Thursday, 2 November 2017

খম্মা ঘানি সা


 বেঁচে তো আছি , কিন্তু জীবনের সে আনন্দ কই”?
তারপর?
না মিল নে কা খুশি  , না জানে কা ঘম । ভেতর থেকে যেন শুকিয়ে যাচ্ছিলাম ।
তারপর?
তারপর আর কী ? তার আর পর নেই। নেই কোনো ঠিকানা । একদিন দুম করে ঠিক করলাম যে দিকে দু চোখ যায় চলে যাব । যাবার আগে কোন রিস্তেদার নয়, হাজির হলাম এক বন্ধুর বাড়ি । বললাম, এই ঘষটে ঘষটে চলা আর পোষাচ্ছে না, শহর ছেড়ে চলে যাব , আজ রাতেই ।
সে বলল, কোথায় যাবে, কিছু ঠিক করেছ
না ।
এক কাজ কর, যখন শহর ছাড়বে মনস্থির  করেই ফেলেছ আমাদের গ্রামটা একবার ঘুরে  এসো । ওখানে আমার বাড়িতে দু তিনদিন থাকো, তারপর ভেবে দেখো ।
বাড়ি গিয়ে চন্দাকে বললাম আজ বেরিয়ে যাব , দরকারি জিনিশপত্র গুছিয়ে ফেলো  । বাচ্চাদের খাইয়ে দাও । আর হ্যাঁ, তুমি আমার সঙ্গে যাবে তো?
সে বলল ,যেখানে তুমি আর বাচ্চারা , সেটাই আমার ঘর ।
মোবাইল থেকে তিনশোটা নম্বর ডিলিট করে ,বাক্স গুছিয়ে খাবার নিয়ে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়লাম ।    গাড়ি চালাবো কি ? হু হু করে দু চোখ ছাপিয়ে জল পড়ছে । এতো দিনের নিজের শহর জয়পুর ছেড়ে চলে যাচ্ছি ।
চন্দা বলল , চোখের জলের সঙ্গে জয়পুর বেরিয়ে যাচ্ছে তোমার ।
নিকল নে দে ।
সেই থেকে আজ সাত বছর হয়ে গেল এখান থেকে নড়তে পারিনি ।
ঝাল ঝাল লঙ্কা মাখা ডালমুট ,মিরচি পকোড়াসামোসা , বুঁদির লাড্ডু । আদা দেওয়া চা । পাওয়ানা হাভেলির টেরাসে ঢিমি ঢিমি আলো । পাশেই রঘুনাথ মন্দিরে আরতির ঘন্টা ।
রাজিন্দর সিং জির একটা ফোন এলো ।
হাঁ হুকুম , বোলো , আভি যা রহা হু । কুছ লানা হ্যাঁয় ?
রাজিন্দর জি উঠে পড়লেন ।
গায়ে পড়েই জিগ্যেস করলাম, এতো মিস্টি করে কার সঙ্গে কথা কইছিলেন ?
আমার বউ, চন্দা ।
হুকুম বলে ডাকেন ?
আমরা রাজপুতরা সম্মান দিয়ে হুকুম বলি, সব্বাইকে । মিচকি হেসে রাজিন্দর উঠে পড়লেন ।
শেখাবতীর মান্ডাবায় রাত ঢলে এসেছে । আমরাও ক্লান্ত ।দিল্লি থেকে ছঘন্টার পথ।   পাওয়ানা হাভেলি । পাওয়ানা মানে অতিথি । একটা হাভেলিকে হোটেল বানানো হয়েছে । রাজিন্দর এর লিজ নিয়েছেন । বাবাকে সাহায্য করে সদ্য যুবক অনুরাগ । দিল্লি পাবলিক স্কুল ছেড়ে জয়পুরের মস্ত মকান ছেড়ে টিমটিমে গ্রাম মান্ডাবায় যখন এসেছিল তখন নেহাত বালক । বাবার খামখেয়ালিপনায় মদত জুগিয়েছে গোটা পরিবার । তখন ছিল  ছোট্ট কুঠরি । কেঠো চারপাই । কোনো ফুটুনি নেই । দিনের পর দিন এভাবেই কেটেছে । মান্ডাবাতেই পড়াশুনো করেছে । সেই সব  কথা বলতে কোনো জড়তা নেই তাদের ।  আর আজ ?
দিল লগ গয়া । আব আচ্ছা লগতা হ্যাঁয় । ইতনা সুকুন এতো শান্তি এখানে ।
আমি হাঁ করে ওইটুকু ছেলের  কথা শুনি । আর্টিস্ট হতে চেয়েছিল কিন্তু বাবার জম্পেশ ট্যুর ও হোটেল ব্যাবসায় হাল ধরা তার  ভবিষ্যৎ, সে  কথা সে বেশ জেনে গেছে  ।
আজ ঘুমন্ত টিমটিমে মান্ডাবার একপ্রান্তে তাদের পেল্লাই বাড়ি , গাড়ি , এনফিল্ড বুলেট সেই বাড়ির খোলা বারান্দাছাদে রাজিন্দর তার বউ এর সঙ্গে  মনের আনন্দে চা খায় আর ভীমসেন জোশির জো ভজে হরি কো সদা , ভজন শোনে । আর জীবনের আনন্দ তারিয়ে তারিয়ে মৌজ করে আকাশে সপ্তর্ষি মন্ডল দেখায় মেয়েকে   ।






পনেরো শতাব্দীর রাজপুত রাজা মহারাও শেখার  দেশ , শেখাবতী । শেখাবত রাজপুতদের দেশ ।  ঝুনঝুনু চুরু আর সিকার জেলা নিয়ে আজকের শেখাবতী । মান্ডাবা নওল গড় রাম গড় ফতেপুরের জমি  রুখা সুখা । বৃষ্টি বিরল সেই ধুলো প্রান্তরে আছে খেজরি গাছ ।সেই গাছের ফলের নাম সাংরি । খুব দাম নাকি । খেতে টকটক । আনাজপত্তর বেশি হয় না তাই ব্যাসনের গাট্টে , ডাল ,আচার এই সব দিয়েই রকমারি খাবার বানায় । কটকটে লাল শাড়ি লম্বা ঘুঙ্ঘট । মাথায় ঘড়া । বিশাল পাগড়ি । উটের গাড়ি । গাধার গাড়ি । ধুলো উড়ছে বিন বিন । মুগ ডালের হালুয়া সদ্য বানানো হয়েছে । তার ওপরে সরু সরু করে কাটা আমন্ড বাদাম ছড়িয়ে দিচ্ছে । গরম লাড্ডু , প্যাঁড়া ।

এখানেই সব  মিস্টি শেষ হয়ে  যায় ?

