতের কাছে টুকটুকে কমলালেবুর থোলো , নীল সমুদ্র আর নীল রোদালো আকাশ ,মাতাল হতে আর কিছু বাকি আছে কি?
পরেরদিন এয়ারপোর্টে যাবার জন্য ট্যাক্সি হাজির । আমরা একঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যাবো ইজমির । সেখানে দেখব এফেসাস ।
ড্রাইভার মোটে ইংরেজি জানে না । কিন্তু গল্পে আদরে সোহাগে একেবারে ফেটে পড়তে বাকি আছে ।  সে তার ভাষায় কথা বলছে অনর্গল , আমরাও বকে চলেছি নন স্টপ । সে যা বোঝাতে চাইলো তার সার মর্ম হল আন্তালিয়া স্বর্গের মতন জায়গা । কোনো কিছুর অভাব নেই । ইস্তানবুল ! বাপরে কি ভিড় ! আচ্ছা তোমারা তো ইন্দিস্তানি ।
হঠাৎ প্রচন্ড চেঁচিয়ে কোনো একটা কিছুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো আতাতুরক আতাতুরক ।
আমরা চোখ তুলে দেখলাম আতাতুরকের একটা বিশাল বড় ছবি ঝুলছে ।
সে উত্তেজিত হয়ে হাত পা ছুঁড়ে বলতে লাগল জান, জান । অর্থাৎ আতাতুরক তার হৃদয়ে । আমরাও প্রবলভাবে বোঝাতে চাইলাম আমরাও আতাতুরক কে ভালবাসি , আমাদের শহরে আতাতুরকের নামে রাস্তাও আছে ।
বোঝানোর কৌশল টা যদিও খুব সহজ ছিলনা , প্রতি মুহূর্তেই  অ্যাকসিডেন্টের চান্স ছিল শতকরা আশিভাগ । কিন্তু লোকটা এত্ত খুশি হল যে তার প্রার্থনার তসবি টা পর্যন্ত আমাদের দিয়ে দিল । আর এই প্রথম তার মুখ দিয়ে একটা মোক্ষম ইংরেজি বাক্য বেরুলো আই লাভ আতাতুরক । 




স্বপ্ন মায়া


কাশ , তুরস্কের ফিরোজা উপকূলে একটা ছোট্ট বন্দর । তুর্কি ভাষায় কাশ  মানে  ভুরু । মাত্র ২০ মিনিটের ফেরি নিয়ে যাবে আরেকটা অন্য  দেশে ,ছোট্ট একটা অন্য  দ্বীপে , তার নাম মেইস । গ্রিসের দ্বীপ । গ্রিক ভাষায় যার মানে চোখ । ভুরুর নিচে দীঘল নীল চোখ । ভুরু আর চোখ ,  দুই দেশের দুটো দ্বীপের নাম মাত্র ২০ মিনিটের ফেরি ।  কি কাছাকাছি, পাশাপাশি ,তাই না ? আমাদের সঙ্গে গ্রিসের কতো মিল ! বাকলাভা কারা  বানিয়েছিল ? তুর্কি না গ্রিক ? তুমি কি এটা নিয়ে ফালতু তর্ক করবে না আরেক টুকরো বাকলাভা খাবে বলে প্লেট এগিয়ে দেবে , বল?
আর মুসাকা ? খাওয়া দাওয়া, গান বাজনা সবেতেই তো মিল!  নীল রঙা ইভিল আই ওরাও ব্যাবহার করে, আমরাও । রাকি আওজু ? সেই মৌরি গন্ধী কড়া মদ ? গ্রিসে যা আরো হালকা করে খায় ? আমার কি মনে হয় জানো , যত দিন ধরে আমরা ঝগড়া করছি তার অনেক অনেক বেশি সময় আমরা অতীতে পাশাপাশি একসাথে ছিলাম ।
ওপরের কথাগুলো বলছিল মেসুট এরকান । আমাদের গাইড । ইজিয়ন সমুদ্র থেকে ঠান্ডা হাওয়া বুনো ল্যাভেন্ডারের গন্ধ মেখে ভেসে আসছিল যেন । এতো চেনা এই কথাগুলো ।ভেতরটা কেমন শিরশিরিয়ে উঠলো । ছোটবেলায় বাবা শিখিয়েছিল সুভাষ মুখুজ্জের কবিতা  “ আমরা যেন বাংলাদেশের চোখের দুটি তারা / মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে থাকুক গে পাহারা/দুয়োরে খিল টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানলা/ এপারে যে বাংলাদেশ ,ওপারে সেই বাংলা”।  আজ চারদিকে সব উত্তাল । দেশ বিদেশ সর্বত্র । জাতি ধর্মের ঝগড়া । কতদিন ধরে চলছে গ্রিস তুরস্ক মন কষাকষি  ।  কতো মৃত্যু কতো রক্তপাত ! পপুলেশন এক্সচেঞ্জের সময় গ্রিকরা  তুরস্কের ভিটে মাটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল গ্রিসে ।

 কোথাও দেওয়াল নেই,কাঁটাতার নেই,পর্দা নেই ,সীমানা নেই
এমন একটা বাড়ি একটা দেশের কথা ভাবত সে
তার চারদিকে ঝুঁকে পড়ত বিষণ্ণ অন্ধকার, মানুষের তৈরি
সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একরাশ জোনাকি তুলে এনে
ছুঁড়ে দিত চুমকির মতো, ঢুকে পড়ত তারা
মানুষ জনের ঘর সংসারে চিন্তা ভাবনায়...(বাসুদেব দেব)
  
ইজিয়নের সেই নীলচে হাওয়ায়  বুনো ল্যাভেন্ডারের  গন্ধের ভেতরে মেসুটের চারদিকে তার স্বপ্নের জোনাকিরা জ্বলে উঠল দেখতে পেলাম । আমরা চলেছি মেরিয়াম আনা , মেরিয়ামানা  ।ইজিয়নের ধারে মেরিয়ামানা । ইজিয়ানের ধারে এফেসাস ।প্রাচীন গ্রিক রোমান বন্দর শহরের ধ্বংসাবশেষ।   জেরুসালেম থেকে এফেসাস কদ্দূর ? প্রায় ২০০০ কিলোমিটার এখনকার হিশেবে ।
ম্যাপল গাছের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা  পাথুরে রাস্তা ।  উঁচুনিচু । কিছু আয়েসি পর্যটক ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে বেড়াচ্ছেন । আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে , টিপিটিপি বারিষ । ম্যাপল গাছের পাতা থেকে বিন্দু বিন্দু ঝরে জল ,শ্যামল বনান্তভূমি করে ছলছল । এসেছিলে তবু আসো নাই ,সমুখের পথ দিয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে



একটা ছোট্ট ঘরে সন্ন্যাসিনী শুয়ে আছেন । প্রায় চলতে ফিরতে পারেন না । দুর্বল ক্ষীণ শরীর । আজীবন রুগ্ন । বিছানার সঙ্গে লেপ্টে থাকেন অ্যানা কাথেরিনা এমেরিচ । ঘোর লাগে  তার । আজ থেকে নয় ,অনেক ছোটবেলা থেকে ঘোর লাগে । সেই ঘোরের মধ্যে প্রভু যিশু আসেন তার কাছে । তাঁর দেশ জার্মানির বাইরে তিনি কোথাও কোনো দিন যান নি।
উপরন্তু তার শরীরে ছিল বিশেষ কিছু চিহ্ন । stigmata ..
ঠিক যেন কেউ পেরেক পুঁতেছে ,সেই রকম দাগ । ফুলে ওঠে , রক্তও পড়ে । ডাক্তার দেখে যায়আবার কিছুদিন পরে একই রকম ব্যথা , যন্ত্রণা , রক্ত পড়া । অ্যানা স্বপ্নের মধ্যে , ঘোরের মধ্যে একটা পাথুরে বাড়ি দেখতে পান । চারকোনা পাথুরে বাড়ি , পাহাড়ের ওপর । সরু পাথুরে রাস্তা । ঝোপঝাড় । সব তিনি দেখতে পান ।এলাকাটা কি রকম তা তিনি স্পষ্ট দেখতে পান ।  দেখতে পান মাতা মেরি যিশু মারা যাবার পর সেন্ট জনের সঙ্গে এই বাড়িতে চলে এসেছেন  । কিন্তু বাড়িটা কোথায় , জায়গাটা কোথায় পুরোটাই ধোঁয়াটে থেকে গেলো যে  । ১৮২৪ সালে অ্যানা মারা যান ।  





