Sunday, 16 April 2017

মন ফকিরা

হাম্মামে দেরি গিয়েছিল আজ ।  গুগগুলের ধোঁয়ায় চুল শুকোনো হয়ে গেলে জান্নি একটা স্ফটিকের গ্লাসে টুকটুকে লাল তরমুজের রসে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছেন আর সামনে খোলা বিরাট নক্সাটায় একটু একটু অদল বদল করছেন । এই শখ টা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে । নিছক শখ বলা বোধহয় ঠিক নয় । একে প্যাশন , তীব্র আবেগ বলা বরং ভালো । ভালো ছবি স্থাপত্য শিল্পকলায় রসবোধ ও রুচি বাবাই দিয়েছেন কিনা !
যাক, এতোদিনের চেষ্টা তার সফল হতে চলেছে । চকের মধ্যিখানে একটা বড় জলাধার , তার থেকে বেরিয়েছে ছোট ছোট খাল । চাঁদনি রাত, ঝিকমিকিয়ে উঠবে খালের জলে, যেন বিবিজানের মাথার হিরের তাজ ।মহতাব । লাগানো হবে সারি সারি গাছ । তার .মধ্যে মধ্যে অর্ধচন্দ্রাকারে দোকান বসবে নানান পশরা সাজিয়ে । শাহজাহানাবাদের সবচেয়ে বড় বাজার । চাঁদনি চক । বাদশা বেগম সাহিবা জাহনারার স্বপ্ন । জান্নি শুধু চাঁদনি চক করেই থেমে থাকেন নি ।শাহজাহানাবাদের অনেক সুন্দর প্রাসাদ আর স্থাপত্য তার কল্পনা থেকে জন্ম নিয়েছে । অসম্ভব সুন্দর একটা বাগান বানিয়েছিলেন , বেগম কা বাগ । সেখানে রাজপরিবার আর বড়বড় আমির পরিবারের মহিলা আর শিশুরা গাছপালা ফুল ঝর্নার মধ্যে হেসেখেলে বেড়াত ,ঝুলায় দোল খেত, গান গাইত । আজকাল যে রকম হস্তশিল্প মেলা হয় সেইরকম মেলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জান্নি , পাঙ্খো কা মেলা । জামা কাপড় খাবার দাবার শৌখিন জিনিশের রকমারি সম্ভার সাজিয়ে বসা পুরোদস্তুর মেলা শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য । সাহিবি নামের একটা জাহাজের পুরো নক্সা করেছিলেন জাহানারা । সেই সময়ে ভাবা যায়!
এমন নাজনিন কবি , বিদুষী , গুণবতী দিলদরাজ ও দিলনশী বেগম সাহিবা , তার প্রণয় প্রার্থী থাকবে না তাও কি হয়? বেচারা শিবা আবাদ পারভেজ পারস্য থেকে এসেছিলেন শাহজাহানের সভায় । রাজকুমারীকে এক ঝলক দেখবার জন্য বোরখা পরে ঢুকে গেলেন বেগম কা বাগে । জাহানারার রূপ মাধুরী বর্ণনা করে একখানা শায়েরিও নামিয়ে ফেলেছিলেন ,কিন্তু ধরা পড়ে গেলেন খোদ বেগম সাহিবার হাতেই । তাকে কিছু সোনার মুদ্রা দিয়ে তখনই চলে যেতে বলেন জাহানারা । কিন্তু তার বাপের কানে কথাটা ঢুকতে কতক্ষণ? আর তার ফলে পারভেজ পাত্তারি গুটিয়ে আবার পারস্যে ।
প্রেমিকেরা সব লুকিয়ে চুরিয়ে আসত , মেহফিল মৌসিকি আশিকি সিরাজি সবই ছিল অফুরান ভরা পেয়ালা ।এক প্রেমিককে তো শাহজাহান বিষ মেশানো খাবার দিয়ে তার ইহলীলা সাঙ্গ করান , আরেক প্রেমিক তো ভয়ের চোটে বাথটাবের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে , কিন্তু বাপের ঝানু চোখ এড়ানো অত সহজ হয়নি । জাঁদরেল আব্বু হুকুম দিলেন ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দাও । আবার ইহলীলা সাঙ্গ । ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়া বারনিয়ে আর ইটালির পর্যটক নিকোলো মানুচ্চি কিছু কিছু লিখে গেছেন এই প্রসঙ্গে ।মেয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত কট্টর ছিলেন, যাকে বলে কিনা পসেসিভ । তবে মদিরামোহ ছিলো বিবিসাহিবার । উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারতেন না , টলে টলে পরে যেতেন । জীবনের সফেন সমুদ্র আকন্ঠ পান করতে এসেছিলেন তিনি , তাতে নানা রঙের মিশেল ছিল ,বিষাদ ছিল , প্রেম ছিল , রাজনীতি ছিল , ছিল দরিয়ার মতো হৃদয় ,আকাশের মতো ব্যাপ্ত ঔদার্য ।
 