না না এইসব মিস্টি আমরা দিল্লি জয়পুর আমেদাবাদ মুম্বাই কলকত্তা সব জায়গায় পাঠাই । হুম । চেখে দেখুন ।

পাওয়ানা হাভেলি মান্ডাবার বাজার এলাকায় । ওইটুকুনই বাজার । বাজার ছাড়িয়ে কয়েক পা এগুলেই শুনশান । আর চারদিকে আরো শুনশান হাভেলি । ইয়া বড় বড় দরজায় বিশাল বিশাল তালা ঝুলছে ।  ছোট্ট ছোট্ট খুপরি খুপরি বন্ধ জানালা আর তারপর ?
সারা হাভেলির শরীর জুড়ে ছবির পর ছবি । রঙের জাদু । নকশার নেশা । রঙ আর নকশা যখন ঘোর ধরাচ্ছে  ভাবছি এখখুনি ওই ঘুলঘুলি জানালার  একটা পাল্লা  একটু ফাঁক হবে আর গোলাপি  ঘোমটার ভেতর থেকে কেউ আমাকে মিছরিদানা গলায় ডাকবে ,
খম্মা ঘানি সা । পধারো মাহরে হাভেলি সা । গলা সুখ গয়ে, থোড়া পানি ফরমাইয়ে সা । কচৌরি খাওগে সা ? মিরচি অচার কে সাথ ।
এখন তো আর কেউ থাকে না । আমার ভারি একা লাগে । আর কতদিন এই হাভেলি আগলে বসে থাকব ? এসো না , দুটো কথা কই, সা ?
আমিও অমনি যাচ্ছি , গুলাবিইইইই বলে  এগিয়ে যাব , ওমা ! সেই শুনশান পাড়ায় এক দঙ্গল ট্যুরিস্ট । হক্কলে বিদেশি । আর গাইড ! সে একবার স্প্যানিশ একবার ফ্রেঞ্চ একবার স্প্যানিশ একবার ফ্রেঞ্চ ,ঝড়ের মতো বলছে কানে মাকড়ি মাতব্বর খচাখচ ছবি উঠছে । তাতা সুখা ভাপে সাদা চামড়া লাল । আর কি ! গুলাবি হাওয়া হয়ে গেল ।
আমিও হাভেলি দেখায় মন দিলাম । দেশের লোক বলতে শুধু আমরাই । শেখাবতী টেনে আনে বিদেশিদের । তাও নাকি ফ্রেঞ্চ আর স্প্যানিশ ভাষাভাষীরাই দলে ভারি । কানে মাকড়ি গাইড গুলো ফরফর করে ওদের ভাষা শিখে যায় । অনুরাগ বলে অনেকে নাকি স্কুলেও পড়েনি । ইশ যে কোন একটা ভাষা জানলে মান্ডাবায় গাইড হয়ে থেকে যেতাম !
দেশের লোকও আসে তবে অত আদিখ্যতা তাদের নেই । বেশির ভাগই জাঁকালো শীতে উইকএন্ড কাটাতে আসে দিল্লি জয়পুর থেকে।  আর সেইসব ফ্রেস্কো মুরালের মধ্যে  খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তন্নু লাভস মন্নু লিখে টিখে ধুলো উড়িয়ে চলে যায়
দেখলাম গোয়েঙ্কাদের হাভেলি লাডিয়া হাভেলি ।মুরমুরিয়া হাভেলি ।  ঝুনঝুনয়ালা , পোদ্দার , শরাফ । কোন হাভেলির নেমপ্লেটে লেখা কলকাতা , মানে বংশের বাতিরা কলকত্তায় থাকে সল্টলেক বা আলিপুরে বা চিত্তরঞ্জন এভিনিউ এ  ।  কোন কোন হাভেলির মধ্যে আবার  বংশের  ঝড়তি পড়তি লোকেরা থাকে, দিব্যি সংসার পেতে  চুলা জ্বালিয়ে  রান্নার কালিতে সেই সব মহার্ঘ শিল্পকলার গুষ্টির তুষ্টি  । কোন হাভেলি এক্কেবারে বন্ধ । কোথাও বা একটা উদাসীন কেয়ারটেকার । অল্প কিছু টাকা নেবে । আর সাঙ্খ্য দর্শনের মতো মুখ করে সেই বর্ণময় তিজোরির দরজা খুলে দেবে । একটা তিজোরির মধ্যে আমি ঢুকে যাবো । আমার মাথাটা আবার টাল খেয়ে যাবে ।
গুলাবি আবার ডাকবে, থোড়া ঘিউ নাও না, সা ? ডাল বাটি চুরমা?








মান্ডাবার জল হাওয়ায় কিছু একটা আছে । মনটা একদম শান্ত । চা নিয়ে হোটেলের ছাদ বারান্দায় বসে আছি তো আছিই । চারদিকে যে খুব নয়নাভিরাম পারকিতিক দিরিশ্য, তাও নয় । তবু কেমন জানি একটা ভারি ভালো লাগা । অকারণ । সময় যেন কতদূর পিছিয়ে গেছে । এটাই বোধহয় রাজিন্দর কে টেনেছিল

 রাজস্থানী মারোয়াড়ি ভাষায় খম্মা  মানে ক্ষমা আর ঘানি মানে অনেক । কাউকে সম্মান জানিয়ে নমস্কার , হ্যালো বলার জায়গায় ওরা বলে খম্মা ঘানি ।বহুত মেহেরবানি  আর সা , যেমন জি বলা হয় হিন্দিতে । আও সা , বসো সা । খাও সা । এইসব । পালটা বলতে হবে ঘানি ঘানি খম্মা সা   

তামাম রাজস্থানে গোটা দশেক প্রধান  চিত্র শৈলী আছে । তার মধ্যে ঢুন্ডহার ঘরানার শেখাবতী কিশানগড় জয়পুর আর আমের শৈলী । শেখাবতী হাভেলির ছবিগুলোকে কয়েকটা  ভাগে ফেলে দেওয়া দেওয়া যায় । ফুল লতা পাতা,শুধুই অলঙ্করণ , এইসব অলঙ্করণ রাজস্থানী প্রিন্টে খুব দেখা যায় , বেডকভার , ড্রেস মেটেরিয়াল , পর্দা । পশু পাখি । যুদ্ধের ছবি ।  ঠাকুর দেবতা ।লোকগাথা । ইতিহাস। দৈনন্দিন জীবন । শেঠ শেঠানি । যানবাহনের ছবি । ব্রিটিশ দের ছবি । যিশু খ্রিস্টের ছবি । রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি । এমনকি শিল্পী  ফ্রিদা কাহলোর ছবি । সত্যি ! গাইডদের মুখে মুখে নাম ফেরে । হয়তো এমনো হতে পারে এই আঁকা জোকায় বিদেশী শিল্পীরাও তুলি ধরতো কখনো কখনো  ।