জেরুসালেমে যিশু ক্রুশবিদ্ধ হলেন খুব অশান্ত সময়ে । ইহুদি পুরোহিত তন্ত্র,  রোমান শাসকদের ঈর্ষা ষড়যন্ত্র । অন্ধকার বিভীষিকা । ঠিক সেই সময়ে এফেসাসের পরিস্থিতি ছিল একেবারে আলাদা । এফেসাস তখন খ্রিস্টানদের শক্ত ঘাঁটি । বাইজানটাইন আনাতোলিয়া যিশুর জীবদ্দশায় তাঁর ধর্মকে গ্রহণ করেছিল ।  জেরুসালেম যখন ধর্মীয় রেষারেষিতে অস্থির সেই সময় কতো দূরে এশিয়া মাইনরের এই অঞ্চল আঁচল পেতে যিশুকে গ্রহণ করেছিল । নতুন খ্রিস্টানরা জেরুসালেমে মোটেও স্বস্তিতে ছিলো না , কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে ছেলের মৃত্যুর পর মা মেরি কাউকে সঙ্গে নিয়ে এফেসাসের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছিলেন । যিশু , জনের হাতে মায়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছিলেন । তাই জনের সঙ্গেই মা মেরি এখানে চলে আসেন ।
এরপর ঝঞ্ঝার মতো আছড়ে পড়ে ক্রুসেড । আনাতোলিয়া চলে যায় মুসলমান অটোমান টার্ক দের অধীনে ।  কিন্তু এই এফেসাস আর তার আশেপাশের ভিটেতে  খ্রিস্টানদের প্রভাব থেকেই  যায় ।    বহু বছর পরে ১৮৯১ সনে অ্যানার স্বপ্নকথা শোনার পর  এক ধর্মযাজক ভয়ানক কৌতূহলী হয়ে পড়েন । জায়গাটা এমনিতেই পাথুরে, পাহাড়ে ।  আন্দাজ করে খুঁজতে খুঁজতে তিনি পাহাড়ের মাথায় একটা চারকোনা পাথুরে বাড়ির সন্ধান পেলেন । সেখানে প্রাচীনপন্থী উপাসনা চলছিল কয়েকশ বছর ধরে । তারপর হৈ চৈ , হট্টগোল , বিশ্বাস অবিশ্বাসের গলিঘুঁজি পেরিয়ে ভ্যাটিকান রোমের মহামান্য  মোহর এসে পড়লো, যে ঘটনাটি সত্য । তারপর ষাটের দশকের পর থেকেই মেরিয়ামানা সারা পৃথিবীর খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমি । তবে এখানে খ্রিস্টান এবং ইসলাম দুই ধর্মের মানুষরাই আসেন । বাইবেলের থেকে নাকি কোরআনে মা মেরির বেশি উল্লেখ আছে । মেরিয়াম । আরবিতে মূর্তির নিচে কিছু লেখাও আছে , ঠাহর হল
গাছপালা ঢাকা ভিজে ঘাসে ঘাসে সবুজ পথ পাকদণ্ডী বেয়ে বেয়ে উঠে গেছে । বেশ প্রশস্ত জায়গা । প্রচুর গাছপালা । গাছের নিচে দাঁড়ালে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগছে না । সেই বর্ষণ স্নিগধ প্রাক মধ্যাহ্নে কোরেসস পাহাড়ের ওপর  একটা সাদাসিধে চারকোনা এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দু কামরার ছোট্ট সহজ সরল  ঘর আমাদের বিহ্বল করে রাখলো বেশ কিছুক্ষণ । ভেতরে ছবি তোলা বারণ । বড় শান্ত পরিবেশ । সাদা লেসের পোশাক পরে এক সন্ন্যাসিনী মালা জপছেন । মুখে একটা আলগা হাসি প্রথম ঘরটি মাঝারি, পরের ঘরটি আরেকটু ছোট , মনে হয় রান্নাঘর । জানলা গুলো বেশ উঁচুতে ।  ব্যাস এইটুকুনই । 







আরকিওলজিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে বাড়িটা খ্রিস্টিয় প্রথম 
শতকে তৈরি কাজেই প্রমাণের দিক থেকেও তথ্য টি জুতসই । অনেকে মোমবাতি জ্বালাচ্ছে, বোতলে জল ভরে নিচ্ছেঝর্না থেকে বয়ে আসা এই জল নাকি খুব জোরালো । অসুখ বিসুখ সেরে যায় । বাইরে সুন্দর বসার ব্যাবস্থা । খোলা আকাশের নিচে বসে বসে প্রার্থনা করা যায় ।
উইশিং ওয়ালে লোকজনেরা মনের কথা টিসু পেপারে লিখে বেঁধে দিচ্ছে , যেমন আমাদের দেশে মানত করে, সুতো বাঁধে , ঢিল বাঁধে । এই কাগজে পাতলা কাপড়ে মনের কথা লেখার ব্যাপারটাকে নাকি শামান প্রথা বলে । তুর্ক রা ইসলাম হবার আগে নাকি শামান ছিল । এ ব্যাপারে বিশদ জানা নেই অবিশ্যি । খ্রিস্টান ,ইহুদি ,ইসলাম কতো নামের বাইরের বাহারি  আচ্ছাদন পরে মানুষ এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রার্থনা করছে  । আর আমি ভাবছি চুয়ান্ন বছর বয়সী এক মহিলার কথা । কতটা পথ পাড়ি দিয়ে কতো ধকল সয়ে  ,মাটি থেকে ১২০০ ফুট উঁচু এই জঙ্গলে নিভৃতচারী হয়ে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ কয়েকটা বছর ।
 কেমন আছো মা ?  ইজিয়ন সাগর ধুয়ে দিচ্ছে তোমার পা । ম্যাপল  পাতা ছড়িয়ে আছে মাথার ওপর ।কেমন আছো  মোমবাতির আলোয় অজস্র ফুলে ফুলে ঢাকা এই নির্জন আবাসে?

আলতো মোমবাতি নিভে যাচ্ছে
বিস্মৃতির কোন চিহ্ন ছাড়াই ,
কুয়াশা- বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে
মাঝ রাতের ঘন ক্যাফেইন

এই নির্জন অন্ধকারে
হয়তো ধ্যানই ছিল আমার একমাত্র গন্তব্য,
তবু ক্রমাগত ভেসে চলেছি জলে
পুরনো মাছের মতো

একটা বিশাল পুরাণ ঘুমিয়ে পড়ছে
আমার বুকের ভেতরে,
আমি ফিসফিসিয়ে জানতে চাইছি-
সভ্যতা ভালো আছে কিনা !




কবিতা প্রমিতা ভৌমিক


Friday, 9 June 2017

ভালোবাসার শহর

“খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে বনের পাখি ছিল বনে
একদা কী করিয়া  মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে
......এমনি দুই পাখি দোঁহারে ভালবাসে তবুও কাছে নাহি পায় ।
খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে নীরবে চোখে চোখে চায় ।“

আমরাও খাঁচার পাখি , তাই থেকে  যাবো বরাবর  , এই জীবনে । বাবার কবিতায় আছে  “সভ্য মানুষ পদ্য লেখো / ঝরনা হতে অনেক মানা । “
কিন্তু বহুকাল  আগে এমনই দুজনার দেখা হয়েছিল । একজনকে সত্যিই পাখি বলে ডাকা হত ।  দেশে দেশে সে ঘুরে বেড়াতো ,চালচুলো  নেই , ভবঘুরে  বাউন্ডুলে । কোন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারতো না । পাখির মতই উড়ে উড়ে বেড়াতো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ।

এদিকে আমাদের বাস ছাড়লো কাপাদোকিয়া থেকে  । চলেছি কোনিয়ায় । আড়াই ঘন্টা মতন লাগবে । বিকেল ছ’টা হবে  পৌঁছতে বিকেল, কারণ সূর্য থাকবে তখনও টগবগে । আরামদায়ক বাস । যে যার মতন বসে আছে ।  সিল্কের মতো মখমলি রাস্তায় বাস চলছে । একটু জোরে চালালে পারত কিন্তু  ।