সে যাই হোক , এরকমই এক প্রেমিকের সঙ্গে ছদ্মবেশে ঘুরছিলেন বেগম সাহিবা । পর্যটকদের , ভিনদেশীদের এই শহরে থাকা খাওয়ার হাল হকিকত খানিকটা মালুম হল তার । জাহানারা যাই করেছেন সারা জীবনে, সকলের ভালোর জন্যই করেছেন । গড়ে উঠল সরাইখানা , জাহানারা সরাই । এমন ভাবেই তৈরি করেছিলেন অনেক মাদ্রাসা , চালচুলোহীন লোকদের জন্য আশ্রয় । জান্নির বেইনতাহা ইশক আর মোহব্বতের ছায়ার তলায় ছিল অনেক অনেক মানুষ ।


আব্বাহুজুর , আয়নায় আপনার চেহারা দেখেছেন? কতো বুড়ো হয়ে গেছেন মাত্র এই কদিনে? “ বাবাকে যত্ন করে আরামকেদারায় বসিয়ে হারেমের খুঁটিনাটি কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো সতেরো বছরের জান্নি ।
সেদিন কমলালেবু রঙের রোদ লুটোপুটি খাচ্ছিল প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে । চবুতরায় দানা খাচ্ছে পায়রার দল । কিন্তু প্রাসাদ থমথমে । হারেমের সক্কলে , দাসী বাঁদি সবাই নিঃশ্বাস চেপে অপেক্ষা করছে । সূতিকাঘরে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মুমতাজ মহল । হেকিমসাহেব বেরিয়ে এলেন , কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠলো চলি মুমতাজ জন্নতাবাদচোদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মুমতাজ মারা গেলেন । শাহজাহান ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন । আর বেরোলেন না । এই একটি মৃত্যু সতেরোর কিশোরীকে হঠাত ই এক লহমায় একটা পোক্ত কাঠামোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিল । বাবার অন্য বেগমরা থাকলেও তাকেই দেওয়া হল সাম্রাজ্যের ফার্স্ট লেডি বা পাদিশাহ বেগমের সম্মান। প্রচুর সম্পত্তি এল , এল তার নিজের সীলমোহর । আব্বাহুজুর তার মতামতকে সম্মান করতেন ।তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান । মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বিগ্ন থাকতেন সম্রাট । দায়িত্বও কিছু কম ছিল না জাহানারার । প্রত্যেকটা খাবার তার নজরদারিতে বানানো হত । বিরাট হারেমের প্রায় সমস্ত কাজ রান্না বান্না ,জামাকাপড়, লেখাপড়া সব কিছুই তাকে দেখতে হত । 


জাহানারা আর দারাশিকো দুই ভাই বোনই সুফি সাধনা করতেন , দুজনেই কবিতা লিখতেন । দুজনেই একে অন্যের সহমরমী ছিলেনআজমের শরিফে জন্ম হয়েছিল জাহানারার ।
তার জীবন দেখেছে উপচে পড়া বিলাস আর শৌখিনতার । বেহিসাবি প্রাচুর্য । কিন্তু সেই রঙিন ফোয়ারায় খেলা করা এক ঝাঁক রঙিন মাছের মধ্যে একটা শূন্য বুদবুদ , স্ফটিক স্বচ্ছ । এক নিঃসীম বেদনার মুক্তো । সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে, চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগেসেই সহজিয়া অনুরাগ খুঁজে নেয় সুফি মরমিয়া সাধনার পথ ।
তিনি নিজের জীবনী লিখে গিয়েছিলেন আর সেটা আশ্চর্য ভাবে চলে আসে প্রায় দুশো বছর পরে এক বিদেশিনী পর্যটকের হাতে । সময় রাজনীতি ধর্ম কবিতা ছাড়াও সেই লেখায় একনিষ্ঠ ব্যর্থ প্রেমের করুণ হাহাকার !
 অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা / সে ভুলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে / আমি ভুলিব না আমি কভু ভুলিব না

কে সেই প্রেমিক?

No comments:

Post a Comment