সমাজ ও রাজনীতি যেমন খাতে বয়ে গেছে ফ্রেস্কো মুরালের মধ্যে নতুন নতুন ভাবনা ঠিক সেই ভাবেই এসেছে । এই অলঙ্করণের কাজ প্রথম দিকে রাজপুতদের মন্দির এবং দুর্গেই দেখা যেত । ব্রিটিশদের প্রধানত ব্যাবসা করতে আসা  , রাজপুতদের  দুর্বল ক্ষমতা আর তার পাশাপাশি দেশি বানিয়াদের রমরমা । 


শেখাবতী মাড়োয়ারি বানিয়াদের দেশ । বিড়লা ডালমিয়া সরাফ ঝুনঝুন ওয়ালা , পোদ্দার । নামগুলো কি চেনা চেনা না ? চেনা চেনা মানে ? হাড়ে হাড়ে চেনা । হাড়ে হাড়ে কেন চেনা তার আর্থ সামাজিক ব্যাখ্যার দরকার অন্তত এই লেখার জন্য নেই । মেধা পরিশ্রম  কৌশল দিয়ে যে যা অর্জন করতে পেরেছে তা তো স্বীকার করে নিতেই হয় ।    ঊনিশ শতকের গোড়া থেকে শেখাবতীর ছোট গন্ডি ছেড়ে  ব্যাবসা বাড়াতে বিভিন্ন শহরে এই মাড়োয়ারিরা ছড়িয়ে পড়ে বিশেষ করে কলকাতায়ব্যাবসার ফেঁপে ওঠা টাকার একটা অংশ যেত দেশে,  মানে এই শেখাবতী অঞ্চলে । ব্যবসা যত বাড়ে তত বেশি রুপিয়া দেশে পাঠানো হয় । জেত্তা রুপিয়া তেত্তা জিগদারি । শেখাবতী ভরে ওঠে ঠাটবাটে । জেল্লাদার হাভেলি, মন্দির , ছত্রী , বিয়ে ,পুজো আচ্চা আর ভিটের টানে শহরিয়া বাবু বানিয়ারা শেখাবতীমুখো হতেন । দানছত্র চলত । দেমাক জাঁক জমক দেখিয়ে পড়শিদের জানানো হত দ্যাখ কত পয়সা কামাচ্ছি । যত পয়সা তত জেল্লা । হাভেলির দেওয়াল মাখন মসৃণ । মিহিন পলেস্তারা ।হাত পিছলে যায় । শেখাবতীর উন্নয়নে মাড়োয়ারিদের  বিরাট ভূমিকা । দেশের বড়বড় রাঘব বোয়াল মাড়োয়ারি ব্যাবসায়ী শিল্পপতির ভিটে এই শেখাবতী । এখনো কালেভদ্রে কেউ গিয়ে কখনো বা হাজির হয় , বাপ পিতেমোর ভিটেয় ধুলো ঝেড়ে প্রদীপ  জ্বালিয়ে আসে ।
  হাভেলির আনাচ কানাচ  উঁচু ছাদ দেওয়াল ভরিয়ে এই ফ্রেস্কো আঁকা খুব সোজা কাজ ছিল বলে তো মনে হয় না ।
কলকাতায় বসে থাকা এই সম্প্রদায়কে দেখলে বিশ্বাসই হবে না যে এদের আপনজমিতে কী ফুল টাই ফুটিয়েছেন এরা , তার সুগন্ধ নিয়ে কত গুলাবি আজো ঘুরে বেড়াচ্ছে হাভেলির মধ্যে ।





মান্ডাবা থেকে ফতেপুর মাত্র কুড়ি কিলোমিটার । এখানে এক মাঝারি মাপের হাভেলি কিনে সেখানে হোটেল বানিয়েছেন ফরাসি আর্টিস্ট নাদিন লেপ্রিন্স । মহিলা । তার একটা ওয়ার্কশপও আছে । ফ্রেস্কোগুলোর পুনরুদ্ধারে তার অনেক খাটুনি গেছে । ছবি নিয়ে অনেক কাজ সেখানে চলছে । উনি এখন প্যারিসেই থাকেন তবে  কয়েকটি অল্পবয়সী ফরাসি মেয়ে কেউ লেখে কেউ আঁকে কেউ ছবি তোলে ,এখানে কাজ করছে । এই খাঁ খাঁ গরমে ধুরধুরে গ্রামে কিসের নেশায় পড়ে আছে । হাভেলির ফ্রেস্কো দেখে দেখে আশ আর  মেটে না
বলে নাকি নওল গড়ের হাভেলিগুলোই সব থেকে বেশি ঠিকঠাক রাখা হয়েছে । তাই চললাম নওল গড় । প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা । পোদ্দার হাভেলি মুরারকা হাভেলি ভগত হাভেলি ।  পুরো শেখাবতী একটা ওপেন আর্ট গ্যালারি
শেঠের হাভেলির তিনটে ভাগ । মর্দানা । জেনানা । নোহরা  ।
মর্দানা , বাইরের ভাগ । গদ্দি তাকিয়া । টানা পাখা ।  হিশেবের খাতা । মেয়েরা এখানে আসবে না । শেঠের দল  ব্যাবসা বচসা নিয়ে থাকবে  এখানে । এ হল বৈঠক খানা ।  তারপর ভেতর মহল , রসুই ঘর , ভাঁড়ার ঘর , শোবার ঘর,ঠাকুর ঘর  আর পায়রাকে খাওয়ানোর জন্য  দানাপানি রাখার  ঘর । এরপর একেবারে পেছনের দিকে নোহরা  । খোলা চাতাল , চারদিকে পাঁচিল সেখানে থাকত উট ,হাতি  ঘোড়া , ভেড়া গরু ছাগলখোলা ছাদে  উঁচু পাঁচিলের আবডালে সাঁঝের বেলা বসত জেনানা মহল । মোটামুটি এইরকমই সব হাভেলির গড়ন ।
রঙদার জেল্লাদার কাজ নিয়ে শেঠেদের মধ্যে টক্কর চলত । মেটে লাল নীল হলুদ সবুজ এই বেসিক রংগুলোই বানিয়ে নেওয়া হত । তারপর এক রঙ কে  অন্যের সঙ্গে মিশিয়ে আরো  নতুন রঙ তৈরি হত ।  ভাগ্যিস বৃষ্টি হয় না । তাহলে কবেই সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যেতো । ধুলোট পটভূমিতে এই রঙিন প্রাসাদ চিত্রমালা কেউ আর দেখতে আসত না ।
এই বর্ণিল জাদুরেখা আর  মায়াবী হাভেলির  জন্য কত হিন্দি সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে এখানে ।