যে কথা হচ্ছিল, ওই ভবঘুরে বাউন্ডুলের বুকের মধ্যে একটা সোনার খনি লুকোনো ছিল । এমনিতে উলিঝুলি চেহারা , কিন্তু ঝুলির মধ্যে অনেক রসদ । সে এক চির পথিক । এক সন্তের মতো । বে ইন্তাহা ইশক , সীমাহীন ভালোবাসার আকাশে পাখির মতো ডানা মেলত । সে লিখেছিল ,”ভালোবাসা যেন জীবনদায়ী জল  ,হৃদয় দিয়ে আত্মা দিয়ে একেবারে তলানিটুকু পান করো ।
ওগো প্রেমিকেরা ,সময় এসেছে বেরিয়ে পড়ার । নক্ষত্রের গহিন থেকে যে শব্দ ভেসে আসছে আমার হৃদয় তা কান পেতে শুনছে প্রতিনিয়ত । আমাদের উট চালকেরা তৈরি ,যাত্রা শুরু হল বলে । ওরা জিগ্যেস করেছে যাত্রীরা এখনও ঘুমিয়ে কেন? “
এই পাগল খিটকেল লোকটির নাম শামস । ইরানের শামস এ তাব্রিজি ।  আরবি ভাষায় শামস মানে সূর্য । সেই আলোয় সত্য সুন্দর আর ভালবাসার সন্ধান ।   সে আবার শুধু বনের পাখিই ছিল না , ছিল বুনো পাখি , কথায় কথায় মুখ খারাপ করত , রেগে যেত । কিন্তু আদতে মানুষটা ছিল আগাগোড়া সোনার আর  তার ছিল  জহুরির চোখ ।  অলৌকিক ক্ষমতা এবং  গভীর প্রজ্ঞা  তার উলিঝুলি পোশাকের  দুই পকেটে পোরা থাকতো ।

ড্রাইভারের সহকারী চা কফি ঠাণ্ডা পানীয় জল দিয়ে যাচ্ছে ।  আমাদের যাচ্ছি কোনিয়ায় । জালালুদ্দিন রুমি মেভলানা ( মৌলানা) র দেশ । 

রুমির প্রতিভায় হিরের জৌলুস ত্রয়োদশ শতকের এই মানুষটি আজও অন্যতম বেস্ট সেলার । টুকরো টুকরো  স্ফটিক খন্ডের মতো দ্যুতিময় তার প্রতিভা , তার কবিতা আজও সমানভাবে জনপ্রিয় , বিশেষ করে পশ্চিমের দেশ গুলোতে । বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ।
কিন্তু এই  রুমিকে,  প্রেমিক কবি রুমি দিওয়ানা রুমি যিনি  বানিয়েছেন তিনি হলেন সেই  খ্যাপা শামস । পরশ পাথর খুঁজতে খুঁজতে একদিন  কোনিয়ায় এসে হাজির হলেন , জানতেন বিলক্ষণ যে পরশ পাথরটি এখানেই আছে ।

রুমি  ছিলেন আদ্যন্ত একজন এলিট । বড়লোক , ক্ষমতাবান ।  শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে  মাখামাখি । ঈশ্বর সব দিয়েছেন,  প্রতিভা , অগাধ পান্ডিত্য , তত্ত্বজ্ঞান । সমাজের উঁচু তলা । উদার মন , বন্ধুবৎসল । এমন একজন এলিট ক্লাসের সঙ্গে বনিকসমাজের মেলামেশা ভালো নজরে দেখা হত না । রুমি প্রগতিশীল , স্বর্ণ বনিক বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক পাকা করলেন বন্ধুর মেয়েকে তার নিজের ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে । বেশ একটা রেভ্যুলুশনারি  উদ্যোগ , সেই সময়ে তো বটেই ।
বাস এসে থামল কোনিয়া বাস ( হাভাস) টার্মিনালে । আমরা যাবো রুমি হোটেলে । কথামত আহমেটকে ফোন করি । আমরা এসে গেছি যে ।
একটু অপেক্ষা করো , রাস্তায় জ্যাম আছে । পনেরো মিনিট লাগবে
সত্যি কথা বলতে কি এই জায়গাটা সম্মন্ধে আমার ভালো ধারণা ছিল না । কেমন যেন পুরনো দিল্লির নিজামুদ্দিন আওলিয়ার দরগার ছবি ভেসে উঠছিল । ওই রকম গলি ঘুঁজি , হৈ হট্টগোল , ধর্মানুরাগীদের ভিড়, গোলাপ ফুল আগরবাতি  । কিন্তু এতো তা নয় । ঝকঝকে আধুনিক  ইওরোপের মতো । বাস ট্রাম  বাড়ি ঘর সব চক চক করছে । কত্ত বড় ট্রাম । ট্রেনের মতো । বেশ ঠান্ডা  হাওয়া । শীত শীত করছে । সামনেই গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের মতো মসজিদ । খুব সুন্দর দেখতে । সামনে দিয়ে যে লোকজনেরা হেঁটে যাচ্ছে তাতে আন্দাজ, এটা একটা মধ্যবিত্ত শহর ।




 আহমেট এসে হাজির হয় । তার হাতে আমাদের কোনিয়া ভ্রমণের ভার । আমরা চলেছি রুমি হোটেল । গাড়িটাও আহমেটের । বড় বিনয়ী । বন্ধুবর কিন্তু হাল ছাড়েন নি । তিনি বলেই চলেছেন এখখুনি ঘিঞ্জি শহর শুরু হয়ে যাবে । এদিকটা আসলে নতুন । খুব আত্ম প্রত্যয় নিয়ে জিগ্যেস করলেন, আহমেট আমরা পুরোনো শহরের দিকে যাচ্ছি , তাই না ?
যেন ধর্মের সঙ্গে  ঘিঞ্জি , গলি , আবর্জনার   একটা রাজযোটক হতেই হবে ।
হ্যাঁ , আমাদের হোটেলটা পুরোনো শহরে , মেভলানার একেবারে পাশেই ।
কিন্তু শেষ অবধি দুয়ে দুয়ে চার হল না । পুরনো শহরে এলাম বটে , ওই একটু পুরোনো বাড়িঘর আর বেশ শুনশান এলাকা ।  তাছাড়া আর কিচ্ছু  মিলল  না । 








রুমি হোটেল থেকে মেভলানার সমাধি ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ।  ইস্তানবুলের ব্লু মস্কের পরেই সবচেয়ে বেশি  দর্শনার্থীর ভিড় এখানেই ।
 আমাদের ঘর থেকে মেভলানা , যেন ” অকূল সুপুরি বন স্থির জলে ছায়া ফেলে একমাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে” ।  নীল আকাশের মাঝখানে ফিরোজা রঙের স্তম্ভ আমাদের স্বাগত জানালো সিটি অফ লাভ , ভালোবাসার শহরে ।

  একটু পরে বাইরে বেরুলাম । লোকজন অল্পই । বেশ ভালো লাগছে হাঁটতে । চারদিকে অনেক দোকান বাজার । স্যুভেনির শপে উপচে পড়ছে  সুফি দরবেশ , দরবেশ আর দরবেশ ।  । নানান মাপের নানান ধরনের । একটা কাবাবের দোকানের নাম “ সুফি কেবাব “।   আর সন্ধের মুখে শেষ  অস্তরাগ মেখে ঘন বেগুনি পিটুনিয়ার ঝাড় বলছে “ইশক , ইশক , ইশক “ ।কে শেখাল অভিজাত ধনী রুমিকে এই  মাতাল করা  ইশক ।







শামসের  সঙ্গে রুমির যখন দেখা হল তখন  শামস ষাটের কোঠায় আর রুমি চল্লিশ ছুঁই ছুঁই । তাদের প্রথম কি ভাবে দেখা হয়েছিল তাই নিয়ে অনেক ধরনের গল্প চালু আছে । কিন্তু আসল কথাটা হল  একে অন্যকে চুম্বকের মতো টেনেছিলেন । শামস ভবঘুরে অথচ নিবিড় অধ্যাত্ম শক্তি । সামাজিক রীতিনীতি কে তোয়াক্কা করেন না । রুমি যিনি একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করতেন , নিজেকে সমর্পণ করেন শামসের হাতে শামস হয়ে  গেলেন তাঁর গুরু । পন্ডিত রুমি, অভিমানী রুমির  হৃদয় খুঁড়ে তিনি বের করে আনলেন ভালোবাসার ফল্গুধারা । রুমি ততদিনে অন্তরের অনিভান আলোর সন্ধান পেয়ে গেছেন । সেই থেকে পথে পথে ভালোবাসার মোহর ছড়াতে ছড়াতে চলেছেন তিনি, এমনকি আজও।
এমনো শোনা যায় রুমি তার বালিকা সৎ মেয়ের সঙ্গে সামস এর বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিলেন যাতে শামস কে হারাতে না হয় ।
কিন্তু মেয়েটি অকালেই মারা যায় ।  লোকে বলে রুমির ছোটছেলেই শামস কে মেরে ফেলে কারণ সৎ বোনের ওপর তার দুর্বলতা ছিল । আবার অনেকে বলে শামস নিজেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছিলেন । যাই হোক না কেন ,  বুনো পাখিকে বেঁধে রাখতে পারেন নি রুমি কিন্তু নিজে বদলে গিয়েছিলেন আগাগোড়া ।
নিজেকে উজাড় করে  দিয়েছেন কবিতায় । অজস্র অগুন্তি কবিতার জন্ম , ভালোবাসার শিশিরে ভেজা । শামসের মৃত্যুর পর  রুমির গভীর শোকমগ্নতা জন্ম  দিল মসনভি বা মথনবি  কাব্য । ঈশ্বর যে সখা , প্রভু আমার প্রিয় আমার ।












