Saturday, 6 May 2017

মৃগনয়নী


জু ,সখি ,মুহু মুহু গাহে পিক কুহুকুহু ,
কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায় ...
অলকে ফুল কাঁপয়ি কপোলে পড়ে  ঝাঁপয়ি...

রাই নদীর ধারে গ্রাম । রুখাশুখা ।  বেশির ভাগ মানুষ   খেতখামারে কোনরকমে  চাষ বাস করে দিন কাটায় । বাকিরা যায় বনের রসদ জোগাড় করতে । ফল মূল কাঠ জড়িবুটি মধু মোম । জন্তু জানোয়ারও । সেই ছোটবেলা থেকেই জঙ্গলে জঙ্গলে মিশে আছে নিন্নি । বাপ মা নেই ।  আহা রে ,  কি বেচারা  হতভাগা রে , এই সব শোনার বাতিক নেই তার । নিন্নি জঙ্গলের মেয়ে । রাই নদীর জল আর গ্রামের মাটি  মেখে মেখে বড় হয়েছে সে । হরিণের পিছনে পিছনে ছোটে , ময়ুরের সঙ্গে নাচে । তার খোলা চুলে বুনো ফুল উড়ে উড়ে এসে পড়ে ,ঘামে লেপটে গিয়ে মুখে আটকে যায় । কানের কাছে ভোমরা ডাকে । প্রজাপতি খোঁপার বাহার হয়ে বসে ।  নিন্নির নিশানা চোস্ত । এক তিরে ঘায়েল করে দেয় দুষ্টু জন্তুকে ।  খ্যাপা মোষের শিং ধরে  তাকে থামিয়ে দেয় । রাই নদীর ধারে গ্রাম । রুখা শুখা । সেই গ্রামের মাটি জলে তেতে পুড়ে হরিণের মতো চোখের সেই ডাগর মেয়ে ভয় কাকে বলে জানেই না ।
গ্রামের কিনারে যেখান দিয়ে নদী বয়ে গেছে সেদিক বরাবর পুব আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় আকাশ ফুঁড়ে এক বিশাল দৈত্যের মতো , না,  না এক অতি সুন্দর বলিষ্ঠ রাজার মতো দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের রাজার কেল্লা । রোদ্দুর পড়লে যেন চোখ ঝলসে যায় , এতো তার দেমাক  । হোলিতে ফাগ ওড়ে , দেওয়ালিতে সারা কেল্লা আলোয় আলোয় ঝলমল । নিন্নি তার হরিণ চোখ মেলে অবাক হয়ে দেখে । শুধুই দেখে । আর দেখে ঘোড়সওয়ার ধুলো উড়িয়ে  পতাকা দুলিয়ে খটখট করে তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যায় । রাজার রানিরা সব মহলের মধ্যেই থাকে । তারা বেরোয় না । কেউ তাদের দেখেও নি কোনোদিন ।
গ্রামের বড়রা সবাই বলাবলি করে , সময়টা নাকি ভালো নয় । ম্লেচ্ছ রাজারা নাকি সব লুটে নিতে চায় । এই কেল্লার ওপরে তাদের নাকি বেজায় লোভ । তবে তোমর রাজার হিম্মত আছে । তিনি কিছুতেই মাথা নোয়াতে রাজি নন ।  রাজাকে যদিও নিন্নি কোনদিন দেখে নি , তবে সবাই বলে দারুণ তাদের রাজা । শুধুই তলোয়ার চালান না , গান বাজনাও করেন ।
বাইরে থেকে আসা ওই লোকগুলো তাদের গ্রামের চারদিকেও ঘুরঘুর করে ।অদ্ভুত পোশাক, মুখের ভাষাও আলাদা ।  এই গ্রামের তার বয়সী অনেক মেয়ে , অনেকে আবার তার সখিও , ঝপাঝপ বিয়ে করে অন্য জায়গায় চলে গেল ।  সময়টা নাকি ভালো নয় । তারা গুজ্জর জাত । নিচু জাত বলে সবাই ।  পেটানো সুন্দর চেহারা তাদের  । নিন্নিকে সবাই বলে সে নাকি ভয়ানক সুন্দর । সে অতশত জানেনা ।   শুধু একদিন বিকেলের শেষ আলোয় রাই নদীর স্থির জলে নিন্নি নিজের ছায়া দেখেছিল , জলে ছায়া পড়েছিল দুটো দীঘল কালো চোখের , সেটা তার না   তার  পোষা বনের ওই হরিণ টার , নিন্নি বোঝেনি ।
গ্রামের মাতব্বর রাও বাপ মা মরা এই মেয়েটাকে বলে  “,ওরে নিন্নি একটু বুঝে শুনে চলিস । সময়টা বেশ খারাপ ।গ্রামের সুন্দরী ডাগর মেয়েদের খবর সব কোথায় কোথায় চলে যায়, জানিস তো ? এই তো সেদিন...“এমন কতো কথা কানে আসে ।
তবে তাকে সবাই একটু সমীহও করে । নিন্নিতো ডাকাবুকো , ভয় কাকে বলে জানেই না । এক তিরে ঘায়েল করে দেয় বুনো জন্তুকে । দামাল ষাঁড়ের শিং ধরে থামিয়ে দেয় । রাই নদীর ধারে গ্রাম । রুখাশুখা ।
কেমন করে সেই দামালপনার খবর পৌঁছে গেলো রাজার কেল্লায় ।  মানসিং তোমর সত্যই ব্যাকুল হয়ে উঠলেন সেই মেয়েকে দেখতে যে “ মাথার পরে দেয় নি তুলে বাস/ লজ্জা পাবার পায় নি অবকাশ “ ।