রাজিন্দরজি ট্যুর আর হোটেল ব্যাবসায় চুল পাকিয়েছেন । জীবনে ঝুঁকি নিয়েছেন বিস্তর ।  ট্যুরিস্ট ঘেঁটে ঘেঁটে দেশ বিদেশ ঘুরে ঘুরে  তাদের মুখ দেখেই গোত্র বলে দিতে পারেন । মালয়েশিয়ার একটা দলকে দেখভাল করতে করতেই  জানিয়ে দিলেন বিকেলবেলা আমাদের নিয়ে রাম গড় যাবেন । রামগড়ের শেঠরা খুব বিখ্যাত ছিল । ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে একেবারে বেমক্কা সপাটে গাড়ি চালিয়ে দিলেন ।
বিকেল প্রায় শেষ হয়ে আসছে । আমরা একটা অদ্ভুত সুন্দর মন্দিরের মধ্যে ঢুকেছি । শনিমন্দির । সন্ধের অস্তরাগ রাঙিয়ে দিচ্ছে মন্দিরের কারুকাজ ।  মন্দিরের মধ্যে মধ্যে  শিশার কাজ । এক কুচি আলোতে হাজার জোনাকি জ্বলে উঠছে । অনুরাগ একটা বাচ্চা ছেলে । বলে উঠল একবার ভাবুন তো , সেই পুরোনো সময়টার কথা । যখন এই হাভেলিগুলো এই মন্দিরটা নতুন ছিল, এতো লোক ছিলোনা , গাড়ি ছিল না । সন্ধের মুখে হাজার জোনাকি জ্বলে উঠতো,আরতির ঘন্টার সঙ্গে  । সেই জোনাকি জ্বলা সন্ধেকে মুঠোয় নিয়ে মান্ডবা ফিরে এলাম ।



দিল্লিহাটের রাজস্থানের ফুড স্টলে বসে আছি তার কারণ আসিফ is obsessed with Rajasthan . মুগ ডালের হালুয়া হাতে দিয়ে বললাম মান্ডবা থেকে এনেছি ।
বাজি (দিদি) মান্ডবা কেন গেছিলে ?
আরে শেখাবতী দেখার ইচ্ছে আমার বহুদিনের, তাই চলে গেছি ।
আমিও গেছি । কেউ একজন নিয়ে গেছিল ।
কে?
কাত্যায়নী ।

মেহরাউলির কোন এক প্রত্ন চত্বরে কোন এক হিমহিমে শীতের সন্ধে বেলা কোন এক বাউন্ডুলে দাস্তানগো গল্প বলছিল । সামনে সব নুক্কড় দল বসেছিল । পয়সা ফয়সার ধার দিয়ে যাবে বলে মনে হয় না । হঠাত সেই বাউন্ডুলে দেখে এক লম্বা সুন্দর কোঙ্কড়া চুলো মেয়ে পশমি কুর্তা আর বুট পায়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গল্প শুনছে । তারপর ঠিক বিদেশি কায়দায় সেই মেয়ে মাথার টুপি খুলে সবার সামনে ধরে আর যে যা পারে দিতে থাকে । গল্প বলা তখনও শেষ হয়নি, তার আগেই মেয়েটি টুপিসমেত  টাকা আসিফের সামনে রেখে হাওয়া হয়ে যায় । এই সেই কাত্যায়নী । রাজপুত মেয়ে । রাজকুমারী সা ।
খুব ভালোবাসা তাদের  । কিন্তু যা হয় । ভিন ধরমী বাউন্ডুলে ছেলে । পরিনতি যা হবার হল ।

উসকো আতা নহি থা মানানা
হম জব ভি নারাজ হোতে থে
উয়ো চুপচাপ পিছে সে আ কর আপনা সর
হমারে কাঁধে পর রখ দেতি থী...
উয়ো অ্যা য়সি মোহব্বত করতী থী


প্রসঙ্গ খানিক হালকা করার জন্য আমি বললাম আরে জানো তো সেখানে এক ট্র্যাভেল পাগল লোকের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছে । এই বলে আমি রাজিন্দরের ছবি দেখাই ।
রাজু ভাইয়া , আরে ইয়ে তো রাজু ভাইয়া হ্যাঁয় । আমি ওকে খুব ভাল করে চিনি ।
অ্যাঁ ?বলো কি ?
হ্যাঁ, বাজি । আমরা তো ওর হাভেলিতেই ছিলাম ।
আমরাও তো  সেখানেই ছিলাম কি আশ্চর্য !
আমি ওখানে বসেই টপাটপ মেসেজ টাইপ করলাম । আপনি কি আমার ভাই আসিফ খান দেহেলভি কে চেনেন? ও আপনার কথা বলছিল ।



কিছুক্ষণ পর টাইপ ফুটে উঠতে লাগল

হাহাহাহাহা , আমি ওকে খুব ভাল করে চিনি । তাহলে কাত্যায়নী রাঠোরকেও চেনেন নিশ্চয়ই । হাভেলিতে হাভেলিতে একজোড়া কবুতরের মতো ঘুরে বেড়াতো ওরা । ঢোলা মারু , হির রাঞ্ঝা , মুমাল মহেন্দ্র আর আসিফ কাত্যায়নী ।

আমি লিখলাম , ওই আসিফের কাছে যে টুকু শুনেছি ।

সত্যি পৃথিবীটা খুব ছোট । there is no meeting without reason . সব কিছু আগে থেকেই ঠিক করা  আছে যে  আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি ।