শামস না থাকলে রুমি পূর্ণতা পেতেন না । শামস তাকে  অতীন্দ্রিয় রহস্যে ভরা নক্ষত্র পথের সন্ধান দিয়েছিলেন । একজন তত্ত্বজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন মরমিয়া পথের পথিক । ঘূর্ণায়মান দরবেশ একহাতে প্রেমসুধা আহরণ  করে অন্য হাতে তা ছড়িয়ে ছড়িয়ে চলেছে,  সেই চির খ্যাপা । সমা এ মেহফিল  বসে প্রত্যেক শনিবার । আমাদের দেখা হয় নি ।
এই মুরিদ মুর্শিদ প্রেম দেখা গেছে শেখ জামালি কামালি, হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া আর আমির খসরুর মধ্যেও
পরের দিন সকালে মেভলানার উদ্দেশে রওনা হলাম , পায়ে হেঁটে । খুব বড় সমাধি গৃহ । সঙ্গে মিউজিয়াম ।

পরিচ্ছন্ন চারদিক । অনেক মানুষজন এসেছে । তবে কোন গোলমাল কোলাহল নেই । নব দম্পতি এসেছে আশীর্বাদ নিতে ।  অনেক ছাত্র ছাত্রী এসেছে ।  হজরত মেভলানার সমাধি ও চারপাশে  অসাধারণ কারুকার্য । বড় সুন্দর । বড় বেশি রকমের সুন্দর । অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি চিত্রকলার অভাব পুরিয়ে দেয় ।  সুফি দরবেশের প্রতিদিনের জীবন মায় রান্না করা বাজার করা  গুরুর কাছে মার খাওয়া সবই পুতুলের  মাধ্যমে প্রদর্শনীর মতো করে রাখা । রাখা আছে তাদের টুপি পোশাক বাদ্যযন্ত্র জপমালা ।
রুমির প্রশস্ত পরিসর চত্বরে   একটা  অবাক করা জিনিস লুকিয়ে ছিল । বলছি না ভালোবাসার শহর ! হঠাৎ চোখে পড়লো একটি স্মারক , মহম্মদ ইকবাল “ সারে জাঁ হা সে অচ্ছা , হিন্দোস্তা হমারা ...” । তিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় কবির সমাধিস্থলে যেন তাঁর কোন একটা চিহ্ন থাকুক  ।
রুমি থেকে সামান্য দূরে  শামস  এ তাব্রিজির সাদাসিধে অনাড়ম্বর সমাধি । খুব সাদা মাটা । এখানেও সমান শান্তি শৃঙ্খলা ।
নিজের  জীবনটা যেমন ছিল , শেষ  আশ্রয়ও সেই রকম । ভানহীন সরল ।












কিছু কেনাকাটি করি , দোকানে ঢুকি ।  পেছন থেকে কে যেন ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে । কি ব্যাপার দেখতে পাচ্ছ না যে ? ওমা আপনি ? গাধার পিঠে উলটো করে  বসে ইয়া বড় পাগড়ি মাথায়  নেসরুদ্দিন হোচা বা আমাদের মোল্লা নাসিরুদ্দিন ।  ভালোবাসার বাটি ততোক্ষণে উপচে পড়ে আর কি !




আমাদের আবার আন্তালিয়া যেতে হবে । ওই  আহমেটের গাড়িতে করে  । প্রায় পাঁচ ঘন্টার পথ । আহমেট একজন সাদাসিধে ছাপোষা লোক । গাড়ি চালিয়ে পয়সাটা নিজের ঘরে তুলতে চায় । তাই হোটেল থেকে ছুটি নিয়েছে । একটু কিন্তু কিন্তু মুখ করে  বলল আমার ন’বছরের ছেলে তায়েব সঙ্গে গেলে কোন অসুবিধে নেই তো ? মানে বাচ্চাদের নিয়ে বিশেষ
বেরোনো হয় না কিনা ।

ভারি মিস্টি ছেলেটি। আপেলের মতো টুকটুকে । ইংরেজি জানে না । ছাত্র হিশেবে ভালো , ওর বাবাই বলল ।
আমরা কোনিয়ার একটা সুন্দর মতন  পাড়ায় রোদ ঝলমলে দুপুরে একরাশ গোলাপ ঘেরা রেস্তোরাঁয় আইরান মানে বিশুদ্ধ নোনতা ঘোল,বুল্গুর  আর আদিনা কাবাব খেয়ে গাড়িতে চাপলুম ।



কাপাদোকিয়ার মায়াজগত থেকে কোনিয়ার সুন্দর শান্ত  স্নিগ্ধ শহর ছেড়ে  এবার ভূমধ্যসাগরের দিকে পাড়ি । আনাতোলিয়া থেকে মেডিটেরানিয়ান । এই ক’দিনে আমরা তুরকিশ চায়ের ভয়ানক ভক্ত হয়ে গেছি । চা নিয়ে আসলে আমাদের অনেক সমস্যা । বেশির ভাগ জায়গায়  চা খেয়ে সুখ নেই ।  একমাত্র  সমস্ত তুর্কি ভ্রমণে এখানকার চা আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড ।
কাপাদোকিয়া, ধরা ছোঁয়ার বাইরে এক স্বপ্নের কুহকিনী  , সে পাগল করে খেপিয়ে মারবে  সবসময় কোনিয়া ছিমছাম আটপৌরে মধ্য বয়সী মা মা সুন্দরী । সে আশ্রয় দিতে জানে , ভালোবাসা দিতে জানে । সে তো ভালোবাসারই শহর ।

অনেকটা পথ । সুযোগ বুঝে আমি মাঝবয়সী  সাদাসিধে ছাপোষা  আহমেট কে জিগ্যেস করি ,  কামাল আতাতুরক একজন কামাল লোক ছিলেন। কী বলুন ?
বেশ কিছুক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলল ।
আহমেট যা বলল তা এইরকম, আপনি দেখবেন বেশির ভাগ মানুষ এখন আতাতুরক কে পছন্দ করে না । তিনি একেবারে সব কিছুর মূল কেটে ফেলতে চেয়েছেন । আধুনিকতা ভালো  কিন্তু তাই বলে আমাদের ঘাড় ধরে   বাপ পিতেমোর সবকিছু জলে ফেলে দিতে হবে, সেটা ঠিক নয় । এখনকার প্রেসিডেন্ট  কিন্তু যথেষ্ট করিতকরমা  । সব কিছুই আমরা পারি   । কী নেই আমাদের ? তাই বলে ছেলেপুলেরা ধর্ম কী ,  রীতিনীতি কী জানবেই না , সেটা মেনে নেওয়া যায় না বাপু  ।

মুখে এসে গেলেও বলতে পারলাম না যে রুমি তাব্রিজ তারা কেউই কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না । আজকে রুমি পশ্চিম দুনিয়ার মন জিতে নিয়েছে  সে কি এমনি এমনি ? কতো আধুনিক ছিল তার ভাষা , চিন্তার ব্যাপ্তি ।  কতো রক স্টার পপ গাইয়েকেও অনুপ্রাণিত করেছে তের শতকের এই কবি ।
গাছেদের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে । বেলা গড়িয়ে এলো । দূর থেকে যেন সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস শোনা যায় । একটা প্রাণবন্ত ঝলমলে শহরের মধ্যে ঢুকে গেছি তায়েবের সঙ্গে চোখ আর হাসি ছাড়া ভাষায় কথা হয় নি । ভারি ভব্য ছেলে ।
আমাদের হোটেল, সমুদ্র ঘেঁষা । সবুজ গাছের মধ্যে নীল রেখা দেখতে পাচ্ছি ।

আহা, এতো দূরের পথ । আবার ফিরে যাবেন । অনেক রাত হয়ে যাবে । ছেলেটার বড় কষ্ট হবে আজকে । ওকে না আনলেই পারতেন ।

নিয়ে এলাম এই জন্য , ও কোনোদিন সমুদ্র দেখে নি তো !