পিনহ চারু নীল বাস, হৃদয়ে  প্রণয় কুসুম রাশ,
হরিণ নেত্রে বিমল হাস, কুঞ্জবনমে আও লো।।

অবকাশ জুটেই গেলো । ওইরকমই এক মহিষ মর্দিনী অবস্থায় বনের ধারে দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদে নিন্নির সঙ্গে দেখা হল রাজার । রাজা মুগ্ধ হয়ে গেলেন শক্তি সাহস আর সৌন্দর্যের এক অনুপম মিশেল দেখে । বললেন , মৃগনয়নী ,তুমি আমার রানি হবে?
নিন্নি ভারি অবাক হয়ে  গেলো । রাজা বলে কি ? তারা গুজ্জর , ছোটো জাত ।  কিন্তু ঘাবড়ে যেতে সে রাজি নয় । মুখে বলল
“থাকবো কোথায় ?”
“কেন ? আমার প্রাসাদে ? ওই যে দেখা যাচ্ছে আমার কেল্লা , ওই যে নিশান উড়ছে । সেখানে তোমার মহল হবে “
“ না , না ওই অত দূরে আমি যাবোই না শুনেছি ওখানে বড়ই কড়াকড়ি । আমার দম আটকে যাবে যে

কেল্লার ভেতর 

হৃদয়ক সাধ মিশাওল হৃদয়ে ,কন্ঠে শুখাওল  মালা ।
বিরহ বিষে দহি বহি গল রয়নি ...।

রাজার মন ভেঙে গেলো । এতো দূর ছুটে এসেছেন  মৃগনয়নীর জন্য। অনেক মান ভঞ্জনের পর নিন্নি বলে ,
“ বিয়ে করবো তোমায় । কিন্তু আমার তিনটে শর্ত আছে ।“
“বলে দেখোই না আমাকে , কী তোমার শর্ত “।
“রাজা , আমি তোমার বাকি রানিদের সঙ্গে থাকতে পারবো না । শুনেছি তারা সব কোন অন্দরমহলে থাকে । তারা বাইরে আসে না । জালের ভেতর দিয়ে যেটুকু দেখা যায় , দেখে । গাঁয়ের কেউ কেউ বলে তারা কেশর জলে চান করে, দোলনায় দোলে , সবই কোন গোপন মহলে , কেউ তা জানতে পারে না । আমার খোলা মহল চাই , যার আঙিনায় রোদ ঝলসে উঠবে , মেঘ  বৃষ্টি ঝামড়ে পড়বে , শিশির জমে থাকবে , আমের বোল খসে খসে পড়বে , ময়ূর উড়ে বেড়াবে , এমনটাই চাই । দেবে?”
‘’দেবো , আর দুটো  বলে ফেলো”।
“ এই যে নদী দেখছ, এর জল খেয়ে আমি বড় হয়েছি । তাইতো এতো তাকত আমার । এই নদীর জল আমার মহল অবধি আসবে । আর শেষের টা   হল , আমি ওইসব ঘোমটা পরে আড়ালে আবডালে জালের পেছনে লুকিয়ে  থাকতে পারবো না । দেখছই তো আমরা গাঁয়ের  মানুষ রা কেমন থাকি ! রাজা, আমি তোমার সঙ্গে সব জায়গায় যাবো , এমনকি যুদ্ধেও , এবার  বল , রাজি ?”
রাজা একটু দোনোমনা দোনোমনা করে রাজি হয়ে গেলেন ।কারণ ততক্ষণে মৃগ নয়নী  রসিকমোহিনী,  তার হৃদয় হরনী হয়ে গেছে ।