দু সেকেন্ড চুপ থেকে  ইংরেজিতে টাইপ করলাম
আমিও ।




ছবি লেখক


Friday, 18 August 2017

গদাধর সাহার শপিং মল


জকাল গদাধরের  ঘুম ভালো হয় না । আবছা আবছা , ছেঁড়া ছেঁড়া , হালকা মেঘের মত । ছায়ার মত , বাতাসের মত । খালি আসছে আর যাচ্ছে । আসছে আর যাচ্ছে ।  ঘুম আর ফাতনা গিলছে না । তাকে ধরি ধরি মনে করি ,ধরতে গিয়ে আর পারি না । আর ঠিক তখখুনি গদাধরের  কোঠা বাড়ির সমুখের রাস্তা দিয়ে  হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে । সংকীর্তন চলছে ,আবেগে মতোয়ারা  । খোল  বাজছে , ভোরের আলো প্রায়  ফুটি ফুটি । সাদা টগর লাল জবা সবে চোখ খুলছে । গদাধর  তড়িঘড়ি উঠে খড়খড়ি ফাঁক করে দেখে রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা  সোনা , তার বাড়ির সমুখ দিয়ে চলে গেল । ফরসা খোলা পিঠ ,লম্বা দুটি হাত আর কিছু দেখতে পেল না  । আপনা থেকেই হাত দুটো  প্রণামের মতো জড়ো হয়ে গেল গদাধরের । আর ঘুমনোর বালাই  নেই । সটান উঠে দিঘির ধারে দাঁড়িয়ে  গদা নিমের ডাল ভেঙে দাঁতন করতে লাগল । জলপিপি পানকৌড়ি ডুব মারছে ।ডানা ঝটপটিয়ে সাদা কালো হাঁসের দল জলে নেমে গেল । দিঘির পারের সব ঝুপসি গাছগুলোয় নিমাই পন্ডিতের কাঁচা সোনার আলো এসে পড়েছে । তারও ওপারে যেখানে ভোরের আকাশ আলতো ভাবে ফুটে উঠছে গদার মনে তখন কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে ওগো সুদূর বিপুল সুদূর তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি ...মোর ডানা নাই  । নাহ , গদার চোয়াল দুটো শক্ত হোল । তার দুটো অদৃশ্য ডানা আলবাত আছে । শ্যাম লাহিড়ী বনগ্রামের কী যেন হয় গঙ্গারামের মতই বাঙালির ছেলে বিজয় সিংহ , হেলায় লঙ্কা করিয়া জয় , তাদের কি যেন কি একটা হত বলে সে বাপ পিতেমোর মুখে বহুবার শুনেছে ।
বউ টা মারা যাওয়া  ইস্তক ঘরেও তার মন টেকে না । গদাধরদের বানিজ্যে বসত লক্ষ্মী এই শান্তিপুর নবদ্বীপের যত শাড়ি আর নানান তেজারতি ব্যাবসা সেই কোন জন্ম থেকে তারা করে আসছে । বাঙলার ব্যাবসা পত্তর মন্দ না । পায়ের উপর পা তুলে ফেলে ছড়িয়ে খাবার রসদ তার আছে । কিন্তু ওই যে গদার বদ রোগ , এক জায়গায় তার মন  বসে না । এ গ্রাম সে গ্রাম করে নদে শান্তিপুর সে চষে ফেলেছে । ঢাকা ফরিদপুরে  মসলিনের কারবার করতেও গেছে । কিন্তু  এই উড়ো স্বভাবটার জন্য তার তো বিশেষ কিছু করার নেই । সে মেষ রাশি মেষ লগ্ন । চরে বেড়ানোর জন্যই তার জন্ম । গদার যদিও জানার কথা নয় কারণ তার সময়ের আরো তিনশ  বছর পর অমনি এক মেষ রাশি মেষ লগ্ন এক চৌহদ্দির মধ্যে পাঁচ পাঁচ খানা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন , ওই এক কারণ, এক জায়গায় মন বসে না । আবার তিনিই লিখেছিলেন মায়েরা সন্তানদের বাঙালি করে রেখেছে । আস্ত মানুষ বানায় নি । তারা  সক্কলে বোতাম আঁটা জামার নিচে শান্তিতে শয়ান । ইহার চেয়ে হতাম যদি আরব বেদুইন । না,  গদা আরব বেদুইন হতে চায় নি বটে তবে আরবের ব্যাবসাদারদের সঙ্গে তার বিলক্ষণ  মোলাকাত হয়েছে  । তাদেরই একটা দলের সঙ্গে তার বেশ লাগে কথা কইতে । একটু অসুবিধে হয় , তবে  আকারে ইঙ্গিতে ভালোই কাজ চালানো যায় । হুশেন শাহি জমানায়  বাঙলায়  মোটের ওপর খুব কিছু অশান্তি নেই । সেই আরবি ভিনদেশিরাই  একটা প্রস্তাব দিয়েছে । দেশের লোক সঙ্গে থাকলে ভিনদেশিদের সুবিধে হয় । গদার মাথায় সেইটাই ঘুরপাক খাচ্ছে আজ প্রায় হপ্তা খানেক হবে ।
গদাধর মুখ ধুয়ে রাধা মাধবকে পেন্নাম ঠুকে উঠোনে  এসে বসে । রাধামাধবের প্রসাদ ,তার সঙ্গে ফেনা ওঠা দুধ , চিঁড়ে , কলা আর বাতাসা । গদাধরের মা আবার তার বিয়ে দেবেন বলে তোড়জোড় শুরু করেছেন । তিনি কি সব  বলে যাচ্ছেন গদার কানে তা এক বর্ণ ও ঢুকছে না । শুধু আমির  উল্লাহের  কথা তার কানে মাথায় বিজবিজ করছে
উঠোনে মালতী লতার ঝাড়ে ভোমরার বোঁ বোঁ  । বেলা বাড়ছে । সবাই যে যার কাজে লেগেছে । আড়তের লোকেরা বার দালানে জড়ো হচ্ছে । গদা বসেই আছে । যেন কোন হুঁশ নেই ।  শুধু একটা কুবো পাখি ডেকে যাচ্ছে কুব কুব কুব কুব ।আর গদার মাথার ভেতরে কে যেন বলছে ঘর থেকে  ছুট ছুট ছুট



পরের দিন আবার খোল বাজল , কীর্তন হল , নিমাই পন্ডিত পথ আলো করে  হেঁটে চলে গেলেন । কিন্তু গদাধর তার কিছুই শুনতে পেল  না , দেখতে পেল না ততক্ষণে রসদপত্র নিয়ে  আরবি বনিকদের সঙ্গে সে ধরেছে পশ্চিমের পথসার সার গোরুর গাড়ি । টুং টাং গলার ঘন্টা , গাড়ির নিচে লন্ঠন নিভুনিভু ।  তন্দুরের রুটি আর ঝলসানো ভেড়ার মাংস । তার এতোদিনের  নিদ্রাহারা রাত আজ ঘুমে ঢলে পড়েছে । অথচ মনের মধ্যে উত্তেজনার তোলপাড় । ওদিকে গদার মা শুয়ে শুয়ে ভাবছেন পান সুপুরি পাঠিয়ে  ছেলের বিয়ের পাকা কথা সেরেই  ফেলবেন রাত পোহালেই ।
গদাধরের জন্মগত বংশগত ব্যাবসাবুদ্ধি , সেয়ানা বুদ্ধি , অজানাকে জানার অদম্য কৌতূহল ,  ক্ষমতা আর অর্থ স্পৃহা কে বাঙলার ধান মাছ নারকেল  ঠান্ডা হাওয়া আর কীর্তন সুখী করতে পারেনি । কিছু লোক জন্মায় চির বুভুক্ষু । গদাধর সেই অদ্ভুত দলের । সুখে থাকতে ভূতে কিলোয় !