ছবি  সুপর্ণা দেব
শামস /ইকবাল ছবি জয়ন্ত নারায়ণ
রুমির কবিতা গুগল 






Tuesday, 6 June 2017

ভিন গ্রহ আর মহীনের ঘোড়া

ন্ন্যাসিনী  ক্রিশ্চিনা  একমনে জপমালার একটা একটা পুঁতি  গুনে চলেছেন  ।  ছোট্ট গুহাঘরে  নিস্তেজ আলো । আবছা আলোয়   নির্জন মায়াবী  প্রার্থনা ঘর । ক্রিশ্চিনার সাদা কাপড়ের প্রান্তভাগ ছিঁড়ে গেছে , দুচোখের পাশে আর কপালে সরু সরু বলিরেখা । বেশ কয়েক মাস আগে এফেসাস থেকে কয়েকজন সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে এখানে এসেছেন , প্রায় লুকিয়ে, আগ্নেয় গিরির লাভা জমে জমে গড়ে ওঠা এই বিস্তীর্ণ পাথুরে অচিন প্রান্তরে । লাভা পাথরের আপাত নরম জমিতে  ছোট ছোট গুহা অনেকদিন ধরেই খুঁড়ে খুঁড়ে বের করে এনেছে অতীতের লোকজন  । সেখানেই এখন তাদের  সাধনা , প্রার্থনা , মানুষের সেবা ,
পড়াশুনো , ফেস্কো আঁকা পাথর মাটি গাছপালা ফুলের রঙ দিয়ে ।  তবে সময়টা ভালো নয় । ত্রাস ও  আতঙ্কের ছায়া । অস্তিত্ব সংকট । ঘোরতর । পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা ,বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন প্রান্তে ।
ক্রিশ্চিনা প্রার্থনার মধ্যে ডুবে গেছিলেন । হঠাৎ একটা ডুকরে ওঠা কান্না । একটি শিশুর নিষ্প্রাণ দেহ । বয়স বড়জোর চার পাঁচ  । রবিনকোনো সোরগোল নয় । খুব শান্তভাবেই শিশুটিকে ওই প্রার্থনা ঘরের কোনায় সমাধি দেওয়া হল । ক্রিশ্চিনার দু চোখ বেয়ে  নীরব জলের ধারা । তিনি মুখ ওপরে তুল্লেন । মৃদু আলোয় দেওয়ালে আঁকা ভগবান যিশুর করুণা ঘন মুখ, নরম দুই চোখ ।
সবাই চলে গেলে তিনিও  মাথা নিচু করে গুহা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন । জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর । কোথাও যেন এতটুকু কষ্ট নেই , শোক নেই , মালিন্য নেই ।  যতদূর চোখ যায় নিরাভরণ প্রস্তর প্রান্তর । বরফ জল বাতাসে ক্ষয়ে ক্ষয়ে কী বিচিত্র তার গঠন । তারই খাঁজে খাঁজে অজস্র অগনিত গুহা ।
কতো সাধু কতো সন্ন্যাসিনী আর তাদের সঙ্গে আসা সাধারণ মানুষ । সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই আশ্চর্য প্রান্তরে ।
ক্রিশ্চিনা  যাবেন আরো দুটো গুহা পার হয়ে তাদের রান্নাঘরে । পাথর কেটে টেবিল আর তার চারদিকে বসে জনা পঞ্চাশ একসঙ্গে খাওয়া সারতে পারে । রুটি জলপাই তেল, নুন মরিচ , জলপাই , অ্যাপ্রিকট, আঙুর মজিয়ে ওয়াইন ।
যেতে যেতেই তার কানে এলো সেই আওয়াজ যা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ঘোড়ার খুড়ের খট খট খট খট । সবুজ নরম ঘাস, নাম না জানা হলুদ বুনো ফুল মাড়িয়ে দিয়ে দুরন্ত ছুটে চলেছে সাদা বাদামি কালো ঘোড়ার দল । তাদের যারা চালাচ্ছে তারা সব মূর্তিমান আতঙ্ক । তারা তছনছ করে দেয় সব কিছু ।
ক্রিশ্চিনা তার রোগা শরীরটা চেপে ধরে একটা ফলন্ত অ্যা প্রিকট গাছের সঙ্গে । তার নিস্তেজ চোখদুটো  ধক ধক করে ওঠে ।  এভাবে আর কতদিন?  তাদের গুহা গুলো একটু উঁচুতে পাহাড়ের গায়ে । রাতের বেলা ঠাহর হয় না । বাতিও জ্বলে খুব কম ।  সেই আওয়াজ মৃদু থেকে মৃদুতর হতে থাকে , ক্রমশ মিলিয়ে যায় ভিজে জ্যোৎস্নার চরাচরে , দিগন্তরেখায়  বিলীন ।






জ্যোৎস্নায় চরাচরে দিগন্তরেখায় বিলীন সেই  ঘোড়ার খুড়ের খট খট মাখন মসৃণ পিচের রাস্তায় একটা ছোট্ট বাসের চাকায় মিশে গেলো কখন  জানতেও পারিনি ইস্তানবুল এয়ারপোর্ট থেকে আসছি কায়সেরি । আকাশ পথে একঘন্টার একটু বেশি । ভিড়ের মধ্যে কে যেন ডাকে “বাবা” । বুকের মধ্যে তোলপাড় । “বাবা” । তুর্কিরা বাবাকে বাবা বলেই ডাকেভদ্রলোক ডেন্টিস্ট ,  ঘরনী টি মনোবিদ , দুটো গুটগুটে সুন্দর বাচ্চা । তুর্কিরা খুব গপ্পে । একটা কথা বললে ওরা একশো টা বলে । নো ইংলিশ বলেই স্ত্রী কে আলাপের মধ্যে টেনে আনেন । ইনি একটু ইংলিশ জানেন তাই । ইস্তানবুল থেকে কায়সেরিতে , নিজের বাড়িতে ফিরছেন ।
প্লেন থেকে নেমে সেই ছোট্ট বাসে চড়ে উধাও হয়ে গেলাম কায়সেরির পথে । আমার চোখের সামনে  প্রসারিত আনাতোলিয়া । ইতিহাসের এশিয়া মাইনর । ধু ধু প্রান্তরে পড়ন্ত বেলার হলদে কমলা রোদ , সেই নাম না জানা তীব্র হলুদ ফুলের লাগামছাড়া  পাগলামি । উঁচু নিচু টিলা , নীল পাহাড়ের আবছা চালচিত্রআর মাঝখানে মাখন মসৃণ পথে জোর ছুটেছে ছোট্ট বাস । তার সামনে বাঁধা নীল কালো সাদা রঙা ইভিল আই ছোট ছোট বাড়িঘর ,হুশ হাশ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি । কোন লোক চোখে পড়ে না । বাসেও আমাদের ছাড়া মাত্র দুজন । কতটা যে পথ পেরিয়ে এলাম । চলেছি কাটপাটুকা  বা তেজি সুন্দর   ঘোড়ার দেশেখ্রিস্টের জন্মের আগে প্রাচীন হিটাইট রা  এই নামেই ডাকত ।  তারই আজকের নাম  কাপাডোকিয়া ।  এখানে সবচেয়ে সরগরম জায়গার নাম  গোরেমি ।
না , আমরা গোরেমিতে নামবো না । তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে ছুটে যাই । আর ক্রমশ আনাতোলিয়ার  আশ্চর্য জাদুমায়াভরা রহস্য প্রান্তর  সালভাদোর দালির  surreal  ছবির মত    আমাকে তার দুই মুঠির মধ্যে গুটিয়ে ফেলতে থাকে ।  
বাঁ দিকের এক খাড়াই রাস্তা , সে রাস্তা স্বর্গে গেছে কি না জানি না কিন্তু আঙুর লতার মাচান পার হয়ে কালো গেটের ওপর থোলো  থোলো গোলাপের বেড়া পার হয়ে কী সুন্দর ডিজাইন করা  জলের কল আর গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের মতো গড়নের  মসজিদ পেরিয়ে বাসটা দুম করে থেমে গেলো । আমি ভাবলাম স্বর্গ হলেও এই উঁচু খাড়াই পথে কেমনভাবে হাঁটবো ? সেই কখন দেশ ছেড়েছি চলিচলিচলিচলি পথের নাই কো শ্যাষ ? ড্রাইভার বলল আপনাদের হোটেলের গাড়ি এসে গেছে ।  সুনের ড্রাইভার দরাজ গলায় প্রায় হাঁক ছাড়ে “মের হাব্বা “ ।
টঙের ওপরে আজুরে কেভ হোটেল । আমার বন্ধুবর যতই পরিচয় দিক না কেন একটা রিনিরিনে বামা কণ্ঠ হোয়ার ইস সুপারনা ? বলে বলে অস্থির । ই মেলে বিস্তর আলাপ ।  কিন্তু ইনি যে মহিলা সেটাই জানা হয় নি এতোদিন বোকেম আমাকে জড়িয়ে ধরে । চোদ্দশো ঊনপঞ্চাশ সনের গুহাকে হোটেল বানানো হয়েছে । গোরেমির সরগরম থেকে  মাত্র কিছু  দূরে এক দিকশূন্যপুরে আজুরে  কেভ । ছড়ানো ছিটনোউঁচু নিচু । হোটেল করার জন্য অদল বদল তো একটু করতেই হয় । তা ছাড়া সেই পুরোনো কাঠামোই আছে । একাধিক পরিবার  এখানে একসময়  থাকতো । গুহা হোটেলের দেওয়ালে মাঝে মাঝে গর্ত । বোকেম বলল , ওখানে ল্যাম্প রাখা হত । মানে কুলুঙ্গির আদিমতম চেহারা । আমি টেরাসে গিয়ে দাঁড়াই । ঠান্ডা হাওয়া । হালকা সন্ধে নামছে , তখন রাত আটটা বেজে গেছে । নিঃশব্দ  নিঃসীম পরিসরে অদ্ভুত পাথুরে পাহাড় । এক শুনশান দিক চক্রবাল । পাহাড়ের গায়ে  গুহা । চোখের সামনে কোন বাধা নেই । আকাশ, উল্টোনো বাটি । তখনো নীল  এ কোন মহাকাশের মাঝে এসে পড়েছি ।  এই অপার নিঃসীমতা , শূন্যতা , শূন্যতা বা পূর্ণতা , আমি জানি না , তার সবটুকু বিশালতা নিয়ে আমার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে । আমি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছি এই আদিম প্রকৃতির মাঝখানে । যেন “স্নিগ্ধ পৃথিবীর পাতা পতঙ্গের কাছে চলে” এসেছি । “ হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো”।