সুন্দরি সিন্দুর দেকে সীঁথি করহ রাঙিয়া..
সহচরি সব নাচ নাচ মিলনগীত গাও রে
চঞ্চল মঞ্জীররাব কুঞ্জ গগন ছাও রে
মল্লিকা চামেলি বেলি কুসুম তুলহ বালিকা
গাঁথ যূথি ,গাঁথ জাতি, গাঁথ বকুলমালিকা

মহা ধুমধামে বিয়ে হয়ে গেলো । মাটি থেকে তিনশো মিটার উঁচুতে যদি গোয়ালিওর দুর্গ হয় তবে তার সানুদেশে বানানো হল  গুর্জর মহল । গুর্জর কন্যা মৃগনয়নীর জন্য । কৌশলী কারিগরিতে  নদীর জল বয়ে এলো মহলে । সত্যই  সেই মহলে কোন ঘোমটা নেই । আঙিনায় ময়ূর চরে বেড়ায় , ফুল পাতা খসে খসে এসে পড়ে । সকালে রোদের আলোয় ঝলমল করে, সারাদিন তেতে পুড়ে আবার সন্ধে বেলায় ঠান্ডা হয় । সব উড়িয়ে ধুলো ঝড় মাখে । সকালে পুব আকাশে জ্বল জ্বল করে শুকতারা তার মাথার ওপর । মৃগনয়নীর জীবনেও এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় । রুখাশুখা গ্রামের মেয়ে সে । বেঁচে থাকার মানে সে জানে ।  রাজাকে তার কর্তব্য মনে করিয়ে দেয় । শর্তই ছিল যে সবসময় রাজার পাশে পাশে থাকবে । অন্দরমহলে নয় ।
ইতিহাসে কতো জল মিশে যায়  । অনেকেই বলে সে ছিল নিচু জাতের । তোমর বংশের সঙ্গে এই বিয়ে সমাজ তো মেনে নেয় নি । তাই তাকে এক ঘর করে কেল্লার বাইরে রাখা হয়ে ছিল । রাজার বাকি আট জন রানি তার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখত না ।
মৃগনয়নী খুব মন দিয়ে গান শিখে ছিল । খুব ভালো গাইত সে ।  তানসেনের গুরু হরিদাস স্বামীর কাছে তার তালিম । ওদিকে দুর্গ প্রাসাদে রানিরাও জাফরির মধ্যে বসে গান শিখত ।  আর মৃগ নয়নী এক পিঠ খোলা চুল নিয়ে  উঠোনে বসে গান ধরতো, তখন অমল তাসের হলুদ ফুল তার চুল পোশাক সব রাঙিয়ে দিত ।
ঢালে কুসুম সুরভভার,ঢালে বিহগসুরবসার
ঢালে ইন্দু অমৃতধার বিমল রজতভাতি রে ...


খোলামেলা গুর্জর মহল , এখন এ এস আই এর মিউজিয়াম , কেল্লা থেকে তোলা 


রানিদের ঘুলঘুলি 



আরো ঘুলঘুলি 

তিন তিন দুই মোট আট টা জাফরির মধ্যে বসে আট রানি গান শিখত  

 ৫

সুজনক পীরিতি নৌতুন নিতি নিতি,নহি টুটে জীবনমরণে ।।

মানসিং আর মৃগ নয়নীর প্রেমগাথা ইতিহাস খ্যাত । দেশে কালে এমন অনেক অনেক কাহিনি আছে ।
তখনও মুঘল শাসন শুরু হয় নি । ইব্রাহিম লোধি দিল্লির তখতে । গোয়ালিওর দুর্গ দখল করতে জান লড়িয়ে দিচ্ছেন ।
এদের প্রেম কথা আভাস নিয়ে আসে রানাদিল আর দারা শিকোহ র মোহব্বতের । রানাদিল , যে  অনাথ মেয়েটি তানসেনের ছেলে বিলাস খানের স্নেহ ধন্য ছিল ভাগ্য বিপাকে  হয়ে পড়ে  স্রেফ  রাস্তার নাচিয়ে ।  মহলের আদবকায়দায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতো । দারার সঙ্গে বিয়ের পর রানাদিলও আলাদা মহলেই থাকত , আগ্রায় । তারা ভরা  খোলা আকাশের  নিচে আশিকের হাত ধরে উধাও হতে চেয়েছে কতবার ।
কেল্লা রক্ষা করতে পারেন নি  মানসিং তোমর । তার আট রানি চন্দন কাঠের চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে জহর ব্রত পালন করেছিল । তখন কেল্লা থেকে দূরে যুদ্ধ ভূমির রক্তে মৃগনয়নী নিন্নি আর মানসিংহের নিথর দেহে  কোনো এক ভানুসিংহ সুর ঝরিয়েছিলেন
“কতো নরনারীক মিলন টুটাওত , ডারত বিরহ হুতাশে” ।




No comments:

Post a Comment