উজ্জয়িনী ইন্দোর পেরিয়ে বছর দশেক  পর গদাধর হাজির হল এক  অদ্ভুত সুন্দর জায়গায় । এরমধ্যে  মাড়বার , কচ্ছ , সিন্ধ ও আরবি ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে মেলামেশায় তার কূপ মন্ডুকের  সীমানা অনেক অনেক বেড়েছে । বংশগত বুদ্ধি  হয়েছে  ছুরির ফলার মত ধারালো , কথাবার্তা হয়েছে তুখোড় , হাতে এসেছে বিস্তর অর্থ , চেহারায় তেল চেকনাই চলে গিয়ে এসেছে  একটা কেঠো আকর্ষণ রাজপুতদের সঙ্গে মিশে মিশে অনেকটা তাদের মত হাবভাব রপ্ত করেছে । অবিশ্যি এটা বঙ্গজদের জাতগুণ । নকল করতে তারা ওস্তাদ । গদাধর নাম টা এখন তার কানে বিচ্ছিরি শোনায় । তাই গদা নিজেকে পরিচয় দেয় মেদিনী রায় বলে । মেদিনী রায় রাজপুত ।  
এক ভরা বর্ষায় এক সবুজ মলমলে চাদরে ঢাকা সুন্দর জায়গায় গদা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাজির । এখানে সে ব্যাবসা করবেগত দশ  বছরে অনেক নতুন নতুন পণ্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে । সে আগে কখনো এসব দেখেনি । সরু সরু উজ্জ্বল হলুদ  সোনালি রঙের সুতোর মত , দারুণ সুবাস , নাম জাফরান । পাহাড়ে বরফের দেশ থেকে আসে , আসে মৃগ নাভি কস্তুরি । তার সুরভি নেশা ধরিয়ে দেয় । বড় দুর্লভ । চড়া দাম নবাব বাদশাদের এগুলো না হলে চলে না ।  আরো একটা নতুন জিনিশের কারবার সে দেখেছে , হাতির দাঁত । এখানকার কারিগররা সেই দাঁত দিয়ে কী যে সব সূক্ষ্ম কারুকাজ করে, না দেখলে গদা বিশ্বাসই করত না । এ জায়গাটায় কোন সমুদ্র নেই , বন্দর নেই । কিন্তু বানিজ্যের স্বর্ণ সুযোগ । কারণ আরব দেশ থেকে আফ্রিকা থেকে লোকজন আনাগোনা করে অথচ পণ্য সরবরাহের তেমন প্রতিযোগিতা নেই । অনেক কৌশলে গদা এইসব খোঁজ খবর জোগাড় করেছে অনেকদিন ধরে  । বিস্তর  আট ঘাট বেঁধে গদা তাই  মালব দেশের এই নিবিড় সবুজ প্রান্তে এসে নোঙর বাঁধল  । পালকি করে পাকদন্ডী বেয়ে ভেজা সবুজের গন্ধ  মেখে মেখে গদা মান্ডু চলেছে । বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে মাঝে সুরম্য প্রাসাদ । ভুট্টার খেত । বড় বড় ফটক । কড়া নজরদারি । এত সবুজ গত দশ বছরে গদা দেখেনি । হঠাত গলার কাছে  দলা পাকিয়ে গেল । সেই দশ বছর আগে এমনই ভরন্ত সবুজ এক দেশ ছেড়ে সে চলে এসেছিল ।   দুনিয়া দেখবে বলে ।  
এমনই ঠান্ডা বাতাস বইছিল সেদিন  । প্রাণ জুরোনো , মায়ের মতো । অনেক দিন পরে গদার চোখে জল এলো । পালকি থামিয়ে গদা  খাড়াই পথ বেয়ে হাঁটতে থাকল । বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তার কোঁকড়ানো সামান্য লম্বা চুল , তার রেশমি পোশাক , দামি নাগরা । সেই মহার্ঘ পোশাক ছাড়াও  শ্রাবণ তখন গদাধরের হৃদয়ের একূল ওকূল ভিজিয়ে আকুল । চোখের জল ,  বৃষ্টির ধারাজলে কখন মিশে গেছে । গদার কান্না কেউ দেখতেই পেল না ।

কিন্তু গদা সফল হয়েছিল । খুব সফল । পাইকারি হারে ব্যবসার আড়ত খুলেছিল মান্ডুতে । বিশাল কারবার সরাইখানা । দুটো বড় বড় বাওলি , অন্ধেরা আর উজালা । এতো বড় ব্যাবসা , কত মাল এসে জমা হত । ছোট ছোট ব্যাপারীরা কিনে নিয়ে যেত । সার সার দোকান । খোদ রাজপ্রাসাদে হারেমে তার গুদাম থেকে রাশি রাশি জিনিশ  পাঠানো হত । পাইকারি আড়ত না বলে আধুনিক শপিং মল বললেই যেন ঠিক হয়কে না জানে বাঙালিরা বাঙলার বাইরে বেশি সফল । দেশের জন্য নাড়ির টানে কিনা জানিনা , গদা , মেদিনী রায় নামটা আর লেখেনি ।
ফটক