বোকেম জানিয়ে দিল ঠিক সকাল নটায় আপনাদের সফর শুরু হবে । গুহাঘরের ভেতরে বেশ আরাম আরাম গরম । কতো শতাব্দীর পুরোনো কাদের ব্যাবহার করা ঘর । কে জানে! কেমন যেন আবহমান পথের পথিক,  সীমাহীন সময় সরণী বেয়ে চলছি এইরকম একটা অনুভূতি হচ্ছিল । ব্যাপারটা ঠিক বাস্তব বলে বোধ  হচ্ছিল না । বেশিমাত্রায় বোকাদের এরকমই হয়! যদি বিস্মিত হওয়ার আনন্দ আর ক্ষমতাই হারিয়ে  ফেললাম তাহলে  আর বাকি কী রইলো ?
  পরের দিন  আবার সেই থোলো গোলাপ বেড়া , আঙুর লতার মাচান, গ্রিক চার্চের মত মসজিদ , সুন্দর কলতলা একে একে সকালের আলোয় উৎরাই বেয়ে একটা ছোট্ট বাসে আমাদের  তুলে দিল । পথে কোন লোকজন নেই । আমরা গোরেমির দিকে চলেছিদু তিনটে জায়গা থেকে আমাদের সঙ্গীরা উঠল। বেশির ভাগই গুহা হোটেল । গোরেমি বেশ  প্রাণবন্ত ছোট্ট একটা ভারি সুন্দর জায়গা । আমাদের সঙ্গী হলেন ইব্রাহিম আর তার বউ , দুটি মালয় কুমারী , একজোড়া দক্ষিণ কোরিয়া , এক পিস তুর্কমানিস্তান  এবং এক ফোঁটা ইংরেজি বলতে না পারা ভারি স্মার্ট  সুদর্শন বয়স্ক তুরকিশ দম্পতি ।  আমাদের গাইড বাসে উঠেই মাতৃ ভাষায় অজস্র কথা বলতে শুরু করল ওই স্মার্ট বয়স্ক সুদর্শন তুরকিশ দম্পতির সঙ্গে । কিছুক্ষণ পরে আমার নাক বলল ,গলিয়ে যাই? আমি বললুম যাও ।
“ মানে বলছিলুম কি একটু যদি ইংরেজিতে বলেন , আমরা আবার মেরহাব্বা চিকিস আর গিরিসের ( এন্ট্রি/ এক্সিট ) বাইরে এখনও আর একটাও তুর্কি শব্দ শিখে উঠতে পারিনি কিনা !”
“আরে না না ,” খুব লজ্জিত হয়ে গাইড সাহেব বলেন ওনারা একদম ইংরেজি জানেন না ,তাই শুরু করার আগে ওদের একটু বলে নিচ্ছিলাম”। এই বলে তিনি  আনুষ্ঠানিক ভাবে তার ভাষণ শুরু করলেন। মাসুট ( মাসুদ) প্রোফেশনাল  গাইড ,ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি আছে । কাপাডোকিয়ায় নানান ধরনের ট্যুর আছে । লাল , নীল, সবুজ । দেখলাম আমাদের ট্যুরটা লাল আর সবুজের একটা মিশেল । আমরা দেখলাম গোরেমি ওপেন এয়ার মিউজিয়াম , ইলহারা ভ্যালিতে হাঁটলাম , আরো দেখলাম লাভ ভ্যালি , ইমাজিনেশন ভ্যালি , গোরেমির প্যানোরামা । দূর থেকে রোজ ভ্যালি ।  এর মাঝখানে এক জায়গায় এলাহি খাওয়া দাওয়া , কারপেট আর পটারি ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখা ।
কাপাডোকিয়া এক আশ্চর্য ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে । অতিপ্রাকৃত ম্যাজিকাল কখনো মনে হবে যেন অন্য কোন গ্রহ । এই অঞ্চল এই পৃথিবীর নয় ।






এটা কি গাছ বলুন তো? আমি বললুম জানি তো ,আপ্রিকট । মাসুট হাসে,  ইয়েস লেদি ,ইউ আর রাইত । আমি মনে মনে বললাম ,আরে ক্রিশ্চিনা সেই কবে রাতের বেলা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার শব্দ শুনে ছিল , এত ভুলে গেলে চলবে ?
আমাদের এখানে প্রচুর অ্যাপ্রিকট হয় । আমরা ইওরোপে প্রচুর এক্সপোর্ট করি ।
গোরেমি ওপেন এয়ার মিউজিয়াম , নরম ভস্ম শিলায় গড়ে ওঠা ছোট বড় গুহায় গড়ে উঠেছিলঅসংখ্য চার্চ । কাপাদোকিয়া খ্রিস্ট ধর্মের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল পঞ্চম ষষ্ঠ শতাব্দীতে । ছোট বড়  গুহা গির্জাগুলোতে ফ্রেস্কো রয়েছে অনেক । নীল সবুজ মেটেলাল , হলুদ খয়েরি রঙে যিশু , মা মেরি ও সন্তদের ছবি আঁকা । যিশুর জন্ম মৃত্যু । ছবি আছে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট  ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা কন্সটান্টাইন ও মা হেলেনার ছবি । সন্ত অনোফ্রিয়াসের অদ্ভুত ছবি ।  শুধু প্রার্থনা নয় , অপেক্ষাকৃত বড় গুহাগুলোতে খাওয়া দাওয়া , রান্না বান্না হত । কবেকার চুল্লির আগুনে কালো হয়ে পুড়ে আছে গুহার ছাদ । পাথর কাটা টেবিল । পূর্ব ও উত্তর আইকনক্লাস্ট যুগের স্পষ্ট তফাত দেখা যাবে এখানেই । বাইজান্টাইন আমলে তৈরি এসব গির্জাগুলো সঙ্কটে পড়েছিল নতুন ইসলাম ধর্মের প্রসারে । মূর্তি আঁকা বন্ধ হল অথবা নষ্ট হল । কোন কোন গুহায় শুধুই ক্রশ । 
আগ্নেয় শিলার বিচিত্র ভাস্কর্য কতো হাজার বছর ধরে একটু একটু করে আকার নিয়েছে , জল বাতাস বরফ যেন তিন শিল্পী । মাসুত বোঝাচ্ছিল , এমন ক্ষয় চলতে চলতে আগামী একশ বছরে অনেক প্রাকৃতিক ভাস্কর্যই একেবারে হারিয়ে যাবে । সরু চিমনির মতো পাথরের স্তম্ভ । কতগুলো   স্তম্ভের মাথায় একটা করে পাথরের টুপি বসানো ।   সবই ক্ষয় কাজের ভেলকি !  
 তাই নিজের মতো করে  ভেবে নাও , দাও কল্পনার ঘোড়ার বলগা ছেড়েমনে রেখো এই দেশের আসল নাম সুন্দর ঘোড়ার দেশ, কাটপাটুকা ।
লাল নদীর জলে ধোওয়া লাল পাথরের রোজ ভ্যালিতে তেরছা রোদের আলো আর হালকা মেঘের মৃদু প্রেম  মস্তবড় ভাঙা মাটির পাত্র তার পাশে চোখ ঝলসানো নীল ইভিল আই এর গুচ্ছ গাছে বাঁধা ।  ধুসর বালু রঙা পাহাড়ের ঢালু  খাতে কে পেতে রেখেছ  সোফা কৌচ ? কে  এমন ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে চাও ? তুর্কমানি তাতিয়ে দেয় , ওইখানে গিয়ে বসবে ?
সুপর্ণা , অই খানে যেও নাকো তুমি । বোলো নাকো কথা অই তুর্কমানির সাথে ।
আমি বললুম নাহে ।
অ্যাফ্রেদ?
ধুর , কি যে বল ?  আমি হলুম গিয়ে বরিশালের বাঙাল । এই তো  সবে ঘোরাঘুরি শুরু । তাই একটু সাবধানী আর কি ! যদি পা হড়কে যায় !
তুর্কমানি মহিলা কেমিক্যাল এগ্রিকালচার নিয়ে কাজ করে । ফার্টিলাইজার পেস্টিসাইড এইসব তো ?
উঃ কী ভীষণ খুশি । সে ভাবতেই পারিনি যে আমরা এইসব বুঝতে  পারব !
সেই টার্কিশ দম্পতির ভয়ানক ফিট  রূপসী মহিলা কতো স্ট্যান্ড লাগিয়ে কঠিন কঠিন ছবি তুলতেই থাকল । কিন্তু কতটুকু আর ফ্রেম বন্দী করা যায় ? শুধু হাসি আর চোখ দিয়ে কতো কথা বলল । ভাষার আর কি দরকার , বেশ চলছে সব কিছু । যত কথা তত ঝামেলা ।