গদার দোকান







তা প্রায় সাড়ে চারশো বছর পরে আমাদের গাড়ি এক ভরা শ্রাবনের দুপুরে  পাহাড়ি পথ ঘুরে ঘুরে উঠছিল । আমরাও ফটক পেরিয়ে গেলাম একটা একটা । আমাদেরও চোখে পড়ল সবুজের ঢেউয়ের মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে থাকা  প্রাসাদের মসজিদের  ভাঙা শরীর , শ্যাওলা জমা ,  বিষণ্ণ । বর্ষার সঙ্গে রেণু রেণু ধোঁয়া , জলের বাষ্প । আর কি আশ্চর্য ! চারটি ফটক পেরিয়ে  শহরে ঢোকার ঠিক আগে  গদার শপিং মলের বিশাল চেহারা আমাদের থামিয়ে দিল । আড়ালে থেকে গদাই থামিয়ে দিল বোধহয় ।  কোনো প্রাসাদ নয় ,অট্টালিকা  নয়  মন্দির মসজিদ , বিলাস ঘর বা  প্যাভিলিয়ন নয় , কেল্লা নয় , এক বিপুলায়তন দোকানঘর । গদার দোকান ।







সেই নিস্তব্ধ শুনশান বর্ষার দুপুরে হঠাত দাঁড়িয়ে পড়লাম সেই পাথুরে  বাড়ির সামনে । কোন টিকিট লাগবে না । কেউ পাহারাও দিচ্ছে না । শুধু এ এস আই এর একটা ফলক । আমরা ভেতরে ঢুকি আর আর আমাদের বিস্মিত করে রাখে এর বিশাল আয়তন । অনেক কুঠরি । বোধহয়  পণ্য দ্রব্যের আড়ত । সারি সারি দোকান । মারোয়ারি গদি ধরনের । দেওয়ালের দু ধারে জিনিশ পত্র রাখার তাক বা র‍্যাক । ছড়ানো চাতাল । একটু দূরেই দুটো  বাওলি । জলের দরকার হত অবশ্যই । সেখানেই সার বাঁধা কয়েকটা ঘর । মনে হল গেস্ট হাউস । সবুজ ঘাসে ঘাসে আর শ্যাওলায় চাপা পড়ে আছে অজস্র বনিকের হট্টগোল , দরদাম , দর কষাকষি ।আরবি বাজার বা সুক (souk) ছিল এই জায়গাটা  বিস্তর মালপত্র জমা হল আড়তে   সৈয়দ মুজতবা আলীকে  কে একেবারে বসিয়ে দেওয়া যায়মজার  ই শরিফ থেকে কার্পেট এসেছে , বদকশান থেকে লাল রুবি, মেশেদ থেকে তসবি, আজারবাইজান থেকে …”
না ভাই এবারের মুক্তো গুলো তেমন ভালো ঠেকছে না ।
কি হল ? শান্তিপুরের দুকুল ঢাকার মসলিন ,আমার সাত গাঁঠরি লাগবে যে !
জাফরানের দাম কিন্তু এবারে বেশি পড়বে  । পারস্য থেকে এসেছে ভায়া , মুখের দিকে চেয়ে থাকলে কি হবে ? 
হাতির দাঁত অমন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছ যে ! এখানে বাজে জিনিশ রাখি না বুঝলে । আজ সকালেই সুলতানের খাস কারিগর চোখ বন্ধ করে কিনে নিয়ে গেছে ।
একবস্তা আখরোট ফাউ নেব কিন্তু!

কস্তুরি ,বিশেষ যত্ন করে রাখা থাকে । কাপড়ে ঢেকে । গুপ্তধনের মতো । ওদিকে সরাই খানায় রান্নার বন্দোবস্ত । জোব্বা জাব্বা খুলে বিশ্রাম নিচ্ছে পথ ক্লান্ত বনিকের দল । এদের মধ্যে কেষ্ট বিষ্টু গোছের কেউ কেউ যাবে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে , ভেট নিয়ে । গদা তাদের সাহায্য করে খুবই । আফ্রিকা থেকে এক ধরনের গাছ আনিয়েছেন সুলতান । মান্ডুর এই ঠাসা জঙ্গুলে আবহাওয়ায় সে গাছ দিব্যি বেঁচে গেল । আজ মান্ডুতে গেলেই চোখে পড়বে আফ্রিকার বাওবাব । সাতশো বছর বাঁচে । একেক টা গাছ বহু ইতিহাসের সাক্ষী , নেহাত কথা কইতে পারে না । প্রকান্ড  প্রকান্ড গুঁড়ি । ফল হয় ইয়া বড় বড় । নারকেলের মতো শক্ত খোলা । খোলা ফাটালে শুকনো রাম টক বিচিওয়ালা ফল । মান্ডুকি ইমলি । স্থানীয়  লোকেরা  তাই বলে । জামি মসজিদের সামনে রূপমতীর প্যাভিলিয়নে রাস্তার ধারে  সব জায়গায় যত্র তত্র এই ইমলি বিক্রি হচ্ছে ।
লে কে যাও লে কে যাও , মান্ডু কি ইমলি , মশহুর । সুলতান আফ্রিকা থেকে আনিয়েছিলেন , এটা পঞ্চাশ , ওটা চল্লিশ । দশ বছরেও কিচ্ছু হবে না । হাত  নাড়িয়ে পার্বতী দেবী এর গুণ আর ইতিহাস গড়্গড়িয়ে বলে গেল । আমাদের দেশে আপনারা এসেছেন। থ্যাংক ইউ । চলে আসার সময় দেখলাম পুরো গোন্দ স্টাইলে পায়ে রুপোর নক্সা করা মল আর ঝুমঝুমি লাগানো  বিছুয়া পরে আছেন সব কটা আঙ্গুলে ।

ইমলি 


বাওবাব গাছ


মান্ডুর সিগনেচার আইটেম কি কি?

রূপমতী বাজবাহাদুরের প্রেম ও সঙ্গীত গাথা ।  রূপমতী প্যাভিলিয়ন বানানো হয়েছিল শুধুমাত্র এই সুন্দরী গায়িকার নর্মদা দর্শনের জন্য । তার একেবারে ওপরের তলা থেকে গহিন জংগলের বুনোটে বাজবাহাদুরের প্রাসাদ দেখা যায় । আর এই ওপরের তলা থেকেই কাঙালের মতো  কুড়িয়ে নিতে হয় বর্ষা স্নাত মান্ডুর গভীর শ্যামলিমা , বিন্দু বিন্দু বাষ্প বয়ে নিয়ে আসে রূপমতীর সৌরভ আর সঙ্গীত ।  অদৃশ্য তরঙ্গ বয়ে নিয়ে আসে প্রেম সঙ্গীত সৌন্দর্যের অতুলনীয় বন্ধন । “পথ হতে আমি  গাঁথিয়া এনেছি সিক্ত যূথীর মালা / সকরুণ নিবেদনের গন্ধ ঢালা “।