মাসুতের পরিচালনায় খুব চমৎকার একটি জায়গায় খুব চমৎকার  একটি লাঞ্চ খাওয়া হল ।  তুর্কমানি এক বাটি স্যুপ নিয়ে , আই রেকমেন্দ ফর ইউ ,বলাতে চোরা চোখে চেয়ে আমি ভাবলাম ওইটা কি
আমি বিলক্ষণ  জানি । ঘন দইএর ঘোল। তাতে গুচ্ছের দিল আর পুদিনা কুচি  আর চুষি  পিঠের মতো ময়দার টুকরো মেশানো । আমি ভাই খাচ্ছি না ।
কাপাডোকিয়া থেকেই কয়েকটা কথা মনে আসছিল । যার প্রথমটাই হল এবারে কি পর্যটক কম? ইওরোপ অ্যামেরিকার বড়লোক পশ্চিমিদের  তো দেখাই যাচ্ছে না । তুরকিশ রা যেমন বাক্যবাগীশ,  রঙ্গ রসিক ,বন্ধুবৎসল  তেমনি ভালো ব্যাবসাদার । ইহুদি শাইলকের রক্তও মিশে গেছে হয়তো । ট্যুরিস্টের বাজারে এবার মন্দা । ইস্তানবুলে বোমা ফাটায় পশ্চিম দুনিয়া কার্যত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । মাসুত বারবার করে বলতে থাকে , তোমরা দেশে ফিরে বোলো, এখানে কোন ঝামেলা ঝঞ্ঝাট নেই । স ব ঠিক আছে , সব
দেখা হল একটা কার্পেট কারখানা । এগুলো সবই প্যাকেজের মধ্যে ঢোকানো । অ্যাপল টি , তুর্কি চা । রকমারি কার্পেটের বাহার । আকাশছোঁয়া দাম । সাতশো গাঁটের কার্পেট হাতে বুনে চলেছেন এক মহিলা ।
এরপর আমরা ঢুকলাম চেজ গালিপের (গালিব ? ) ওয়ার্ক শপে । গালিপ খুব নামজাদা মৃৎ শিল্পী । আভা্নোর , কাপাডোকিয়ার খুব নামকরা পটারি শিল্প কেন্দ্র । গালিপ সেখান থেকেই এসেছেন । বংশ পরম্পরায় এই কাজ করে চলেছেনগিনেস বুকে নাম উঠেছে । আইনস্টাইনের মতো দেখতে গালিপ খুব বিখ্যাত, এটুকু বোঝা গেলো । ঢোকা মাত্রই পটারি নিয়ে একটা ছোটখাটো ডেমো দিয়ে দিল কাদির , সারা গায়ে কাদা মাটি মাখা । কুমোরের চাক ,পা দিয়ে ধাঁই ধাঁই করে লাথি মেরে ঘোরাচ্ছে কাদির । মাটির তালের আকার বদলে বদলে যাচ্ছে । আর চারপাশ থেকে হাই হুই  বিস্ময় ধ্বনি তুলছে আমাদের ছোট্ট গ্রুপের লোকজনেরা । আবার অ্যাপল টি,  তুর্কি টি আর সারাপ বা ওয়াইন , সেটা আবার ট্র্যাডিশনাল সারাপ টেস্টিসি( পাত্র) থেকে ঢেলে ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল । ওয়ার্ক শপের তিনটে ভাগ । যেখানে গালিপের সিগনেচার কাজকর্ম আছে সেখানে ছবি তোলা বারণ । বিক্রিবাটা তেমন জমল না আকস্মিক ভাবে শিল্পী গালিপ কোথা থেকে বেরিয়ে এলেন কিন্তু সেভাবে কেনাকাটায় তেমন উদ্বুদ্ধ করতে পারলেন না ।  তবে শিল্প কর্ম গুলো অতি চমৎকার । পটারি সেরামিক টাইলস , রঙের আর নক্সার জলুসদার যুগলবন্দী একেবারে মারকাটারি রকমের ভালো ।
বাস যখন আজুরে কেভে নামিয়ে দিল , তখনও “আকাশ নীল মদের গেলাস “, টিমটিমে বাতি জ্বলে উঠছে পাহাড়ে পাহাড়ে । মাঝখানে কখন বৃষ্টি এসে পথে ধুয়ে দিয়েছে । টার্কিতে কথায় কথায় ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি নামে , আবার রোদ ওঠে । ঈশ্বর যাকে দেন, ছপ্পড় ফুঁড়ে দেন । এই দেশটিও তাই ।




খুব সকাল মানে রাত তিনটে চল্লিশে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেলো । চলুন চলুন  বালুন (বেলুন) রাইড করতে হবে । রয়াল বেলুন রাইড কোম্পানি দুয়ারে হাজির । তাদের আপিসে হাজিরা । সাথে ফাঁসির খাওয়া । এতো সকালে খাবার অভ্যাস নেই । সবাই গান্ডে পিন্ডে খাচ্ছে । সেখান থেকে বেলুন চড়ার মাঠে গেলুম । হাউ হাউ করে ইয়া বড় বড় বেলুনে দাউদাউ আগুন জ্বালিয়ে গ্যাস ভরা হচ্ছে , বোঁ বোঁ করে পেল্লাই সব  ফ্যান চলছে । বেলুনের সঙ্গে লাগানো বড় বড় বেতের টুকরির মধ্যে আমরা সেঁধিয়ে যাবো ।  আমি মিলিটারি ট্যাঙ্কে দু দু বার চড়েছি মশাই ,এতো আমার কাছে তুশ্চু । ঢুকে তো গেলাম কিন্তু নামার সময় দুটো  তুর্কির কাঁধে চেপে নেমেছিলাম। ও ,এমন একটু হয়েই থাকে । তা না হলে মজা কিসের ? বেলুন তো উড়তে থাকল । কাপাদোকিয়ার সেই আশ্চর্য ভিন গ্রহ সদ্য ফোটা সকালের আলোয় আবার  দিগন্তজোড়া ম্যাজিকআমাদের পাইলট খুব মজা করছেন সবার সঙ্গে । ঠান্ডায় কাঁপছে চিনে তরুণী । পাইলট জ্যাকেট খুলে তাকে দিয়ে দেয় । উড়তে উড়তে পরিষ্কার ভাবে গুহা বাড়িগুলো দেখতে থাকি । মাটি থেকে খানিক উঁচুতে । তিনটে পরপর ফুটো , বোধহয় ভেন্টিলেটর বা রান্নাঘর । নিচে জল বেরিয়ে যাবার গর্ত । জানালা, ঢোকার পথ । ১৯২২ সনে তুর্কি গ্রিক জনগন বিনিময়ের সময় পর্যন্ত অনেক পরিবার এই গুহাগুলোতেই থাকতো । আজও নাকি অনেকে গ্রিস থেকে তাদের পুরোনো গুহা দেখতে আসে , নাতিপুতিদের দেখাতে আসে । মানে বহু বহু কাল ধরে বংশ পরম্পরায় গুহাতেই থেকে গেছে  এদিকে বেলুন কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গায় নামতে পারল না । বাতাসের গতি তাকে অন্যদিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো । উড়ন্ত বেলুনকে অনুসরণ করে চলে  কোম্পানির গাড়ি । সেও রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না । অস্থির পাইলট ওয়াকি টকিতে নির্দেশ দিচ্ছে আর বলছে চবক চবক চবক মানে জলদি জলদি তাড়াতাড়ি ।  ঠিক এই সময়ে যখন পাইলট ঝোপঝাড়ের মধ্যে  কোথায় নামাবো কোথায় নামাবো,  ঠিক করতে পারছে না ,  সে সময় একটা কিছু ঘটলো ।  আমি ক্রিশ্চিনার গুহাঘর দেখতে পেলাম । বেলুন যখন দুলে দুলে জমি আঁকড়ে ধরছে  সেই সময় লম্বা লম্বা একসারি সরলবর্গীয় গাছের ফাঁক দিয়ে দেখলাম ছুটে চলেছে তেজিয়ান চকচকে খান চারেক ঘোড়া ।
সফল বালুন রাইড সেলিব্রেট করা হল শ্যাম্পেন দিয়ে । আমোদের এখানেই শেষ নয় , আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হল মেডেল । কি সব যাচ্ছেতাই  হাস্যকর বালখিল্য  ব্যাপার !  তবে ভালো লাগছিল খুব । পাইলট মনে করিয়ে দিল সেই কথা , সব্বাইকে মনে করে বলবেন টার্কিতে কোন ঝামেলা নেই । চিনে তরুণী দৌড়ে এসে মোবাইল বাগিয়ে ধরে কি দেখাতে থাকে , দেখি দেখি । আমির খানের দঙ্গল । বেইজিং এ দেখেছে সে । তার খুব ভালো লেগেছে । গার্ল পাওয়ার ! দারুণ !





আজই কাপাদোকিয়ায় আমাদের শেষদিন । ব্রেকফাস্টের পর আজুরে কেভের সেই প্রশস্ত টেরাস , গরম নরম ঘর আর ভারি মিস্টি মেয়ে বোকেম কে টাটা করে সুনের এর গাড়ি  করে সোজা পিজন ভ্যালি  লাভা পাথরের গায়ে ছোট ছোট গর্ত করে পায়রাদের থাকার ব্যাবস্থা  করা হয়েছিল । কবে ? কে জানে ! হাজার হাজার পায়রা থাকতো এখানে আর তাদের  বর্জ্য ,সার হিশেবে ব্যাবহার হত । এখনো দেখি উজ্জ্বল রোদ্দুরে ঝাঁক ঝাঁক পায়রা । তাদের দানাপানির ব্যাবস্থা । আর পিজন ভ্যালি বাঁচানোর আর্তি , পর্যটকদের কাছে ।
হাতে সময় খুব বেশি নেই । আমরা আবার কোনিয়ার বাস ধরবো । সুনের আমাদের নিয়ে চলেছে কেমাকলি । রেল স্টেশনের মতো একটা কাউন্টার । আমরা টিকিট কাটলাম । প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা কাপাদোকিয়ায় এক আজব দুনিয়া বসিয়েছে  তেমনি মানুষের কঠোর শ্রম আর মেধা কীভাবে ভস্ম শিলার নরম দেহে মাটির নিচে বসবাসের এক বিপুল আয়োজন করেছে তা দেখলে বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই চায় না । বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি কি গুলে খেয়েছিল এরা ? এই পাতালঘর খ্রিস্টের জন্মেরও আগে থেকে । সেই হিটাইটদের আমলে । কিন্তু এগুলোর ব্যাপক ব্যাবহার শুরু হয় খ্রিস্টান দের হাতে । নিজেদের আরব বিধরমীদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচবার তাগিদে । নিজেদের ধর্ম রক্ষার তাগিদে ।
একজন বয়স্ক গাইড বাবা ছেলেকে খুব মন দিয়ে বোঝাচ্ছেন । মন্দার বাজারে ভিড়ভাট্টা নেই । আমরা বললাম আপনাদের সাথে জুড়ে যাই ? ভদ্রলোক সহাস্যে রাজি । এরা দুবাইএর ভারতীয় । বাবা ছেলে বন্ধু বন্ধু । বাবার আগ্রহ উৎসাহ ছেলের চেয়ে ঢের বেশি । গাইড বাবা মুস্তাফার সঙ্গে সেই পাতালঘরে প্রবেশ করি । ভেতরে আলো জ্বলছে । আবার একতলা দোতলা  তিনতলা চারতলা , লখনোউ ভুলভুলাইয়ার ঠাকুরদাদাসবটা মাটির তৈরি । ঘরের ভেতর ঘর, তার মধ্যে ঘর। ঘরের মধ্যে সুড়ঙ্গ ।ওপর নিচ । একতলা দোতলা । সুড়ঙ্গের মধ্যে কখনো মাথা নিচু , কখনো হামাগুড়ি । ওরে বাবা , কাল ঘাম ছুটে যাচ্ছে । ঘর বানানোর, শ্ত্রুর চোখে ধুলো দেবার কী প্যাঁচ পয়জার!











শোবার ঘর , বসার জায়গা , কমিউনিটি ডাইনিং , পাকশালা, তেলের বাতি রাখার জায়গা, দানা শস্য রাখার জায়গা  । পিপে পিপে মদ আর তেল রাখার জায়গা । আঙুর পিষে মদ বানানোর নিখুঁত  ব্যাবস্থা । মশলা  পেষাই ।  পুজোর ঘর, জল নিকাশ , বাইরের আলোহাওয়া আসার ছিদ্র, বর্জ্য পদার্থ কপিকলের সাহায্যে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা, ঘন্টা বাজাবার ব্যাবস্থা ।একটা বিশাল গোল পাথরের দরজা । ব্যাস একবার ঘরাং করে বন্ধ হয়ে গেলে যতই  চিচিং ফাঁক বল না কেন , সে দরজা খুলতে পারবেই না তুমি । শত্রুর মুখের সামনে দড়াম করে সে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত । কিন্তু কী ভীষণ শক্ত ছিল সে জীবনকী ভীষণ উৎকণ্ঠা ছিল । মাটির তলায় এই আয়োজনে বিস্মিত হলেও কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম ।
বাবাছেলে জুটি দারুণ ফুর্তিবাজ । আশি বছরেরও বেশি মুস্তাফা আরো প্রাণোচ্ছল । বাইরে বেরিয়ে আসি । হাঁফ ছাড়ি ।
সুনের আবার স্টিয়ারিং ধরে । সে একেবারেই ইংরেজি জানে না ।  কতগুলো এবড়ো খেবড়ো শব্দ আর প্রবল হাত পা ছুঁড়ে সুনের যা বলতে চাইল তা হল , নো ট্যুরিস্ট নো মানি । তার তিন মেয়ে । সবাই বায়না করে খেলনা দাও। চকোলেট দাও , এটা দাও সেটা দাও । দিলেই তুমি কী ভালো বাবা ! আর না দিলেই বাবা নো গুড নো গুড ।
বাইরের দেশ আমাদের দেশ নিয়ে যা তা বলছে । বলছে নো টার্কি নো টার্কি ,  টার্কি মানেই বম বম বম । কোথায় বম্ব ! দেখো সব কি সুন্দর ! কি সুন্দর আমাদের এই জায়গা !
সুনের আমাদের বাস টারমিনাসে নামিয়ে দেয় । ঝাঁ চকচকে পরিষ্কার । আমাদের বাস আসতে একটু দেরি । বাস সময়ের কাঁটা ধরেই ছাড়বে ।
সুনের মেরহাব্বা বলে হাত নেড়ে চলে যায়। যেতে যেতে থামে , একটা গাছ থেকে কিছু ছিঁড়ে আমার হাতে দিয়ে বলে আপ্রিকত !
আমি তুরস্কের প্রেমে পড়ে গেলাম ।



সন্ধ্যাকালে গর্ভে ফেরা নিরুপায় বেচারা
পথিক
সেই জন্ম-মৃত্যু চক্রে, চরাচর সমুদ্র 
সৈকত
ঢেউ আসে , ফিরে যায়, বালি নুনে 
আমিও তো বাঁধা
এ জন্মে কী থাকবে? কিছু শব্দ , কিছু সুর ,
নশ্বরতা!

কবরের নেমপ্লেটে যে শোক, আমি কি বন্ধু
 তার !
নেমে যাই নীচে, দেখি শবদেহ হয়েছে
উধাও
অস্থি-বাস্তবতা –মোহ গ'লে ফোটে রোদ্দুরের
হাসি
পাহাড়ের খোঁজে ফের মোমের মাচিস
হারালাম।





কবিতা ঃ  “বাদামি চিনি “ সোমাভ রায়চৌধুরী
জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন নেওয়া হয়েছে
ছবি  ঃ সুপর্ণা দেব