সেই সোঁদালো সন্ধেয় যখন নেমে আসছি , সঙ্গের একজন বললেন, এই মেয়েটা আপনার সঙ্গে কথা বলবে । একটা হাসি হাসি মুখ । সরল কিশোরী ।  একটু অবাক হলাম বটে ! কেনই বা কথা বলবে ? কি নাম রে তোর ? বৈশ্নো । আমি বল্লুম দূর পাগলি , তুই তো রূপমতী । মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসে ।
রূপমতী দেখা দিয়ে গেল ! সেও তো গাঁয়ের মেয়েই ছিল ।

রূপমতীর প্যাভিলিয়ন

বাজবাহাদুরের বাড়ি

অজস্র বাওবাব গাছ আর মান্ডু কি ইমলি ।  হোসংগ শাহ সমাধি বা মিনি তাজমহল ,  দুটো কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝখানে বানানো জাহাজ মহল  যাকে বর্ষার ডুবন্ত  জলে  ভেসে থাকা জাহাজের মতো দেখাতো , হিন্দোলা মহল যার তেরছা দেওয়ালে ঝুলা বেঁধে তিজ উৎসব পালন  করতেন বেগম শাহজাদির দল আর বীনকার বাজাতেন রাগ হিন্দোল । আশরাফি মহল যেখানে নুরজাহান একেকটা সিঁড়িতে তার পদ্ম কমল বিছিয়ে দিতেন আর জাহাঙ্গির একটা করে আশরাফি রাখতেন । পরে ওই সোনার মুদ্রা বিলিয়ে দেওয়া হত গরিবদের মধ্যে । মোঘল শাসন কায়েম হবার পর মান্ডু তে জাহাঙ্গির সময় কাটাতে ভালোবাসতেন ।


জাহাজ মহল





থিয়েটার হল



এ ছাড়া আরো দুটো কথা খুব জরুরি । মান্ডুর বিভিন্ন প্রাসাদে শব্দ কৌশল বা acoustics এর ব্যাবহার । মনে হতে পারে এ এমন কি কথা ? যে কোন কেল্লা বা প্রাসাদে গেলে অমনি গাইড বলবে ওইখানে গিয়ে ফস করে একটা দেশলাই জ্বালছি  আপনি এইখানে  দাঁড়িয়ে পরিষ্কার শুনতে পাবেন । না, ঠিক এমন টা নয় । জাহাজ মহলে আছে গ্রিনরুম সমেত পুরোদস্তুর স্টেজ পারফরমেন্সের ব্যাবস্থা , অদ্ভুত ভাল শব্দব্যাবস্থা । গমগম করে উঠছে ।

বাজবাহাদুরের প্রাসাদে একেবারে ওপরের তলা থেকে নিচের ছোটখাটো বসতি দেখা যায় । ওই খানে দাঁড়িয়ে উনি  দর্শন দিতেন আর কথা কইতেন সাধারণ  মানুষের সঙ্গে । দর্শন দিতেন , না হয় মানা গেল । কথা কইতেন কি করে? সামনেই পাহাড়ি ঢালে জঙ্গলের মধ্যে ছুটকো ঘর বাড়ি । কিছু ইন্টিবিন্টি খেলে বেড়াচ্ছে । তাদের দেখাচ্ছে লিলিপুটের থেকেও ছোট । আমাদের গাইড মোহম্মদ কুরেশি হাল ছাড়বেন না ।
তিনি একেবারেই না চেঁচিয়ে খুবই  স্বাভাবিক ডেলিমালে  বাচ্চাগুলোকে ডেকে, হ্যাঁ রে  ইস্কুল যাস নি ? তোরা ক’ভাই বোন রে ? এইসব হালাং তালাং বকতে লাগলেন । আর ওই নিচ থেকে পরিষ্কার সব শোনা যেতে লাগল ।

“ আসিছে সে ধারাজলে সুর লাগায়ে ,নীপবনে পুলক জাগায়ে “।বাজবাহাদুরের ছিমছাম প্রাসাদে একটা সুন্দর ভাইব্রেশন ছিল ।  খুব ইচ্ছে করছিল আরো কিছু সময় থাকি । যেন মাথার জট খুলে যাচ্ছে , মনটা শান্ত । কেউ যেন ভালবাসছে অন্তরাল থেকে । যেন আপনা থেকেই পা দুটো আটকে থাকছে , সরছে না ।  ভালো লোক ছিলেন তো । প্রেমিক , গায়ক । সুর তাল ভালোবাসার তরঙ্গ  আজো রয়ে গেছে বাতাসে ।


্বাজবাহাদুর প্রাসাদ

মান্ডুর আরেকটা আকর্ষণ হল , জল বন্টন ব্যাবস্থা । বছরের সব সময় এমন ধারা জল সিক্ত থাকে না সে । গরমে সব রুখা শুখা । শুকনো খাঁ খাঁ । তাই প্রতিটি জায়গায় বর্ষার জল ধরে কিভাবে তাকে ব্যাবহার করা যায় , তয়খানা কেমন ঠান্ডা রাখা যায় তার নজির ধরে রাখা আছে । কিছু শুনলাম। কিছু ভুলে গেলাম । ঘোরতর ইঞ্জিনিয়ারিং । প্রাসাদের মধ্যে সুইমিং পুল । বড় বড় তালাও । তালাও মধ্যে বসে ঢালাও আমোদের আয়োজন প্রচুর জলঘোলা হল


হিন্দোলা মহল

পরের দিন ফিরে আসছি , কেন জানি না গদার দোকানের সামনে আবার থামলাম । আসলে ওর গড়নটাই খুব বলিষ্ঠ ,  সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না ।
আমাদের মুখ ভরতি মান্ডুর ভুট্টার দানা ।  আমাদের রূপমতী বাজবাহাদুর , গদাধর সবার সঙ্গেই দেখা হয়েছে , নানান মাধ্যমে, নানান ভাবে  । একটা একটা করে চারটে ফটক পেরিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছি , বারিশ কা বুন্দ আর হরিয়ালি মেখে মেখে নিয়ে । ড্রাইভার রাজেশ এসি বন্ধ করে জানলা খুলে দিয়েছে । হাওয়া লুটোপুটি খাচ্ছে । আর পেন ড্রাইভে বাজছে

কতরা কতরা মিলতি হ্যাঁয়
কতরা কতরা জিনে দো
জিন্দগি হ্যাঁয় , বেহনে দো
পিয়াসি হুঁ ম্যায় , পিয়াসি রহনে দো
রহনে দো না………
হলকে হলকে কোহরে কে  ধুঁয়ে মে
শায়দ আসমান তক আ গয়ি হুঁ……




গুলজারের কবিতা 

ছবি লেখক